শৈশবের হারানো দিনগুলো
বিকেলের রোদটা যখন আলতো করে ঘরের মেঝের ওপর এসে পড়ে, তখন শহরের ব্যস্ত রাস্তা থেকে কোনো এক ফেরিওয়ালার পরিচিত হাক ভেসে আসে। হঠাৎ করেই থমকে যায় হাতের কলম, থমকে যায় সময়ের ঘড়ি। বুকের ভেতর কোথাও যেন এক হালকা মোচড় দেয়। সেই অচেনা আলো-ছায়ার ফ্রেমে ভেসে ওঠে ধুলোবালি মাখা দুটো খুদে পা, কাদা লেগে থাকা প্যান্ট আর একজোড়া নিষ্পাপ চোখ। আমরা যারা বয়সের ভারে প্রতিদিন একটু একটু করে গাম্ভীর্যের খোলসে নিজেদের লুকিয়ে ফেলি, আমাদের সবার ভেতরেই এক ভীষণ অসহায় শিশু বাস করে। সে সুযোগ পেলেই স্মৃতির জানলা দিয়ে বাইরে হাত বাড়ায়, একটুখানি ধুলো মাখা বাতাস ছোঁয়ার আশায়।
শৈশব আসলে কোনো বয়স নয়, শৈশব হলো জীবনের এক অদ্ভুত অনুভূতি। যেখানে প্রতিদিনের সকাল শুরু হতো কোনো এক অচেনা অভিযানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে, আর সন্ধ্যা নামত একরাশ না-মেটা কৌতূহল বুকে চেপে। আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই দিনগুলো যেন কোনো এক দূর অতীতের স্বপ্ন। যে স্বপ্নে কোনো ক্লান্তি ছিল না, ছিল না কোনো মিথ্যে মুখোশ পরার তাগিদ। ছিল কেবল বেঁচে থাকার এক অপার্থিব আনন্দ।
শৈশবের রঙিন দিনগুলো
গ্রামের মেঠো পথ ধরে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার স্মৃতি যাদের আছে, তারা জানে মাটির সুবাসের চেয়ে বড় কোনো সুগন্ধি এই পৃথিবীতে আর হতে পারে না। বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহের পর যখন হঠাৎ কালবৈশাখী মেঘে আকাশ কালো হয়ে আসত, তখন বুক চিরে উঠে আসত ভেজা মাটির গন্ধ। সেই গন্ধে কেমন যেন এক মাতাল করা জাদু ছিল। ঝড়ের তোড়জোড় শুরু হলেই হাতছাড়া হয়ে যেত ঘরের শেকল। আমবাগানে ছুটে যাওয়া, অন্য বন্ধুদের সাথে রেষারেষি করে কুড়িয়ে নেওয়া কাঁচা আম। ঝড়ের তোড়ে পড়া সেই আমগুলো কেবল ফল ছিল না, ওগুলো ছিল আমাদের বিজয়ের ট্রফি।
বর্ষা এলে পৃথিবীটা অন্য রূপ নিত। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ যেন কোনো এক অচেনা দরবারি কানাড়ার রাগ। স্কুল থেকে ফেরার পথে ইচ্ছা করেই ছাতাটা বন্ধ করে পকেটে পুরে দিতাম। কাদা-পানিতে ভরা রাস্তায় নেমে কাঁচা কাগজের নৌকা ভাসিয়ে দেওয়া, তারপর সেই নৌকা ভেসে যেতে দেখতে দেখতে পাড়ার নদীটার দিকে হেঁটে যাওয়া—এ সবই ছিল এক একটা অঘোষিত উৎসব। কাদা মেখে বাড়ি ফিরলে মায়ের সেই কপট রাগ, শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার উষ্ণতা আজও বুকের ভেতরে খুব স্পষ্ট হয়ে বাজে।
গাছে ওঠার প্রতিযোগিতা, নদীর হিমশীতল জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝাঁপ দেওয়া, কিংবা বিকেলের মাঠে হারিয়ে যাওয়া—এগুলোর কোনো তুলনা হয় না। শরৎ আসত ঘুড়ির মেলা নিয়ে। নীল আকাশে যখন সাদা মেঘের ভেলা ভাসত, তখন লাল, নীল, হলুদ ঘুড়িতে ছেয়ে যেত আকাশ। কার সুতো কতটা মজবুত, কে কাকে 'প্যাঁচ' দিয়ে কেটে দিল—তা নিয়ে কত বিবাদ, কত যে অভিমান! সেই কাটা ঘুড়ির পেছনে ভোঁ-কাট্টা বলে দৌড়ানো ছেলেটি জানত না যে সে আসলে নিজের ছুটে চলার স্বাধীনতাকেই তাড়া করছে।
সন্ধ্যা নামার মুখেই কানামাছি আর লুকোচুরি খেলা জমে উঠত। পাড়ার অন্ধকার গলিগুলো তখন যেন একেকটা দুর্গ। দেয়ালের আড়ালে দম বন্ধ করে লুকিয়ে থাকার সেই আনন্দ, হুট করে এসে বন্ধুকে ছুঁয়ে দেওয়ার সেই উচ্ছ্বাস—আজকের বড়দের কোনো দামী খেলাতেই তা আর পাওয়া যায় না। কখনো কখনো হাতের মুঠোয় বন্দী করা জোনাকি পোকার আলো দেখে মনে হতো, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড বুঝি আমাদেরই হাতের তালুতে নেমে এসেছে।
বড় হয়ে যাওয়ার অদৃশ্য মূল্য
বড় হওয়া মানেই কি সব সহজতা হারিয়ে ফেলা? ছোটবেলায় কত দ্রুত বড় হতে চাইতাম আমরা। বাবার জুতোয় পা গলিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হতো, ইশ! কবে যে বড় হব! স্কুলের সেই কাঠের শক্ত বেঞ্চে বসে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনতাম আর ভাবতাম, এই ক্লাসটা শেষ হলেই মুক্তি। ছুটির ঘণ্টা বাজলেই এক দৌড়ে গেট পার হওয়া—সেই মুক্তির আনন্দ আজ কোথায়?
বয়সের সাথে সাথে আমরা অনেক কিছু পেয়েছি সত্যি, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর দেওয়াল ঘড়ির দিকে আমরা ছুটির আশায় তাকাই না, তাকাই কোনো এক অনর্থক ডেডলাইনের ভয়ে। স্কুলের পরীক্ষাগুলোর কত ভয় ছিল! গণিতের কঠিন সমীকরণ কিংবা ভূগোলের ম্যাপ পয়েন্ট না মিললে রাতের ঘুম উবে যেত। কিন্তু আজ বুঝি, জীবনের সত্যিকারের পরীক্ষাগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাস থাকে না। সেই খাতার পাতার ভুলের জন্য শুধু একখানা লাল কালির দাগ পড়ত, কিন্তু বড় বয়সের ভুলের খেসারত দিতে হয় নিজের শান্তিকে বিসর্জন দিয়ে।
ঈদের নতুন জামা কিংবা দুর্গাপূজার মেলার সেই চারটে দিন—এদের জন্য যে ব্যাকুল প্রতীক্ষা ছিল, তা আজ কোটি টাকা খরচ করলেও কেনা যায় না। নতুন জামাটা বালিশের পাশে নিয়ে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার মধ্যে যে গভীর স্বর্গীয় অনুভূতি ছিল, তা আজকের নামীদামী ব্র্যান্ডের জামাকাপড়ে পাওয়া যায় না। মেলার সেই সস্তা প্লাস্টিকের বাঁশি, কাঠের মটরগাড়ি, আর জিলাপির ঘ্রাণ আজও নাসারন্ধ্রে লেগে আছে। উৎসবগুলো এখন শুধুই ক্যালেন্ডারের ছুটির দিন, যার গায়ে আর শৈশবের সেই জাদুকরী সুবাস জড়িয়ে থাকে না।
স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলো
শৈশব একা গড়ে ওঠে না, শৈশব তৈরি হয় কিছু প্রিয় মানুষের ভালোবাসার পরশ দিয়ে। আজ ভাবলেই বুকটা খালি হয়ে যায়, কোথায় হারিয়ে গেল সেই মানুষগুলো?
বর্ষার সন্ধ্যায় কিংবা শীতের কনকনে রাতে দাদু-দাদির কাছে রূপকথার গল্প শোনার দিনগুলো আজও খুব মনে পড়ে। ঘরের এক কোণে হারিকেনের মিটিমিটি আলো জ্বলত। বাইরে হয়তো হু-হু করে হাওয়া বইছে, আর ঘরের ভেতর আমরা ভাইবোনেরা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুনছি পঙ্কিল রাজকন্যার গল্প, কিংবা রাক্ষসের প্রাণ কীভাবে ভোমরার ভেতর বন্দী থাকে। গল্পের ছলে দাদু কীভাবে যে জীবনের গভীর শিক্ষাগুলো মনের ভেতর বুনে দিতেন, তা তখন বুঝিনি। এখন বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই জেনারেটর বা ইনভার্টারের আলো জ্বলে ওঠে ঠিকই, কিন্তু ঘরের ভেতরে যে প্রাণের আড্ডা বসত, তা আর ফিরে আসে না।
বাবার সাইকেলের সামনের রডে বসে পুরো পৃথিবী ঘুরে দেখার সেই আনন্দ ছিল অদ্বিতীয়। মনে হতো বিশ্বজয়ের রথে চেপে বসেছি। হ্যান্ডেল ধরে থাকা বাবার হাত দুটোকে মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয়। আর মা? মায়ের সেই একটানা ডেকে যাওয়া—'সন্ধ্যা হয়ে এল, এবার ঘরে আয়!' সেই ডাকের ভেতর ছিল অদ্ভুত এক ঘরের টান। আজ হাজার ডেকেও কেউ আর সেই নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ফেরাতে পারে না।
স্কুলের সেই প্রথম শিক্ষক, যিনি আলতো করে হাত ধরে প্রথম অ আ ক খ লেখা শিখিয়েছিলেন, কিংবা সেই প্রথম বন্ধু—যার সাথে টিফিন ভাগ করে না খেলে পেট ভরত না, আজ তারা কে কোথায়? প্রথম কোনো প্রিয় খেলনা ভেঙে যাওয়ার কষ্ট কিংবা প্রথম বন্ধুটির অন্য শহরে চলে যাওয়ার পর চোখের জল ফেলে যে দুঃখ আমরা পেয়েছিলাম, সেটাই হয়তো ছিল আমাদের জীবনের প্রথম হারানোর পাঠ। সেই দুঃখগুলো ছোট ছিল, কিন্তু তাদের সততা ছিল গভীর।
ফিরে পাওয়া যায় না, তবু থেকে যায়
অনেক সময় মনে হয়, শৈশব কি সত্যিই হারিয়ে যায়? নাকি তা ঘরের কোনো এক পুরোনো কাঠের বাক্সে পড়ে থাকা জং ধরা চাবির মতো ভেতরেই জমা থাকে?
আসলে শৈশব কোথাও হারিয়ে যায় না, শুধু আমরা বড় হয়ে যাই। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি জটিল হিসাব-নিকাশের দুনিয়ায়। কিন্তু আজও যখন কাজের ফাঁকে কোনো এক ভিড় বাসে বসে থাকি, আর হঠাৎ জানলা দিয়ে চোখে পড়ে কোনো একদল শিশুর বেপরোয়া দৌড়াদৌড়ি, তখন থমকে যায় সব হিসেব। কোনো এক বর্ষার দিনে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মুহূর্তে নাসারন্ধ্রে ভেসে আসা ভেজা মাটির গন্ধ আমাদের সজোরে এক ধাক্কায় কুড়ি-ত্রিশ বছর পেছনে ফেলে দিয়ে আসে।
রেডিওতে কোনো পুরোনো সুর বাজলে, কিংবা অনেক দিন ধরে বন্দি থাকা কোনো পুরোনো ডায়েরির শুকনো ফুলের পাপড়ি ছোঁয়ালেই স্মৃতির দরজায় কড়া নাড়ে আমাদের সেই পুরোনো দিনগুলো। সেই দিনগুলো আর কোনোদিন ফিজিক্যালি ফিরে আসবে না, তা আমরা খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু স্মৃতির নদীর স্বচ্ছ জলে যদি আমরা একবার হাত ডোবাই, তবে আজও টের পাওয়া যায় সেই একই হিমশীতল পরশ।
শৈশব হলো জানালার ধারে বসে থাকা বিকেলের সেই মিঠে আলো, যা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু তার উষ্ণতার স্মৃতিটা ঘরজুড়ে রয়ে যায়। শৈশব হলো সুতো ছিঁড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই রঙিন ঘুড়ি, যা নাগালের বাইরে চলে গেলেও আকাশের দিকে তাকালে তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। জীবনের এই পথচলায় যখনই ক্লান্ত লাগে, যখনই এই কৃত্রিম সমাজের মুখোশগুলো ভারী হয়ে ওঠে, তখন আমরা মনের অজান্তেই সেই শৈশবের দিনগুলোর কাছে একটু আশ্রয় চাই। কারণ, সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা একসময় কতটা খাঁটি ছিলাম, কতটা সরল ছিলাম, আর কতটা মানুষ ছিলাম।
কখনো কোনো এক নিঃসঙ্গ বিকেলে যদি নিজের ভেতরের সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি বা মেয়েটির মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন, তাকে জড়িয়ে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। বলবেন, 'তুমি খুব ভালো ছিলে।' সময় হয়তো নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে, কিন্তু শৈশবের সেই সোনালী দিনগুলোর ছায়া আজও আমাদের প্রতিটি ক্ষতের ওপর এক পরম মমতার হাত বুলিয়ে দেয়।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.