বাঙালির বোধ-বিকৃতি ও ভারতের ইতিহাস—দ্বিতীয় পর্ব
এতক্ষণ আমাদের কাছে স্পষ্ট হ’ল যে বিকৃত ইতিহাসের পঠন-পাঠন আমাদের জাতীয় ঐক্যে ভাঙন ধরিয়েছে। শুধু তাই নয়, আমরাও হারিয়ে ফেলেছি আমাদের স্বকীয়তা—সত্যসন্ধানী দৃষ্টি আর দৃঢ় সংকল্প।
‘...সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে— মানুষ করনি।’
কবির এই আক্ষেপের মর্মার্থ বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমরা,বাঙালিরা এখনও মানুষ হতে পারিনি। ‘বাঙালি’ বলতে কবি বুঝিয়েছেন তৎকালীন ‘বাংলা’র সব মানুষকে। ধর্মাধর্ম ও জাতাজাতির জাঁতাকলে পিষ্ট হিন্দু-মুসলিমকে আলাদা করে চিহ্নিত করা যায় না। তবুও ঐতিহাসিক দুঃস্বপ্ন যাতে চিরস্থায়ী হয়, তার জন্য অভিনব কলাকৌশলের অন্ত নেই। অশিক্ষিত ও হতবুদ্ধি মানুষের পথভ্রষ্ট হওয়া অস্বভাবিক নয়; কিন্তু সজ্ঞান-সচেতন শিক্ষিত বাঙালি যখন দলাদলির শিকার হন, ধর্মের নামে অধার্মিক অক্টোপাসের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গৌরবান্বিত হন, সেটাই আমার কাছে চরম বিস্ময়ের কারণ হয়ে পড়ে!
অনেকে ভাবেন হিন্দুরাই এ দেশের দাবিদার। আবার কেউ কেউ এমনও ভাবেন মুসলমানের স্বদেশ এই ভারতবর্ষ। অথচ, এ প্রসঙ্গে কবিগুরুর এই বাণী হয়তো কারো মর্মে প্রবেশ করে না—
‘...হেথায় আর্য,হেথা অনার্য,হেথায় দ্রাবিড় চীন-
শক-হুন-দল পাঠান মোগল এক দেহে হ’ল লীন...
...এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।‘
এ সব কথা জেনেও, আমরা হিন্দু,মুসলমানের অপব্যাখ্যা করে থাকি। তার অকাট্য প্রমাণ, এ দেশের বুকে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা। যার ফল—দেশের মানুষ ও ধনসম্পত্তির সামুহিক বিনাশ।
একটি নীতিশিক্ষামূলক গল্পের সারসংক্ষেপ এখানে উল্লেখযোগ্য। একটিমাত্র বাক্যে গল্পটি এরকম—‘দু’মুখো একটি পাখির মুখ ক্রোধ,হিংসা ও অহংকারবশে অন্য মুখকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিষফল ভক্ষণ করায় ঘটল মৃত্যু।’
আমাদের অবস্থা এই পাখির চেয়েও ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। কারণ, পাখিটা ছিল দু’মুখো; আর আমরা তো বহুমুখী।
একটি শক্ত সবল জাতিগঠনে মুখের সংখ্যা যত কম হয়,ততই মঙ্গল। আর, একান্তই যদি আমাদের ‘বহুমুখী’ পরিচয় অটুট রাখতে হয়,তাহলে প্রত্যেকটা মুখকে ‘মুখ’ হয়েই থাকতে হবে, ‘মুখোশ হয়ে নয়। কেননা,সব মুখেরই সহনশীল সহাবস্থানেই একটা দেশের অস্তিত্ব নির্ভর করে। অপরপক্ষে, ‘মুখোশ’ হ’ল যত নষ্ট’র গোড়া—বিচ্ছিন্নতা ও ধ্বংস’র উৎস।
এবার পূর্বোল্লিখিত ভারতীয় বিকৃত ইতিহাসের দু’একটা নমুনা পেশ করা যাক।... সৈয়দ আহমদ বেরেলী ১৭৮৬ খৃষ্টাব্দ’র ১৯শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ইরেজ বিতাড়ন- পরিকল্পনা তাঁর মাথায় এমন গাঢ় হয়ে বসে গেল যে বিখ্যাত আলেম হবার কঠোর সাধনা ছেড়ে, তিনি যোগ দিলেন এক ক্ষুদ্র মুসলমান সামন্ত-প্রভুর সেনাবাহিনীতে; শিখলেন সামরিক কলাকৌশল। এর সঙ্গে অন্যদের সাহায্য করার বিনিময়ে শিখলেন প্রশাসনিক কাজকর্ম। কিন্তু ওই মুসলমান সামন্তপ্রভু সুবিধাবাদীর ভূমিকায় ইংরেজদের সাথে বন্ধুত্ব করল। এ কথা জানার সাথে সাথেই বেরেলী ঘৃণাভরে চাকরী ছেড়ে, নিজের বাড়ি ফিরে এলেন। তারপর তিনি সারা ভারতবর্ষ ঘুরে ঘুরে তাঁর আদর্শে বিশ্বাসী শিষ্য-সংখ্যা বাড়াতে লাগলেন। সবশেষে চাইলেন ইংরেজের বিরূদ্ধে তাঁর সশস্ত্র সংগ্রাম। একই নামের আরও একজন(সৈয়দ আহমদ), যাঁর বাড়ি ছিল আলিগড়ে; ইংরেজ-হিতৈষী বলেই তিনি ‘স্যার’ উপাধি পেয়েছিলেন,চাকরীতেও পদোন্নতি হয়েছিল তাঁর। অপরদিকে বেরেলী মাওলানা সৈয়দ আহমদ ইংরেজদের কাছ থেকে পেয়েছেন, উপহারস্বরূপ অকথ্য অত্যাচার অবশেষে শহিদী মৃত্যুবরণ। দেশপ্রেমের জন্য যে বীর বিপ্লবী মানুষটি আত্ম-বলিদান দিলেন,ইতিহাস তাঁকে সেভাবে মনে রাখেনি।
মজার কথা হ’ল—এই বিপ্লবী-বীরকে উইলিয়াম হান্টার তাঁর ‘দি মুসলমানস’(The Musalmans) গ্রন্থে ডাকাত,ভন্ড ও লুন্ঠনকারী বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। এখন কোনও পাঠক যদি উইলিয়াম হান্টারের উক্ত ইতিহাস পাঠ ক’রে মৌলানা সৈয়দ আহমদ বেরেলীর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন,তাতে পাঠকের আর দোষ কী? আর, ভারতীয় শিক্ষানীতি-নির্ধারকগণ যদি অন্ধ আবেগে,হান্টার সাহেবের গ্রন্থটাকে অনুবাদ ক’রে ,স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করেন,তাহলে বর্তমান প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্ম’র ইতিহাস-শিক্ষার্থীরা কতটা ‘প্রকৃত তথ্যজ্ঞ’ হবে, তা বলা-ই বাহুল্য। পেশ করা যাক, আর একটি উদ্ধৃতি। ‘...যাঁর জীবনস্মৃতি প্রেরণা জুগিয়েছিল যুগে যুগে এই দেশের মহাবিপ্লবীদের; যাঁর জীবনাদর্শ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের আওতার বাইরে থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে, সাম্রাজ্যবাদকে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করা— পথ দেখিয়েছিল পরবর্তীকালের মহেন্দ্রপ্রতাপ বরকতুল্লা, এম.এন.রায়, রাসবিহারী বসু এমনকি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকেও। কে এই মহাবিপ্লবী যাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সহস্র সহস্র মানুষ প্রাণ দিয়েছিল ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে— শত শত মানুষ বরণ করেছিল দ্বীপান্তর, সশ্রম কারাদন্ড,কঠোর যন্ত্রণাময় মৃত্যু! কে ইনি?
... বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর তার দালালদের লেখা ইতিহাসে এর নামোল্লেখ থাকলেও এঁর সম্বন্ধে বিশেষ কিছু লেখা থাকা স্বাভাবিক নয়। আর,আজও স্কুল-কলেজে যে ইতিহাস পড়ানো হয় সেসব ওই সাম্রাজ্যবাদীদের প্রাচীন গলিত বিকৃত ইতিহাসের আধুনিক সংস্করণ মাত্র। তাই কি ক’রে জানবে এই মহাপুরুষের নাম?
এই মহান বিপ্লবী, মহাবিদ্রোহীর নাম হজরত মৌলানা সৈয়দ আহমদ বেলভী...।’ [তথ্যসূত্র: ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সত্যিকারের ইতিহাস— রতন লাহিড়ী(পৃ: ৭—৯)]
.....................(ক্রমশ:)
Comments (1)