টিনের চালে শ্রাবণের বৃষ্টি নামলে মেহেরপুরের এই পুরোনো বাড়িটায় একধরনের অদ্ভুত শব্দ হয়। মনে হয় ওপর থেকে কেউ মুঠো মুঠো ঝিনুক ছড়িয়ে দিচ্ছে।
আবির জানালার গ্লাসটা সামান্য নামিয়ে দিল। বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এক লহমায় গাড়ির ভেতরটা ভরিয়ে দিল। পেছনের সিটে শুয়ে থাকা কাঠের পোর্টফোলিও বক্সটার দিকে একবার তাকাল সে। ঢাকা থেকে এই দীর্ঘ সফরটা স্রেফ চারটে পুরোনো নকশার খোঁজে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বিভাগের চাকরিটা ভালো, কিন্তু সমস্যা হলো মাঝেমধ্যে এমন সব প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটতে হয় যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক তো দূরের কথা, ঠিকঠাক চা-ও পাওয়া যায় না।
গাড়িটা এসে থামল ‘নীলাম্বরী’র সামনে। এক আমলকাননের পেছনে লুকিয়ে থাকা দোতলা লাল ইটের বাড়ি। বাড়ির নামফলকে শ্যাওলা জমেছে, কিন্তু তার মধ্যে অক্ষরের অহংকার মুছে যায়নি। আশি বছর আগে আবিরের প্রপিতামহ এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। এখন দেখভাল করেন গফুর চাচা।
আবির গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। বারান্দায় পা রাখতেই কাঠগোলাপের মিষ্টি সুবাস ভেসে এল। উঠোনের কোণে মস্ত এক কাঠগোলাপ গাছ, তার সাদা ঝরা ফুলগুলো ভেজা মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে।
"আবির বাবা? শেষমেশ পথ চিনলে তবে?"
উঁচু বারান্দা থেকে লাঠি ঠকঠক করতে করতে নেমে এলেন গফুর চাচা। বয়স সত্তরের কাছাকাছি, কিন্তু চোখ দুটো এখনো পরিচ্ছন্ন। আবির এগিয়ে গিয়ে প্রবীণ মানুষটির হাত দুটো ধরে হাসল।
"পথ তো চেনিই চাচা, সময়টা কেবল হাতের মুঠো থেকে পিছলে যায়।"
"ভেতরে এসো। সব পরিষ্কার করে রেখেছি। আর... তোমার জন্য একজন অপেক্ষা করছে।"
আবির একটু থমকে দাঁড়াল। "অপেক্ষা করছে? কে?"
গফুর চাচা রহস্যময় হাসলেন। "ভেতরে গেলেই দেখতে পাবে। বড় ভালো মেয়ে। কদিন ধরে আমাদের এই পুরোনো বইয়ের আলমারিগুলো ঘাটছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের ছাত্রী।"
ভেতরের বিশাল বসার ঘরটায় পা রাখতেই আবির অনুভব করল পরিবেশটা বদলে গেছে। উঁচ ছাদ, কাচের ঝাড়বাতি, আর দেয়ালজুড়ে ভারী মেহগনি কাঠের বইয়ের তাক। ঘরটায় ধূপের ধোঁয়া আর পুরোনো কাগজের হালকা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে।
উঁচু বইয়ের সেলফটার একদম শেষ মাথায়, কাঠের একখানা তিনধাপের মইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। পরনে হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি, তার আঁচলটা লুটিয়ে পড়েছে নিচের মেঝেতে। হাত বাড়িয়ে একদম ওপরের তাক থেকে চামড়ায় বাঁধাই করা একটা মোটা বই নামানোর চেষ্টা করছে সে। বৃষ্টির ঝাপটায় ঘরের খোলা জানালা দিয়ে যে আলো আসছে, তাতে তার ডানদিকের মুখাবয়বটা স্পষ্ট। একগোছা আলগা চুল কানের পাশ দিয়ে নেমে এসে তার গালে ঠেকেছে।
আবির নিঃশব্দে কয়েক পা এগিয়ে গেল। কাঠের মেঝে সামান্য কঁকিয়ে উঠতেই মেয়েটি চকিতে ঘাড় ফেরাল।
মইয়ের শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে থমকে গেল মেয়েটির ডান হাত। তার হাতের বইটা ঝুলে রইল শূন্যে।
চোখাচোখি হলো দুজনের।
প্রথম দেখাটা ঠিক কোন অনুভূতি তৈরি করে, তা কাব্যগ্রন্থে অনেক লেখা আছে। কিন্তু আবিরের মনে হলো, থমকে যাওয়া বৃষ্টি আবার হঠাৎ করে শুরু হলে বাতাস যেমন একমুহূর্ত স্থির হয়ে যায়, ঘরটা ঠিক তেমনি থমকে গেছে। মেয়েটির চোখ দুটো কালো, তবে কিসব গভীরতা লুকিয়ে আছে সেখানে। চোখের মণি দুটো যেন খুব সাবধানে কাউকে মাপছে। ভালোবাসার আগুন বা রোমাঞ্চের স্ফুলিঙ্গ নয়, সেই চোখে ছিল একরাশ শান্ত কৌতূহল।
"আপনিই আবির ভাই?"
মেয়েটির গলা শোনাল বেশ নিচু, খানিকটা সরু কিন্তু স্পষ্ট। ঠিক যেন সেতারের প্রথম তারে আঙুল ছোঁয়ানো হলো।
আবির নিজেকে একটু গুটিয়ে নিয়ে বলল, "হ্যাঁ। আর আপনি...?"
মেয়েটি মই থেকে খুব সাবধানে দুটো ধাপ নিচে নেমে এল। তার পায়ের মল দুটো মিহি শব্দে বেজে উঠল। "আমি সুকন্যা। সুকন্যা সেন। গফুর কাকা বলেছিলেন আপনি আজকে আসবেন।"
"আপনি এই বাড়ির বইপত্র ঘাটাঘাটি করছেন দেখলাম?" আবির তার গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল, যদিও ভেতরের একটা অচেনা অস্বস্তি তাকে একটু নড়িয়ে দিয়েছে।
সুকন্যা পায়ের শাড়ির কুঁচিটা একহাতে সামান্য তুলে শেষ ধাপ থেকে মেঝেতে নেমে এলো। সে আবিরের ঠিক তিন হাত দূরে এসে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং একধরনের সরল আত্মবিশ্বাস।
"হ্যাঁ। এই অঞ্চলের উনিশ শতকের জমিদারি স্থাপত্যের ওপর কাজ করছি। আপনার দাদুভাই নীলকণ্ঠ রায় মহাশয়ের কিছু ব্যক্তিগত ডায়েরি আর চিঠিপত্র দরকার ছিল। গফুর কাকা আমাকে অনুমতি দিয়েছেন।"
আবির হালকা হাসল। "দাদুভাই কাউকে তার পড়ার ঘরে ঢুকতে দিতেন না। জীবদ্দশায় তিনি খুব কড়া মানুষ ছিলেন। আপনি ভাগ্যবতী।"
সুকন্যা হাসল না। শুধু গম্ভীরভাবে বলল, "কড়া মানুষরা আসলে ভেতর থেকে খুব একলা হন। উনার ডায়েরির প্রথম তিনটা পাতা পড়লেই সেটা বোঝা যায়।"
কথাটা বেশ সোজা হলেও আবিরের বুোকে এসে বিঁধল। তার প্রপিতামহ সম্পর্কে এই কথাটা পরিবারের কেউ কখনো এভাবে বলেনি। সবাই তাকে এক শক্ত, নিষ্ঠুর জমিদার হিসেবেই জানত। আবির একটু সময় নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকাল। কপালে ছোট একটা টিপ, কোনো মেকআপ নেই, ঠোঁট দুটো সামান্য শুষ্ক। ডান হাতের তর্জনীতে নীল রঙের কালির একটা আলতো দাগ। হয়তো লিখতে লিখতে লেগে গেছে।
"আপনি চা খাবেন?" সুকন্যা আচমকা প্রশ্ন করল।
আবির অবাক হলো। "আপনি বানাবেন?"
"গফুর কাকা রান্নাঘরে পানি বসিয়েছেন। উনি আদা চা বানাচ্ছেন। আমি নিয়ে আসছি।"
সুকন্যা ঘুরে দাঁড়িয়ে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার পথে নীল শাড়ির আঁচলটা হাওয়া দুলিয়ে দিয়ে গেল। আবির কয়েক মুহূর্ত সেই খালি হয়ে যাওয়া দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত। মেয়েটির মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো আড়ষ্টতা নেই, আবার খুব বেশি গায়ে পড়ার প্রবণতাও নেই। একটা অসম্ভব শান্ত, নিজস্ব বলয় আছে তার চারপাশে, যা অন্যকে টান দেয় কিন্তু কাছে আসতে দ্বিধা তৈরি করে।
আবির কাঁধের ব্যাগটা সোফায় রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু একটানা টিপটিপ শব্দ হয়ে চলেছে। আমগাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ছে নিচের ঘাসে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সুকন্যা দুটো মাটির কাপে চা নিয়ে এল। একটা কাপ আবিরের দিকে বাড়িয়ে দিল। কাপটা নেওয়ার সময় আবিরের আঙুল সুকন্যার আঙুলের ডগা স্পর্শ করল সামান্য। সুকন্যা চকিতে আঙুল সরিয়ে নিল না, কিন্তু তার চোখের পাতা দুটো একবার কেঁপে উঠল। খুব সূক্ষ্ম একটা পরিবর্তন, যা অন্য কারও চোখে পড়ত না, কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক আবিরের নজর এড়ালো না।
"ধন্যবাদ," চায়ে চুমুক দিয়ে বলল আবির। "দারুণ আদা চা।"
"এটা গফুর কাকার কামাল, আমার নয়," সুকন্যা জানালার বাইরে তাকাল। "আপনার মেহেরপুরে কতদিন থাকা হবে?"
"চার-পাঁচ দিন। কিছু পুরোনো নকশা ক্যাড ফাইলে তুলতে হবে। আপনার কতদিন লাগবে?"
"আমার কাজ প্রায় শেষ। কাল বা পরশু হয়তো ফিরে যাব।"
কথাটা শুনে আবিরের বুকের ভেতরটা যেন সামান্য ফাঁকা হয়ে গেল। কেন এমন হলো, সে বুঝতে পারল না। এক অচেনা মেয়ে, যাকে সে মিনিট দশেক আগে চিনেছে, সে কাল চলে গেলে তার কী আসে যায়? কিন্তু মনের হিসাব তো আর গাণিতিক সুত্র মেনে চলে না।
সুকন্যা বসার ঘরের কোণের একটা বড় কাঠের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো পুরোনো নথিপত্র, একটা মোটা নোটবুক আর কিছু ঝরনা কলম। সে খুব নিবিষ্ট মনে খাতাগুলো গুছিয়ে রাখতে লাগল।
আবির দূর থেকে লক্ষ করল তার প্রতিটি ভঙ্গি। সুকন্যার হাতের কাজগুলো খুব পরিচ্ছন্ন। সে যখন কোনো পুরোনো কাগজ ধরছে, যেন খুব যত্রতত্র ছোঁয়া না লাগে, এমন এক ধরনের যত্ন ফুট উঠছে তার আঙুলে।
"একটা কথা জিজ্ঞেস করব?" আবির নীরবতা ভাঙল।
সুকন্যা খাতা গোছানো বন্ধ না করেই বলল, "বলুন।"
"আপনি কি সবসময় এরকম... এত কম কথা বলেন?"
সুকন্যা থামল। ধীরে ধীরে আবিরের দিকে মুখ ফেরাল। জানালার আলোটা তার চোখের ওপর পড়েছে। সেই চোখে একটা মিষ্টি, অবাধ্য আলো খেলে গেল।
"কথা কম বলাটা কি অপরাধ?"
"না, অপরাধ নয়। তবে এই বিশালাকার জনমানবহীন বাড়িতে এত কম কথার মানুষ থাকলে নীরবতাটা বড্ড ভারী হয়ে ওঠে।"
সুকন্যা প্রথমবার একটু হাসল। তার সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কেবল ঠোঁটের কোণ দুটো সামান্য প্রসারিত হলো আর গালে একটা ছোট টোল পড়ল। ওইটুকু হাসি যেন ঘরের সমস্ত ধুলোপড়া নীরবতাকে এক লহমায় ধুয়ে মুছে দিল।
"যে নীরবতা উপভোগ করতে পারে না, সে ইতিহাস বুঝতে পারে না, আবির ভাই," সুকন্যা মৃদু স্বরে বলল। "এই দেওয়ালগুলো, এই পুরোনো কাঠগুলো... এরা সবাই কথা বলে। শুধু শোনার জন্য নিজস্ব নীরবতাটুকু তৈরি করতে হয়।"
আবির বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। মেয়েটি শুধুই ইতিহাসের ছাত্রী নয়, তার চিন্তাভাবনার গভীরে এক অদ্ভুত পরিপক্বতা রয়েছে। সে সোফায় বসে নিজের কাপের শেষ চাটুকু শেষ করল।
সন্ধ্যা নেমে এল খুব দ্রুত। গ্রামের দিকে সন্ধে নামে অন্যভাবে। আলোটুকু যেন কেউ ধীরে ধীরে শুষে নেয়, আর চারপাশটা ঢেকে যায় এক গম্ভীর নীলচে ছায়ায়। গফুর চাচা হ্যারিকেন আর ঘরের পুরোনো পাওয়ারফুল বাল্বগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন। লোডশেডিং এই অঞ্চলে নিত্যদিনের সঙ্গী।
রাত আটটা নাগাদ কড়া লোডশেডিং হলো। হঠাৎ করে পুরো নীলাম্বরী ডুবে গেল ঘুটঘুটে অন্ধকারে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও চড়েছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর বৃষ্টির শব্দ মিলে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করেছে।
আবির মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে বসার ঘরের দিকে গেল। সুকন্যা তখনো সেই টেবিলেই বসে ছিল। টেবিলের ওপর জ্বলছে একখানা মোমবাতি। হালকা মোমের আলোয় সুকন্যার মুখটা দেখাচ্ছে কোনো ধ্রুপদী ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো। সে মোমবাতির শিখার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।
আবির কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে তার বিপরীতে বসল।
"ভয় করছে না?" আবির নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
সুকন্যা মোমের আলো থেকে চোখ সরিয়ে আবিরের দিকে তাকাল। "অন্ধকারকে ভয় পাওয়ার মতো বয়স আমার অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। বরং মোমবাতির এই আলোটায় কত কিছু স্পষ্ট দেখা যায়, খেয়াল করেছেন?"
"যেমন?"
"যেমন... মানুষের ভেতরের ছায়াটা।" সুকন্যা মোমবাতিটা একটু আবিরের দিকে সরিয়ে দিল। "আপনি এতক্ষণ আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাই না?"
আবির একটু অপ্রস্তুত বোধ করল। কিন্তু অস্বীকার করল না। "আমি আসলে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। আপনাকে এই বাড়ির অংশ বলেই মনে হচ্ছে। কোনো অচেনা অতিথি নয়।"
সুকন্যা একটা গভীর শ্বাস ফেলল। তার চোখ দুটি হঠাৎ যেন একটু উদাস হয়ে গেল। "কিছু জায়গা থাকে না, যেখানে প্রথমবার গেলেও মনে হয় আমি তো এখানেই ছিলাম? এই ঘর, এই গন্ধ, এই জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা—আমার মনে হয় এই অনুভূতিগুলো আমার খুব চেনা। বহু বছরের পুরোনো।"
আবির নিঃশব্দে শুনছিল। মোমবাতির আলোয় সুকন্যার চোখের মণি দুটো চিকচিক করছিল। কোনো এক অজানা কষ্টে নাকি কোনো গভীর অনুভূতিতে, তা বোঝা যাচ্ছিল না।
"আপনার পরিবারে কে কে আছেন?" আবির শুধাল।
"বাবা ছিলেন। দু-বছর হলো উনি নেই। আর কেউ নেই।" সুকন্যার গলা একটুও কাঁপল না, কিন্তু কথার ভেতরের যে শূন্যতা, তা আবিরের বুকের ভেতর এক অদৃশ্য থাবা বসাল।
"আই অ্যাম সরি..."
"ইটস ওকে," সুকন্যা হালকা হাসল। "মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ভালোবাসাটুকু রয়ে যায়। তাই না?"
আবির কিছু বলল না। সে শুধু চেয়ে রইল সুকন্যার দিকে। এই মেয়েটার বয়স হয়তো তেইশ বা চব্বিশ। কিন্তু তার ভেতরের প্রজ্ঞা এবং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি যেন বহুকালের পুরোনো।
হঠাৎ একঝলক দমকা হাওয়া এসে জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকল। মোমবাতির শিখাটা ভীষণভাবে কেঁপে উঠে এক লহমায় নিভে গেল।
সম্পূর্ণ ঘর অন্ধকার হয়ে গেল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। কড়কড় করে বাজ পড়ল দূরে কোথাও।
সেই ঘন অন্ধকারে দুজন মানুষ একদম পাশাপাশি বসে রইল। কেউ কোনো কথা বলল না। কিন্তু আবির স্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিল সুকন্যার উসখুস করার শব্দ, তার শাড়ির খসখস আওয়াজ, আর... তার নিঃশ্বাসের শব্দ। খুব কাছে, অথচ কত দূরে।
আবিরের মনে হলো, সে যেন এক অদ্ভুত রহস্যের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই অন্ধকার, এই বৃষ্টি, আর এই মেয়েটি—সব মিলে তার ভেতরে এমন এক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে, যার কোনো নাম তার জানা নেই। এটা ভালো লাগা? না কৌতূহল? নাকি এর চেয়েও বড় কিছু, যা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করছে?
"আবির ভাই?" অন্ধকারের মধ্যে সুকন্যার গলা ভেসে এল।
"বলুন?"
"আপনি কি কোনোদিন কাউকে খুব গভীরভাবে ভালোবেসেছেন?"
প্রশ্নটা এতই অপ্রত্যাশিত ছিল যে আবির কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না। তার বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল।
"না," আবির সত্যিটাই বলল। "কখনো সেই সুযোগ হয়নি। বা হয়তো তেমন কাউকে পাইনি।"
"ভালোবাসা সুযোগ মেনে আসে না," অন্ধকারের ভেতরেই সুকন্যার মিষ্টি গলার আওয়াজটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। "ওটা আসে হঠাৎ ঝড়ের মতো। এসে সব কিছু এলোমেলো করে দিয়ে যায়। তারপর ঝড় থেমে যায়, কিন্তু ভাঙাচোরা ঘরটা আর আগের মতো তৈরি করা যায় না।"
আবির অন্ধকারের মধ্যেই সুকন্যার চোখের অবস্থানটা খোঁজার চেষ্টা করল। "আপনার সাথে কি এমন কিছু হয়েছে?"
কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না। শুধু বাইরে বৃষ্টির একনাগাড়ে ঝরে পড়ার শব্দ।
তারপর সুকন্যা খুব নিচু গলায় বলল, "হয়তো হয়েছে। কিংবা হয়তো হতে যাচ্ছে।"
আবিরের বুকটা হঠাৎ ধক করে উঠল। 'হতে যাচ্ছে'—কথাটার অর্থ কী? সে কি অন্য কারও কথা বলছে, নাকি...
ঠিক তখনই কারেন্ট চলে এল। ঘরের মাথার ওপর ঝুলন্ত বাল্বটা তীব্র আলো ছড়িয়ে জ্বলে উঠল।
আবির পলক ফেলে তাকাল।
সুকন্যা তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু তার চোখে এখন আর সেই শান্ত কৌতূহল নেই। সেখানে জমেছে এক গভীর, অতল দীঘির মতো নীরবতা। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে এক অদ্ভুত লাজুক হাসি, যা সে লুকানোর কোনো চেষ্টা করছে না।
হঠাৎ সুকন্যা টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।
"আজ অনেক রাত হয়েছে। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। শুভরাত্রি, আবির ভাই।"
সে আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। শাড়ির আঁচলটা সামলে নিয়ে দ্রুত পায়ে করিডোর দিয়ে নিজের ঘরের দিকে হেঁটে গেল।
আবির একা বসে রইল সেই কাঠের টেবিলটার সামনে। টেবিলের ওপর সুকন্যার ভুলে ফেলে যাওয়া সেই পুরোনো নোটবুকটা পড়ে রয়েছে। নোটবুকের মলাটে নীল কালির আলতো ছাপ।
আবির হাত বাড়িয়ে নোটবুকটা ছুল। ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে একদম শেষ পাতায় গিয়ে তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে কোনো ইতিহাসের নোট লেখা নেই। ঝরনা কলমের নীল কালিতে, একদম তাজা অক্ষরে ছোট ছোট দুটো লাইন লেখা রয়েছে। লেখাটি স্পষ্টতই কিছুক্ষণ আগে লেখা হয়েছে—
"কিছু মানুষকে প্রথমবার দেখলেই মনে হয়, তাকে হারানোর ভয়টা বহু পুরোনো। আজ তাকে আবার দেখলাম, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারলাম না—আমি তোমাকেই খুঁজতে এসেছিলাম।"
আবিরের হাতটা জমে গেল। চোখের সামনে শব্দগুলো যেন নাচতে লাগল। সে আবার পড়ল লাইন দুটো। প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদপিন্ডে এসে হাতুড়ির মতো আঘাত করছে।
কাকে খুঁজতে এসেছিল সুকন্যা? কাকে হারানোর ভয় তার এত পুরোনো?
আবির জানালার দিকে তাকাল। বাইরের অন্ধকার বৃষ্টি তখন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। কিন্তু আবিরের বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন বাইরের সব ঝড়কে ছাপিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই নীলাম্বরী আর কেবল তার প্রপিতামহের পুরোনো বাড়ি নয়, এই বাড়ি এখন এক অদ্ভুত ধাঁধার কেন্দ্রবিন্দু—যে ধাঁধার নাম সুকন্যা।