কাজল  রেখা

                                                                    নীল নাঈম

অধ্যায় ১

ও ভাই হাটুরে, ও মাঝিভাই, ও গাঁয়ের মা-বোনেরা, একটু থামো। মাথার বোঝা নামাও, নৌকার বৈঠা তোলো। আমি বনমালী গায়েন, হাওরের পাড়ে পাড়ে আমার বাস। নাম শুনে চিনবে না, কিন্তু গলা শুনলে হয়তো চিনবে। কোনো এক বর্ষার সন্ধ্যায়, কোনো এক ঘাটে, আমি এই গান গেয়েছি। কেউ থেমেছে, কেউ থামেনি। যারা থেমেছিল, তাদের চোখ আমি দেখেছি।

আজ আমি দুজন মানুষের কথা বলব। একজন জেলের ছেলে, আরেকজন জমিদারের মেয়ে। এ রূপকথা নয় গো ভাই। রূপকথায় রাজকন্যা ঘরে ফেরে, রাজপুত্র ঘোড়া ছুটিয়ে আসে। এ সত্যি ঘটনা, তাই এর শেষে আছে শুধু জল।

কিন্তু কথা ধরার আগে একটা কাজ বাকি। আগে হাওরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই।

ও হাওর, ও বুড়ো হাওর, তুমি আমার চেয়ে বুড়ো। তোমার বুকের তলায় আমার চেয়ে অনেক বেশি কথা জমা আছে। আজ সেই কথা আমি মানুষের সামনে বলতে বসেছি। ভুলচুক হলে মাপ কোরো। বুড়ো মানুষের জিভ বড় বেহায়া, সে সবসময় নিজের কথাই বলতে চায়।

ওগো মা-বোনেরা, তোমরা হয়তো ভাবছ, হাওর কি মানুষ যে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে? তোমরা কখনো ভরা বর্ষায় হাওরের মাঝখানে নৌকায় রাত কাটিয়েছ? যেদিকে তাকাও শুধু জল, আকাশ নেমে এসে জলের সঙ্গে মিশেছে, মাটির চিহ্ন কোথাও নেই। তখন বুঝবে, হাওর জ্যান্ত জিনিস। সে ঘুমোয়, সে জাগে, সে রাগ করে, আবার এমন শান্ত হয়ে থাকে যেন কিছুই হয়নি। আমি তাকে চিনি। ষাট বছর তার বুকে ভেসে কাটিয়েছি।

যাদের গল্প আজ বলব, তারাও তাকে চিনত। জলকে ওরা ঘর বানিয়েছিল, জলকেই বানিয়েছিল ডাকঘর। আর শেষে সেই জলই...

না গো না, শেষের কথা আগে বলতে নেই। যে গায়েন গোড়াতেই সব বলে দেয়, তার গল্প সন্ধে না হতেই মরে যায়। তোমরা বসো, আমি ধীরে ধীরে শুরু করি।

সেটা ছিল আষাঢ়ের প্রথম রাত। আকাশে মেঘ জমেছে, চাঁদ ঢেকে গেছে, আর হাওরের দিক থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসছে। ভিজে মাটি আর পচা শাপলার গন্ধ। বুড়োরা এই গন্ধ চেনে। বলে, হাওর জাগছে।

সেই রাতেই জেলেপাড়ার এক ভাঙা কুঁড়েঘরে জন্ম নিল একটা ছেলে। দাই বলল, এমন কালো ছেলে সে জীবনে দেখেনি, যেন বর্ষার প্রথম মেঘ গায়ে মেখে এসেছে। বাপ বলল, তবে নাম থাক কাজল।

কাজল। চোখের কাজল যেমন সামান্য, তেমনি সামান্য ছিল তার জন্ম। আবার কাজল ছাড়া যেমন চোখ সাজে না, তেমনি তাকে ছাড়া এই গল্প সাজে না।

অধ্যায় ২

কাজলের বাবার নাম দয়াল মাঝি। দয়ালের ঘর বলতে একখানা চালা, সম্পত্তি বলতে একখানা নৌকা, দুই বোঝা জাল আর বুকভরা হাওরের গান। সে বলত, "জমিদারের আছে ধানের গোলা, আমার আছে জলের গোলা। কার বেশি, কে জানে!"

কাজলের মা তাকে জন্ম দিয়েই চোখ বুজেছিলেন। বর্ষার সেই প্রথম রাতে ছেলে এল, মা গেলেন। তাই দয়াল ছেলেকে বুকে নিয়েই নৌকায় উঠত। বলত, "তোর মা নাই রে, তবে হাওর আছে। হাওর তোর মা।"

সাত বছর বয়সে কাজল সাঁতার শিখল, দশে এসে জাল বুনতে। কিন্তু তার আসল শিক্ষা ছিল অন্য। হাওরের কোন জলে কোন মাছ, কোন বাতাসে কোন ঝড়, কোন তারা উঠলে কোন দিকে নৌকা ঘোরাতে হয়, এসব সে শিখেছিল কারও মুখে শুনে নয়, নিজের চোখে দেখে। বুড়ো মাঝিরা অবাক হয়ে বলত, "দয়ালের ছেলের চোখে জল ঢুকে আছে রে।"

আর ছিল তার বাঁশি। সেও কেউ কিনে দেয়নি। বর্ষা শেষে হাওরের পাড়ে বনবেতের ঝাড় শুকিয়ে যায়। সেখান থেকে একটা সরু বেত কেটে এনে কাজল নিজের হাতে ফুটো করল। প্রথম দিন বাঁশিতে কোনো সুরই এল না, শুধু ফুঁ আর হাওয়া। দ্বিতীয় দিনও তাই। তৃতীয় দিন সে নৌকার গলুইয়ে বসে বাঁশি ঠোঁটে তুলল, আর ঠিক তখনই দূরে জলের ওপর একটা পানকৌড়ি ডেকে উঠল। কাজল সেই ডাকটা বাঁশিতে তুলে নিল।

সেদিন থেকে সে বাঁশি বাজায়। পাখির ডাক, বাতাসের শিস, মাছের ঘাই, সবই তার বাঁশিতে ওঠে। শুধু একটা সুর তার কাছে ছিল না, যে সুর মানুষের জন্য বাজে।

কাজলের সামনে কোনো সোনার সিঁড়ি ছিল না, কোনো রাজপথ ছিল না। তার একমাত্র পথ ছিল জল। আর যে জলের পথে চলে, সে জানে, জল যা দেয়, সময় হলে সব ফিরিয়ে নেয়।

অধ্যায় ৩

হাওরের পাড়ে উঁচু ভিটার ওপর জমিদারবাড়ি। লাল ইটের দালান, সামনে বিশাল দিঘি, পাশে বটগাছ। সেই বাড়ির আদরের মেয়ে ছিল রেখা।

জমিদার বংশীধর রায়ের ছেলে ছিল না, রেখাই একমাত্র সন্তান। রেখার মাও তাকে রেখে আগেই চলে গেছেন। একজন জন্মেছে কুঁড়েঘরে, আরেকজন দালানে, কিন্তু দুজনের মাথার ওপরেই মায়ের ছায়া ছিল না।

বংশীধর খারাপ লোক ছিলেন না। প্রজার কান্না শুনে তাঁর চোখ ভিজত, দুর্ভিক্ষের বছরে তিনি নিজের গোলা খুলে দিয়েছিলেন। মেয়েকে এত ভালোবাসতেন যে তার একটা কথাও ফেলতে পারতেন না। তাই রেখা একদিন যখন এমন জিনিস চেয়ে বসল, যা সে গাঁয়ের কোনো মেয়ে কখনো চায়নি, তিনি না বলতে পারলেন না। রেখা বলেছিল, "বাবা, আমি পড়তে শিখব।"

পিসিমা শুনে মাথায় হাত দিলেন। "মেয়েছেলে লেখাপড়া শিখলে যে অমঙ্গল হয়!" কিন্তু বংশীধর মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। পরদিনই শহর থেকে এক বুড়ো মাস্টার এলেন। সেই থেকে অন্দরমহলের পেছনের ঘরে রেখার বইয়ের জগৎ শুরু।

বই যত পড়ে, মন তত বড় হয়, আর বড় মনের সামনে ঘরের দেয়াল ততই ছোট হয়ে আসে। বইয়ে সে পড়ে সমুদ্রের কথা, পাহাড়ের কথা, দূর দেশের নদীর কথা। অথচ চোখের সামনে শুধু একটা জানলা, আর জানলার ওপারে দিঘির কালো জল।

তবু ওই জানলাই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। বিকেল হলেই সে বই বুকে নিয়ে জানলার ধারে বসত। দিঘির ওপারে বটগাছ, বটগাছের ওপারে হাওরের সীমা, আর সেই সীমার ওপারে কী আছে, সে জানত না।

একদিন, সেই আষাঢ়েরই এক বিকেলে, বাতাসে ভেসে এল পাখির ডাকের মতো একটা সুর। কিন্তু পাখি তো এভাবে বাজে না। বইয়ের পাতা থেমে গেল, রেখা জানলার গরাদ ধরে উঠে দাঁড়াল। দূরের কোনো নৌকা থেকে ভেসে আসছিল এক বাঁশির আওয়াজ। সে বাঁশি পাখির ডাক জানে, বাতাসের শিস জানে, শুধু জানে না মানুষের কথা বলতে।

রেখা, যে মেয়ে বই পড়ে দুনিয়া চিনেছে, সেদিন প্রথমবার বুঝল, দুনিয়ায় এমন কিছুও আছে যা বইয়ে লেখা নেই।

সন্ধ্যায় পিসিমা ডাকতে এসে দেখলেন, মেয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে রে?"

রেখা বলল, "কিছু না পিসিমা। শুধু মনে হলো, কেউ আমার নাম ধরে ডাকল।"

অধ্যায় ৪

শ্রাবণ মাস। হাওর তখন কূল ছাপিয়ে ভরা। জমিদারবাড়ির নৌকা চলেছে দূরের গাঁয়ে আত্মীয়বাড়িতে। মাঝিমাল্লা চারজন, সঙ্গে পিসিমা আর রেখা। রেখা এই প্রথম হাওরের বুকে নামল। এতদিন যা জানলা দিয়ে দেখেছে, আজ সে তার মাঝখানে।

সে কথাই বলতে পারছিল না। পিসিমা অনর্গল বকে যাচ্ছেন, রেখা কিছুই শুনছে না। যেদিকে তাকায় শুধু জল আর আকাশ। বইয়ে পড়া সমুদ্র আজ যেন চোখের সামনে।

কিন্তু হাওর যেমন সুন্দর, তেমনি বিশ্বাসঘাতক। যে হাওর সকালে আয়নার মতো থাকে, সেই হাওরই দুপুরে ক্ষেপে যায়, এক নিমেষে।

আকাশের কোণে হঠাৎ কালো মেঘ জমল। বুড়ো মাঝি চেঁচিয়ে উঠল, "ঝড় আসে রে, পাল নামা!" কিন্তু বলতে বলতেই বাতাস এসে আছড়ে পড়ল। ঢেউ উঠল নৌকার দুই মাথা ছাপিয়ে, পাল ছিঁড়ে গেল, নৌকা একবার ডাইনে হেলল, একবার বাঁয়ে। তারপর এক বিশাল ঢেউ নৌকাটাকে উল্টে দিল।

জলের নিচটা বড় শান্ত জায়গা। ওপরে ঝড়, নিচে নিঃশব্দ। রেখা তলিয়ে যাচ্ছে, শাড়ি পায়ে জড়াচ্ছে, বুকের বাতাস ফুরিয়ে আসছে। সে ভাবছে, কী চুপচাপ জগৎ, কী নীল...

ঠিক তখন হাওরের আরেক মাথায় একখানা ছোট নৌকায় বসে এক জেলের ছেলে জাল গুটাচ্ছিল। ঝড়ের গন্ধ সে আগেই পেয়েছিল, তাই নৌকা পাড়ের দিকে ঘোরাচ্ছিল। এমন সময় দূর থেকে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার, তারপর নৌকা উল্টানোর শব্দ।

আর কেউ হলে হয়তো ভাবত, ঝড়ের ভেতর ওদিকে যাওয়া মানে মরণ ডেকে আনা। কাজল ভাবল না। সে বৈঠা ঘুরিয়ে নৌকা ছুটিয়ে দিল ঝড়ের ভেতর দিয়ে, ঠিক যেদিক থেকে শব্দ এসেছিল।

সে পৌঁছে দেখল, উল্টানো নৌকার পাশে কয়েকজন মাঝি জলে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর পিসিমা একটা ভাঙা তক্তা আঁকড়ে ধরে চেঁচাচ্ছেন। এক এক করে সবাইকে সে টেনে তুলল। তারপর পিসিমা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমার রেখা! আমার মেয়েটা কোথায়!"

কাজল আর কিছু ভাবল না। বৈঠা ফেলে সোজা জলে ঝাঁপ দিল।

কতক্ষণ খুঁজেছিল সে, কেউ জানে না। কেউ বলে এক নিমেষ, কেউ বলে এক প্রহর। শুধু জানা যায়, জলের নিচের নীল আলোয় সে দেখল একটা শাড়ির আঁচল ভেসে যাচ্ছে। সে হাত বাড়াল, আঁচল ধরল, টেনে তুলল এক মেয়েকে, যার চোখ বন্ধ, ঠোঁট নীল। নৌকায় শুইয়ে বুকে চাপ দিয়ে জল বের করল, আর একসময় রেখা কাশতে কাশতে চোখ খুলল।

জীবনে প্রথমবার সে অচেনা একটা মুখ দেখল। ভেজা, কালো, চোখে অদ্ভুত উদ্বেগ। রেখা ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি সেই বাঁশির লোক?"

কাজল অবাক হয়ে চুপ করে রইল। সে তো জানত না, কোন বিকেলে কোন জানলার ধারে তার বাঁশির সুর কার বুকে গিয়ে ঠেকেছিল।

অধ্যায় ৫

ঝড় থামল, নৌকা ঘাটে ফিরল, রেখাকে তার বাপের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলো। জমিদার বংশীধর কাজলকে ডেকে পাঠালেন, মাথায় হাত রেখে বললেন, "বাবা, তুই আমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছিস। যা চাইবি, তাই দেবো।"

কাজল মাথা নিচু করে বলল, "কিছু চাই না কর্তা। জেলের ছেলে জলের মানুষকে না তুললে কে তুলবে?"

বংশীধর তবু একটা ধানের থলি আর একখানা নতুন জাল দিলেন। কাজল সেগুলো নিয়ে ফিরে গেল। কিন্তু আসল পুরস্কারটা তখনো সে বুঝতে পারেনি। সেটা রয়ে গেল জানলার ওপারে, এক মেয়ের বুকে।

সেদিন থেকে রেখার চোখ আর বইয়ের পাতায় থাকে না, সে দিঘির ওপারে হাওরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাজলও বদলে গেছে। জাল ফেলতে ভুলে যায়, বাঁশি বাজাতে বসে সুর হারিয়ে ফেলে। দয়াল মাঝি ছেলের মুখ দেখে মুচকি হাসে, কিছু বলে না। সে জানে, জলের মানুষের এই রোগ একদিন না একদিন ধরেই।

ঝড়ের তিন দিন পর এক ভোরে জমিদারবাড়ির খিড়কির ঘাটে এক বুড়ি দাসী এসে ফিসফিস করে বলল, "দিদিমণি বলে দিয়েছেন, কাল পূর্ণিমার রাতে দিঘির ওপারে বটতলার ঘাটে এসো।"

পূর্ণিমার রাতে চাঁদ উঠল, জোছনা নামল জলে। বটতলার ঘাটে বাঁধা এক ছোট নৌকায় কাজল বসে ছিল, বুক কাঁপছে। রেখা এল চুপিচুপি, পায়ের নূপুর খুলে হাতে নিয়ে, যাতে শব্দ না হয়। দুজন কিছুক্ষণ কিছুই বলল না। শুধু জলে চাঁদের ছায়া কাঁপছিল।

শেষে রেখা বলল, "তুমি সেদিন আমাকে নাম জিজ্ঞেস করোনি।"

কাজল বলল, "আপনি জমিদারের মেয়ে, আমি জানি।"

"আমার একটা নাম আছে।"

"রেখা।"

"তুমি জানো?"

"পাড়াময় জানে। কিন্তু আজ আপনার মুখে শুনতে চাই।"

রেখা হেসে ফেলল।

সেই রাত থেকে ওদের খেলা শুরু হলো। প্রতি পূর্ণিমার রাতে, যখন গ্রাম ঘুমোত, দুজন বটতলার ঘাটে মিলত। কাজল নৌকা বেয়ে হাওরের মাঝখানে নিয়ে যেত, যেখানে কোনো মানুষ নেই, শুধু জল আর আকাশ আর চাঁদ। রেখা আনত বই, কাজল আনত বাঁশি।

রেখা কাজলকে পড়তে শেখাত। প্রথম দিন একটা অক্ষর চিনতেই কাজলের সারা রাত লাগল। রেখা বলত, "এটা 'অ'।" কাজল বলত, "এ তো দেখতে ঠিক নৌকার গলুইয়ের মতো।" রেখা হেসে বলত, "হ্যাঁ, ঠিক তাই, তুমি মনে রাখবে।"

আর কাজল রেখাকে শেখাত বাঁশি। রেখার ঠোঁটে প্রথম দিন শুধু ফুঁ আর হাওয়া। কাজল হেসে বলত, "প্রথম দিন আমারও তাই হয়েছিল।" রেখা বিরক্ত হয়ে বলত, "তুমি হাসছ কেন?" কাজল বলত, "আপনি বিরক্ত হলে ঠিক পানকৌড়ির মতো দেখান।"

একদিন সেই বাঁশিতেই রেখা প্রথমবার একটা সুর বের করল। ছোট, কাঁপা কাঁপা, ভুল সুর। কাজল স্তব্ধ হয়ে শুনল। তারপর বলল, "জানেন, এই সুরটাই আমি এতদিন খুঁজছিলাম।"

"কোন সুর?"

"যে সুর মানুষের জন্য বাজে।"

সুখের দিনই ছিল সেগুলো। কিন্তু বটগাছ সবই দেখে। বটগাছের আড়ালে যে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, সে কথা তারা তখনো ভাবেনি।

অধ্যায় ৬

বর্ষা গিয়ে শরৎ এল, শরৎ গিয়ে হেমন্ত। কত পূর্ণিমা এল, কত পূর্ণিমা গেল, আর বটতলার ঘাটে কাজল আর রেখার দেখা চলতেই থাকল। কাজল এখন অক্ষর চেনে, ছোট ছোট শব্দ পড়তে পারে। রেখা বাঁশিতে সুর তোলে, ভুল হলেও সে সুরে প্রাণ থাকে। হাওরের জল কমতে লাগল, কিন্তু ওদের মনের জল দিনে দিনে বাড়তেই লাগল।

চোরের সুখ বেশিদিন টেকে না। সে যত সাবধানেই থাকুক, কোথাও না কোথাও একটা পায়ের শব্দ হয়, একটা চোখ খোলা থাকে।

সেদিন ছিল কার্তিকের পূর্ণিমা। হিম পড়তে শুরু করেছে, কুয়াশা জমছে হাওরের বুকে। রেখা শাল জড়িয়ে ঘাটে এল। সেদিন কাজলের মুখে একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য। রেখা জিজ্ঞেস করল, "কী হয়েছে?"

"আজ একটা কথা বলব, রাগ করবেন না। আমি জানি, আমরা যা করছি তা ঠিক নয়। আপনি জমিদারের মেয়ে, আমি জেলের ছেলে। এ পথের শেষে কিছু নেই। তবু..." কাজল থামল। "তবু আমি এ পথ ছাড়তে পারব না।"

রেখা চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কাজলের হাত নিজের হাতে তুলে নিল। জীবনে প্রথমবার। বলল, "আমিও পারব না।"

বটগাছের আড়ালে সেদিন একজন দাঁড়িয়ে ছিল। এক গ্রামবাসী, সামান্য মানুষ, যে রাতে হাওরে মাছ ধরতে বেরিয়েছিল। সে দূর থেকে দেখল, জমিদারের মেয়ে এক জেলের ছেলের হাত ধরে বসে আছে। বুকের ভেতর হাজারটা কথা ঘুরছে। এ কথা বললে কী হবে? না বললেই বা কী? সে ভাবল, ওরা তো কারও ক্ষতি করছে না।

কিন্তু একটা ভয় তার বুকে বাসা বেঁধেছিল। সে জানত, এ কথা একদিন ফাঁস হবেই। আর যেদিন ফাঁস হবে, সেদিন যদি জানাজানি হয় যে সে আগে থেকে জেনেও চুপ করে ছিল, জমিদার তাকেও ছাড়বে না।

সেই ভয়ই সব নষ্ট করল।

তার নাম আমি আজ বলব না। বলার সময় এখনো আসেনি। শুধু জেনে রাখো, পরদিন সকালে লোকটা জমিদারবাড়ির দরজায় গিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, "কর্তা, একটা কথা জানাতে এসেছি।"

বংশীধর তখন বারান্দায় বসে তামাক টানছিলেন। লোকটা মাথা নিচু করে সব বলে দিল। কোন পূর্ণিমায়, কোন ঘাটে, কার সঙ্গে। এক নিশ্বাসে, চোখ না তুলে।

তামাকের কলকে জমিদারের হাত থেকে পড়ে গেল। বহুক্ষণ তিনি কিছু বললেন না। তারপর আস্তে বললেন, "তুই যা। এ কথা আর কাউকে বলিস না।"

লোকটা চলে গেল। কিন্তু সেদিন থেকে তার ঘুম গেল। যতবার চোখ বোজে, ততবার দেখে বটগাছের আড়াল, জলের ছায়া, আর হাতে হাত রাখা দুটো মুখ।

অধ্যায় ৭

বংশীধর সেদিন সারা রাত ঘুমোননি। বারান্দায় বসে একা তামাক টেনেছেন, হাওরের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। রাগ তাঁর আসেনি, এসেছিল ভয়। মেয়েটা তাঁর বুকের ধন, তার মা নেই, তিনিই বাপ, তিনিই মা। তিনি ভাবলেন, এ কথা গাঁয়ে ছড়ালে কে বিয়ে করবে রেখাকে? কোন ঘরে ঠাঁই পাবে সে? সমাজ বড় নিষ্ঠুর, মেয়েমানুষের একটা ভুল সে সারাজীবনেও ক্ষমা করে না।

পরদিন সকালে নায়েবকে ডেকে বললেন, "শহরের সেই পাত্রের বাড়িতে খবর পাঠাও। যে প্রস্তাব এসেছিল, আমি রাজি। আগামী অগ্রহায়ণেই বিয়ে।"

নায়েব অবাক। "কর্তা, মেয়ে তো এখনো কিছু জানে না।"

"জানবে। যথাসময়ে জানবে।"

সেদিন থেকেই রেখার জানলায় তালা পড়ল। সে তালা লোহার ছিল না, ছিল স্নেহের। কেউ রেখাকে মারল না, কটু কথা বলল না। শুধু পিসিমা সারাক্ষণ তার সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। ঘাটে যাওয়া বন্ধ, দিঘির পাড়ে যাওয়া বন্ধ, জানলার ধারে বসাও বন্ধ। জানলায় ভারী পর্দা টাঙিয়ে দেওয়া হলো।

তৃতীয় দিন রেখা বাপের ঘরে গিয়ে সোজা দাঁড়াল। বলল, "বাবা, আমাকে বন্দি করেছেন কেন?"

বংশীধর চোখ তুললেন না। "বন্দি না মা। আমি তোর ভালো চাই।"

"আমার ভালো কী, সেটা কি আমি বুঝব না?"

"তুই বুঝিস না রে মা। তোর বয়স কম, তুই দুনিয়া চিনিস না।"

রেখা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শান্ত গলায় বলল, "আমি তো বই পড়ে দুনিয়া চিনেছি বাবা। আপনিই তো আমাকে পড়তে শিখিয়েছিলেন।"

বংশীধর এবার চোখ তুললেন, আর সেই চোখে এমন কষ্ট দেখা গেল যে রেখা আর কিছু বলতে পারল না। দুজনেই বুঝল, দুজনেই ঠিক, আর সেটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

বিয়ের আয়োজন জোরেশোরে শুরু হলো। শহর থেকে এল শাড়ি, গয়না আর মিষ্টির ঝুড়ি। বাড়ি জুড়ে হইচই, কিন্তু সেই হইচইয়ের মাঝখানে একটা মেয়ে ঘরের কোণে পাথরের মতো বসে রইল। সে শাড়ি ছুঁল না, গয়না পরল না, মিষ্টি মুখে তুলল না।

আর হাওরের অন্য পাড়ে প্রতি সন্ধ্যায় এক ছেলে নৌকা নিয়ে বটতলার ঘাটে গিয়ে বসে থাকত। একদিন, দুই দিন, তিন দিন, কেউ এল না। জাল পড়ে থাকে, বাঁশি বাজে না।

দয়াল মাঝি একদিন জিজ্ঞেস করল, "কাজল, তুই কার জন্য এমন করে ঘাটে বসে থাকিস?"

কাজল চুপ করে রইল। দয়াল বলল, "আমি জানি রে। বাপ কি ছেলের চোখ চেনে না?" তারপর ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলল, "শোন কাজল, জলের মানুষ জলের নিয়ম মানে। জল যখন ফিরিয়ে নিতে চায়, তখন লড়তে নেই। সরে যেতে হয়।"

কাজল ধীরে ধীরে মুখ তুলল। "আর যদি সরে যেতে না পারি বাবা?"

দয়াল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অস্ফুট গলায় বলল, "তাহলে আল্লা ভরসা।"

অধ্যায় ৮

কুয়াশা নামল ভোরে, হিম পড়ল ঘাটে। জমিদারের লোক এল জেলেপাড়ায়। "কাজল, তোকে কর্তা ডাকেন।" দয়াল সবই বুঝল, কিছু বলল না।

কাজল গেল। কেউ তাকে মারেনি, বেঁধেও নেয়নি। সে হেঁটে গেল সেই লাল ইটের দালানের সামনে, যেখানে একদিন ধানের থলি পেয়েছিল। আজ সেখানে সে দাঁড়াল মাথা নিচু করে। বারান্দায় বসে আছেন বংশীধর। আজ তাঁর মুখে স্নেহ নেই, আছে ক্লান্তি আর ভয়।

তিনি বললেন, "কাজল, তুই আমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছিলি, আমি ভুলিনি। তাই তোকে মারব না, কাটব না। শুধু একটা কথা বলব। টাকা নে, জমি নে, দূর গাঁয়ে চলে যা। আর কখনো এ হাওরের ছায়ায় আসিস না। রেখার বিয়ে ঠিক, সে শহরে যাবে। তুই এ দেশে থাকিস না, মিনতি করছি।"

জমিদার হুকুম দেননি, মিনতি করেছিলেন। আর সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় মার, কারণ কাজল রাগ করার মতো কিছুই পেল না।

সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল। "কর্তা, টাকা আমি চাই না। যে ধন হারাব, কোনো টাকা তার ঘাটতি পূরণ করে না। তবু যাব, কথা দিলাম, আপনার মেয়ের জন্য।"

বংশীধর আর কিছু বললেন না। শুধু হাত নাড়লেন, লোকজন এসে কাজলকে বাইরে নিয়ে গেল।

কিন্তু শাস্তি তখনো শেষ হয়নি। নায়েব ভাবল, ছেলেটা যদি নৌকা নিয়ে ফের হাওরে ফেরে? তার হুকুমে লোকজন জেলেপাড়ায় গিয়ে কাজলের নৌকাখানা টেনে নিয়ে এল ঘাটে। তারপর সবার সামনে সেই নৌকায় আগুন ধরিয়ে দিল।

ধোঁয়া উঠল আকাশে, কালো মেঘের মতো। দয়াল মাঝি হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছিল। সেই নৌকা তার নিজের হাতে গড়া, সেই নৌকায় কাজলের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা। কাজল দূর থেকে দেখল, কিন্তু এগিয়ে গেল না। সে জানত, এগোলে আরও কিছু পুড়বে।

পরদিন ভোরে সে বেরিয়ে পড়ল। সঙ্গে নিল শুধু গামছায় বাঁধা কিছু মুড়ি আর তার সেই বনবেতের বাঁশি। দয়াল দরজা পর্যন্ত এল, ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল, "যা বাপ, জলের মানুষ জলের পথ চেনে। ঠিক ফিরবি।"

এদিকে জমিদারবাড়ির অন্দরমহলে পর্দা ঢাকা ঘরে রেখা সবই শুনেছে। দাসীদের ফিসফিস, নৌকা পোড়ার গন্ধ, বাপের ভারী পায়ের শব্দ। সে চিৎকার করেনি, কাঁদেওনি। শুধু জানলার পর্দার পাশে কান পেতে বসে রইল।

তখন বহু দূর থেকে, হাওরের ওপার থেকে ভেসে এল একটা সুর। সেই পুরনো বাঁশি, কিন্তু আজ তার ভেতরে পাখির ডাক নেই, বাতাসের শিসও নেই। আজ সে বাঁশি মানুষের সুরে বাজছে, সেই সুরে, যা কাজল এতদিন খুঁজছিল। আর সেই সুর বিদায়ের সুর।

রেখা নিজের বাঁশি তুলে ঠোঁটে ঠেকাল। ভুল সুরে, কাঁপা সুরে, উত্তর পাঠাল।

কাজল সেই উত্তর শুনেছিল কি? কেউ বলে শুনেছিল, কেউ বলে বাতাসে সে সুর হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু জানা যায়, কাজল হাওরের পাড়ে একবার থেমে দাঁড়িয়েছিল, পেছন ফিরে তাকিয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে কুয়াশার ভেতর মিলিয়ে গিয়েছিল।

আর সেই গ্রামবাসী, যে সব বলে দিয়েছিল, সে সেদিন ঘাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। সে দেখল কাজল চলে যাচ্ছে। তার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল। সে চোখ নামিয়ে নিল, আর সেদিন থেকে আর কখনো কাজলের চোখের দিকে তাকাতে পারেনি।

অধ্যায় ৯

কাজল গ্রাম ছেড়েছিল কার্তিকের শেষে। ফিরল চৈত্রের এক দুপুরে, যখন হাওরের জল নেমে গিয়ে মাঠ জেগে উঠেছে, আর সেই মাঠে বোরো ধানের সবুজ ঢেউ খেলছে।

এই পাঁচ মাসে সে অনেক জায়গায় ঘুরেছে। কিছুদিন ছিল সুনামগঞ্জের এক মাছের আড়তে, বস্তা টানত। তারপর কিশোরগঞ্জের এক নৌকার মাঝির সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিল, তার সঙ্গে নদী ধরে ধরে চলে গিয়েছিল অনেক দূর। কোথাও এক মাসের বেশি থাকেনি। সবখানেই সেই একই অস্থিরতা, যেন তার ভেতরে কোনো একটা জিনিস সারাক্ষণ হাওরের দিকে মুখ ফিরিয়ে আছে।

শেষে একদিন সে বুঝতে পারল, এভাবে আর চলবে না। দূরে গেলে মন শান্ত হয় না, বরং আরও জ্বলে। সে ঠিক করল, ফিরবে। জমিদারের কথা রাখা হয়নি, তা সে জানে। কিন্তু সে এও জানে, রেখার বিয়ে হয়ে গেছে কিনা, সেটা না জানলে তার আর শান্তি নেই।

ফেরার আগে সে নিজের চেহারা বদলে নিল। দাড়ি রাখল, মাথায় গামছা বাঁধল, গায়ে চাপাল এক ভিনদেশি ফকিরের ময়লা আলখাল্লা, যেটা সে এক হাটে কিনেছিল সামান্য কয়েকটা পয়সায়। হাতে লাঠি, কাঁধে ঝোলা, ঝোলার ভেতর বনবেতের সেই বাঁশি।

গ্রামে ঢুকে প্রথমেই সে অনুভব করল, কিছু একটা বদলে গেছে। লোকজনের কথাবার্তায় একটা চাপা উত্তেজনা। মেয়েরা ঘাটে জটলা করছে, পুরুষেরা চায়ের দোকানে মাথা গুঁজে ফিসফিস করছে। একজন বুড়ো তাকে দেখে বলল, "ফকির সাহেব, এ গাঁয়ে আজ ভিক্ষা চেয়ে লাভ নেই। সবাই জমিদারবাড়ির বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত।"

কাজলের বুকের ভেতর কিছু একটা দুলে উঠল। সে যতটা সম্ভব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করল, "বিয়ে? কার বিয়ে?"

"জমিদারকন্যার। পরশু রাতে বিয়ে। শহর থেকে বর আসবে নৌকায় করে।"

পরশু রাতে।

কাজল লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাত কাঁপছে, কিন্তু সে মুখে কিছু বুঝতে দিল না। শুধু আস্তে বলল, "আল্লা মঙ্গল করুন।" তারপর ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।

সে গেল সোজা জেলেপাড়ায়, নিজের কুঁড়েঘরের কাছে। দূর থেকে দেখল, ঘরের চালাটা আগের চেয়ে নিচু হয়ে গেছে। দরজার সামনে একটা ভাঙা চৌকিতে বসে আছে এক বুড়ো মানুষ, শরীর আধখানা হয়ে গেছে, চোখে ঘোলা দৃষ্টি।

দয়াল মাঝি।

কাজলের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। বাবাকে সে এমন কখনো দেখেনি। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে পায়ে পড়ে, কিন্তু সে সামলাল নিজেকে। ছদ্মবেশ ছাড়া এখানে আসা সম্ভব ছিল না, আর এই মুহূর্তে কেউ তাকে চিনে ফেললে সব শেষ হয়ে যাবে।

সে কাছে গিয়ে ভিখারির সুরে বলল, "বাবা, একটু জল পাবো?"

দয়াল ঘোলা চোখ তুলে তাকাল। কিছুক্ষণ চেয়ে রইল সেই দাড়িওয়ালা মুখের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলল, "ঘরের ভেতরে কলসি আছে, নিয়ে খাও।"

কাজল ভেতরে ঢুকে কলসি থেকে জল ঢেলে খেল। ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখল, সবই আছে, সবই আগের মতো, শুধু একখানা জিনিস নেই। দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো ছিল তার ছেলেবেলার ছোট্ট একটা জাল, সেটা আর নেই।

বাইরে এসে সে আবার বসল দয়ালের পাশে। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শেষে দয়াল নিজেই বলল, "ফকির সাহেব, আপনি কোথা থেকে আসছেন?"

"অনেক দূর থেকে বাবা।"

"আমার একটা ছেলে ছিল," দয়াল বলল, যেন আপনমনে কথা বলছে। "কালো, লম্বা, বাঁশি বাজাত। কোথায় গেছে জানি না। পাঁচ মাস হলো কোনো খবর নেই।" তারপর একটু থেমে বলল, "যদি কোথাও দেখেন, বলবেন, বাপ বেঁচে আছে। আর যতদিন চোখ খোলা আছে, দরজা খোলা থাকবে।"

কাজলের গলার ভেতরটা শক্ত হয়ে এল। সে মাথা নিচু করে কেবল বলতে পারল, "বলব বাবা।"

আর সে উঠে চলে এল, কারণ আর একটু থাকলে সে কেঁদে ফেলত।

সন্ধ্যায় সে গেল বটতলার ঘাটে। সেখানে এখন কেউ নেই। হাওরের জল নেমে গেছে, ঘাটের সিঁড়ির নিচে শুকনো কাদা। যে জায়গায় এক সময় নৌকা বাঁধা থাকত, সেখানে শুধু একটা পুরনো খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে। কাজল সেই খুঁটির পাশে বসে পড়ল, অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর সে ঝোলা থেকে বাঁশিটা বার করল। ঠোঁটে তুলল। কিন্তু বাজাল না। শুধু হাতে ধরে রইল।

হঠাৎ পেছনে একটা শব্দ হলো। কাজল চমকে ফিরে তাকাল। অন্ধকারে একটা ছায়া নড়ে উঠল। ধীরে ধীরে সামনে এল এক বুড়ি, জমিদারবাড়ির সেই দাসী, যে এক সময় দিদিমণির খবর বয়ে আনত।

বুড়ি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাজলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দাড়ি, গামছা, আলখাল্লা, কিছুই তার চোখ ফাঁকি দিতে পারল না। সে ফিসফিস করে বলল, "কাজল?"

কাজল কিছু বলল না। বুড়ি আরও কাছে এসে বলল, "আমি জানতাম তুই ফিরবি। দিদিমণিও জানত।"

"রেখা..." কাজলের গলা দিয়ে নামটা বেরিয়ে এল, যেন বহুদিনের জমানো নিশ্বাস।

"পরশু বিয়ে," বুড়ি বলল, "কিন্তু দিদিমণি বিয়ে করবে না। সে আমাকে বলেছে, তুই যদি ফিরিস, তাহলে বলতে।"

"কী বলতে?"

বুড়ি এদিক-ওদিক তাকিয়ে আরও গলা নামাল। "বিয়ের রাতে, যখন সবাই আনন্দে মত্ত থাকবে, দিদিমণি ঘাটে আসবে। যদি সেদিন নৌকা নিয়ে তুই থাকিস..."

বুড়ি আর কিছু বলল না। দরকারও ছিল না। কাজল মাথা নিচু করে বসে রইল। অন্ধকার হাওরের ওপর থেকে ঠান্ডা হাওয়া উঠছিল, আর দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল।

সেই রাতে কাজল বাপের কুঁড়েঘরে ফিরল না। সে ঘাটেই বসে রইল, আর ভাবতে লাগল, নৌকা কোথায় পাবে। তার নিজের নৌকা পুড়ে গেছে, নতুন নৌকা কেনার টাকা নেই।

তবে একটা উপায় ছিল।

অধ্যায় ১০

কাজল সারা রাত ঘাটে বসে ভাবল। ভোর হওয়ার একটু আগে সে উঠে দাঁড়াল, আর তখনই বুঝতে পারল, একটা জায়গায় তাকে যেতেই হবে, যেখানে যেতে সে এতদিন সাহস পায়নি।

সে ফিরে গেল জেলেপাড়ায়।

দয়াল মাঝি তখন জেগেই ছিল। বুড়ো মানুষের ঘুম এমনিতেই পাতলা, আর ছেলে হারানোর পর থেকে সে প্রায় ঘুমোতেই পারে না। দরজায় টোকা পড়তেই সে আস্তে করে উঠে এসে দরজা খুলল। সামনে সেই দাড়িওয়ালা ফকির। দয়াল কিছু বলার আগেই লোকটা মাথার গামছা খুলে ফেলল, হাত দিয়ে দাড়ির নিচটা তুলে ধরল।

দয়াল অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর কাঁপা হাতে ছেলের মুখ ছুঁয়ে বলল, "আমি জানতাম। কাল তুই যখন জল চাইলি, তখনই আমার মনে হয়েছিল, এই গলা আমি চিনি। কিন্তু ভরসা পাইনি, পাছে ভুল হয়।"

কাজল বাপের পায়ের কাছে বসে পড়ল। দুজনের কেউ অনেকক্ষণ কথা বলতে পারল না।

শেষে কাজল বলল, "বাবা, আমার একটা নৌকা চাই।"

দয়াল চোখ তুলে তাকাল। সেই ঘোলা চোখে হঠাৎ কিছু একটা জ্বলে উঠল। সে বলল, "তুই কী করতে চাস, আমি জানি। জিজ্ঞেস করব না। শুধু বল, ফিরে আসবি?"

কাজল মাথা নিচু করে রইল। এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল না।

দয়াল উঠে ঘরের ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল একটা মরচে ধরা চাবি হাতে। বলল, "আমার বাপের একটা নৌকা আছে, নলখাগড়ার ঝোপের আড়ালে লুকানো। জমিদারের লোকেরা পোড়ানোর সময় সেটা খুঁজে পায়নি। আমি এতদিন কাউকে বলিনি। সেটা তোর। নিয়ে যা।"

কাজল চাবিটা হাতে নিল। বাপের হাতের উষ্ণতা তখনো তাতে লেগে আছে।

পরদিন সারাটা বেলা কাজল নৌকাটা ঠিকঠাক করল। পুরনো নৌকা, কাঠে ঘুণ ধরেছে, তলায় কয়েক জায়গায় ফাটল। সে মাটি আর আলকাতরা দিয়ে সেগুলো বন্ধ করল, নতুন দড়ি লাগাল, বৈঠা শানিয়ে নিল। কাজ করতে করতে তার মনে হলো, এই নৌকা যেন তার সঙ্গে কথা বলছে। দয়ালের বাপ, দয়াল, আর এখন সে, তিন পুরুষ এই কাঠে ভর করে জলের ওপর বেঁচেছে।

সন্ধ্যা নামার আগে সে নৌকা নিয়ে এল বটতলার ঘাটের কাছে নলখাগড়ার ঝোপে, যেখানে কেউ খেয়াল করবে না। তারপর অপেক্ষা শুরু হলো।

ওদিকে জমিদারবাড়িতে তখন সানাই বাজছে। আলোয় আলোয় ভরে উঠেছে পুরো দালান, উঠোনে সামিয়ানা, দিঘির ধারে সারি সারি হ্যারিকেন। শহর থেকে বর এসে পৌঁছেছে বড় একখানা বজরায়। বরযাত্রীদের হইচই, মেয়েদের উলুধ্বনি, ঢাকের শব্দ, সব মিলিয়ে গোটা গ্রাম যেন উৎসবে মেতেছে।

শুধু অন্দরমহলের একটা ঘরে সেই উৎসবের ছোঁয়া নেই।

রেখা সেই ঘরে লাল বেনারসি পরে বসে আছে। গায়ে সোনার গয়না, কপালে চন্দনের ফোঁটা, চোখে কাজল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ছবির মতো, কিন্তু সেই ছবির ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। পিসিমা তাকে বারবার বলছেন, "মা, একটু হাসো, বরযাত্রীরা দেখলে কী ভাববে?" রেখা কোনো জবাব দিচ্ছে না।

দাসী বুড়ি ঘরে ঢুকে পিসিমার কানে কানে বলল, "রান্নাঘরে আপনাকে ডাকছে, কিছু একটা নিয়ে গোলমাল।" পিসিমা বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন। দরজা ভেজিয়ে দিল বুড়ি। তারপর রেখার কাছে এসে বলল, "দিদিমণি, সে এসেছে।"

রেখা কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। গা থেকে ভারী গয়নাগুলো একে একে খুলে ফেলল। পায়ের নূপুর খুলে বিছানার ওপর রাখল। বেনারসির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে গুঁজে নিল। তারপর শুধু একটা জিনিস সঙ্গে নিল, কাজলের সেই বনবেতের বাঁশিটার পাশে যে ছোট্ট বাঁশিটা সে নিজে বানিয়েছিল, সেটা।

"চলো," সে বলল।

বুড়ি তাকে পেছনের দরজা দিয়ে বের করে আনল, বাগানের ভেতর দিয়ে, যেখানে অন্ধকার আর ঝোপঝাড়ের আড়াল। দূরে সানাইয়ের সুর, কাছে ঝিঁঝিঁর ডাক। রেখার বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু পা থামছে না। দিঘির পাড় ঘুরে, বটগাছের পাশ দিয়ে, নেমে এল সেই ঘাটে।

নলখাগড়ার আড়াল থেকে একটা ছায়া নড়ে উঠল। কাজল।

দুজনে মুখোমুখি দাঁড়াল। কত মাস পর। কেউ কিছু বলল না, কারণ বলার মতো কথা ছিল না। কাজল হাত বাড়াল, রেখা সেই হাত ধরল। তারপর নৌকায় উঠল, আর কাজল বৈঠা তুলে নিল।

নৌকা ঘাট ছেড়ে ধীরে ধীরে হাওরের দিকে এগোল। জল তখন অনেক কমে গেছে, নৌকা প্রায়ই কাদায় আটকে যাচ্ছিল। কাজল বৈঠার বদলে লগি ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছিল। রেখা চুপ করে বসে ছিল, মাঝে মাঝে পেছনে তাকিয়ে জমিদারবাড়ির আলোগুলো দেখছিল। সেগুলো ক্রমশ ছোট হচ্ছে, ঝাপসা হচ্ছে।

হঠাৎ রেখা বলল, "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"

কাজল বলল, "জানি না। যেখানে জল আছে, সেখানে।"

রেখা মৃদু হাসল। "তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?"

"সব জায়গায়, কোথাও না।"

রেখা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, "আমি প্রতিদিন তোমার বাঁশি শোনার চেষ্টা করেছি। কখনো শুনিনি। তবু রোজ জানলার ধারে বসে থাকতাম।"

কাজল লগি থামিয়ে তার দিকে তাকাল। চাঁদ তখন আকাশে উঠে এসেছে, আজও পূর্ণিমা, আর সেই আলোয় রেখার মুখ ঠিক সেই প্রথম রাতের মতো দেখাচ্ছে। কাজল আস্তে বলল, "এখন তো শুনছেন।"

"কই?"

কাজল ঝোলা থেকে বাঁশি বার করে ঠোঁটে তুলল। বাজাতে শুরু করল সেই সুর, যেটা সে একদিন রেখার কাছ থেকে শিখেছিল, মানুষের জন্য বাজা সুর।

ঠিক তখনই, ঘাটের দিক থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল।

"ধর! ধর! ওই যায়!"

দুজনেই চমকে পেছনে তাকাল। দূরে ঘাটের কাছে অনেকগুলো আলো জ্বলছে, মানুষের ছায়া ছুটোছুটি করছে। কেউ একজন সবার আগে ছুটে এসে আঙুল তুলে এদিকে দেখাচ্ছে। এত দূর থেকে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু সে যে ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে, তা বোঝা যাচ্ছে।

কাজল লগি ফেলে বৈঠা তুলে নিল। প্রাণপণে নৌকা চালাতে শুরু করল। কিন্তু নৌকাটা পুরনো, ফাটল ধরা, আর জলও কম। পেছনে বড় একটা ডিঙি জলে নামানো হলো। তাতে উঠল চার-পাঁচজন লোক, হাতে লাঠি আর মশাল।

রেখা কাজলের হাত চেপে ধরল। "ওরা আমাদের ধরে ফেলবে।"

কাজল কোনো কথা বলল না। শুধু আকাশের দিকে একবার তাকাল। চাঁদের গায়ে হঠাৎ একটা কালো মেঘের ছায়া পড়েছে, আর সেই মেঘের কিনারা যেন কেমন অস্বাভাবিক ভারী, ফোলা।

তার মনে পড়ল, ছেলেবেলায় বাপ তাকে বলেছিল, চৈত্র মাসে এমন মেঘ উঠলে বুঝতে হবে, ওপরের পাহাড়ে বৃষ্টি হয়েছে। আর সেই বৃষ্টির জল নেমে আসছে হাওরের দিকে, ঢল হয়ে।

"রেখা," কাজল বলল, তার গলা হঠাৎ অন্যরকম শোনাল, "শক্ত করে ধরে বসুন।"

"কেন?"

কাজল উত্তর দিল না। শুধু বৈঠা আরও জোরে চালাতে লাগল। কারণ দূর থেকে, হাওরের উত্তর দিক থেকে, একটা গুমগুম শব্দ ভেসে আসছিল, যে শব্দ সে এর আগে জীবনে একবারই শুনেছিল, ছেলেবেলায়, বাপের কোলে বসে।

সে শব্দ বানের।

অধ্যায় ১১

হাওরের মানুষ এই শব্দটাকে বলে "পাহাড়ি ঢলের ডাক"। প্রথমে মনে হয় দূরে কোথাও মেঘ ডাকছে। তারপর শব্দটা মাটির নিচ দিয়ে এসে পায়ের তলায় কাঁপুনি ধরায়। তারপর আসে বাতাস, ঠান্ডা আর ভেজা, যার গায়ে কাদার গন্ধ।

কাজল সেই বাতাস পেল আগেই।

"রেখা, নিচু হয়ে শুয়ে পড়ুন। নৌকার তলায়।"

"কিন্তু ওরা..."

"ওদের কথা এখন ভাবার সময় নেই।"

রেখা কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজল তাকে ঠেলে নৌকার পাটাতনে শুইয়ে দিল। নিজে দাঁড়িয়ে রইল বৈঠা হাতে, মুখ উত্তর দিকে ফেরানো। চাঁদের আলোয় সে দেখতে পেল, দূরে হাওরের কিনারে একটা সাদা রেখা, যেন কেউ আকাশের গায়ে চুন দিয়ে একটা দাগ টেনে দিয়েছে। সেই দাগটা ধীরে ধীরে মোটা হচ্ছে, উঁচু হচ্ছে, আর কাছে আসছে।

পেছনের ডিঙিটা তখনো তাড়া করছিল। তার মাঝিরা কিছুই টের পায়নি। তারা মশাল উঁচিয়ে চেঁচাচ্ছে, "থাম! থাম বলছি!" ডিঙির সামনে দাঁড়ানো লোকটা, সেই যে সবার আগে আঙুল তুলেছিল, সে একবার উত্তর দিকে তাকাল। কাজল দূর থেকে দেখল, লোকটা হঠাৎ থমকে গেছে। তার হাত নেমে এসেছে, মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

সে বুঝতে পেরেছিল।

"ফিরে চল!" সে চিৎকার করে উঠল, "ফিরে চল সবাই, বান আসছে!"

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

বান এল না, বান ভেঙে পড়ল। সাদা রেখাটা এক মুহূর্তে দেয়াল হয়ে উঠে এল। তার মাথায় ফেনা, তলায় কালো জল, আর তার ভেতরে ভেসে আসছে উপড়ে-যাওয়া গাছ, ভাঙা চালা, মরা গরু, ধানের আঁটি। পাহাড় থেকে নেমে আসা পুরো একটা নদী যেন এক রাতের জন্য হাওরের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

ডিঙিটা প্রথমে গেল। কেউ চিৎকার করার সময়ও পেল না।

কাজল নৌকার মুখ ঘুরিয়ে ঢলের সঙ্গে সঙ্গে চালাতে শুরু করল। সে জানত, ঢলের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে মরণ। একমাত্র উপায় ঢলের সঙ্গে ভেসে চলা, আর যতটা পারা যায় নৌকাটাকে সোজা রাখা। পুরনো নৌকার কাঠ কাঁপছে, ফাটলগুলো থেকে জল ঢুকছে, কিন্তু সে বৈঠা ছাড়ল না।

রেখা পাটাতন থেকে মাথা তুলে চিৎকার করে বলল, "ঘাট! আমাদের গ্রাম!"

কাজল ফিরে তাকাল।

দূরে ঘাটের দিকে আলোগুলো তখনো জ্বলছিল। বিয়ের আলো, সামিয়ানা, হ্যারিকেন। সেই আলোর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে সাদা দেয়ালটা। কাজল স্পষ্ট দেখতে পেল, দূরে ঢেউ গিয়ে জমিদারবাড়ির দিঘির পাড়ে আছড়ে পড়ল। একটা আলো নিভল। তারপর আরেকটা। তারপর সব একসঙ্গে।

গ্রামটা অন্ধকার হয়ে গেল।

রেখা মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠল। কাজল বৈঠা ফেলে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। সেই মুহূর্তে সে একটা কথাও বলতে পারল না, কারণ তার নিজের বাবা ওই জেলেপাড়ায়, ওই নিচু চালার ঘরে, দরজা খুলে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিল।

"আমাকে ফিরিয়ে নাও কাজল!" রেখা কাঁদতে কাঁদতে বলল, "বাবা ওখানে! পিসিমা, সবাই ওখানে!"

কাজল তার মুখ দুহাতে ধরল। বলল, "রেখা, আমার বাবাও ওখানে। কিন্তু এখন ফিরে গেলে আমরা কারও কাজে আসব না। জল আমাদেরও নেবে।"

"তাহলে কী করব?"

কাজল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, "যতটা পারি, যাকে পারি, তুলব।"

সেই রাতে, বানের ভেতর দিয়ে, কাজল তার পুরনো ফাটা নৌকা নিয়ে ফিরে গেল গ্রামের দিকে। রেখা পাশে বসে বৈঠা ধরল, বাঁশি বাজানো হাতে যে কোনোদিন বৈঠা ছোঁয়নি। দুজনে মিলে একটা গাছের মাথায় আটকে থাকা এক বুড়িকে তুলল। তারপর ভাঙা চালার ওপর বসে কাঁদতে থাকা দুটো বাচ্চাকে। তারপর একজন জেলেকে, যার মুখ চিনতে পারল না কাজল, তবে সে লোক কাজলের হাত ধরে কেবল বলল, "ভাই, ভাই, ভাই।"

নৌকা ভরে উঠল। জল ঢুকছে, নৌকা ডুবু ডুবু, তবু কাজল তাকে আরও একবার ঘুরিয়ে আনল। দিঘির পাড়ের কাছে এসে সে দেখল, বটগাছের মগডালে কেউ একজন বসে আছে, দুহাতে ডাল আঁকড়ে।

পিসিমা।

কাজল নৌকা নিয়ে গেল সেদিকে। রেখা চিৎকার করে ডাকল, "পিসিমা, লাফ দাও!" পিসিমা কাঁপতে কাঁপতে ডাল ছাড়লেন, আর কাজল দুহাত বাড়িয়ে তাঁকে ধরে ফেলল।

এবার নৌকাটা সত্যিই আর বইতে পারছিল না। তলার ফাটলগুলো একে একে খুলে যাচ্ছে। জল কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে। আটজন মানুষ, ঢেউয়ের মাথায় একটা ছোট্ট নৌকা, আর চারদিকে শুধু অন্ধকার জল।

কাজল বুঝল, এই নৌকা আর বেশিদূর যাবে না। সে নৌকার মুখ ঘোরাল জমিদারবাড়ির উঁচু ছাদের দিকে, যেটা এখনো জলের ওপর জেগে আছে। সেখানে পৌঁছাতে পারলে অন্তত এদের প্রাণ বাঁচবে।

"সবাই শক্ত করে বসুন," সে বলল, "আর একটু।"

শেষ পঞ্চাশ হাত সে নৌকা বেয়েছিল দুই হাতে নয়, দাঁত চেপে, বুক চিরে, পুরো জীবনের জোর দিয়ে। নৌকা ছাদের কিনারায় ঠেকল। এক এক করে সবাই লাফিয়ে উঠল। রেখাও উঠল। শেষে কাজল দাঁড়িয়ে ছিল নৌকার ওপর, যখন একটা বিশাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল।

নৌকা ছিটকে গেল। কাজল জলে পড়ল।

রেখা ছাদের কিনারা থেকে ঝুঁকে হাত বাড়াল। "কাজল!"

কাজল হাত বাড়াল। আঙুলে আঙুল ছুঁল। এক মুহূর্তের জন্য দুজনের হাত মুঠো করে ধরা রইল, ঠিক যেমন সেই কার্তিকের পূর্ণিমায় ঘাটে ধরেছিল।

তারপর পেছন থেকে আরেকটা ঢেউ এল।

রেখা শুনতে পেল কাজলের গলা, ঢেউয়ের গর্জনের ভেতর দিয়েও পরিষ্কার: "আমি জলের মানুষ, রেখা। জল আমাকে ফিরিয়ে নেবে না, জল আমাকে নিয়েই যাবে।"

আঙুল ফসকে গেল।

রেখা চিৎকার করে উঠল। তার সেই চিৎকার কেউ শোনেনি, কারণ হাওরের গর্জনে সব ডুবে গিয়েছিল। সে ছাদের কিনারায় হাঁটু গেড়ে বসে রইল, অন্ধকার জলের দিকে তাকিয়ে, যেখানে এক মুহূর্ত আগে একটা মুখ ছিল।

ভোর হলো একসময়। বান নেমে গেল, যেমন হঠাৎ এসেছিল তেমনই হঠাৎ। হাওর আবার শান্ত, আয়নার মতো, যেন কিছুই হয়নি। জমিদারবাড়ির ছাদে আটজন মানুষ বেঁচে রইল। জেলেপাড়ার একটা চালাও আর দাঁড়িয়ে ছিল না।

কাজলকে কেউ কোনোদিন খুঁজে পায়নি।

অধ্যায় ১২

আজ আমার গান শেষ হলো, ভাই হাটুরে। এবার একটা কথা বলব, যা চল্লিশ বছর ধরে আমি কাউকে বলিনি।

তোমরা ভাবছিলে, আমি এই গল্প জানি কী করে? সব গায়েনই তো কিছু না কিছু বানিয়ে বলে। কিন্তু আমি যা বলেছি, তার প্রতিটা কথা নিজের চোখে দেখা। কারণ আমি সেখানে ছিলাম।

আমার নাম বনমালী। জেলেপাড়ায় আমার ঘর ছিল, দয়াল মাঝির কুঁড়ের তিনটে বাড়ি পরে। কাজলকে আমি ছেলেবেলা থেকে চিনতাম, একসঙ্গে জাল টেনেছি, একসঙ্গে নৌকা বেয়েছি। ও আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল, কিন্তু ওর মতো সাঁতারু আমি জীবনে দেখিনি।

সেই কার্তিকের পূর্ণিমার রাতে আমি মাছ ধরতে বেরিয়েছিলাম। বটতলার ঘাটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই দেখলাম ওদের। কাজল আর রেখা, হাতে হাত রাখা। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম বটগাছের আড়ালে। তখন আমার মনে একটাই কথা, এ জানাজানি হলে কী হবে?

আমি ভাবলাম, জমিদার যদি জানতে পারে আমি আগে থেকেই জানতাম, আর চুপ করে ছিলাম, তাহলে আমাকে ছাড়বে না। আমার ঘরে তখন বউ, ছোট একটা ছেলে। আমি সামান্য মানুষ, আমার ভয় পাওয়ার অধিকার আছে, এই ভেবে নিজেকে বোঝালাম। পরদিন সকালে জমিদারের দরজায় গিয়ে সব বলে দিলাম।

আমি ভেবেছিলাম, একটু বকাঝকা হবে, মেয়েকে আটকে রাখা হবে, ব্যস। ভাবিনি যে এর পরিণতি এত দূর যাবে। ভাবিনি, কাজলকে গ্রাম ছাড়তে হবে, তার নৌকা পুড়বে, তার বাপ ছেলের শোকে আধখানা হয়ে যাবে। ভয় মানুষকে যা করে, ভালোবাসাও তা পারে না, ভাই। আমি ওই এক সকালে দুটো জীবন ভেঙে দিয়েছি।

ভাঙার পর আমি আর কাজলের চোখের দিকে তাকাতে পারতাম না। সে গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার দিন আমি ঘাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর সেদিনই বুঝেছিলাম, এই বোঝা আমি সারাজীবন বইব।

বিয়ের রাতে, যখন ঘাটে লোকজন চেঁচিয়ে উঠল, আমি ছিলাম সবার আগে। আঙুল তুলেছিলাম আমিই। ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেছিলাম, "ওই যায়!" কেন করেছিলাম, আজও জানি না। হয়তো ভয়ে, হয়তো অভ্যাসে, হয়তো নিজের অপরাধটাকে ঢাকতে চেয়েছিলাম। জমিদারের লোকেরা যখন ডিঙি নামাল, আমিও তাতে উঠে পড়লাম।

তারপর এল বান।

আমি হাওরের লোক। উত্তর দিকের সেই গুমগুম শব্দ আমিও চিনতাম। চিৎকার করে বলেছিলাম, "ফিরে চল!" কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। ডিঙি উল্টে গেল, আমি জলে পড়লাম, আর কিছুক্ষণ পর সব অন্ধকার।

যখন আবার জ্ঞান হলো, আমি একটা ভাঙা নৌকার পাটাতনে শুয়ে আছি। কে যেন আমাকে টেনে তুলেছে। একটা কালো মুখ ঝুঁকে আছে আমার ওপর, চাঁদের আলোয় চোখ জ্বলছে। আমি তার মুখ চিনতে পারিনি, কারণ ভয়ে আর জলে আমার চোখ ঝাপসা ছিল। আমি শুধু তার হাত ধরে বারবার বলেছিলাম, "ভাই, ভাই, ভাই।"

সে কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু বৈঠা তুলে নৌকা চালিয়ে গিয়েছিল। আরও মানুষ তুলছিল সে, বুড়িকে, বাচ্চাদের, শেষে পিসিমাকে।

ভাই হাটুরে, আমি পরে জেনেছি, সেই কালো মুখ ছিল কাজলের। যাকে আমি ধরিয়ে দিয়েছিলাম, যার জীবন আমি ভেঙেছিলাম, সে-ই আমাকে মরণের মুখ থেকে টেনে তুলেছিল। জেনেও সে আমাকে কিছু বলেনি। বোধহয় চিনতেও পারেনি। আর তারপর সে নিজে নৌকা থেকে ছিটকে পড়ে গেল, আর কখনো ফিরল না।

সেই থেকে আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেল। আমি ঘর ছাড়লাম, বউ-ছেলেকে নিয়ে অন্য গাঁয়ে সরে গেলাম। ছেলে বড় হয়ে নিজের পথ ধরল, বউ একদিন চলে গেল। আমি রয়ে গেলাম একা, হাওরের ওপর নৌকায়। তখন থেকেই আমি এই গান গাইতে শুরু করেছি। প্রথমে নিজের জন্য, তারপর যারা শুনতে চায় তাদের জন্য। প্রতিটা গানের শুরুতে আমি হাওরের কাছে ক্ষমা চাই। আজ বুঝছ ভাই, কেন?

দয়াল মাঝি আর বেশিদিন বাঁচেনি। বানের পরের প্রথম ভোরে সে খুঁজে বের করে সেই লুকানো খুঁটি, যেখানে নৌকাটা বাঁধা থাকত। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল দিনভর। কেউ তাকে সরাতে পারেনি। সন্ধ্যার দিকে সে সেখানেই বসে পড়ে, আর ওঠেনি। গাঁয়ের লোক বলে, দরজা খোলা রেখে গিয়েছিল সে।

জমিদার বংশীধর বেঁচেছিলেন, কিন্তু মাথার ঠিক ছিল না। শেষ জীবন কাটালেন ভাঙা দালানে, মেয়ের হাত ধরে, কারও নাম ধরে ডাকতেন না, শুধু বিড়বিড় করতেন, "আমি ভালো চেয়েছিলাম।"

আর রেখা?

রেখা আজও বেঁচে আছে, ভাই। জমিদারবাড়ির ভাঙা অংশে একা থাকে। সে আর বিয়ে করেনি। সে গাঁয়ের মেয়েদের পড়তে শেখায়, কোনো পারিশ্রমিক নেয় না। আর প্রতি পূর্ণিমার রাতে, যখন গ্রাম ঘুমিয়ে পড়ে, সে বটতলার ঘাটে গিয়ে বসে। বহু বছর হয়ে গেছে, তবু সে যায়। হাতে থাকে ছোট একটা বনবেতের বাঁশি।

আমি অনেকবার দূর থেকে দেখেছি। সে বাঁশি বাজায় ভুল সুরে, কাঁপা সুরে, ঠিক যেমন প্রথম দিন বাজিয়েছিল। কারও জন্য নয়, কিছুর জন্য নয়, শুধু বাজায়। তখন আমার নৌকা থাকে অনেক দূরে, অন্ধকারে। সে কোনোদিন জানতে পারেনি, ওই সুর শুনতে শুনতে একজন বুড়ো গায়েন কাঁদে।

আজ আমি তোমাদের সামনে সব বললাম। আমি জানি, তোমাদের কেউ কেউ আমাকে ঘৃণা করছ। আমার তাতে আপত্তি নেই। আমার এই গান কোনো প্রায়শ্চিত্ত নয়, ভাই। প্রায়শ্চিত্ত বলতে কিছু হয় না। এ শুধু একটা ঋণ, যা শোধ হয় না, শুধু বয়ে বেড়াতে হয়।

কাল রাতে পূর্ণিমা। আমি ঠিক করেছি, এবার আর দূর থেকে নয়। এবার আমি নৌকা নিয়ে সোজা ওই ঘাটে যাব, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াব। সে আমাকে কী বলবে, আমি জানি না। হয়তো তাড়িয়ে দেবে। হয়তো কিছুই বলবে না। হয়তো শুধু বাঁশিটা নামিয়ে আমার দিকে একবার তাকাবে।

যাই হোক, আমাকে বলতে হবে। কারণ গানের শেষ লাইন গায়েন নিজে লেখে না, শ্রোতা লেখে। আমি আমার শ্রোতার কাছেই যাচ্ছি।

ও হাওর, তুমি আমার চেয়ে বুড়ো। তুমি সব জানো। এবার আমার ক্ষমা চাওয়া শেষ হলো। বাকিটা তোমার আর রেখার ওপর।

                                                                                      ( সমাপ্ত )