এক অন্য মায়ের গল্প
মূলচাঁদ মাহাত
"আমি কিডনি দান করবো" অনেকক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শোনার পর পর্দা সরিয়ে স্বশরীরে প্রবেশ করে ডাক্তারের প্রশ্নের জবাবে বলল সরলা। ডাক্তার আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাস করলেন.. "কে আপনি?" সরলা বিনম্র চিত্তে জবাব দিল.. "আমি রোগীর স্ত্রী"। ডাক্তারের বিপরীতে পাশে বসে থাকা ত্রিলোচন মুখ ঘুরিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো.. "তরা কিডনি দান করবেহে গো? তরা কিনা জানিহা একটি কিডনি দেইকে তরা গটা জিনগানি কনঅ ভারি কাম করে নি পারবেহে! আর তরা কিনা একর সঁগে জিনগানি পুহাউএ পারবেহে?" কুড়মালি এই কথার তর্জমা করলে দাঁড়ায় "তুমি কিডনি দান করবে বউঠান? তুমি কী জানো একটা কিডনি দান করে তুমি সারা জীবন কোনও ভারি কাজ করতে পারেবে না। তাছাড়া তুমি কী এর সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারবে?" সরলার চোখ ভরে ওঠে। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জবাব দেয়.. " কেসনঅ করি জিনগানিটা বিতাউবে কেরম। মেনতুক সিঁথাক সিঁদুর কেসে পঁছি লম। আর ছউনাগিলাকেই কেসে টুঅর হেউএ দেবেন।হামি হিঁআ নি..." (কোন রকমে জীবনটা কেটে দেব। কিন্তু মাথার সিঁদুর মুছতে দিতে পারি কি করে! সন্তানদের অকালেই অনাথ করতে পারি কি করে? আমি এখানে না..." ) কথোপকথনের মাঝেই ডাক্তার বললেন... "যদি আপনি কিডনি দান করবেন"। ত্রিলোচনের দিকে তাকিয়ে বললেন... "যদি আপনি ব্লাড ডোনেট করবেন। তাহলে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি অফিসে গিয়ে কাগজপত্রে সই করে রেডি করুন। আমরা শীঘ্রই অপারেশনের ব্যবস্থা করবো। কাল বিলম্ব করলে রোগীর জীবন সংকটে পড়বে।
তিনজন তিনটা বেডে পড়ে আছে। পাশাপাশি সরলা ও সনাতন অচেতন হয়ে আছে। ত্রিলোচন ও ভাইয়ের গ্রুপ এক হওয়ায় রক্ত দিতে কোন অসুবিধা হলো না। আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে বৌ টি এভাবে ছুটে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবে নি ত্রিলোচন। গত দুদিন সনাতনের ব্লাড ইউরিন দেখে ও ডাক্তারের জবাব শুনে ত্রিলোচন ভেবে নিয়েছিল ভাইকে আর বাঁচাতে পারবে না। সনাতনের অতিরিক্ত মধ্যপানে ও তার এ হেন পরিণতিতে শিউরে উঠেছিল সারা সারেংডি গ্রাম। সনাতনের প্রতিদিনের মধ্যপানে ও অসহ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বছর চারেক আগে স্বামী ও সংসারের প্রতি বিতস্রদ্ধ হয়ে ঘর ছেড়ে সদ্য কন্যা সন্তান সহ বাপের বাড়িতে উঠেছিল সরলা। তিন বছরের পুত্র রাহুলকেও সঙ্গে নিতে চেয়েছিল কিন্তু মাতাল ও একঘেয়েমি স্বামী তাকে নিয়ে যেতে দেয়নি। সেই থেকে রাহুল তার জেঠা জেঠিমার সাথেই রয়ে গেছে। রাহুলকে নিজের সন্তানের মতই লালন পালন করেছে ত্রিলোচন। ভিন্ন নজরে দেখেনি কোনদিন। বাউন্ডুলে সনাতনের জীবনের অর্ধেকটা সময় ও বেতনের প্রায় সমস্ত অর্থই নষ্ট হয়েছে ঝুমনি মাঝিনের ঠেকে। গনগনে আগুনের আচে হাঁড়ির মুহুল যখন সিদ্ধ হয়ে তাওয়ার নল থেকে টস টস করে চুয়ানের এক একটা ফোটা বোতলে পড়তে দেখে জীব লকলক করতে থাকে সনাতনের। রসালাপ চলে ঝুমনি মাঝিনের সাথে। "এ ভউজি দিহা নঅ টুকু চাখি দেখম"।(বৌদি একটু দাও না খেয়ে দেখি) সনাতনের দিকে আড় চোখ করে ঝুমনি বলে.. "তাতলটাঁই জিউ পড়তন"(গরমে জীব পুড়বে)। সনাতন ঝুমনির ঘাড় হাত দিয়ে টেনে মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয় বলে.. "তবে জুড়ালটাই পিআউএঁ" (তবে শিতলটাই পান করাও)
ঝুমনির গায়ের রং শ্যামলা হলেও সারা অঙ্গ রসে টইটম্বুর হয়ে আছে। একসময় ঝুমনির সারা অঙ্গে বিচরন করে সনাতন।
শুকর মাংস সহযোগে মহুয়ার রসের উন্মাদনায় আচ্ছন্ন হয়ে টলতে টলতে প্রায় মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে এসে মুর্ছিত হয়ে পড়ে বিছানায়। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গলে খোঁজ নেয় ছেলের কোনদিন বা খোঁজ নেওয়াও হয়ে ওঠে না। চলে যাই ঝুমনির ঠেকে সেখানেই স্নানাহার করে আবার কয়লা খাদানে।
অবচেতন ভেঙ্গে ধীরে ধীরে চোখ খুলছে সরলা। নার্স দিদিকে দেখেই বলল... "দিদি আমার ছেলেকে ডেকে দাও না। রাহুল... রাহুল... তার নাম"। এদিকে বাইরে তখনও ঠাকুরদা রামদয়ালের সাথে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে রাহুল। আজ কত কাল পরে মায়ের দর্শন পেয়েছে বেচারী। শৈশবের অনেক সময় কেটে গেছে মায়ের স্নেহ আদর ভালবাসায় বঞ্চিত হয়ে। মাতৃ স্পর্শ কতটা শান্তির তা মা যখন এসেই তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল তখনই সে প্রথম অনুভব করে। প্রতিটা শিশু যে প্রেমের চির কাঙ্গাল সেই প্রেম থেকে এতদিন বঞ্চিত ছিল সে। তার মনে হচ্ছিল যেন মাকে জড়িয়ে অনন্তকাল যাপন করতে পারে। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি অবোধ বালকের। এত কিছু বোঝার আগেই তার মা অপারেশন থিয়েটারে চলে গেছে। তাই তার দুর্ভাগ্য যেন কিছুতেই পিছু ছাড়তে চাইছে না। আসন্ন বিচ্ছেদের আশঙ্কায় সে কেঁদেই চলেছে।
পেছন থেকে নার্স দিদি যখন এসে বলল "রাহুল তোমার নাম? তোমার মা তোমাকে ডাকছে"। এক দৌড়ে ছুটে গেল এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে.. "মাই মঁই তোকে যাই নি দিবঁ"। (মা মা, আমি তোমাকে যেতে দেব না)। এবার কান্না শুরু হলো দুজনের। বুকের উপরে মাথা রেখে একনাগাড়ে কেঁদে চলেছে দুই মাতা পুত্র। এ কান্না অন্তহীন। এই কান্না আনন্দের না দুঃখের তা হয়তো বিধাতাও বুঝে উঠতে পারেননি। সরলা অনুভব করে রাহুলের চোখের জলে তার বুকের কাপড় ভিজে যাচ্ছে। সরলা কয়েকবার উঠার চেষ্টা করলেও ব্যার্থ হয়েছে পেটের বাঁ পাশের তীব্র যন্ত্রণায়। ধীরে ধীরে রাহুল অনুভব করে তার মায়ের হৃদয়ের স্পন্দন যেন খুব বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ বিচ্ছেদ যন্ত্রনায় কাতর স্নেহ আদরের প্রত্যাশী বালকের এতসব বোঝার ক্ষমতা কোথায়! এই নির্মল মিলনের দর্শক ত্রিলোচন, রাম দয়াল ও পাশের বেডের রুগি ও তাদের পরিজন। অনতিকাল পরেই রাহুল বুঝতে পারে মায়ের বুকের স্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে গেছে। পিঠের উপরে জড়ানো হাত দুটি ধীরে ধীরে আলগা হয়ে পড়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। রাহুল বুকে মাথা গুঁজেই ধিরে ধিরে মাকে ডাকছে "মাই...মাই... মাই.... গো"। দুরে কোথায় কোনও মন্ডপে হতে লাউড স্পিকারে ভেসে আসছে "জাগো... জাগো... মা, দশপ্রহরধারিণী"। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে নার্স দুটি তৎপর হয়ে উঠলো। সরলার হাতের নাড়ি ধরে অনেকটাই অবগত হল। এমার্জেন্সি সাইরান বটন চিপলে ডাক্তারেরাও ছুটে আসেন। সরলাকে আবার অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো।
ধীরে ধীরে অবচেতন থেকে মুক্ত হচ্ছে সনাতন। ত্রিলোচন কাছে গিয়ে বসলো। রাহুল ও তার দাদু রামদয়াল সেখান থেকে বেরিয়ে চলে গেল অপারেশন থিয়েটারের দরজার কাছে। আজ তিনদিন অজ্ঞান থাকার পর জ্ঞান ফিরল সনাতনের। সম্পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দিলো ত্রিলোচন।
ঘড়ির কাঁটাই তখন রাত দুটো পাশাপাশি সমস্ত রোগী ও তার পরিজনের গভীর নিদ্রায় মগ্ন দূরের কোন মন্ডপে আজ কৃষ্ণদাসী পদ্মা নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। লাউড স্পিকারে ভেসে আসছে জয়দেব পদ্মাবতীর সংলাপ। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের করা হলো নিস্পন্দন সরলার দেহ। রাহুল ছুটে গিয়ে মুখের কাপড় সরিয়ে ‘মাঁই মাঁই’ চিৎকারে জেগে উঠলো গোটা নার্সিংহোম। ত্রিলোচনও ছুটে গিয়ে দেখে রামদয়াল মেয়ের ট্রলি ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ত্রিলোচন অনেক কিছু সহ্য করতে পারলেও সদ্য মাতৃ বিয়োগে কাতর অবোধ বালক রাহুলের অসহ যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছে না। তৎক্ষণাৎ রাহুলকে বুকে জড়িয়ে ধরে সেও কাঁদতে থাকে। রামদয়াল অস্পষ্ট স্বরে বলতে থাকে.. "ঘার জাইকে কে তোর বেটিকে কিনা জবাব দেবেঁই রে মাঁঅ। চল নঅ উঠেঁ, ঘার চঅ" (বাড়ি গিয়ে তোর মেয়েকে কী জবাব দেবো রে মা। চল না ওঠ, বাড়ি চল)। দুজন ওয়ার্ড বয় এসে সরলার ট্রলি নিয়ে যেতে উদ্যত হলে রাহুল জেঠাকে ছেড়ে নিস্পন্দন মাকে জড়িয়ে ধরে আবার বলতে থাকে... মাঁই... মাঁই গো হামু তর সঁগেই জাম" (মা.. মা... গো আমিও তোমার সাথেই যাবো)। পুত্র স্নেহে লালন করা মাতৃ প্রেমের এই কাঙ্গালকে ত্রিলোচন কি ভাষায় সান্তনা দিবে তার শব্দ খুঁজে পাই না। ওয়ার্ড বয় সরলার ট্রলি নিয়ে চলে গেল। গলির শেষের বাঁকে যখন অদৃশ্য হলো দেওয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল রামদয়াল। তাকে জড়িয়ে রাহুল নিরবিচ্ছিন্ন কেঁদে চলল। ত্রিলোচন ভারাক্রান্ত হয়ে সনাতনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ত্রিলোচনের রক্তে পুনরুজ্জীবিত সনাতনের আর বুঝতে কিছুই বাকি থাকলো না। কোন প্রকার শরীরটাকে ঘুরিয়ে পাস ফিরে বালিসে মাথাটা গুঁজে কাঁদতে লাগলো। যাত্রা মঞ্চ হতে ভেসে আসছে সদ্য সমাপ্ত হওয়া পাণ্ডুলিপি পড়ে জযদেব বলে চলেছে... "স্মরগরল খণ্ডনং, মম শিরসি মণ্ডনং, দেহি পদপল্লব মুদারম"।
©®মূলচাঁদ মাহাত
Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.