গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি বিশাল মাঠ। বর্ষাকালে সেখানে পানি জমে ছোট ছোট আয়না তৈরি হতো। শীতের সকালে সেই মাঠজুড়ে ঝরে থাকত শিশির, আর বসন্ত এলে কচি ঘাসের গন্ধে চারদিক ভরে উঠত।

মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বহু বছরের পুরোনো কদমগাছ। তার বিশাল ডালপালা যেন আকাশকে ছুঁয়ে থাকার চেষ্টা করত। সেই গাছের ছায়াতেই প্রতিদিন গরু চরাতে আসত রাখাল ছেলে রুদ্র।

রুদ্রের সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ছিল একটি বাঁশি।

বাঁশিটা সে নিজেই বানিয়েছিল। মাঠের ধারের বাঁশঝাড় থেকে একটি সরু বাঁশ কেটে এনে তৈরি করেছিল সেটি। দেখতে সাধারণ, অথচ রুদ্র যখন তাতে সুর তুলত, তখন মনে হতো—এই সামান্য বাঁশের ভেতরে যেন কোনো অদৃশ্য জগতের দরজা লুকিয়ে আছে।

প্রতিদিন বিকেল হলেই রুদ্র কদমগাছের নিচে বসত। গরুগুলো আপনমনে ঘাস খেত, দূরে কৃষকেরা দিনের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরত, আর পশ্চিম আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠত।

রুদ্র তখন বাঁশি বাজাত।

তার সুর কখনো নদীর মতো শান্ত, কখনো পাখির ডানার মতো চঞ্চল, আবার কখনো এত বিষণ্ণ হয়ে উঠত যে মনে হতো—কেউ যেন বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া কাউকে দূর থেকে ডাকছে।

কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল অন্যরকম।

রুদ্র বাঁশিতে একটি দীর্ঘ সুর তুলতেই হঠাৎ চারপাশের বাতাস থেমে গেল।

গরুগুলো ঘাস খাওয়া বন্ধ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাঠের ঘাসগুলো নড়ে না, গাছের পাতাও কাঁপে না। অথচ আকাশে কোথাও কোনো মেঘ নেই।

তারপর হঠাৎ কদমগাছের মাথার ওপর নীলাভ আলো জ্বলে উঠল।

সেই আলোর ভেতর থেকে ঝরে পড়তে লাগল অসংখ্য সাদা ফুল। ফুলগুলোর আলো ভেদ করে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল এক অপরূপ কন্যা।

তার পোশাক ছিল ভোরের কুয়াশার মতো শুভ্র। কালো চুলের মাঝে জোনাকির আলো জ্বলছিল। হাতে ছিল তারার মতো ঝলমলে একটি জাদুর কাঠি। সে মাটিতে পা রাখতেই আশপাশের ঘাসগুলো যেন আনন্দে দুলে উঠল।

রুদ্র ভয়ে উঠে দাঁড়াল।

—তুমি কে?

মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,

—আমি ইন্দুলেখা। পরীদের রাজ্যের একজন রাজকুমারী।

রুদ্র বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

ইন্দুলেখা বলল,

—তোমার বাঁশির সুর আমাদের দেশে পৌঁছে গেছে।

—আমাদের দেশে?

—হ্যাঁ। পরীদের দেশে। বহু বছর ধরে মানুষের কোনো বাঁশির সুর আমাদের রাজ্যে পৌঁছায়নি। তোমার সুরে এমন কিছু আছে, যা আমাদের জগতের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে।

রুদ্র কিছু বলার আগেই ইন্দুলেখা তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

—চলো, তোমাকে আমাদের দেশ দেখাব।

রুদ্র দ্বিধায় পড়ল।

—কিন্তু আমার গরুগুলো?

ইন্দুলেখা হেসে বলল,

—তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তারা তোমার অপেক্ষায় থাকবে।

রুদ্র পরীর হাত ধরল।

মুহূর্তেই তার পায়ের নিচের মাটি যেন হালকা হয়ে গেল। বাতাস তাকে তুলে নিতে লাগল।

মাঠ ছোট হতে লাগল।

কদমগাছ ছোট হতে হতে একসময় বিন্দুর মতো হয়ে গেল। গ্রামের ঘরগুলো কুয়াশার ভেতর হারিয়ে গেল। নদী, মাঠ, গাছপালা—সবকিছু নিচে পড়ে রইল।

তারপর হঠাৎ—

চারদিক আলোয় ভরে গেল।

রুদ্র চোখ মেলে দেখল এমন এক জগৎ, যার কথা সে শুধু দিদিমার রূপকথায় শুনেছে।

সেখানে নদীর পানি ছিল রুপালি। কোনো নৌকা চলত না সেই নদীতে; বিশাল পদ্মফুলই ছিল সেখানকার নৌকা। পাহাড়গুলো ছিল নীল, আর তাদের বুক থেকে ঝরে পড়ছিল সোনালি আলো।

গাছের পাতায় বাতাস লেগে সৃষ্টি হতো টুংটাং শব্দ —যেন হাজারো রুপালি ঘণ্টা একসঙ্গে বাজছে।

আকাশে পাখির বদলে উড়ছিল রঙিন প্রজাপতি। কিছু প্রজাপতির ডানায় ছিল নক্ষত্রের মতো আলো।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—এত সুন্দর দেশ আমি কখনো দেখিনি!

ইন্দুলেখা মৃদু হেসে বলল,

—তোমাদের পৃথিবীও এমনই সুন্দর।

—তাহলে আমরা দেখতে পাই না কেন?

—কারণ মানুষ কাছের সৌন্দর্যকে দেখতে পায় না। অনেক সময় সৌন্দর্যের মাঝখানে থেকেও সৌন্দর্যকে খুঁজতে দূরে চলে যায়।

কথা বলতে বলতে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল।

এমন সময় দূর থেকে কয়েকজন পরী তাদের দিকে এগিয়ে এল।

ইন্দুলেখা একটু চিন্তিত হয়ে বলল,

—তোমাকে অন্য কেউ দেখে ফেললে বিপদ হতে পারে। আমাদের রাজ্যের সবাই মানুষের প্রতি বিশ্বাসী নয়।

তারপর সে জাদুর কাঠি ঘুরিয়ে রুদ্রকে একটি ছোট্ট পাখিতে পরিণত করে দিল।

রুদ্র অবাক হয়ে নিজের ডানা মেলল।

তারপর উড়ে উঠল আকাশে।

এ যেন তার জীবনের নতুন আনন্দ।

উড়তে উড়তে সে একসময় রাজপ্রাসাদের কাছে চলে গেল। বিশাল সোনালি প্রাসাদটি মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার চূড়াগুলো সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে।

প্রাসাদের এক বাগানে রুদ্র এমন একটি গাছ দেখতে পেল, যা দেখে তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

গাছটির পাতাগুলো ছিল সোনালি, আর ডালে ঝুলছিল সোনার মতো উজ্জ্বল আপেল।

রুদ্রের মনে পড়ে গেল দিদিমার গল্প।

দিদিমা বলতেন—

“সোনালী আপেল গাছ পৃথিবীর কোনো গাছ নয়। তার একটি পাতাও যদি সত্যিকারের ভালো মানুষের হাতে যায়, তবে তা তার একটি ইচ্ছা পূরণ করতে পারে।”

রুদ্র কিছুক্ষণ গাছটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, যদি এই গাছের একটি ডাল সে পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারে!

কিন্তু পরক্ষণেই নিজের মনকে থামিয়ে দিল।

“আমি তো একজন সাধারণ রাখাল। রাজপ্রাসাদের গাছের ডাল চাওয়ার অধিকার আমার কোথায়?”

কিছুক্ষণ পর ইন্দুলেখা তার সখীদের বিদায় দিয়ে ফিরে এলো।

রুদ্র আবার মানুষ হয়ে তার সামনে দাঁড়াল।

কথায় কথায় নিজের অজান্তেই সে সোনালী আপেল গাছটির কথা বলে ফেলল।

ইন্দুলেখা মৃদু হেসে বলল,

—তুমি জানো, এই গাছ আমাদের রাজ্যে খুবই দুর্লভ। সারা রাজ্যে মাত্র তিনটি গাছ আছে।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে কি আমি একটি ডাল পেতে পারি?

—পেতে পারো। তবে সহজে নয়।

—কী করতে হবে?

— সাত দিন এই গাছের পরিচর্যা করতে হবে। আর তোমাকে তিনটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সেগুলো হলো লোভ, অহংকার, ঈর্ষা, ভালোবাসা এবং ন্যায়-অন্যায়ের পরীক্ষা।

রুদ্র রাজি হলো।

ইন্দুলেখা তাকে সোনালী আপেল গাছের কাছে নিয়ে গেল। তাকে মানুষ থেকে পাখি এবং পাখি থেকে মানুষ হওয়ার মন্ত্র শিখিয়ে দিল।

—আজ থেকেই তোমার কাজ শুরু। সাত দিন পরে আমাদের আবার দেখা হবে।

প্রথম পরীক্ষা

রুদ্র গাছের চারপাশের আগাছা পরিষ্কার করছিল।

হঠাৎ রুগ্ন বিড়ালের মতো দেখতে একটি ছোট প্রাণী তার কাছে এসে বলল,

—আমাকে একটু পানি দাও। খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।

রুদ্রের কাছে তখন অল্প পানি ছিল, যা সে গাছটিকে দেওয়ার জন্য এনেছিল।

সে কিছুক্ষণ ভাবল।

“আমি আবার পানি নিয়ে আসতে পারব। কিন্তু এই প্রাণীটির হয়তো এখনই পানিটা দরকার।”

সে সমস্ত পানি প্রাণীটিকে দিয়ে দিল।

প্রাণীটি পানি পান করে খুশি হয়ে বলল,

—তুমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—পরীক্ষা?

প্রাণীটি মৃদু হেসে বলল,

—আমার নাম ইকুরা। আমি এই গাছের পাহারাদার।

তারপর সে দূরের একটি পাহাড় দেখিয়ে বলল,

—এখন দ্বিতীয় পরীক্ষা। আজ ওই পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে ঘুমাবে। কারণ আমাদের রাজ্যে রাত আসে না। পাহাড়ের গুহাই কেবল অন্ধকার। কালকে ফিরে এসো।

রুদ্র পাহাড়ের দিকে রওনা হলো।

অনেক পথ পেরিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে সে উপরে উঠতে লাগল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ক্লান্ত হয়ে একসময় একটি গুহা দেখতে পেল।

গুহার ভেতরেই ঘুমিয়ে পড়ল সে।

কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতেই রুদ্র অবাক হয়ে গেল।

গুহার ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আকাশ যেন তার একেবারে মাথার ওপর।

হাজার হাজার আলো ঝলমল করছে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল—ওগুলো তারা নয়।

গুহার দেয়াল ও মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মণিমুক্তা।

দিদিমার গল্পে সে শুনেছিল, এমন একটি মুক্তার মূল্য পৃথিবীর সাত রাজার ধনের সমান।

রুদ্রের চোখে বিস্ময় ছিল, কিন্তু লোভ ছিল না।

সে শুধু একটি ছোট পাথর তুলে নিল।

“আমি যে এখানে এসেছিলাম, তার স্মৃতি হিসেবে এটা রাখব।”

তারপর সে ফিরে এল সোনালী আপেল গাছের কাছে।

ইকুরা তাকে দেখে বলল,

—তুমি দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছ। এত মণিমুক্তার ভিতরে রাত কাটিয়ে তুমি খালি হাতে ফিরে এলে।

রুদ্র অবাক হয়ে নিজের পকেট থেকে পাথরটি বের করল।

ইকুরা পাথরটি দেখে চমকে উঠল।

—তুমি জানো, এটা কী?

—না।

—ওই পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা মণিমুক্তার মধ্যে এটিই একমাত্র পাথর, যার মূল্য সবকিছুর চেয়ে বেশি। কিন্তু তুমি যদি লোভ করে এটিকে নিতে চাইতে, তবে তুমি সেখানে থেকেই ধ্বংস হয়ে যেতে।

রুদ্র অবাক হয়ে পাথরটির দিকে তাকাল।

ইকুরা বলল,

—এই পাথর তোমাকে যেকোনো জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। তুমি শুধু এটি মুঠোর মধ্যে নিয়ে যে জায়গার কথা মনে করবে, সেখানেই পৌঁছে যাবে।

তারপর বলল,

—এখন গাছের পরিচর্যা করো। আজ তোমাকে পাশের জঙ্গলে ঘুমাতে হবে।

তৃতীয় পরীক্ষা

রুদ্র আবার গাছের পরিচর্যা শুরু করল।

গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে সে কয়েকটি ছোট প্রাণী দেখতে পেল। অসাবধানতায় আগাছা পরিষ্কার করার সময় তারা আহত হয়েছিল।

রুদ্র নিজের কাজ ভুলে তাদের সেবা করতে লাগল।

সবচেয়ে ছোট প্রাণীটি এতটাই আহত ছিল যে হাঁটতেও পারছিল না।

রুদ্র সেটিকে নিজের সঙ্গে নিয়ে নিল।

কাজ শেষ করে পাথরটি হাতে নিয়ে সে পাশের জঙ্গলের কথা মনে করল।

মুহূর্তের মধ্যেই সে জঙ্গলের ভেতরে পৌঁছে গেল।

হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল এক হিংস্র ও দানবাকৃতির প্রাণী।

তার দেহ পাহাড়ের মতো বিশাল, চোখ দুটো অন্ধকার আগুনের মতো জ্বলছে।

রুদ্র ভয়ে স্থির হয়ে গেল।

প্রাণীটি ধীরে ধীরে তার কাছে এসে তাকে শুঁকল।

রুদ্র ভাবল, এবার হয়তো আর রক্ষা নেই।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে প্রাণীটি তাকে কোনো ক্ষতি না করেই চলে গেল।

রুদ্র ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।

দুদিন পর ইন্দুলেখা এসে তাকে জাগাল।

—রুদ্র! তুমি এখানে দুদিন ধরে ঘুমিয়ে আছ! তোমার কী হয়েছে?

রুদ্র সব ঘটনা বলল।

ইন্দুলেখা বিস্ময়ে বলল,

—এটা অসম্ভব! এই প্রাণী আমাদের রাজ্যে কোনো প্রাণীকে জীবিত রাখে না।

ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল রুদ্রের পকেট থেকে বের হওয়া ছোট প্রাণীটির দিকে।

সবকিছু বুঝতে তার আর বাকি রইল না।

—এটি ওই বিশাল প্রাণীটির সন্তান!

ইন্দুলেখা বলল,

—তুমি বুঝতে পারছ, তুমি কী পেয়েছ? এই প্রাণীটিকে ব্যবহার করে আমরা ওই বিশাল প্রাণীটিকে পরাজিত করতে পারি।

রুদ্র মাথা নাড়ল।

—না।

ইন্দুলেখা বলল,

—তাহলে তুমি কী চাও?

—আমি কাউকে হত্যা করে কিছু পেতে চাই না।

ইন্দুলেখা এবার তাকে নানা প্রলোভন দেখাল।

—তোমাকে আমাদের রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে। যত মণিমুক্তা চাও পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারবে।

রুদ্র শান্তভাবে বলল,

—প্রাণীটি এই জঙ্গলেই থাকে। তোমাদের রাজ্য দখল করেনি, আমারও কোনো ক্ষতি করেনি। তাহলে তাকে হত্যা করব কেন?

ইন্দুলেখা বলল,

—তুমি রাজি না হলে, কিছুই পাবে না।

রুদ্র সেই ছোট্ট প্রাণীটির মাথায় হাত রেখে বলল,

—আর এই নিষ্পাপ বাচ্চাটিকে তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে—এটা তো আরও বড় অন্যায়। আমাকে ক্ষমা করো। আমি এটা কোনোদিন করতে পারব না।

মুহূর্তেই চারপাশের জঙ্গল নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

ইন্দুলেখার শরীর থেকে আলো বের হতে লাগল।

তার সাদা পোশাক বদলে গেল সবুজ-সোনালি আভায়। মাথায় ফুটে উঠল বনফুলের মুকুট। তার হাতে থাকা জাদুর কাঠি পরিণত হলো অরণ্যের লতায়।

রুদ্র বিস্ময়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন জঙ্গলের দেবী—বনমায়া।

দেবী মৃদু হেসে বললেন,

—ভয় পেও না, বৎস। আজ তুমি আমার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—তাহলে ইন্দুলেখা?

—সে আমারই রূপ ছিল।

বনমায়া বললেন,

—লোভকে তুমি জয় করেছ। ক্ষমতার সামনে মাথা নত করোনি। দুর্বল প্রাণীর প্রতি মায়া দেখিয়েছ। আর নিজের স্বার্থের জন্য নিরপরাধ কাউকে হত্যা করতে অস্বীকার করেছ। এ কারণেই তুমি এই জগতের যোগ্য অতিথি।

দেবী তার হাত বাড়িয়ে দিলেন।

সেখানে দেখা গেল একটি অপূর্ব বাঁশি।

—এই বাঁশিটি তোমার। এর সুরে তুমি বনের সব পশু-পাখির সঙ্গে কথা বলতে পারবে। তাদের ভাষা বুঝতে পারবে, তারাও তোমার কথা বুঝবে।

রুদ্র কৃতজ্ঞতায় মাথা নত করল।

রুদ্র সোনালী আপেল গাছের নিচে ফিরে এলো।

ইকুরা তার হাতে বাঁশিটি দেখে বিস্মিত হলো।

—তুমি নিশ্চয়ই জঙ্গলের দেবী বনমায়াকে সন্তুষ্ট করেছ। একই সঙ্গে তৃতীয় পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হয়েছ।

রুদ্র কিছু বলল না।

ইকুরা বলল,

—তোমার সরলতা, প্রাণের প্রতি ভালোবাসা আর সম্পদের প্রতি অনাসক্তি আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমিও তোমাকে একটি উপহার দিতে চাই।

সে একটি সাধারণ দেখতে পাটি বের করল।

—এটা তোমার।

রুদ্র অবাক হয়ে বলল,

—পাটি দিয়ে আমি কী করব?

ইকুরা হেসে বলল,

—তোমাকে এটা বয়ে বেড়াতে হবে না, এটা তোমার হুকুমে উপস্থিত হবে।
তুমি যেখানে, যেভাবে, যে কাজে চাইবে সেভাবেই ব্যবহার করতে পারবে। নৌকার মতো চাইলে নদীতে ভাসবে, বিছানার মতো চাইলে ঘুমাতে পারবে, আবার চাইলে পক্ষীরাজের মতো আকাশেও উড়তে পারবে।

রুদ্র আনন্দে পাটিটি গ্রহণ করল।

দেখতে দেখতে সাত দিন কেটে গেল।

সোনালী আপেল গাছটি যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠল। রুদ্র প্রতিদিন যত্ন করে তার গোড়া পরিষ্কার করেছে, পানি দিয়েছে, আহত প্রাণীদের সেবা করেছে।

সপ্তম দিনে রাজপ্রাসাদের বাগানে এসে দাঁড়ালেন পরীদের রাজা।

বাগানের দিকে তাকিয়ে তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন,

—কে আমার গাছের এত যত্ন নিয়েছে?

ইকুরা সামনে এসে বলল,

—মহারাজ, একজন মানব সন্তান।

রাজার মুখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।

—মানুষ?

তিনি ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,

—যাদের হাত ধ্বংস করতে জানে, তারা আমাদের রাজ্যে কীভাবে প্রবেশ করল?

ইকুরা শান্তভাবে বলল,

—মহারাজ, তাকে একবার শুনুন।

তারপর সে রুদ্রের সাত দিনের সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।

রাজা সব শুনলেন। কিন্তু সোনালী আপেলের ডালের কথা উঠতেই তিনি মাথা নাড়লেন।

—না। শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই এই ডাল দেওয়া যাবে না। আগের পরীক্ষাগুলো আমাদের রাজ্যের নাগরিকদের জন্য। একজন মানুষের জন্য আলাদা পরীক্ষা হবে।

রাজা আদেশ দিলেন,

—রুদ্রকে আমার সামনে হাজির করো।

রুদ্র রাজদরবারে এসে দাঁড়াল।

রাজা গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—রুদ্র, তুমি এই সোনালী আপেলের ডাল দিয়ে কী করবে?

রুদ্র নীরব।

রাজা আবার বললেন,

—তুমি লোভকে জয় করেছ। অহংকারকে প্রত্যাখ্যান করেছ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছ। তাহলে এমন একটি ডালের জন্য এত কষ্ট কেন?

রুদ্র ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তার চোখে তখন আর কোনো ভয় নেই।

সে বলতে শুরু করল—

—মহারাজ, এই ডাল আমার নিজের জন্য নয়।

দরবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

রুদ্র বলল,

—আমাদের পরিবারে বাবা, মা, আমার ছোট বোন আর আমি—এই চারজন ছিলাম। আমরা খুব ধনী ছিলাম না, আবার অভাবেও ছিলাম না।

আমার বাবা বাঁশি বাজাতে খুব ভালোবাসতেন। তিনি আমার মতোই মাঠে গরু চরাতেন। সন্ধ্যা হলে কদমগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতেন।

একদিন হঠাৎ বাবা নিখোঁজ হয়ে গেলেন।

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া গেল না।

শেষ পর্যন্ত আমরা এক সন্ন্যাসীর কাছে গেলাম।

সন্ন্যাসী বললেন, কিছু দুষ্ট পরী আমার বাবাকে কুহেকাফে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রেখেছে।

শুধু তাই নয়—আমার মায়ের ওপরও তারা অভিশাপ দিয়েছে।

সন্ন্যাসী বলেছিলেন, মা এখনো জীবিত আছেন। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি এমন অবস্থায় চলে যাবেন, যখন বেঁচে থেকেও নড়তে পারবেন না, কথা বলতে পারবেন না।

রুদ্রের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

—তবে সন্ন্যাসী আরও একটি কথা বলেছিলেন।

আমি যদি কোনো ভালো পরীকে আমার বাঁশির সুরে সন্তুষ্ট করতে পারি এবং তার রাজ্য থেকে সোনালী আপেল গাছের একটি ডাল পৃথিবীতে নিয়ে যেতে পারি, তবে সেই ডালের একটি পাতা আমার মায়ের অভিশাপ দূর করতে পারবে এবং আমার বাবাকেও মুক্ত করা সম্ভব হবে।

আমরা তখনও সন্ন্যাসীর কথা বিশ্বাস করব কি না বুঝতে পারছিলাম না।

এর মধ্যেই মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

আমার ছোট বোনটি এতটাই ছোট যে মায়ের যত্ন নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তাই আমি তাকে সবকিছু শিখিয়ে দিলাম—কীভাবে মাকে পানি দিতে হবে, কীভাবে খাবার খাওয়াতে হবে, কীভাবে মায়ের পাশে বসে থাকতে হবে।

তারপর আমি বাঁশি বাজানো শিখলাম।

দিনের পর দিন মাঠে বসে বাঁশি বাজিয়েছি।

একদিন সেই সুর ইন্দুলেখার কাছে পৌঁছাল।

তারপরের ঘটনা আপনারা সবাই জানেন।

রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর দুই হাত জোড় করে বলল,

—মহারাজ, আমি সোনালী আপেলের ডাল চাই আমার নিজের কোনো ইচ্ছা পূরণের জন্য নয়।

আমি চাই আমার বাবা-মাকে ফিরে পেতে।

আমার মা যেন আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

আমার বাবা যেন আবার সন্ধ্যায় কদমগাছের নিচে বসে বাঁশি বাজাতে পারেন।

আর আমার ছোট বোনটি যেন আবার তার বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাতে পারে।

রুদ্রের কণ্ঠ এবার আরও ভারী হয়ে এল।

—এই ডালটি আমার কাছে সোনা নয়, মণিমুক্তা নয়। এটি আমার পরিবারের শেষ আশার আলো।

দরবারে নেমে এলো গভীর নীরবতা।

রাজা দীর্ঘক্ষণ রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

রাজার চোখেও তখন অদ্ভুত এক কোমলতা।

তিনি বললেন,

—রুদ্র, তুমি জানো, আমাদের রাজ্যে বহু মানুষ এসেছে। কেউ চেয়েছে অমরত্ব, কেউ চেয়েছে ধনসম্পদ, কেউ চেয়েছে ক্ষমতা। কিন্তু তুমি এমন কিছু চাইছ, যা নিজের জন্য নয়।

তিনি ইকুরার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—এই ছেলেটি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি। সে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে—মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার হৃদয়।

তারপর রাজা নিজ হাতে সোনালী আপেল গাছের একটি ছোট ডাল কাটলেন।

ডালে ছিল মাত্র সাতটি সোনালী পাতা।

তিনি সেটি রুদ্রের হাতে দিয়ে বললেন,

—এই ডাল তোমার।

কিন্তু রুদ্র ডালটি হাতে নিতেই রাজা বললেন,

—শুধু ডাল নয়। আজ থেকে তোমার বাবা আর বন্দী নন।

মুহূর্তেই রাজপ্রাসাদের দরজা খুলে গেল।

সেখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

দীর্ঘদিনের ক্লান্তি মুখে, কিন্তু চোখে সেই চেনা মায়া।

রুদ্র এক মুহূর্ত তাকে চিনতে পারল না।

তারপর লোকটি মৃদু কণ্ঠে বলল—

—রুদ্র...

একটি শব্দ।

শুধু একটি শব্দই যথেষ্ট ছিল।

রুদ্র দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

তার চোখের জল আর থামল না।

রাজা বললেন,

—তোমার মায়ের অভিশাপও আজ শেষ হবে।

রুদ্র কাঁপা হাতে সোনালী পাতাগুলোর দিকে তাকাল।

রুদ্র এবার পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল।

ইকুরা তাকে বিদায় দিতে এল।

পাহাড়ের সেই পাথর, বনমায়ার দেওয়া বাঁশি তার হাতে, ইকুরার দেওয়া জাদুর পাটি তার সঙ্গে, আর বুকের কাছে সযত্নে রাখা সোনালী আপেলের ডাল।

রাজা বললেন,

—তুমি যখনই সত্যিকারের প্রয়োজনে আমাদের স্মরণ করবে, পরীদের রাজ্যের দরজা তোমার জন্য খুলে যাবে।

ইন্দুলেখা মৃদু হেসে বলল,

—তবে মনে রেখো, রুদ্র—জাদু কখনো মানুষের জীবন সুন্দর করে না। মানুষের ভালোবাসাই জাদুকে অর্থ দেয়।

রুদ্র মাথা নত করল।

তারপর পাটির ওপর বসে সোনালী পাথরটি মুঠোর মধ্যে নিল।

চোখ বন্ধ করল।

মনে মনে নিজের গ্রামের কথা ভাবল।

মুহূর্তেই চারপাশের আলো মিলিয়ে গেল।

চোখ খুলে সে দেখল—

সেই পরিচিত মাঠ।

সেই পুরোনো কদমগাছ।

সন্ধ্যার মায়াবী আকাশ।

আর মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে রুদ্রের প্রিয় গরুগুলো।

সবকিছু আগের মতোই আছে, অথচ রুদ্রের কাছে পৃথিবীটা যেন একেবারেই নতুন।

তার হাতে তখন শক্ত করে ধরা সোনালী আপেলের ডাল।

রুদ্র জাদুর পাটিটি মেলে তার বাবাকে তাতে বসিয়ে দিল।

—বাবা, তুমি বাড়ি যাও। আমি সন্ন্যাসীর কাছে যাচ্ছি। একটু পরেই তোমার সঙ্গে দেখা হবে।

বাবা ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—তাড়াতাড়ি ফিরে এসো, বাবা।

রুদ্র মাথা নেড়ে সন্ন্যাসীর আশ্রমের দিকে ছুটে গেল।

সন্ন্যাসী তখন আশ্রমের সামনে বসে ছিলেন। রুদ্রকে দূর থেকে দেখেই তার চোখ আটকে গেল সোনালী ডালটির দিকে।

রুদ্র কাছে যেতেই সন্ন্যাসীর মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল।

—তুমি পেরেছ, রুদ্র! তুমি সত্যিই পেরেছ!

রুদ্র কোনো কথা বলল না। শুধু কাঁপা হাতে সোনালী ডালটি সন্ন্যাসীর হাতে তুলে দিল।

সন্ন্যাসী অত্যন্ত যত্নে ডালটি গ্রহণ করলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে একটি প্রাচীন মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন।

মন্ত্রের প্রতিটি শব্দের সঙ্গে আশপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল।

হঠাৎ সোনালী ডাল থেকে একটি পাতা নিজে থেকেই আলাদা হয়ে সন্ন্যাসীর হাতে এসে পড়ল।

সন্ন্যাসী পাতাটিকে দুই হাতের মাঝে ধরে আবার মন্ত্র পাঠ করলেন।

তারপর পাতাটি মাটির দিকে ছুড়ে দিলেন।

পাতাটি মাটিতে পড়ামাত্র চারপাশে তীব্র সোনালী আলো ছড়িয়ে পড়ল।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আশ্রমের চারপাশের গাছপালা, মাটি, আকাশ—সবকিছু যেন সেই আলোয় ভেসে গেছে।

অন্যদিকে—

একটি ছোট্ট ঘরে নিস্তব্ধ হয়ে শুয়ে ছিলেন রুদ্রের মা।

হঠাৎ তার আঙুল নড়ে উঠল।

তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেললেন তিনি।

বহুদিন পর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন।

তিনি হাত তুললেন।

নিজের মুখ স্পর্শ করলেন।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।

দরজার দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে ডাকলেন—

—মা...!

কণ্ঠস্বর শুনে তার ছোট মেয়েটি যেন বিশ্বাসই করতে পারল না।

সে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল।

—মা! তুমি কথা বলছ!

মা তার মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

সেই কান্নায় ছিল বহুদিনের কষ্ট, ভয় আর অসহায়তা—কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

মায়ের চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

ঠিক তখনই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালেন রুদ্রের বাবা।

তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন।

তারপর মাকে দেখে বললেন—

—তুমি... তুমি সুস্থ হয়ে গেছ!

মা কিছু না বলে শুধু হাত বাড়িয়ে দিলেন।

দুজনের চোখে তখন অশ্রু।

ছোট মেয়েটি একবার বাবার দিকে, একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আনন্দে কাঁদতে লাগল।

বহুদিন পর সেই ছোট্ট ঘরে আবার একটি পরিবারের নিঃশ্বাস একসঙ্গে মিশে গেল।

তবু একজনের অপেক্ষা রয়ে গেল।

রুদ্রের।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে সন্ন্যাসীর সঙ্গে রুদ্রকে আসতে দেখা গেল।

রুদ্র উঠোনে পা রাখতেই তার ছোট বোন ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।

—ভাইয়া! মা ভালো হয়ে গেছে!

রুদ্র কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।

সে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

মা ছেলের মাথায় হাত রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

—তুই কোথায় ছিলি এতদিন, বাবা?

রুদ্র মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,

—তোমাদের কাছে ফিরতেই তো গিয়েছিলাম, মা।

তারপর সে বাবার দিকে তাকাল।

বাবা এগিয়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

সেই আলিঙ্গনে কোনো কথা ছিল না।

ছিল শুধু ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

রুদ্র চারজনকে একসঙ্গে দেখে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

এই সেই পরিবার—যে পরিবারটিকে সে একদিন হারাতে বসেছিল।

আজ আবার সবাই একসঙ্গে।

মা সুস্থ।

বাবা ফিরে এসেছে।

ছোট বোন হাসছে।

আর সে নিজেও ফিরে এসেছে।

রুদ্র আকাশের দিকে তাকাল।

সন্ধ্যার আকাশে তখন একটি তারা জ্বলেছে।

তার মনে পড়ল ইন্দুলেখার কথা, বনমায়ার আশীর্বাদ, ইকুরার উপহার, সোনালী আপেল গাছের বাগান, সেই অদ্ভুত পরীদের দেশ আর রাজাকে।

মনে মনে সে বলল—

“আমি জানি না, তোমরা কোথায় আছ। কিন্তু তোমাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।”

সন্ন্যাসী নীরবে রুদ্রের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

তিনি বললেন,

—মনে রেখো রুদ্র, তোমার বাবা-মাকে ফিরিয়ে দিয়েছে শুধু ওই সোনালী পাতা, এমন নয়।

রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল।

সন্ন্যাসী বললেন,

—তোমার ভালোবাসাই তোমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। তোমার লোভহীন মন তোমাকে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করেছে। আর তোমার ভালোবাসাই আজ তোমার পরিবারকে আবার এক করেছে।

রুদ্র কিছু বলল না।

শুধু নিজের বাঁশিটা হাতে নিল।

তারপর সেই পুরোনো কদমগাছের নিচে গিয়ে বসল।

বহুদিন পর আবার সে বাঁশিতে সুর তুলল।

সেই সুর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল মাঠের ওপর, গ্রামের পথ পেরিয়ে, নদীর ওপারে, দূর অরণ্যের দিকে।

গাছের পাতাগুলো মৃদু কেঁপে উঠল।

কোথাও যেন পাখিরা উত্তর দিল।

আর রুদ্রের মনে হলো—

সেই সুর হয়তো আবার পৌঁছে যাচ্ছে সেই অদৃশ্য রাজ্যে।

হয়তো নীল আলোর আড়াল থেকে ইন্দুলেখা শুনছে।

হয়তো বনমায়া হাসছেন।

হয়তো ইকুরা সোনালী আপেল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

আর পরীদের রাজ্যের কোনো এক অচেনা প্রাসাদে, সোনালী পাতাগুলো বাতাসে দুলছে।

রুদ্র চোখ বন্ধ করল।

তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি।

তারপর সে বাঁশিতে একটি দীর্ঘ সুর তুলল।

সেই সুরে ছিল—

হারানোর বেদনা,

ফিরে পাওয়ার আনন্দ,

ভালোবাসার শক্তি,

আর এক অদৃশ্য জগতের প্রতি চিরন্তন কৃতজ্ঞতা।