পঞ্চম পরিচ্ছদ
এরপর প্রান্তর পুষ্পিতার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, " সুমেধা অ্যান্টি, একটু চায়ের ব্যাবস্থা হবে, আজ বোধ হয় এই বাড়িতে অতিথি অনেক ..... কি বলেন সমরেশ অ্যাঙ্গেল ? বুঝলাম পুষ্পিতার মায়ের নাম সুমেধা মজুমদার এবং কাকার নাম সমরেশ মজুমদার। দেখলাম, প্রান্তর কথাটা সমরেশ কাকুর কানে যেতেই তিনি আমতা আমতা করতে করতে বললেন, " হ্যাঁ ..মানে .... হ্যাঁ...... "। এদিকে সুমেধা কাকিমা বললেন, " হ্যাঁ অবশ্যই, কেন নয় ! " সুমেধা কাকিমার সাথে সাথে পুষ্পিতা ও ওর ছোটো কাকিমাও রান্না ঘরের দিকে চলে গেলেন।
অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি মিঃ সমরেশ মজুমদার বারবার পানের পিক ফেলছেন একটা পাত্রে...... বোধ হয় উনি পান খান খুব বেশী। অন্যদিকে পুষ্পিতার বাবা এরই মধ্যে দুটো সিগারেট শেষ করে ফেললেন। তার দিকে তাকিয়েই প্রান্তর বললো, " যদি কিছু না মনে করেন তাহলে একটা কথা বলতে পারি কুমারেশ আঙ্কেল, এত সিগারেট খাবেন না। আপনারা সবাই জানেন, ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর। তাছাড়া, সিগারেটের প্যাকেটেও একথা স্পষ্ট লেখা আছে। আপনার ভবিষ্যৎ আছে তাই অন্ততঃ নিজের জন্য না হোক, আপনার মেয়ের জন্য এটা ছেড়ে দিন। " দেখলাম কথাগুলো খুব সামান্য হলেও প্রান্তরের চোখের কোণায় জলের কণা চকচক করছে।
আমার মনে অনেক প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রান্তর আবার বললেন, " মিঃ মজুমদার, আপনার নাতি মানে পুষ্পিতা যথেষ্ট সাহসি একজন মেয়ে। এখান বর্তমানে আমাদের রাজ্য তথা দেশের যে অবস্থা সেক্ষেত্রে এরকম একজন সাহসী মেয়ের খুব দরকার। কথাটা বলতে আমার যেমন একদিকে খারাপ লাগছে এটা জেনে যে আমাদের রাজ্য তথা দেশ কতটা পিছিয়ে, আজও নারী সম্মান দেওয়া হয় না, কিন্তু এটা জেনে তার থেকেও বেশি গর্ব অনুভব হচ্ছে যে পুষ্পিতার মতো মেয়েরা নিজের আত্মসম্মান ছিনিয়ে নিতে জানে ..... ।" দেখলাম, উপস্থিত সবাই এসব শুনতে শুনতে যথেষ্ট ভাবাবেগ হয়ে পড়েছে। প্রান্তর বলতে থাকলো, " আমি জানি, আমার কথাটা এখনও আপনাদের কাছে অস্পষ্ট। সেজন্য এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি বললে এটা দাঁড়ায় যে পুষ্পিতার আত্মসম্মানে কেউ আঘাত করতে পারেনি, তবে চেষ্টা করেছিল। আর সেজন্য ওর হাতে একটু নখের আঁচড় ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে একটা মূল্যহীন প্রশ্ন ধরা দিল আর সঙ্গে সঙ্গে বলেই দিলাম, " তাহলে পুষ্পিতা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করলো কেন ?
প্রান্তর মৃদু হেসে বললো, " আত্মসম্মান রক্ষা করেছে ঠিকই কিন্তু বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস কয়েক মুহুর্তের জন্য হারিয়ে যায়। একাকিত্ব ঘিরে ধরে সেজন্য এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। " এবার আমিও বুঝতে পারলাম কেন পুষ্পিতা পথে এত হাসিখুশি থাকলেও বাড়িতে এসে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনজনে চা ও তেলে ভাজা নিয়ে হাজির....... । অনেক গল্প হল। হাসি ঠাট্টা হল। এর মধ্যে সমরেশ কাকু নিজের ঘরে গেলেন। ইনস্পেক্টর অভিজিৎ স্যার চলে গেলেন, সুবিনয়ও চলে গেলেন। যাওয়ার আগে পুষ্পিতা সুবিনয়কে বললেন, " ভালোবাসাটা কোনো অপরাধ নয়, তুমি আমাকে ভালোবাসো, এটা তোমার পছন্দ, তোমার ভালো লাগা...... কিন্তু আমার পছন্দ তোমার সঙ্গে মিল নাও হতে পারে, প্রত্যেক মানুষের ভাবনা চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। সেজন্য আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না, তবে তোমার ভালো বন্ধু হয়ে, সুখ দুঃখের অংশীদারিত্ব নিতে পারি। এর বেশি কিছু আশা করো না। প্লিজ ...... ।" কিছুক্ষণ থেমে যখন সুবিনয় চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো তখন পুষ্পিতা বললো, " তবে তোমাকে একটা সাজেশন দিতে পারি, তুমি আমাকে ভুলে যাও, দেখবে আরও বেশি ভালো থাকবে।" সুবিনয়ের কন্ঠ থেকে স্বর অস্পষ্ট ভাবে বেরিয়ে এটুকু বললো, " চেষ্টা করবো, আসলাম। ভালো থেকো... ।"
যখন এসব পর্ব সব শেষ, তখন আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, " সাধারণত বসিরহাট থেকে মুর্শিদাবাদ এসে ঘুরে দেখতে একদিন সময় লাগে। ভোরে আগে লালগোলা এক্সপ্রেস ধরলেই সাড়ে আটটায় নাগাদ পৌচ্ছানো যায় আর সাধারণত সন্ধ্যার আগে ঘরে ফেরা যায়। তাহলে আমার প্রশ্ন হল এটাই যে আমরা দু'দিনের জন্য এখনে এলাম কেন ? উত্তরটা আমি নিজেই দিচ্ছি, এখনের সমস্ত ঐতিহাসিক স্থান পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখবো বলে। কিন্তু সেটা হল কৈ ?? " এবার রাজ বললো, " আমাদের অর্ধেকের বেশি স্থান ভ্রমণ শেষ হয়ে গেছে বাকিটা কাল হবে।" আমরা তিন জন মানে প্রান্তর, আমি ও দীপঙ্কর বাবু ছাড়া বাকি সবাই এটা জানালো যে তাদের আর বেশি কিছু দেখতে বাকি নেই .... । অবশেষে এটাই সিদ্ধান্ত হল যে আমরা তিনজন কাল ভোরেই বেরোবো মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে ..... । কিন্তু প্রান্তর চোখ মুখ দেখে মনে হল কাল যেন আমরা যাচ্ছিই না।
এসব আলোচনা শেষ সবাই যে যার ঘরে চলে গেল। যেতে যেতে আমি প্রান্তরকে বললাম, " আচ্ছা, প্রান্তর তুই কীভাবে বাড়ির সবার নাম জানিস ? " প্রান্তর হাসতে হাসতে বললো, " মার্ক জাকারবার্গ ফেসবুক কেন আবিষ্কার করেছিলেন বল তো ! " আমি বললাম," ইন্টারটেইন্টমেন্ট এর জন্য ..... । " প্রান্তর বললো, " তুই শুধু ওটুকু জেনেই বসে থাক।" একটু তাচ্ছিল্য করেই বললো, " মার্ক জাকারবার্গ জানতে পারলে হয়ত তোকে বলত, ফেসবুক প্রোফাইল ডিলিট করে দিতে ... । " এত অপমানের মাঝে এটুকু পরিষ্কার হল যে প্রান্তর পুষ্পিতার প্রোফাইল চেক করে এত কিছু জেনেছে। এমনকি পুষ্পিতা সাহসিকতা সম্পর্কেও ...... । কিছুক্ষণ থেমে আমি প্রান্তরকে বললাম, " তুই অপরাধীকে ধরিস নি, কিন্তু তুই তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ব্যপারটা আমার ঠিক ভালো ঠেকলো না। কি কারণ বলত ! " প্রান্তর ফেসবুকে পুষ্পিতার প্রোফাইল ঘাটতে ঘাটতে বললো, " অপরাধী যদি নিজের শাস্তি নিজে নিজেই পেয়ে যায় তাহলে আমার সেখানে কি করার আছে ??"
প্রান্তরের কথা শেষ হতে না হতেই ঠিক তখনই নীচের তলায় হইচই পড়ে গেল। সবাই যে যার ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো এবং নীচে গেল ছোটো অর্থাৎ সমরেশ কাকুদের ঘরের দিকে ... কারণ কান্নাকাটি স্বরটা ঐদিক থেকেই আসছিল। ঘরের দরজার কাছে পৌচ্ছেই যা দেখলাম, তা সত্যিই কল্পনা করাও কঠিন। মিঃ সমরেশ মজুমদার গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। দেখলাম, প্রান্তর তার কাছে গেল। টেবিলের উপরে একটা কাগজে লেখা যা ছিল সেটা নিম্নে উল্লেখ করলাম,
জানি না এ মৃত্যুকে কীভাবে মেনে নেব। তবে মরতে আমাকে হবেই। তা না হলে জীবন্ত মৃত হয়েই বেঁচে থাকতে হত। এভাবে কখনও সত্য প্রকাশ পাবে কখনও ভাবেনি। বাবা, আমার স্ত্রী সুলক্ষণাকে দেখবেন যেন কখনও ওকে কষ্ট পেতে না হয়। এতদিনে বুঝেছি আমি ওর যোগ্য নই। যাই হোক, পুষ্পিতা আমার ভাইঝি মানে আমি ওর কাকা, বাবার থেকে কোনো অংশে কম নই। তবুও আমি শুধুমাত্র অনেক টাকা লোভের বশে ওকে অন্যের আংশিক সুখের পাত্র করে দিয়েছিলাম। কে সেই ব্যক্তি তা আমি ইনস্পেক্টর অভিজিৎ বাবুকে এস এম এস মারফৎ জানিয়ে দিয়েছি। প্রান্তর, তোমার বুদ্ধির কাছে আমি চির পরাজিত...... ।
ইতি,
সমরেশ মজুমদার
চিঠিটা পড়ে শেষ করতে করতেই ইনস্পেক্টর অভিজিৎ স্যার হাজির। আমরা একটা অপরাধীকে ধরতে পারলাম না কিন্তু আরেকজন অপরাধী আমাদের কবলে ..... । আমরা সবাই আশ্চর্য হয়েই দরজার দিকে তাকিয়ে। আর দরজা দিয়ে হাতে হাতকড়া পড়ে যে ব্যক্তিটি ঘরে ঢুকলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের সদ্য চেনা পরিচিত সুবিনয়.... । পুষ্পিতা সুবিনয়ের কাছে গিয়ে ওর কানের কাছে সজোরে এক চড় মারলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতে মায়ের বুকে মাথা রাখলেন।
প্রান্তর ইনস্পেক্টর অভিজিৎ স্যারকে বললো, " কোথায় পেলেন সুবিনয়'কে ?"
অভিজিৎ স্যার বললেন, " এস এম এস আসার সাথে সাথেই সমস্ত চেকিং পোস্টে খবরটা দিয়ে দেয়। পালিয়ে যাওয়ার বৃথা একটা চেষ্টা করেছিল।"
চলছে ....
Comments (6)