ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। ঘরের কোণে হালকা অন্ধকার তখনো জাঁকিয়ে বসে আছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কমে এসে চড়ুইয়ের কিচিরমিচির কেবল শুরু হতে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়টায়, যখন গোটা বাড়িটা এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, খুব মৃদু একটা শব্দের উৎপত্তি হয় রান্নাঘর থেকে। পিত্তলের হাঁড়িতে চাল ধোয়ার শাঁ শাঁ শব্দ, কিংবা চুলায় দেশলাই জ্বালানোর চটাস একটা আওয়াজ। খুব সাবধানে, যাতে কারো ঘুম না ভেঙে যায়, একজন মানুষ পা টিপে টিপে হেঁটে বেড়ান সারা ঘরজুড়ে।
ছেলেবেলায় ভোরে যখন কপালে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ পেতাম, চোখ মেলে দেখতাম মা শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালটা মুছিয়ে দিচ্ছেন। কখনো কি ভেবে দেখেছি, এই যে নিঃশব্দে একটা দিন শুরু হয়ে যায়, এই যে আমাদের না চাওয়া স্বাচ্ছন্দ্যগুলো তৈরি হয়ে থাকে সকাল হওয়ার আগেই—এর নেপথ্যে কে কাজ করে যাচ্ছেন? পৃথিবীর যাবতীয় মহৎ শিল্পকর্ম নাকি নীরবতায় জন্ম নেয়। যদি তা সত্যি হয়, তবে মায়ের নীরব ভালোবাসা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিল্পকর্ম, যার কোনো হইচই নেই, কোনো বিজ্ঞাপনী প্রচারণা নেই, অথচ যার উপস্থিতিতেই টিকে থাকে আমাদের আস্ত একটা শৈশব, কৈশোর আর যৌবন।
আমরা ভালোবাসার কথা বলি হাজারো কবিতায়, গানে আর উপন্যাসে। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা এমন এক ব্যাকরণ, যা কোনো কাব্যের ফ্রেমে পুরোপুরি ধরে রাখা যায় না। এর কোনো নিজস্ব ভাষা নেই, আবার একই সাথে পৃথিবীর সব ভাষাকে হার মানানোর ক্ষমতা রাখে। এই ভালোবাসার কোনো উচ্চবাচ্য নেই। মা কখনো এসে বুক চাপড়ে বলেন না, ‘আমি তোমাকে ভালোবেসে আজ এই ত্যাগ স্বীকার করলাম।’ মা কেবল নীরবে আমাদের জীবনের ছোট ছোট প্রয়োজনগুলো নিজের হাতের তালুতে তুলে নেন। পরম মমতায় আগলে রাখেন এমনভাবে, যেন এটাই ছিল তাঁর একমাত্র করণীয়।
ছোটবেলার কথা মনে পড়ে? যে রাতটায় প্রচণ্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল, থার্মোমিটারের পারদ ছুঁয়েছিল একশ চার। আমরা যখন কড়া ওষুধের প্রভাবে কিংবা যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমে ঢলে পড়তাম, তখন একজন মানুষ কিন্তু জেগে থাকতেন। ঘরের আলো নিভিয়ে, হ্যারিকেন বা টেবিল ল্যাম্পের আবছা আলোয়, কপালে জলপট্টি বদলে দেওয়ার কাজটা মা করে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। প্রতিবার কপালে ভেজা কাপড়ের টুকরোটা পড়ার সময় যে পরম আরাম মিলত, তার পেছনে লুকিয়ে ছিল একটা মানুষের সমস্ত রাতের ঘুম, তাঁর পিঠের ব্যাথা আর ঈশ্বরের কাছে করা এক নিঃশব্দ মিনতি। মা কি কখনো পরদিন সকালে উঠে বলেছেন, ‘আজ রাতে তোর জন্য আমি ঘুমাইনি’? না, বলেননি। বরং সকালে ঘুম ভাঙলে দেখা যেত, মা একইভাবে হেসে জিজ্ঞেস করছেন, ‘এখন কেমন লাগছে রে, জ্বরটা একটু কমেছে?’
এই যে নিজের ক্লান্তি, নিজের শারীরিক কষ্টকে এক নিমেষে উধাও করে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা, এটা মা পান কোথায়? উত্তরটা খুব সহজ—ভালোবাসায়। তবে সেই ভালোবাসা উদযাপনের নয়, তা ধারণ করার।
রোজকার সাধারণ জীবনযাত্রায় আমরা কত কী আনি, কত কী খাই। কিন্তু ছেলেবেলায় কোনো ভালো খাবার পাতে পড়লে খেয়াল করেছ কি, মায়ের ভাগে সবচেয়ে ছোট বা সবচেয়ে খারাপ টুকরোটাই কীভাবে যেন গিয়ে পৌঁছাত? মাছের পেটির টুকরোটা সবসময় সন্তানের পাতে তুলে দিয়ে মা কেমন যেন এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে বলতেন, ‘মাছের গাদাটাই আমার বেশি পছন্দ রে, কাঁটা চিবোতে বেশ লাগে।’ আমরাও কত নির্বোধ ছিলাম, কত সহজেই না বিশ্বাস করে নিতাম সেই বানানো সত্যকে! ভেবে বসতাম, মা সত্যিই হয়তো ওটাই খেতে ভালোবাসেন। বড় হওয়ার পর, পৃথিবীর হিসাব-নিকাশ যখন একটু একটু করে বুঝতে শিখলাম, তখন বুকের ভেতরটায় একটা মোচড় দিয়ে উঠল। বুঝলাম, ওটা কোনো খাদ্যাভ্যাস ছিল না, ওটা ছিল নিজের ক্ষুধা মারার এক চিরন্তন মাতৃত্বের কৌশল।
ছোট্ট একটা শৈশবের স্মৃতি প্রায়ই মনের কোণে ভেসে ওঠে। স্কুল থেকে ভিজে ভিজে বাড়ি ফেরার পর মা যখন তোয়ালে দিয়ে মাথাটা মুছে দিতেন, সেই তোয়ালের ঘষা আর মায়ের হাতের স্পর্শের মধ্যে যে উষ্ণতা ছিল, তা কি পৃথিবীর কোনো দামী হিটার দিতে পারে? স্কুলে যাওয়ার আগে টিফিন বক্সে দুটো রুটি গুটিয়ে দেওয়ার আগে মায়ের সেই হাজারটা কড়া নির্দেশ—‘টিফিনটা অন্য কাউকে দিবি না, পুরোটা নিজে খাবি কিন্তু!’—সেই শাসনের পেছনে কি রাগের লেশমাত্র ছিল? নাকি ছিল সন্তানের পেটের ক্ষুধা মেটানোর এক আকুল আর্জি?
আমরা যখন বড় হই, একটু একটু করে নিজেদের এক একটা জগত তৈরি হতে থাকে। বন্ধু, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার, প্রেম, সংসারের টানাপোড়েন—কত শত ব্যস্ততা আমাদের ঘিরে ধরে। কিন্তু মায়ের জগতটা কিন্তু বদলায় না। তাঁর মহাবিশ্ব জুড়ে কেবলই আমরা। অথচ কত অদ্ভুত, সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে মায়ের নীরব ত্যাগগুলোকে আমরা যেন খুব সাধারণ, খুব স্বাভাবিক ধরে নিতে শুরু করি। মনে করি, এটা তো মায়ের কাজই, এটা তো ওঁর করাই উচিত। যে মা দিনের পর দিন নিজের শখ-আহ্লাদগুলোকে একটা পুরোনো ট্রাঙ্কের তলায় চাপা দিয়ে আমাদের ইচ্ছেগুলোকে ডালপালা মেলতে দিয়েছেন, সেই মাকে আমরা কত সহজেই না অবহেলা করি!
মায়ের চোখেরও একটা নিজস্ব ভাষা থাকে। যে ভাষা পড়তে কোনো বর্ণমালার প্রয়োজন হয় না। পরীক্ষার আগের রাতে যখন টেবিলে মাথা নিচু করে পড়তাম, মা এক কাপ চা বা এক গ্লাস দুধ এনে পাশে রেখে যেতেন। মুখে হয়তো একটা শব্দও বলতেন না। কেবল একটা হাত এসে মাথায় পিঠে একটুখানি বুলে যেত। ওই একটা স্পর্শের মধ্যে যেন পৃথিবীর সব আত্মবিশ্বাস লুকিয়ে থাকত। মনে হতো, পুরো বিশ্ব একপাশে চলে গেলেও আমার পেছনে এই একজন মানুষ আছেন, যিনি আমার পড়ে যাওয়া আটকাবেন।
আবার কখনো কোনো অন্যায় করলে মায়ের সেই গম্ভীর মুখ, ঘরের এক কোণে একা একা বসে থাকার দৃশ্য—এগুলো কি কেবলই রাগ? না, ওই রাগের আড়ালেও লুকিয়ে থাকত এক অদ্ভুত অভিমান আর শাসন। সন্তান যাতে জীবনে ভুল পথে পা না বাড়ায়, তার জন্য মায়ের সেই কঠোর ভূমিকা নেওয়াটাও তো এক ধরনের নীরব প্রেম। যে প্রেমে নিজেকে সাময়িকভাবে খলনায়ক বানাতেও মা দ্বিধা করেন না, যাতে সন্তান একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে, আমাদের অলক্ষ্যে মায়ের কত দোয়া কাজ করে, তার হিসাব কি আমরা কখনো রাখি? সন্তান যখন প্রথম চাকরিটা পায়, কিংবা কোনো বড় পরীক্ষায় সাফল্য আসে, তখন আনন্দ মিছিলে সবার সামনে হয়তো মাকে দেখা যায় না। মা হয়তো তখন ঘরের কোণে ঠাকুরের আসনের সামনে, কিংবা জায়নামাজে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। চোখের কোণে দু’ফোঁটা জল নিয়ে নিঃশব্দে শুকরিয়া জানাচ্ছেন ওপরওয়ালার কাছে। এই সফলতার পেছনে তাঁর নিজের অবদান যে কতখানি, তা জানান দেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো তাঁর মধ্যে থাকে না। পৃথিবীর সব আলো যখন সন্তানের মুখকে আলোকিত করে, মা তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে সেই আলোর দিকে তাকিয়ে শান্ত এক হাসি হাসেন।
কিন্তু আমরা কতটুকু ফেরত দিই এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার?
সময়ের চাকা ঘুরতে থাকে নিজের নিয়মে। আমরা পরিণত হই, আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। আমাদের ঘরের দেয়ালগুলো রঙিন হয়, জীবনের পরিধি বাড়ে। আর অন্যদিকে, মায়ের ঘরের দেয়ালগুলোতে ধূলিকণা জমে, মায়ের চোখের কোণে বলিৰেখা আরও গভীর হয়। চুলের চুলে পাক ধরে, হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে আসে। জীবনের এই অপরাহ্ণে এসে যে মা সারা জীবন নিজের উপস্থিতি দিয়ে আমাদের ঘরকে পূর্ণ করে রেখেছিলেন, সেই মা-ই কেমন যেন একটু একা হয়ে পড়েন।
আধুনিক এই ছুটন্ত জীবনে আমরা বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক। হাতে সময় নেই, কাজের ভীষণ চাপ, ফোনের নোটিফিকেশনের ভিড়ে আমরা মগ্ন। আর মা? মা হয়তো জানালায় মুখ রেখে বসে থাকেন। ভাবেন, কখন ছেলেটার বা মেয়েটার একটু সময় হবে। একটা ফোনের অপেক্ষা, শুধু দুটো কথা শোনার ব্যাকুলতা—‘মা, ভালো আছো?’
অথচ এই কথাটুকু বলতেও আমাদের সময়ের বড্ড অভাব। কতদিন আমরা মায়ের পাশে বসে তাঁর কথা শুনেছি? কতদিন জানতে চেয়েছি, ‘মা, তোমার শরীরের ব্যথাটা কি এখন একটু কমেছে?’ না, আমরা ধরে নিই মা ভালোই আছেন। মাও তো কখনো নিজের কষ্টের কথা বানিয়ে বানিয়ে আমাদের বলতে যান না। আমরা ফোন করলে ওপাশ থেকে সেই একই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘আমি খুব ভালো আছি রে। তুই ভালো আছিস তো? ঠিকমতো খাচ্ছিস তো?’
নিজের শত যন্ত্রণা লুকিয়ে রেখে সন্তানকে ভালো রাখার এই নিঃশব্দ যে অভিনয়, এ কেবল একজন মা-ই আজীবন করে যেতে পারেন।
আজকাল মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে বা একলা কোনো সন্ধ্যায় যখন স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসে, তখন খুব অবাক হয়ে ভাবি—কী বিশাল এক বটবৃক্ষের ছায়ায় আমরা বড় হয়েছি! মা তো সেই জীবনধারা, যা কোনো প্রতিদানের আশা না রেখে কেবল বয়েই চলে। নদী যেমন সাগরকে জল দিয়ে ধন্য করে কিন্তু নিজে কিছু দাবি করে না, মা-ও ঠিক তেমনি পুরো জীবনটা আমাদের দিয়ে খালি হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে।
জীবন বড় অদ্ভুত। যখন হাতে প্রচুর সময় ছিল, তখন আমরা মায়ের ভালোবাসার মূল্য বুঝিনি। আর যখন বুঝতে শিখলাম, তখন হয়তো দেখা যায় সময় বড্ড কম, কিংবা মায়ের সেই হাত দুটো আর আমাদের মাথায় হাত বোলানোর জন্য শক্ত নেই। শাড়ির আঁচলের সেই পরিচিত সুবাস, যা আমাদের শৈশবের সব ভয় তাড়িয়ে দিত, তা যেন কেমন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে।
তুমি যেখানেই থাকো না কেন, জীবনের যে প্রান্তেই পৌঁছে যাও না কেন, একবার পেছন ফিরে তাকাও। দেখো, একটা মানুষ এখনো তোমার ফেরার পথ চেয়ে বসে আছেন। যার ভালোবাসার কাছে পৃথিবীর সব প্রাপ্তি, সব পদবী, সব ধন-সম্পদ বড্ড তুচ্ছ আর অর্থহীন।
পরের বার যখন মায়ের মুখোমুখি দাঁড়াবে, কিংবা ফোনে কথা বলবে, একটু থেমো। তাঁর মুখের ওই ক্লান্ত রেখাগুলোর দিকে তাকাও, তাঁর চোখের নীরব ভাষাটা একটু পড়ার চেষ্টা করো। যে মানুষটা কোনোদিন নিজের জন্য কিছু চাননি, যিনি নিঃশব্দে নিজের জীবনটাকে মোমের মতো গলিয়ে তোমার অন্ধকার দূর করেছেন, তাঁকে অন্তত একটুখানি সময় দাও। কোনো বড় উপহার নয়, কোনো দামী শাড়ি বা গয়না নয়—মায়ের নীরব ভালোবাসার জবাবে তাঁকে শুধু একটুখানি সঙ্গ দাও, তাঁর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকো।
কারণ এই পৃথিবীতে এই একটা স্পর্শই চিরন্তন, যার চেয়ে নিরাপদ আর কোনো ঠিকানা মানুষ তাঁর আস্ত জীবনে কখনো খুঁজে পাবে না।
Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.