জীবনের একটা বড় সময় কেটেছে আয়ারল্যান্ডে। প্রায় দশ বছর।
বিদেশের জীবন অনেক কিছু শেখায়। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা অন্যরকম হয়ে যায়। তবে সব অভিজ্ঞতা যে সুখের হয়, তা নয়। আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় ৭ থেকে ৮ বার বর্ণবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে। বেশিরভাগ ঘটনাই ছিল ছোটখাটো। কিছু কথা, কিছু আচরণ—যেগুলো হয়তো কয়েক মিনিট পর ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের মনে কিছু কিছু ঘটনা দাগ রেখে যায়।
এর মধ্যে একটি ঘটনা আজও মনে আছে। ঘটনাটি এতটাই দূর গিয়েছিল যে রক্ত পর্যন্ত ঝরেছিল। শেষ পর্যন্ত Garda—আয়ারল্যান্ডের পুলিশ—এসে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছিল। সেদিন আমাকেও Garda Station-এ যেতে হয়েছিল। বলা যায়, আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল—যদিও আসলে ব্যাপারটা ছিল জিজ্ঞাসাবাদ। কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সেই দিনের গল্পটা আজ বলব।
কারণ কিছু ঘটনা শুধু মনে রাখার জন্য নয়, কখনো কখনো বলার জন্যও হয়।
সেই দিনের গল্পে যাওয়ার আগে, ছোট্ট করে কিছু কথা বলে নেওয়া ভালো। এতে পাঠক বুঝতে পারবেন—কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে ঘটনাটা ঘটেছিল।
আয়ারল্যান্ডে থাকার সময় আমার একটা ছোট্ট বন্ধুদের দল হয়ে গিয়েছিল। কেউ ছিল আমার ক্লাসমেট, কেউ আবার কর্মক্ষেত্রের পরিচিত। বিদেশের মাটিতে এমন কিছু মানুষ পাওয়া যায়, যাদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও ধীরে ধীরে একটা আপন সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
এই জায়গায় একটা কথা বলে রাখা ভালো—আমাদের সেই গ্রুপে আমি ছিলাম একমাত্র সাউথ এশিয়ান। আরেকজন এশিয়ান ছিল, সে চীনের নাগরিক। এছাড়া আমাদের গ্রুপে আইরিশ, পোলিশ ও জার্মান বন্ধুরাও ছিল। যাদের সাধারণভাবে আমরা “হোয়াইট” বা সাদা চামড়ার মানুষ হিসেবে জানি।
তবে বন্ধুত্বের জায়গায় কখনো এই পার্থক্যগুলো আমাদের মধ্যে আসেনি। কে কোন দেশ থেকে এসেছে, কার গায়ের রঙ কেমন—এসব কখনো আমাদের সম্পর্কের মাঝে কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়নি।
সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে আমরা প্রায়ই একসঙ্গে বের হতাম। কখনো ঘুরতে যাওয়া, কখনো আড্ডা—এইভাবেই সময় কেটে যেত।
সেদিনও তেমনই একটা উইকেন্ড ছিল। আমরা সবাই একটা নাইটক্লাব থেকে বের হয়েছি। রাত তখন বেশ গভীর। হাসতে হাসতে, গল্প করতে করতে সবাই বাসার দিকে ফিরছি।
বিদেশের শহরের রাতগুলো একটু অদ্ভুত। চারপাশে আলো থাকে, মানুষ থাকে, কিন্তু একটা সময় পর সবাই নিজের নিজের পথে চলে যায়।
আমাদের দলটাও ধীরে ধীরে ছোট হতে লাগল। যার বাসার রাস্তা পড়ছে, সে হাত নেড়ে বিদায় নিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও যে দলটা বড় ছিল, একসময় সেখানে শুধু দুজন মানুষ বাকি থাকল।
আমি আর Sinead।
এখানে Sinead সম্পর্কে একটু বলে রাখা দরকার।
Sinead ছিল আইরিশ মেয়ে। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল কর্মক্ষেত্রে।
আয়ারল্যান্ডে যাওয়ার পর তখন মাত্র ছয় মাস হয়েছে আমার। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। ইংরেজিতেও খুব একটা স্বচ্ছন্দ ছিলাম না। তাই তখন আমাকে কিচেন পোর্টারের কাজ করতে হতো। কাজটা খুব কঠিন ছিল না, কিন্তু শারীরিক পরিশ্রম অনেক। সারাদিন রান্নাঘরে কাজের পর যখন অনেক কাপ-প্লেট জমে যেত, তখন বেশিরভাগ মানুষ নিজের কাজে ব্যস্ত থাকত। কিন্তু মাঝে মাঝে দুজন মানুষ এগিয়ে আসত।
Sinead আর Trisha।
Trisha-এর কথা অন্য কোনো দিন বলব।
সেই সময় থেকেই Sinead-এর সঙ্গে আমার পরিচয়।
ধীরে ধীরে বুঝলাম, Sinead একটু অন্য ধরনের মানুষ। পড়াশোনা খুব বেশি করেনি। একটু বাউন্ডেলে স্বভাবের ছিল। আমাদের দেশে যাকে অনেকে “মাস্তান টাইপ” বলে, অনেকটা সেরকম। চটপটে, মুখের ওপর কথা বলতে পারে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পায় না। প্রয়োজন হলে গালাগালি করত, ঝগড়াতেও পিছিয়ে যেত না। অনেক ছেলেকেও দেখেছি ওকে একটু ভয় পেতে।
আমি মজা করে মাঝে মাঝে ভাবতাম, ওকে যদি “বেডা মানুষ” বলি, হয়তো খুব একটা ভুল হবে না।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
ওর হাসি আর চোখ—এই দুই জিনিসের কাছে এসে সেই কঠিন ভাবটা আর থাকে না।
সময় যেতে যেতে Sinead শুধু সহকর্মী থাকেনি, ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল।
আর যে বন্ধুদের গ্রুপের কথা বলছিলাম, সেই গ্রুপটাও আসলে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। আমার পরিচয়ের মাধ্যমেই সবাই একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
আইরিশ, পোলিশ, জার্মান, চাইনিজ—ভিন্ন ভিন্ন দেশের মানুষ ছিল আমাদের সেই ছোট্ট দলে।
মোটামুটি ১৩ জনের একটা গ্রুপ।
বিদেশের মাটিতে এই মানুষগুলোই একসময় আমার নিজের মানুষের মতো হয়ে গিয়েছিল।
যাই হোক, মূল ঘটনায় ফিরে আসি।
শেষ পর্যন্ত আমি আর Sinead আলাদা হলাম।
পরিকল্পনা ছিল, আমার বাসার কাছে যে ট্যাক্সি বুথটা আছে, সেখান থেকে ও ট্যাক্সি নেবে। কারণ Sinead-এর বাসা ছিল কাউন্টির দিকে।
তবে তার আগে একটা কাজ বাকি ছিল।
ওর স্পাইসি কাবাব খেতে হবে।
**(চলবে ... ) **

Comments (0)
Only registered members can comment. Log in
No comments yet. Be the first to comment.