"এতদিন সংসার করার পর হঠাৎ Separation-এর কথা ভাবছিস কেন অপু ?"
"জানিনা রে। আমার মনে হয় এই পাঁচ বছরে আমি রণজয়ের কাছে বোঝা হয়ে গেছি। আমার জন্য ওর কাছে এখন কোন সময়ই নেই। আমিও তো একটা মানুষ। খুব হাঁপিয়ে উঠেছি রে...।"
"হুম বুঝলাম।কিন্তু রণদা তো আগে তোকে খুবই ভালোবাসতো।এক কাজ কর তুই বরং রণদার সঙ্গে এই ব্যাপারটা নিয়ে একটু আলোচনা কর।দেখ সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"না রে নতুন করে আর কিছু ঠিক হবার নেই। আমি বাধ্য হয়েই এই সিন্ধান্ত নিতে চলেছি। "
"দেখ, যেটা ভাল বুঝবি। আমার মনে হয় একটু সময় নে। তাছাড়া তোর মেয়েও তো বড় হচ্ছে নাকি! ওর তো একটা জীবন আছে। তাই না?"
"হুম। এই একটাই তো আমার দুর্বলতা। আমার মেয়ে। ওকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন।"
"ছাড়। বাদ দে এসব। এই পেপার পড়েছিস ? কেষ্টপুরের মেয়েটার ওপর চারটে ছেলে যেভাবে অত্যাচার করেছে....Ufff!!Just intolerable...এসব ছেলেদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা উচিত। আর আমাদের রাজ্যের পুলিশ তো কোন কাজের নয়। এক সপ্তাহ হয়ে গেল কেউই ধরা পড়ল না। হয়তো, এইসব আসামীরাই আমাদের চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে...”
"সত্যিই...কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। আজকাল তো পেপার খুললেই শুধু এইসব খবর। মাঝেমধ্যে মনে হয় আমাদের মেয়েদের কোন নিরাপত্তাই নেই। যাইহোক, চল এখন রাখি রে। আমার মেয়ের স্কুল থেকে আসার সময় হয়ে গেল। তোকে পরে ফোন করবো রিয়া। বাই। "
অপু ফোনটা রাখল। রিয়া ওর ছোটবেলার বান্ধবী। সুখে-দুঃখে রিয়া সবসময় অপুর পাশে রয়েছে এই এতদিন ধরে। জীবনের প্রত্যেকটা ঘটনা অপু শেয়ার করে রিয়ার কাছে। এখন ওদের নিয়মিত দেখা হয়না ঠিকই কিন্তু ফোনে যোগাযোগ আছে। এইতো আজ প্রায় আধ ঘণ্টার বেশী কথা হল। অপুর ভালো নাম অর্পিতা। স্বামী রণজয় পেশায়ে ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে ইপ্সি লোয়ার নার্সারি-তে পড়ে। বিধাননগর স্টেশনের সামনে একটি বহুতল ফ্লাটে ওদের বাসস্থান। রণজয় সকালবেলা অফিসে ও ইপ্সি স্কুলে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্নান,খাওয়া-দাওয়া সেড়ে অর্পিতা প্রতিদিন ব্যালকনিতে এসে বসে। কোনদিন বাস-ট্রেন দেখে, আবার কোন-কোনদিন ম্যাগাজিন পড়ে সময় কাটায়। অর্পিতার ইচ্ছে ছিল বিয়ের পর চাকরিটা চালিয়ে যাওয়া কিন্তু রণজয়ের প্রবল আপত্তির কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি। অর্পিতার মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছে হয় পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে, দেখা করতে কিন্তু হয়ে ওঠেনা। কথা ছিল রণ আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে অর্পিতাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। হঠাৎ, পাশের টেবিলে রাখা মোবাইলটা সশব্দে বেজে উঠল। ফোনটা ধরতেই -
"হ্যালো। আমার আজ ফিরতে দেরি হবে। একটা বিশ্রী কাজে ফেঁসে গেছি। তুমি পারবেনা আজ একা একা যেতে? প্লিজ একটা দিন ম্যানেজ করে নাও।"
অর্পিতা কোন উত্তর দিলনা। ইপ্সি স্কুল থেকে ফিরল। কাজের মেয়ে মালাকে ইপ্সির দায়িত্ব দিয়ে অর্পিতা সন্ধ্যে ৬টা নাগাদ একা একাই বেরলো । মনে মনে ভাবতে লাগল, এখন রণর কাছে সে একটা পাশবালিশ মাত্র। থাকলে সুখ, না থাকলে আরও সুখ, দিব্যি হাত-পা ছড়িয়ে চিৎপাত হয়ে শোওয়া যায়। শুধু কাজ কাজ আর কাজ। রণর কাছে এখন কাজটাই সবথেকে বড়। বউ-এর শরীর খারাপের থেকেও। একা একা ডাক্তারের কাছে যেতে ভাল লাগে কারুর ?
দুইঃ
প্রথমটা দেখে রণজয় চিনতেই পারেনি। সাদাসাপটা চেহারার একটা লোক। মাথার সামনে চুল কম। অর্ধ টাক বলা যায়। অফিস থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড-এ আসতেই লোকটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল - "আমায় চিনতে পারলি ?"
ভুরু কুঁচকে রণজয় বলল - "না মানে...আমি তো ঠিক..."
"শ্যামনগরের সুজিত কে মনে পড়ে?"
"ওহো, সুজিত। মানে...তুই সুজিত? তোকে তো চেনাই যাচ্ছেনা।"
"যাক! তাহলে চিনতে পারলি? আমি তো ভাবছিলাম তুই চিনতেই পারবিনা। কেমন আছিস বল? এখন কোথায় থাকিস?"
"বিধাননগরে। তুই?"
"আমি বাগবাজারে একটা ভাড়া বাড়িতে।"
কথা বলতে বলতে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। ট্যাক্সি ড্রাইভার মুখটা বের করে জিজ্ঞেস করল –
"কোথায় যাবেন দাদা?"
রণজয় সুজিতকে বলল - "উঠে আয়। আমি তোকে ড্রপ করে দেব"। সুজিত কিছুটা দোনোমনো করে উঠেই পড়ল ট্যাক্সিতে। ট্যাক্সি ছুটতে লাগল দুরন্ত গতিতে। পেরিয়ে যেতে লাগল ইকো পার্ক, রবীন্দ্র তীর্থ, নজরুল তীর্থ...এক এক করে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে রণজয় প্রশ্ন করল - " তুই এত রাতে রাজারহাটে ?"
"ওই একটা ক্লায়েন্ট-এর বাড়িতে। প্রিমিয়ামের টাকা নিতে। বাজারের অবস্থা খুব খারাপ বুঝলি। বিশেষকরে আজকাল তো আর কেউ পলিসি করতেই চায়না।"
"হ্যাঁ। তা ঠিক বলেছিস। এইসব নিয়ে যা অবস্থা চলছে আমাদের রাজ্যে কি আর বলব !!"
"যাক বাদ দে এসব কথা। তারপর বল তোর খবর? বিয়ে করেছিস? ছেলে-মেয়ে আছে?"
"হ্যাঁ। ওই পাঁচ বছর হল। একটাই মেয়ে তিন বছরের। তুই ?"
"আমার বিয়ে হয়েছে আট বছর হল। ছেলে-মেয়ে হয়নি। আমার স্ত্রীকে অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি কিন্তু কিছুই লাভ হয়নি। কি আর করা যাবে। সবই আমার ভাগ্য বুঝলি !"
কথা বলতে বলতে ট্যাক্সি চলছে নিউটাউনের রাস্তা ধরে। চোখের পলকে পেরিয়ে যেতে লাগল রাস্তার ধারের বড় বড় বিল্ডিংগুলো।
সুজিত বলল - "হঠাৎ শ্যামনগরের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে বিধাননগরে চলে গেলি কেন?"
"ওই একটা ফ্ল্যাট কিনেছি কিছুদিন হল। আসলে বিধাননগর থেকে আমার অফিস-এ যাওয়া খুব সুবিধে। একটা বাস বা ট্যাক্সিতেই হয়ে যায়।"
"হুম। এটা ভালই করেছিস। তার মানে আজকাল ভালো টাকাই রোজগার করছিস। বিধাননগরের মতো জায়গায় ফ্ল্যাট বলে কথা। এখন জমি-জায়গার যা দাম !!"
"শুধু টাকাটাই দেখলি? আর পরিশ্রম! সাকসেস কি এমনি এমনি আসে মশাই ?"
"তা ঠিক। তোর মধ্যে ট্যালেন্টটাও ছিল। তুই তো আমাদের পাড়ার গর্ব ছিলিস। আমি জানতাম তুই একদিন ঠিক বড় হবি। অনেক বড়..."।
রণজয় আজকাল এসব বাক্য অহরহ শোনে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলেই নাকি জানত ও একদিন অনেক বড় হবে। অনেক টাকা রোজগার করবে। এখন ভাবলেও ওর হাসি পায়।
তিনঃ
তিন বছরের ছোট্ট ইপ্সি খুব দুরন্ত। মাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারেনা। মালা সন্ধ্যে থেকেই চেষ্টা করছে ওকে সামলে রাখার। রণজয়ের অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে ওই ১০টা বাজে। তাই সারাদিন ওকে অর্পিতাই সামলায়। কিন্তু আজ অর্পিতাকে ডাক্তার দেখাতে যেতেই হল। আসলে সেই তিন মাস আগে থেকে ডেট বুক করা আছে তাই বাধ্য হয়েই…..। রাত ৮টা থেকে ডাঃ সান্যালের বসার কথা লেকটাউনের চেম্বারে। বিধাননগর থেকে অবশ্য লেকটাউন যেতে বেশী সময় লাগেনা। জাস্ট দুটো অটো চেঞ্জ করেই যাওয়া যায়। কিন্তু অর্পিতা বাসে করে যেতেই বেশী সাছন্দ বোধ করে। অর্পিতার রোগটা তেমন গুরুতর নয়। আজকাল তো ঘরে ঘরে প্রায় ডায়বেটিস লেগেই আছে। বছর খানেক হল অর্পিতার সুগার ধরা পরেছে। এখন নিয়মিত ওষুধের মধ্যে থাকতে হয়। তিন মাস ছাড়া ছাড়া ডাঃ সান্যালকে দেখাতে আসে। যাইহোক, অর্পিতা গিয়ে চেম্বারে পৌছাল। পাঁচ নম্বরে নাম আছে। ডাক্তাররা আজকাল কখনই ঘড়ি ধরে চেম্বারে আসে না, অপেক্ষা করে করে রুগীরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সব ডাক্তাররাই আজকাল বড় বেশী প্রফেশানাল হয়ে গেছ। অর্পিতার ডাক পড়ল তখন ঘড়িতে প্রায় ৮-৪৫ বাজে। দেখতে বেশীক্ষণ সময় লাগল না। আজকাল তো সব ডিজিটাল মেশিনের যুগ। হাত দিয়ে নাড়ি টিপে দেখা এখন উঠেই গেছে। টেস্টের সব রিপোর্ট গুলো ডাক্তারবাবু দেখলেন। ফাস্টটিং টা নরমাল কিন্তু পিপি টা একটু বেশী। প্রেসার টা একটু কমের দিকেই থাকে প্রত্যেকবার। ডাক্তারবাবু ওষুধ লিখে দিলেন। দশ মিনিটের মধ্যেই দেখানো হয়ে গেল। তারপর অর্পিতা জয়া সিনেমা হলের সামনে এসে বাসের জন্য দাঁড়ালো। ঘড়ির কাঁটাটা দেখল, ৯টা বেজে গেছে। একবার ভাবল রণকে ফোন করবে, কিন্তু কেন করবে? অফিসের কাজে আজ ও আসতে পারেনি ঠিকই কিন্তু একবার কি ফোন করে জানতে চেয়েছে সে ডাক্তার-এর কাছে একা একা গেছে কিনা? কখন বাড়ি ফিরবে? ইপ্সি কার কাছে আছে? এখন ওদের সম্পর্কটাতে সত্যিই অনেক দূরত্ব এসে গেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সামনে একটা ইনোভা এসে দাঁড়ালো। সামনের কাঁচটা একটু খুলে একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করল –
"কোন দিকে যাবেন?" ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। চোখে চশমা। হ্যান্ডসাম এক ভদ্রলোক।
অর্পিতা দেখে চমকে উঠল তারপর সৌজন্যর হাসি হেসে বলল - "এই তো সামনেই। বিধাননগর ষ্টেশন।"
ভদ্রলোকটি গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল –
"ভালো আছো? অসুবিধা না থাকলে উঠে এসো আমিও ওই দিকেই যাব।"
অর্পিতা অসস্তিতে পড়ে গেল। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। খানিকটা এড়িয়ে যাবার জন্য বলল –
"নানা ঠিক আছে। আমি বাস পেয়ে যাব।"
"আসলে অনেক রাত হয়ে গেছে,তাই বললাম। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। সংকোচ না করে আমার গাড়িতে উঠে আসাই ভালো "।
আবার ইতস্তত করে অর্পিতা বলল – "আমি পারব চলে যেতে। "
ভদ্রলোকটি তখন বলল – "অ্যাজ ইউ প্লিজ। হঠাৎ তোমাকে দেখতে পেলাম রাস্তায়। তাই ভাবলাম...তাছাড়া আমিও তো ওই দিকেই যেতাম।"
আর আপত্তি করার যুক্তি খুঁজে পেল না অর্পিতা। কি আর এমন ভয়ঙ্কর কিছু হবে? অবশেষে ঘাড় নেড়ে বলল - "আচ্ছা চলো...। "
লোকটি এগিয়ে এসে গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিল। ভব্য স্বরে বলল - " বসো comfortably...।"
অর্পিতা প্রশ্ন করল - "তুমি এই দিকে কোথায় যাবে?"
"কসবা। উল্টোডাঙ্গা হয়েই যাব।"
গাড়ি স্টার্ট দিল লোকটা। রাস্তায় জাম-টাম নেই। গাড়ি সহজ ছন্দে ছুটতে লাগল। অর্পিতা চুপ করে বসে রইল। খানিকক্ষণ পর লোকটাই বলে উঠল -
"সেই একই রকম আছো। সামান্য মোটা হয়েছ ঠিকই কিন্তু দেখলেই চেনা যায়। কতদিন পর আমাদের দেখা হল তাই না?"
"হ্যাঁ। অনেকদিন পর। তুমিও সেই আগের মতই আছো। হ্যান্ডসাম !!"
"থাঙ্ক ইউ। তারপর? বিয়ে করেছো? কি করে হাসব্যানড?"
"সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। প্রাইভেট কোম্পানি তে চাকরি করে। তুমি কি কর এখন?"।
"বাঃ দারুন। আমি ওই বাবার বিসনেস টাই দেখাশোনা করছি"।
"বিয়ে করেছো?"
"না। সেটা আর করা হল কই!! সেরকম ভালো মেয়েই পেলাম না ।"
কিছুটা চুপ করে রইল অর্পিতা। মনে মনে ভাবল, দুর্জয় কি তাহলে এখনো ওকে ভালোবাসে? যাইহোক এসব ভাবনা হঠাৎ করে কেন মাথায় এল অর্পিতা জানে না! গাড়ি এখন শ্রীভুমি ক্লাব পেরিয়ে উল্টোডাঙ্গার দিকে এগিয়ে চলেছে। আবার লোকটি প্রশ্ন করল -
"তারপর এদিকে কোথায় এসেছিলে?"
"ডাক্তারখানায়। তিন মাস ছাড়া ছাড়া ডেট থাকে। প্রত্যেকবার আমার হাসব্যানড আসেন আমার সাথে কিন্তু এবারে ও অফিসের একটা কাজে আটকে পরেছে। তাই আমি একাই..."
"ওহ। তা প্রবলেমটা কি জানতে পারি?"
"তেমন কিছু না। ব্লাড সুগার আছে। আর এখন মাঝে মাঝে একটু নিঃশ্বাসের প্রবলেম হয়। "
গাড়ি চলছিল দ্রুত গতিতে। হঠাৎ, পাশে একটা স্কুটার চলে আসায় লোকটি Accelerator টা ছেড়ে দিয়ে Clutch আর Break টা একসাথে পা দিয়ে টিপে গাড়িটা আচমকা দাঁড় করালো।
চারঃ
সুজিত ট্যাক্সি ড্রাইভারকে হঠাৎ বলে উঠল - "ভাইসাব গাড়ি ডানদিকে ঘোরাও। ওইদিকে রাস্তাটা ফাঁকা থাকে। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাব।" ড্রাইভার কথা মতো গাড়ি ঘোরালো।
রণজয় বলল – "বাবা...তুই তো দেখছি এখন কলকাতার রাস্তাঘাট ভালই চিনে গেছিস।"
উত্তরে সুজিত মুচকি হাসল তারপর বলল - "আচ্ছা তুই সুখী হয়েছিস রণ?"
"কি জানি। এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই আমার কাছে। আমার স্ত্রী অর্পিতা ভালো। খুবই ভালো কিন্তু কেন জানিনা ইদানিং আমাদের দূরত্ব বেড়েই চলেছে।"
"হুম বুঝলাম। এরকম একটু মনে হয়। এসব নিয়ে ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা বলছি তোদের এতদিন হল বিয়ে হয়েছে, কোন পলিসি করেছিস? মানে এটা তো আজকালকার দিনে খুব জরুরী।"
মনে মনে রণজয় ভাবতে লাগল, সুজিত কি এখন কোন পলিসি বিক্রি করতে চাইছে আমাকে? ওই জন্যই কি আমার রোজগার নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছে সুজিত? এবার কিন্তু ব্যাপারটা বেশ বিতৃষ্ণাজনক লাগছে। সুজিত আবার প্রশ্ন করল।
রণজয় তখন বলল - "শোন না। আমার অনেক পলিসি করা আছে। তবুও তুই যখন বলছিস আমি ভেবে দেখব। আমার কার্ডটা রাখ। পরে অফিসে দেখা করিস।"
"ওকে ওকে। সে ঠিক আছে। নো প্রবলেম। তারপর বল। শ্যামনগরে যাস কখনো?"
"নারে। একদম সময় হয় না।"
ট্যাক্সি কিন্তু ক্রমশ অচেনা রাস্তায় এগিয়ে যেতে লাগল। রণজয় এই রাস্তাটা ভালো করে চেনে না। কি রকম যেন সব অচেনা লাগছে। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল -
"আমরা ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো?"
"হ্যাঁ রে। ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি। তুই চিন্তা করিস না। আমি তো আছি।"
রণজয়ের কিন্তু একটু ভয় ভয় করতে লাগল। যদিও মুখে কিছু প্রকাশ করল না। হঠাৎ, সুজিত বলল -
"আচ্ছা । তুই তৃষাকে চিনিস?" চমকে উঠল রণজয়। আমতা আমতা করে বলল -
"হ্যাঁ। কেন বল তো?"
"না না এমনি। আসলে মেয়েটি কিছুদিন আগে রেপ হয়েছিলো।"
"তো? আমাকে বলছিস কেন? আমি কি করব?" রণজয় কিন্তু এবার খুব ভয় পেয়ে গেল।
"কিরে রণ, তোর কি হল? এনি প্রবলেম? কিরে শরীর খারাপ লাগছে?"
"না না। আমি ঠিক আছি।"
কোন রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে রণজয় বলল।
ট্যাক্সি এখন গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠল। সামনেই দেখা যাছে উল্টোডাঙ্গা হাডকো মোড়। রণজয় এবার খানিকটা স্বস্তি অনুভব করল।
পাঁচঃ
ভদ্রলোকটি আবার গাড়ি স্টার্ট করলো। রাস্তায় বাসের সংখ্যা খুব কম। দু-দিকে বড় বড় দোকান, ফ্ল্যাট আর মাঝখান দিয়ে ওদের গাড়ি এগিয়ে যেতে লাগল। অর্পিতা এবার মাথাটা বাঁদিকে হেলিয়ে কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরেটা দেখতে লাগল। লোকটি প্রশ্ন করল -
"তুমি এখনো আবৃতি করো? সেই কলেজ লাইফে কত শুনেছি। তোমার গলায় 'বনলতা সেন' আমার দারুন লাগত"।
"না গো। সংসারের চাপে ওসব আর হয়ে ওঠে না । তুমি এখনও গান গাও আগের মতো?"
"ওই অল্প-সল্প। সময় পাইনা। একটা কবিতা শোনাবে প্লিজ খুব ইচ্ছে করছে!"
"আমি? কবিতা? ওসব তো ছেড়েই দিয়েছি অনেকদিন হলো।"
গাড়িটা রাস্তার এক ধারে দাঁড় করিয়ে অর্পিতাকে বলল - "প্লিজ অর্পিতা। একবার......"
অর্পিতা অবাক হয়ে দুর্জয়ের দিকে তাকালো। পাশ দিয়ে একটা-দুটো গাড়ি যেতে লাগল। অর্পিতা বলে উঠল -
"হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি;
বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি;
আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন..."
সিংহল সমুদ্র থেকে আরো দূর অন্ধকারে মালয় সাগরে অনেক ঘুরেছি আমি;
বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে সেখানে ছিলাম আমি;
আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন..."
"ব্যাস। এইটুকুই...আর পারছি না।"
"বাঃ অসাধারন লাগল। আমার কোন ভাষা নেই তোমাকে অভিনন্দন জানাবার।"
"ধন্যবাদ। অনেকদিন পর আবার..."
"আচ্ছা। অর্পিতা তুমি বিয়ে করে খুব সুখী হয়েছ তাই না?"
"না মানে...হঠাৎ এই প্রশ্ন?"
"এমনি। রোজ রাতে ঘুমাও তো ভালো করে? তোমার চোখের তলায় কালি পড়েছে"। অর্পিতা এবার প্রসঙ্গটা পরিবর্তন করে বলল -
"চলো এবার। গাড়ি স্টার্ট করো। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
"আচ্ছা। অর্পিতা, তুমি কখনও ভেবেছিলে আমাদের আবার দেখা হবে?"
"না। সত্যিই ভাবিনি। এখনো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি আমার সামনে!!"
"আমি ভেবেছিলাম জানো যে আমাদের আবার একদিন দেখা হবে। আচ্ছা তোমার পুরানো কথা মনে পড়ে?"
"কি? কি কথা?"
"সেইসব দিনগুলোর কথা।কলেজ লাইফের কথা। আমাদের সেই সম্পর্কের কথা। বাড়িতে না জানিয়ে আমার সঙ্গে তাজপুর ঘুরতে যাবার কথা? মনে পড়ে, তাজপুরের কটেজে সেই রাতের কথা ?"
"প্লিজ...দুর্জয় চুপ করো। কি লাভ এসব মনে রেখে? ভুলে যাওয়াই ভালো।"
"ঠিকই বলেছ। ভুলে যাওয়াই বোধহয় ভালো। কিন্তু আমি কেন পারিনা ভুলতে? কেন পারিনা?"
অর্পিতা চুপ করে রইল। লোকটি গাড়ি আবার স্টার্ট করল। প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে ওরা। এবার গাড়ি থেকে নামার পালা অর্পিতার। হঠাৎ অর্পিতা বলে উঠল –
"দুর্জয়। আমাকে তুমি বিয়ে করলে না কেন? আমাকে না বলে সেদিন কেন ছেড়ে চলে গেছিলে? কারণটা আমাকে আজ বলবে?"
"বিধাননগর এসে গেছে। নামবে তো?"
"হুম। ধন্যবাদ। আমাকে লিফট দেবার জন্য। এই সামনের ফ্ল্যাটের চারতলায় থাকি। চলি তাহলে?"
"আচ্ছা ।"
"কোই তুমি বললে না তো? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেছিলে? কেন বিয়ে করলে না আমাকে? কেন এইভাবে আমাকে ঠকিয়েছিলে? কেন...?"
"আজ থাক। সত্যিই এতদিন পর এসব কথা জেনে কোন লাভ নেই। "
"দুর্জয়...দুর্জয়...আমার যে অনেক কথা আছে তোমার সাথে...একটু শুনবে প্লিজ ??"
দুর্জয় কোন উত্তর দিল না। শুধুই চুপ করে রইল। পাশ দিয়ে বাস, ট্যাক্সি গর্জন করে বেরিয়ে যেতে লাগল। মৃদু স্বরে দুর্জয় বলল - "একটা গান শুনবে অর্পিতা ?”
"জানি আমি জানি ভেসে যাবে অভিমান,
নিবিড় ব্যথায় ফাটিয়া পড়িবে প্রাণ,
শূন্য হিয়ার বাঁশিতে বাজিবে গান,
পাষান তখন গলিবে নয়নজলে।
হার-মানা হার পরাব তোমার গলে...."
নিবিড় ব্যথায় ফাটিয়া পড়িবে প্রাণ,
শূন্য হিয়ার বাঁশিতে বাজিবে গান,
পাষান তখন গলিবে নয়নজলে।
হার-মানা হার পরাব তোমার গলে...."
"চলি। আবার হয়ত কোনদিন দেখা হয়ে যাবে ঠিক এই ভাবে। "
"তাহলে কি আর কখনো...?"
"কিছু কথা না বলাই থাক অর্পিতা। কিছু কথা সত্যিই বোধহয় বলা বারণ..."
ছয়ঃ
হাডকো মোড়ের উল্টোদিকে পি.সি চন্দ্রের সামনে এসে সুজিত ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলল -
"ভাইসাব গাড়ি দাঁড় করাও। আমি এখানেই নামব।"
"এখানে নামবি কেন? আমি তোকে বাগবাজারে ছেড়ে দিয়ে আসছি "।
"না না। ঠিক আছে। সেটার আর দরকার নেই। চলি তাহলে রণ..."।
"কিন্তু তুই এখানেই...?"
"রণ। আমি কিন্তু তোর কাছে পলিসি বিক্রি করতে আসিনি। আর একটা কথা, তৃষা কিন্তু দুজনের নাম বলেছে। যদিও ওর অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক। কেষ্টপুরের একটা বেসরকারি হসপিটালে ওকে ভরতি করা হয়েছে।"
"মানে? তুই আমাকে এসব বলছিস কেন? কে তুই?"
সুজিত ট্যাক্সি থেকে নামল। রণজয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর পকেট থেকে একটা কার্ড বার করে রণজয়ের হাতে দিয়ে বলল -
"আশা করি তৃষার ব্যাপারে তুই আমাকে সবরকম সাহায্য করবি। তাই তো? চলি। আবার দেখা হবে বন্ধু। সাবধানে থাকিস। কেমন!"
"আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সুজিত...এই সুজিত...আমার কথা শোন......"
সুজিত সামনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যেতে লাগল। রণজয় লক্ষ্য করল দূরে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সুজিত গিয়ে ওই গাড়িটায় উঠল। রণজয় টেনশানে আর কথা বলতে পারছে না। এবার সুজিতের দেওয়া কার্ডটা খুলে দেখল। ছোট ছোট হরফে লেখা রয়েছে - 'SUJIT ROY (Deputy Commissioner of Police, Detective Department, Lalbazar, Kolkata, India)'। চমকে উঠল রণজয়। হাত টা কাঁপতে শুরু করল কার্ডের লেখাটা পড়ার পর। কথা বলবার কোন ক্ষমতা রইল না। ট্যাক্সি থেকে নেমে রণজয় রাস্তার ওপর বসে পড়ল। পাশ থেকে ট্যাক্সি ড্রাইভার চিৎকার করতে লাগল - "দাদা...ও দাদা...কি হলো শুনছেন? আমার ভাড়াটা দেবেন তো….?"
সাতঃ
প্রচণ্ড জোরে ল্যান্ড ফোনটা বাজতে লাগল। রণজয় আর অর্পিতা দুজনেই ধড়ফড় করে উঠে বসল। মাঝখানে ছোট্ট ইপ্সি ঘুমিয়ে রয়েছে। ঘুমের ঘোরে অর্পিতা ফোনটা রিসিভ করতেই -
"হ্যালো। Happy Anniversary!!! কি রে আজকেও এত ঘুম তোদের? ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন-টপ্ন দেখছিলিস নাকি? কতক্ষণ ধরে ফোন করছি...।"
"ওহ। রিয়া। তুই?"
"বাবা। এত ঘুম যে আমাকেও চিনতে পারছিস না? উফফ। রণদা কোথায়? এই তোদের মধ্যে সব ঝামেলা মিটেছে তো? আজকের দিনে একদম ঝগড়া করবি না। Separation-এর কথা মাথায় আনবি না। তোরা তোদের সব মনের কথা আজ শেয়ার কর আর চুটিয়ে প্রেম কর। কেমন? আমি রাখি। টাটা।"
ফোনটা রেখে দিল রিয়া। সত্যিই তো Separation-টা কোন সমাধান নয়। তাছাড়া ইপ্সি-র একটা ভবিষ্যৎ আছে। মা হিসেবে অর্পিতার আর বাবা হিসেবে রণজয়েরও একটা কর্তব্য আছে। আজ অর্পিতা সত্যি চায় সেই পুরানো অতীতের না বলা কথাগুলো রণজয়ের কাছে শেয়ার করতে। কলেজ লাইফে দুর্জয়ের সাথে সব সম্পর্কের কথা। এমনকি সেই দিনটার কথাও, যেদিন ওরা দুজন দুজনের খুব কাছে গিয়েছিল।
মনটাকে প্রস্তুত করে অর্পিতা রণজয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। কিছু বলার আগেই রণজয় অর্পিতাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল -
"আমি তোমাকে অনেক কিছু বলতে চাই অর্পিতা...অনেক কিছু...কথাগুলো শোনার পর প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিও...প্লিজ...।"
আজ গরম পড়েছে খুব। এত গুমোট, যে পাখার হাওয়াও গায়ে লাগছে না। বৈশাখ গড়িয়ে এলো, এখনও কালবৈশাখী এল না। এক আধ দিন মেঘ উঁকি দেয় ঠিকই আবার মিলিয়েও যায় হুশ করে। তারপর আকাশ আবার খটখটে, নিষ্করুণ। বৃষ্টিহীন পৃথিবীতে তাপ বাড়ছে ক্রমশ। তবুও পাখাটা মাথার ওপর হনহন করে ঘুরে চলেছে।
পাশ থেকে অর্পিতা শান্ত গলায় উত্তর দিল –
"আমিও বলতে চাই। যেগুলো এতদিন তোমাকে বলিনি। পারলে তুমি আমাকেও ক্ষমা করো ।"
Comments (5)