“অসমাপ্ত”
আজ চল্লিশটা বছর পার হয়ে গেল।সময়ের আর্বতনে সব শোক ফিঁকে হয়ে যায়।গিয়েছেও বটে,তাই আজ এত কষ্ট হয়না।শুনলে অবাক হবে আজ আমার দুচোখ জলে ভেঁজে না।কাদঁতে কাদঁতে বড় ক্লান্ত আজ আমি।ষাট উর্ধ এই বুড়োর কষ্টে বুক ফেঁটে যায় তবু চোখ দিয়ে জল পড়ে না।ওরাও ক্লান্ত, বিদায় নিয়েছে।তবু জ়ীবনটা কিন্তু থেমে নেই, ভবঘুরে রেলগাড়িটার মত এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন ছুটে চলছি।তুমি যাওয়ার পর আর পাখি পোষা হয়নি।খাঁচাটা ওভাবেই পড়ে আছে ফাঁকা।তুমি না থাকায় অযত্নে অবহেলায়,খাঁচাটাই উঁইপোকা যায়গা করে নিয়েছে।যেন একটু স্পর্শে ভেঙ্গে পড়বে।আর তারপর থেকে বয়ষ্কো চিলের মত তাই বেচেঁ থাকার জন্য বেচেঁ আছি।চার ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা একটা ফ্রেমে বাধাঁনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে প্রায়ই এমন ভাবে একা একাই কথা বলেন বৃদ্ধ মুহিব সাহেব।আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, উনি কিন্তু মানসিক রোগী নন।
আজ অনেক দিন পর শরত বাবুর শ্রীকান্ত বইটা খুলতেই মুহিব সাহেবের চোখে পড়লো চার দশকের বেশি পুরানো সেই গোলাপটা।আর স্মৃতির পাতা যেন পিছুঁ হাটলো চারটা দশক।গোলাপটা ওভাবেই পড়েছিল বইটার ভিতরে।আজ গোলাপটার গায়ে কোন তীক্ষ্ণ কাঁটা নেই,লাল স্নিগ্ধ পাপড়ীর উপর জলের ফোঁটা্টাও বোধ করি সেই কবেই ঝরে গেছে।আর গোলাপটা? শুকিয়ে কালো আর চ্যাপ্টা হয়ে আছে।
মেয়েটার নাম ছিল মৃন্ময়ী।খুব শান্ত স্বভাবের।ওর মায়াবী চেহারায় কেমন যেন একটা সরলতার ছাপ ছিল। চুপচাপ কাম্পাসে আসতো আর ক্লাস শেষে চুপচাপ চলে যেত।পরিচিত বা অপরিচিত কোন ছেলে দেখলেই মাথা নিচু করে হাটতো মৃন্ময়ী।মৃন্ময়ী ক্লাসের মেধাবী ছাত্রী।ওর সাথে সবসময় ছোট-খাটো দেখতে একটা মেয়ে থাকতো।নামটা আজ ভূলে গেছি।
মুহিবের আখ্যান অনুযায়ী,রবি ঠাকুর মনে হয় তার সব গুলো কবিতা আর গানের উপমা মৃন্ময়ীর কাছ থেকে ধার করে নিয়েছেন।বনলতা সেনের চুলের বর্ণনাও মনে হয় মৃন্ময়ীর ঘনকালো মেঘকেশ থেকে চুরি করা জীবনানন্দের।মুহিবের এক সেমিস্টার জুনিওর ছিল মৃন্ময়ী।মুহিবের কাছে মৃন্ময়ী একটা সরল প্রতীমা, যার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা জীবন পার করে দেয়া যায়।বলছিলাম চার দশক আগের কথা,মুহিব সাহেবের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কাহিনী।
মুহিব ছিল খুব চঞ্চল প্রকৃ্তির,কাম্পাসের সব চেয়ে প্রিয়,আলোচিত আর পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে অন্যতম। মৃন্ময়ীর থেকে একেবারেই আলাদা।মুহিব সিনিওর,জুনিওর এমন কি টিচারদের কাছেও প্রিয় পাত্র।মুহিব খুব হ্যান্ডসাম বা পারফেক্ট একথা বলছি না,কিন্তু অনেক মেয়েই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ওর উপরে ক্র্যাশ খেয়েছে।
এরই মাঝে যতই দিন কাটে ততই মৃন্ময়ীর প্রতি মুহিবের ভাললাগা ভালবাসা তে রুপান্তরিত হতে থাকে। মুহিব বুঝতেই পারে না যে,সে কবেই মৃন্ময়ীকে ভালোবেসে ফেলেছে।তবে মৃন্ময়ীর,মুহিবকে নিয়ে কোন প্রকার আগ্রহ কখনো আমাদের চোখে পড়েনি।মৃন্ময়ী যতটা পারত মুহিব কে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। আমি যতটুকু জানি মৃন্ময়ীর একটা বয়ফ্রেন্ড ছিল আর মেয়েটা ছিল হিন্দু ধর্মালম্বি।মুহিব এত কিছু জেনে বুঝেও মৃন্ময়ীর পিছু ছাড়তো না।সারা দিন কাম্পাস এর সামনে দাড়িয়ে থাকতো কখন মৃন্ময়ী বের হবে আর ও দেখবে।মুহিব মৃন্ময়ীর ক্লাসের সামনে গিয়ে উঁকি দিত মৃন্ময়ীকে দেখার জন্য আর মৃন্ময়ী দেখেও না দেখার ভান করতো আর অভূতপূর্ব এক হাসি হাসতো।মুহিব যে কেন এমন করতো জানিনা।মনে হয় মৃন্ময়ীর ঐ হাসিটা দেখার জন্য।আমরা যখন মুহিবকে বলতাম, এইসব করে লাভ কি? মেয়েটা তো তোকে ভালোবাসে না।প্রতিউত্তরে মুহিব বলতো এটা জরুরী না মৃন্ময়ী আমাকে ভালোবাসে কিনা, এটা জরুরী না তাকে আমি কখনো পাব কিনা, কিন্তু এটা জরুরী তাকে আমি কতটা ভালোবাসি।তবে একটা কথা মুহিব বারবার বলতো, মৃন্ময়ীর মত করে পৃ্থিবীর আর কেউ হাসতে পারেনা।“আমাদের যশোরে কবি মাইকেল মধূসুদন দত্তের জমিদার বাড়িতে প্রতিবছর মধূ মেলা হয়।পুরো জমিদার বাড়ির এরিয়াটা (যেখানে মেলা হয়) এতই প্রসস্থ যে, কেউ যদি না চিনে তাহলে তার হারিয়ে যেতে হাতে গোনা কয়েকটা মিনিট লাগবে মাত্র।কিন্তু মৃন্ময়ীর দিকে তাকালে আমার হারিয়ে যেতে তার চেয়ে খুব কম সময় লাগে।” এমন ভাবেই বলত মুহিব আমাদেরকে।মুহিব মাঝে মাঝেই কোন কারন ছাড়ায় সারা রাত মৃন্ময়ীর বাসার সামনে যেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।এটা মৃন্ময়ী মনে হয় জানতো না।মুহিব তার বিছানার পাশে মৃন্ময়ীর একটা ছবি বাধিঁয়ে রেখেছিল।যেন সব সময় সে মৃন্ময়ীকে দেখতে পায়।এর মধ্যেই কাম্পাসের ছোট বড় এমনকি অনেক টীচারও জেনে গিয়েছিল,মুহিব মৃন্ময়ীকে অনেক ভালোবাসে।মুহিব সারারাত ভাবতো কাল ও মৃন্ময়ীর সামনে গিয়ে কথা বলবেই।কিন্তু ও কখনও মৃন্ময়ীর সামনে দাড়াতে পারেনি।এভাবেই দিনের পর দিন পার হতে লাগল।প্রায় দেড় বছর পর বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মুহিব, মৃন্ময়ীর সামনা-সামনি হওয়ার সীদ্ধান্ত নিয়েছিল।কিন্তু কি বলবে?কিভাবে শুরু করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলনা মুহিব।পরে বন্ধুদের দেওয়া সাজেসন অনুযায়ী একটা প্রেমের চিঠি সারা রাত পড়ে ঠোটস্ত করে ফেলল মুহিব।পরের দিন একটা গোলাপ ফুল হাতে কাম্পাস এর সামনে মৃন্ময়ীর জন্য অপেক্ষা।সময় যেন সেদিন বাঁধা ছিল।অপেক্ষা শেষই হয়না মুহিবের।প্রচন্ড ভাবে ঘামছিল মুহিব।মৃন্ময়ীকে দেখে কেমন যেন চুপ হয়ে গেল মুহিব।কিন্তু এমন তো কথা ছিলনা।তারপর মুহিব ভাবলো এক নিঃশ্বাসে মনের কোণে জমে থাকা পুঞ্জিভূত সব মেঘগুলোকে বৃষ্টিতে রুপ দেবে সে।কিন্তু মৃন্ময়ী যখন সেই কবিতাটির ন্যায় পাখির নীড়ের মত চোখতুলে তাকালো তখন মুহিব, কেমন আছো ছাড়া আর কিছুই বলতে পারলনা।গোলাপটাও দেওয়া হয়নি সেদিন মৃন্ময়ীকে।আর তারপর থেকে স্বযত্নে মুহিব সাহেব আজ চল্লিশটা বছর ধরে আগলে রেখেছে এই গোলাপটাকে।
ভার্সিটি লাইফের শেষদিকে,ভালোবাসি কথাটা মনে হয় মৃনময়ীকে একবার বলেছিল মুহিব।কিন্তু মৃনময়ী কোন উত্তর দেয়নি সেদিন।হয়ত মৃনময়ীর কাছে কোন উত্তরই ছিলনা।এরপর আর কখন মৃনময়ীকে ভালোবাসি কথাটা বলা হয়নি মুহিবের।যখন মৃনময়ীকে খুব বেশি মনেপড়ে,খুব বেশি মৃনময়ীর কন্ঠ শুনতে ইচ্ছা হয় ঠিক তখনই মৃনময়ীকে ফোন দিত মুহিব।কিন্তু বেশি কিছু বলতে পারত না।এভাবেই কেটে গেল ভার্সিটি জীবনের চারটা বছর।সময়ের প্রয়োজনে সবকিছুই নিজের নিয়মে পরিবর্তনশীল।মুহিব আজ অনেক বেশি পরিণিত তবে সেটা বয়সে,বুদ্ধিতে আর জ্ঞানের পরিসীমায়।মনটা তাঁর এখনো সেই ওখানেই পড়ে আছে। আর তারপর কখনো মৃনময়ীর সাথে যোগাযোগ হয়নি মুহিবের।এটাও সময়ের প্রয়োজনে।এক কথায় বলতে গেলে মুহিব সাহেবের জীবনটা, কাজী নজরুল ইসলামের ওই দুটি চরণের মত …………
“ওপার হতে ছায়াতরু দাও তুমি হাতছানি
আমি মরু পায়নি তোমার ছায়ার ছোয়াও খানি।”
সময় ও থেমে নেই।আজ চল্লিশটা বছর পার হয়ে গেল।আর তারপর থেকে মুহিব সাহেব তার জীবনের প্রতিটা পরতে পরতে বুড়ো মেঘের মত আর নীড়হারা পাখির মত মৃত্যু আর কষ্ট নামক শব্দ দুটিকে খুব কাছ থেকে দেখেছে।বৃষ্টির ফোঁটা যেমন গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে গড়িয়ে যায়,একস্থান থেকে অন্য স্থানে সুখের সন্ধানে তেমনি মানুষ।কিন্তু মুহিব সাহেব এখনও সেই মৃনময়ীর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।অধিক শোকে পাথর মুহিব সাহেব আজ গল্পের বট গাছটার মত কতশত স্মৃতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আর মৃন্ময়ী আছে চার ফুট তিন ইঞ্চি ফ্রেমে বাধাঁনো একটা ছবি হয়ে।শেষ কয়েকদিন ধরে লাঠী মুহিব সাহেবের জীবনে নতুন সঙ্গী।জীবনের এতটা পথ এসে আজ ব্যাটারি শেষ হওয়া ঘড়িটার মত তাই মুহিব সাহেবের সব কিছু ভূল হয়ে যায়।কিন্তু উনি এখনো প্রতিদিন মৃনময়ীর সামনে এসে উপস্থিত হন আর একা একাই বলতে থাকেন
আমি হাজার বার জন্ম নিয়েছি
আর অনেকটা দূরপথ হেঁটেছি
শুধু তোমার জন্য।
আমি বহুবার ঘুরে ফিরেছি
সত্যিই আমি দূর হতে দেখেছি
তুমি খেয়াল করনি।
আমার তৃষ্ণিত চোখে,
শুধু তোমাকেই খুজেঁ ফিরেছি
আর মধ্যরাতে হেঁটে গিয়েছি তোমার রাস্তায়।
আফসার উদ্দীন রোড, ধানমন্ডি-১৫।
আমি দেখেছি তোমায়
কোন নগ্ন হাওয়ায়, কোন বিদিশার নেশায়
আমার কল্পনায়।
আর নিঝুম রাতে,কলঙ্কের আলোমাখা চাঁদে,
বেদনার নীলাকাশে তোমার প্রতিচ্ছবি।
আমি ভালোবেসেছি।
তবু প্রেমাডোরে বাঁধিনি
দেবী করেও পূঁজা দেয়নি তোমায়,
সাধ্য যে নেই আমার;
আমি শুধু লিখেছি তোমারই নাম।
মৃন্ময়ী রাণী দাস।
Comments (7)