এই শহর এখন স্তব্ধ।
ল্যাম্পপোস্টগুলো একা পাহারা দেয় নিজেদের হলুদ চিতা।
আলোর নিচে জেগে ওঠে শুধু আমার শরীরী ছায়া:
যে ছায়া এতকাল নিঃশব্দে হেঁটেও কখনো এতটা জীবন্ত হয়নি।
ঘড়ির কাঁটারা মৃত। ফুটপাতে কোনো জুতোর শব্দ নেই।
শুধু বুকের অন্ধকার খাঁচায় আটকে আছে
পুরোনো গ্রামোফোনের ক্ষয়প্রাপ্ত সূচ।
একই পঙ্ক্তি বারবার ফেরে রক্তাক্ত বৃত্তে:
“তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে।”
প্রেমিকারা চলে গেছে পায়ের কোনো চিহ্ন না রেখে,
ফেলে গেছে ধুলোয় লুটানো দু-এক গাছি কাঁচের চুড়ি।
ফুটপাতের হিমে যা এখন মৃত জোনাকির মতো জ্বলে।
শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টিতে তারা আর্তনাদ করে ওঠে,
যেন খুঁজছে চেনা আঙুলের স্পর্শ এই মৃত নগরে।
আমি হাঁটি। প্রতি পদক্ষেপে পিচ চিরে উঠে আসে
মায়ের শাড়িতে লেগে থাকা ভাতের ওম, বাবার নিভে যাওয়া চুরুটের ছাই,
বন্ধুদের অট্টহাসি, যা আজও বাতাসে পারদের মতো ভারী।
এই শহর এখন আমাকে চিনতে পারে না,
অথচ আমি চিনি তার পাঁজরের প্রতিটি ইট,
প্রতিটি ফাটল যেখানে আমার যৌবন নখের রক্তিম দাগ রেখে গেছে।
এ এক বিশাল বোবা ক্যানভাস,
যেখানে সব রং খসে গিয়ে কেবল ছায়ারা নিজেদেরই গিলে খাচ্ছে।
কথা রাখার মানুষগুলো কুয়াশায় মিশে গেছে কবেই।
শুধু এক জীর্ণ জানালায় একা ওড়ে মলিন পর্দা,
যেন কেউ তার এলোচুলে জমিয়ে রাখছে রাত্রির জমাট বিষাদ।
এই নিস্তব্ধতা আমারই নিজস্ব অসুখ।
যেদিন আমি নিজের ভেতর গুটিয়ে নিলাম সমস্ত কোলাহল,
সেদিন থেকে পুরো শহর ওষ্ঠ কামড়ে বোবা হয়ে গেছে।
এখন আমরা দুজন, আমি আর এই নিঃসঙ্গ নগরী,
একই বিছানায় এপিঠ-ওপিঠ জাগি।
ঘুম আসে না কারো, শুধু দুই বুকের ধুকপুকানি এক হয়ে যায়।
তবু যখন শেষ রাত কাটে,
যখন আকাশ হয়ে ওঠে ক্ষয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে লোহা,
গলির মোড়ে কোথাও এক সদ্যোজাত শিশু কেঁদে ওঠে।
সেই কান্না তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে শূন্য পিচে।
আর আমার পাঁজরের ভেতর কেউ ধীরে চোখ মেলে ফিসফিস করে:
“এখনো সব ফুরিয়ে যায়নি।”
তখন এই নির্বাক শহর প্রথমবার ছুঁয়ে দেয় আমার আঙুল।
আর আমি বুঝি,
হারিয়ে যাওয়া সব নগরীই ফিরে আসে,
যদি তুমি নিজের ভেতরে এক বিন্দু বেঁচে থাকো।
তখন এই বোবা শহর আবার গেয়ে ওঠে গান,
আমারই ফিরে পাওয়া কণ্ঠে।

Comments (1)