ইসলামে কোনো কিছুই গোপনীয় নয় বরং ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে স্পষ্ট, পরিষ্কার এবং সহজবোধ্য। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের ঈমান আমল আকিদার জন্য কুরআন নাজিল করেছেন, আর রাসূল ﷺ তাঁর শিক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কিভাবে ঈমান আমল আকিদার চর্চা করতে হবে। তাই মুসলমান হিসেবে ইবাদত কিংবা উৎসব যা-ই পালন করিনা কেন, তা অবশ্যই কুরআন আর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। কিন্তু আজ আমরা সমাজে ইসলামের নামে এমন অনেক উৎসব দেখি, যেগুলো কখনোই রাসূল ﷺ কিংবা তাঁর সাহাবীরা পালন করেননি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী।

কেউ এটাকে রাসূলপ্রেমের প্রকাশ মনে করেন, আবার কেউ একে বিদআত বলে আখ্যা দেন। তাই সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই লেখায় আমরা জানব আসলে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী সম্পর্কে ইসলামের শরয়ি অবস্থান কী, এর ইতিহাস কোথা থেকে শুরু হলো এবং আমাদের করণীয় কী হওয়া উচিত।

ইসলামে উৎসবের মূলনীতি

ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলমানদের কোনো উৎসব নয়। কারণ ইসলামে উৎসব নির্ধারণের অধিকার শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ–এর। রাসূল ﷺ নিজে কখনো জন্মদিন পালন করেননি, সাহাবিরাও করেননি। তাই এটি শরিয়তের স্বীকৃত কোনো উৎসব হতে পারে না।

মদিনায় আগমনের পর রাসূল ﷺ দেখলেন, মানুষ দুটি দিনে উৎসব পালন করছে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, “জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এই দিনে আনন্দ করতাম।” তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহা।”

সহিহ হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনাটি থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য নতুন কোনো উৎসব প্রবর্তনের সুযোগ রাখেনি। যদি এই দুটি ঈদের বাইরে কোনো উৎসবের প্রয়োজন থাকত, তাহলে রাসুল ﷺ নিজেই তা নির্দিষ্ট করে দিতেন।

ঈদ-এ-মিলাদুন্নবীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রাসুল ﷺ এর জন্মদিন কিংবা জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ কুরআন বা হাদিসের কোথাও নেই। এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অনুসারী, সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-গণ, যারা তাঁর ভালোবাসা ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয় ছিলেন, তারাও এটি পালন করেননি। ইসলামের প্রথম তিন প্রজন্ম—সাহাবা, তাবেঈন এবং তাবে-তাবেঈন— যাদেরকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়, তাদের জীবনেও ঈদ-এ-মিলাদুন্নবীর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এর কারণ একটাই: এই উৎসব ইসলামের অংশ নয়।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ঈদ-এ-মিলাদুন্নবীর প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে রাসুল ﷺ এর ইন্তিকালের বহু শতক পর। সর্বপ্রথম মিসরের ফাতিমি শাসনামলে এর প্রচলন শুরু হয়, যা ছিল একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল। অর্থাৎ, এই উৎসব রাসুল ﷺ এর শিক্ষা থেকে সরাসরি আসেনি, বরং এটি পরবর্তীকালে মানবসৃষ্ট সংযোজন।

বিদআতের ধারণা ও এর ভয়াবহতা

ইসলামে ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, রাসুল ﷺ কুরআন ও হাদিসের আলোকে যে ইসলাম রেখে গিয়েছেন সেখানে নতুন কোনো কিছু সংযোজন করা যাবে না কিংবা বাদও দেওয়া যাবে না। এই বিষয়ে রাসুল ﷺ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন সংযোজন করবে যা এর অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।" (বুখারী ও মুসলিম)। এই হাদিসটি আমাদেরকে সতর্ক করে যে, ইবাদত শুধু সেভাবেই গ্রহণীয়, যেভাবে রাসুল ﷺ নিজে তা পালন করেছেন এবং করতে বলেছেন।

রাসুল ﷺ আরও বলেছেন, "প্রতিটি নব উদ্ভাবিত বিষয় হলো বিদআত, আর প্রতিটি বিদআত হলো গোমরাহী।" (মুসলিম)। এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায় যে, বিদআত ছোট হোক বা বড়, ভালো হোক বা মন্দ, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিদআত হচ্ছে এমন একটি আমল যা আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর অনুমোদিত নয়।

মিলাদুন্নবী বিদআত হওয়ার কারণ সমূহ

একটি নির্দিষ্ট দিনে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা বিদআত। এর পক্ষে সুনির্দিষ্ট দলিল প্রমাণাদি না থাকলেও, এর বিপক্ষে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। নিম্নে কারণ গুলো উল্লেখ করা হলো।

শরীয়তে কোনো প্রমাণ নেই

আমরা আগেই জেনেছি রাসূল ﷺ তাঁর জীবদ্দশায়, বা খুলাফায়ে রাশেদিন (হযরত আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী) এবং পরবর্তী কোনো সাহাবিই এই ধরনের কোনো বার্ষিক উৎসব পালন করেননি। সুতরাং দুই ঈদের পাশাপাশি এই নতুন ঈদ পালন করা কখনোই শরিয়তসম্মত নয়।

জন্মতারিখের অনিশ্চয়তা

সাধারণত ১২ই রবিউল আউয়ালকে রাসূলের ﷺ জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে, কিন্তু এই তারিখটি ঐতিহাসিক ও হাদিস বিশেষজ্ঞদের মতে সুনির্দিষ্ট নয়। বরং অনেক শক্তিশালী প্রমাণ থেকে জানা যায়, তাঁর জন্ম হয়েছিল ৮ বা ৯ রবিউল আউয়াল। অন্যদিকে, ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখে তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে—এ বিষয়ে প্রায় সকল ঐতিহাসিক একমত। যে দিনে রাসূলের ﷺ ইন্তেকাল হয়েছে, সেই দিনে আনন্দ-উৎসব করা মুসলিম উম্মাহর জন্য কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন।

বিধর্মীদের অনুকরণ

জন্মদিন পালন করা বা কোনো ধর্মীয় প্রধানের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে উৎসব করা ইসলামে প্রচলিত কোনো প্রথা নয়। বরং এটি ইহুদি, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের রীতি। রাসূল ﷺ তাঁর উম্মতকে বিধর্মীদের অনুকরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।" (আবু দাউদ) তাই, বিধর্মীদের অনুসরণ করে জন্মদিন পালন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে আপত্তিকর।

রাসূলকে ﷺ নিয়ে বাড়াবাড়ি

রাসূল ﷺ তাঁর উম্মতকে তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, "তোমরা আমাকে নিয়ে এমন বাড়াবাড়ি করো না যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়ামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে।" (সহীহ বুখারী) ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে অনেক সময় এমন বাড়াবাড়ি হয়, যা রাসূলের নির্দেশনার পরিপন্থী।

অন্য ধর্মের অনুকরণ

মুসলিমদের জন্য এটি একটি মৌলিক বিধান যে তারা অন্য কোনো জাতির অনুকরণ করবে না। রাসুল ﷺ বলেছেন, "যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।" ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী পালনের প্রথাটি অনেকটা হিন্দু, বৌদ্ধদের দেবতা, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের নবী ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের জন্মদিন পালনের রীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। মুসলমানরা যখন এটি পালন করে, তখন অজান্তেই তারা অন্য ধর্মের সংস্কৃতিকে অনুকরণ করে বসে, যা ইসলামের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট করে।

বাংলাদেশে প্রচলিত রীতিনীতি ও তার শরয়ি ভিত্তি

আমাদের সমাজে ঈদ-এ-মিলাদুন্নবী উপলক্ষে যেসব আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত, যেমন জশনে জুলুস, শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, মিষ্টি বিতরণ, ইত্যাদি—এগুলোর কোনোটিরই শরয়ি ভিত্তি নেই। যদি কেউ এগুলিকে ইবাদত বলে দাবি করে, তবে তার জন্য অবশ্যই কুরআন বা সহিহ হাদিসের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করতে হবে। যদি প্রমাণ না থাকে, তাহলে এগুলি কেবল সামাজিক আয়োজন বা প্রথা হিসেবে গণ্য হবে। আর যখন এমন কোনো প্রথাকে ধর্মের অংশ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়, তখন তা বিদআতে রূপান্তরিত হয়।

রাসুলপ্রেম প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি

যদি প্রশ্ন আসে, রাসুল ﷺ এর প্রতি ভালোবাসা কীভাবে প্রকাশ করব? ইসলাম এর সহজ ও সুন্দর সমাধান দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন,(হে রাসুল ﷺ) বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সূরাঃ আল ইমরান, আয়াতঃ ৩১)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, রাসুল ﷺ এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা হলো তাঁর সুন্নাহকে অনুসরণ করা। এর মানে হলো:
দৈনন্দিন জীবনে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করা। অর্থাৎ রাসুল ﷺ এর অনুসরণে ঈমান, আমল ও আকিদা পোষণ করা।
তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা সমাজে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করা।
নিয়মিত সালাত আদায় করা ও বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
তাঁর সিরাত (জীবনী) পাঠ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

এছাড়াও রাসুল ﷺ নিজে সোমবারে রোজা রাখতেন এবং এর কারণ হিসেবে বলেছিলেন, "এই দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।" এটিই হলো তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি সুন্নাহসম্মত তরিকা। এই আমলটি ব্যক্তিগত ইবাদত, কোনো উৎসব নয়।

বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ফরজ ইবাদতগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। মানুষ নামাজ, রোজা, যাকাতের মতো মৌলিক বিধান পালনে যতটা যত্নবান হওয়া উচিত, ততটা নয়। রাসুল ﷺ এর প্রতি সত্যিকারের প্রেম হলো তাঁর নির্দেশিত ফরজ ও সুন্নাহগুলো যথাযথভাবে পালন করা।

সুতরাং, ঈদ-এ-মিলাদুন্নবীর মতো নতুন ও বিতর্কিত উৎসবের পেছনে না ছুটে, আমাদের উচিত রাসুল ﷺ এর শিক্ষাগুলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। আমাদের জীবন যদি তাঁর সুন্নাহর আলোয় আলোকিত হয়, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন।

ইসলামে উৎসবের দিন দুটি: ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহা। এর বাইরে কোনো উৎসব শরিয়তের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আসুন, আমরা তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে তাঁর প্রকৃত প্রেমিক হওয়ার চেষ্টা করি।

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
লেখক ও সমাজ গবেষক