ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে।
আরিফ জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পর্দার ভেতর কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, আলো নয়—কেউ যেন দূরে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে।
সে চুপচাপ বৃষ্টি দেখছে।
মনের ভেতর অনেক কথা জমে আছে। কিছু কথা কাউকে বলা যায় না। শুধু একজন মানুষকেই বলা যেত।
কিন্তু সেই মানুষটা আর নেই।
হঠাৎ—
ঠুং।
মোবাইলে মেসেজ আসার শব্দ।
আরিফ চমকে উঠলো।
অন্ধকার ঘরে মোবাইলের ছোট্ট স্ক্রিনটাই যেন একমাত্র আলো হয়ে জ্বলছে।
রাত ১১টা।
আরিফ ধীরে ধীরে মোবাইলটা হাতে নিলো।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠলো।
নামটা দেখে সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলো।
নীলা।
তারপরও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
আঙুল কাঁপছে।
কারণ এই নামটা এখন আর তার ফোনে জ্বলে ওঠার কথা নয়।
তিন দিন আগে নীলা চলে গেছে।
এই পৃথিবী থেকে।
আরিফ এখনো মাঝে মাঝে ভুলে যায়—নীলা আর তাকে ফোন করবে না, রাগ করবে না, বলবে না—
"তোমাকে একটা কথা কতবার বলেছি, এত রাত করে খাওয়া যাবে না। নিজের যত্ন নিতে শেখো। সবসময় কি আমি তোমার পাশে থেকে মনে করিয়ে দিতে পারবো?"
কিন্তু আজ...
মৃত মানুষের নাম থেকে একটা মেসেজ এসেছে।
ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ এক বছরের লড়াই শেষে, শেষ পর্যন্ত হার মেনেছিল মেয়েটি।
আরিফ এখনো সেটা মেনে নিতে পারে না।
যে মানুষটা প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার আগেই একটা মেসেজ দিত—
"সুপ্রভাত। ঘুম থেকে উঠেছো?"
যে মানুষটা আরিফের ছোট ছোট বিষয় নিয়েও চিন্তা করতো—
"এত রাত পর্যন্ত কাজ করো না। শরীর খারাপ করবে।"
সেই মানুষটা আজ নেই।
কখনো কখনো আরিফের মনে হয়, নীলা বুঝি পাশের ঘরেই আছে।
হয়তো একটু পর এসে বলবে—
"এভাবে চুপ করে বসে আছো কেন?"
কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবতা তাকে মনে করিয়ে দেয়—
নীলা আর নেই।
কাঁপা হাতে আরিফ মেসেজটা খুললো।
মাত্র কয়েকটা শব্দ লেখা।
"আজ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকো না। প্লিজ, নিজের যত্ন নিও।"
মেসেজটা পড়ার পর আরিফ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলো।
চোখের কোণে জমে থাকা পানি কখন গড়িয়ে পড়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
এটা কীভাবে সম্ভব?
নীলা তো নেই।
তাহলে...
তার ফোন থেকে মেসেজ এলো কীভাবে?
আরিফ আর নীলার পরিচয় হয়েছিল তিন বছর আগে।
একটা বইয়ের দোকানে।
সেদিন বৃষ্টি ছিল।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের হাতে ছিল শরৎচন্দ্রের "দত্তা"।
আরিফ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলেছিল,
"বইটা পড়ে ফেলেছেন?"
মেয়েটা বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে একটু মন খারাপ করা কণ্ঠে বলেছিল,
"না, অর্ধেকের বেশি পড়ে ফেলেছি। কিন্তু আর পড়তে ইচ্ছে করছে না।"
আরিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
"কেন?"
মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
"বিজয়ার ওপর রাগ হচ্ছে।"
আরিফ হেসে বলেছিল,
"কেন?"
মেয়েটা এবার একটু অভিমানী গলায় বললো,
"বোকা মেয়েটা নরেন্দ্রকে কেন বলতে পারছে না, ভালোবাসি? নরেন্দ্র যদি হারিয়ে যায়?"
কথাটা শুনে আরিফ হেসে ফেলেছিল।
মেয়েটার এই অদ্ভুত মায়াভরা রাগটাই আরিফের ভালো লেগেছিল।
হাসতে হাসতে বলেছিল,
"পড়ে ফেলুন। নরেন্দ্র হারাবে না।"
সেদিনের সেই ছোট্ট কথোপকথন যে একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্প হয়ে উঠবে, সেটা হয়তো কেউ জানতো না।
তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব।
বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা।
নীলা ছিল খুব সাধারণ একটা মেয়ে।
কিন্তু তার মধ্যে ছিল এক ধরনের অদ্ভুত মায়া।
যে মায়া মানুষকে নিজের অজান্তেই কাছে টেনে নেয়।
আরিফ অফিস থেকে ফিরতে দেরি করলে নীলা রাগ করতো। বলতো,
"নিজের যত্ন নিতে শেখো। সবসময় অন্যদের কথা ভাবলে হবে?"
আরিফ হাসতো। বলতো,
"তুমি তো আছো আমার যত্ন নেওয়ার জন্য।"
নীলা তখন চুপ করে যেত। কারণ সে জানতো—
সবসময় সে থাকবে না।
নীলার অসুস্থতার কথা প্রথম জানতে পেরেছিল তার পরিবার।
যেদিন ডাক্তার বলেছিল, ক্যান্সার অনেক দূর এগিয়ে গেছে, সেদিন নীলা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
ডাক্তার বলেছিল,
সময় খুব বেশি নেই।
কিন্তু নীলা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে আরিফকে কিছু জানাবে না।
কারণ সে জানতো, আরিফ যদি সত্যিটা জানতে পারে, তাহলে নিজের জীবনটাও থামিয়ে দেবে। নীলার কাছে নিজের কষ্টের চেয়ে আরিফের কষ্টটাই বড় ছিল।
শেষ কয়েকটা মাস সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছে। আরিফকে হাসিয়েছে। তার সঙ্গে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা বলেছে। কিন্তু নিজের ভেতরের ভয় আর কষ্টগুলো লুকিয়ে রেখেছে।
মাঝে মাঝে আরিফ অবাক হয়ে বলতো,
"তুমি ইদানীং এত চুপচাপ কেন?"
নীলা মৃদু হাসতো। বলতো,
"কিছু না। শুধু ভাবি, মানুষকে ভালোবাসার জন্য সময় এত কম কেন?"
আরিফ তখন হাসতো।
ভাবতো, নীলা হয়তো এমনিই কিছু একটা বলছে। সে বুঝতে পারেনি—
কিছু কিছু কথা মানুষ বিদায়ের আগেই বলে যায়। শুধু আমরা তখন তার অর্থ বুঝতে পারি না।
পরের দিন রাত ১১টা।
আবার মেসেজ এলো।
আরিফ তখন জেগেই ছিল।
হয়তো সে নিজেও জানতো না, সে অপেক্ষা করছিল।
মোবাইলের স্ক্রিনে আবার সেই নাম।
নীলা।
কাঁপা হাতে মেসেজটা খুললো।
লেখা—
"আজ তোমার পছন্দের গানটা শুনলাম। মনে হলো তুমি পাশে বসে আছো।"
আরিফের শরীর কেঁপে উঠলো। কিছুক্ষণ সে শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর হঠাৎ কল দিলো।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
ফোন বন্ধ।
আরিফ বারবার চেষ্টা করলো।
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এলো না।
শুধু একটা নীরবতা।
তৃতীয় দিনও একই সময়ে মেসেজ এলো।
রাত ১১টা।
চতুর্থ দিনও।
পঞ্চম দিনও।
প্রতিদিন ঠিক একই সময়ে।
একই নম্বর থেকে।
একই মানুষ।
যে মানুষটা আর এই পৃথিবীতে নেই।
প্রথম কয়েকদিন আরিফ ভয় পেয়েছিল। নিজেকেই প্রশ্ন করতো—
"এটা কীভাবে সম্ভব?"
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ভয় বদলে গেল এক অদ্ভুত অপেক্ষায়।
রাত ১১টা এখন আর তার কাছে ভয়ঙ্কর কোনো সময় নয়।
বরং দিনের সবচেয়ে প্রিয় সময়।
কারণ এই সময় নীলা আসে।
**চলবে.......... **

Comments (0)
Only registered members can comment. Log in
No comments yet. Be the first to comment.