চুলোচুলি পর্ব: ছোটবেলায় আমাদের পাড়ার বিখ্যাত নাপিত ছিলেন ‘দ্য গ্রেট’ কালী কাকা, বেশ লম্বা চেহারা, গায়ে হাতকাটা পাঞ্জাবি, পরনে তেলচিটচিটে ধুতি, আর মুখে চওড়া থেকে সরু হয়ে মিলিয়ে যাওয়া গোঁফ। তিনি মাসে একবার করে আসতেন। এসে বসতেন আমাদের গাঁতাতলায়—যেখানে তাঁতের সুতো গাঁথা হতো, যাকে তাঁতের কাপড়ের ‘টানা’ বলা হয় (তারপর মাকু চালিয়ে তা পূরণ করে কাপড় বোনা হয়)।আমড়া গাছের ছায়ায়, কাকা বসতেন একটা টুলের মতো কালো পাথরের উপর আর আমরা বসতাম ইটের উপর (আমাদের বিখ্যাত ‘ইটালিয়ান সেলুন’), সেদিন পাড়ার সব ছোটদের চুল কাটা হতো, বিশেষ করে আমাদের পরিবারের সবার, মা বলতেন, “যাও কাকাকে বল- ‘ফেসিয়ান’ (fashion)করে চুল কেটে দিতে।”

বড়রা দাড়ি কামাতেন, সেই সঙ্গে নাকের চুল, কানের চুলও ছাঁটা হতো। কেউ কেউ আবার ফ্রিতে বগলের লোমও চাঁচিয়ে নিতেন। কালী কাকার কাছে চুল কাটা ছিল এক বিভীষিকা! কাকা তাঁর একটা হাঁটু তির্যকভাবে নিচের দিকে নামিয়ে দিতেন, আর আমরা তাঁর তেলচিটে নোংরা উরুর কাপরের ওপর আধঘণ্টা ঘাড় বাঁকিয়ে বসে দমবন্ধ করে বসে থাকতাম, সেই সময় চলত তাঁর অপরিষ্কার চিরুনি আর ধারহীন কাঁচি দিয়ে চুল কাটার পর্ব।

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসতো যখন তিনি জুলফি আর ঘাড়ের চুল ছোট করতে অতি পুরনো ধারহীন হ্যান্ড-ক্লিপার চালাতেন। সেই ক্লিপারে ধার না থাকার দরুন চুল টেনে টেনে ছিঁড়ত—যা ছিল ভীষণ বেদনাদায়ক (তখন তো এখনকার মতো ইলেকট্রিক ট্রিমার আসেনি) । ঘাড়ের চুল ছোট হলে কাঁপাকাঁপা হাতে ক্ষুর দিয়ে ঘাড় কামাতেন। এতে নানা জায়গা কেটে রক্তাক্ত হতো, আর তার ওপর চলত ফিটকিরির চরম জ্বালা! তাই চুল কাটতে যাওয়া আমার কাছে আজও এক মহা যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা।

এ তো গেল কালীকাকার পর্ব। এরপর শুরু হলো সৈনিক স্কুল পর্ব। ১৯৭৬ সালে সারা বছরের চুল কাটার জন্য বরাদ্দ ছিল ৮০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে একবার করে চুল কাটতে হত, দুজন পিয়ন-কাম-নাপিত মাত্র সাড়ে তিন মিনিটে ক্লিপার চালিয়ে একেক জনকে ‘বাটি ছাঁট’ উপহার দিত। ‘দে ওয়্যার ভেরি এক্সপার্ট!’ সেই বয়সে অমিতাভ বচ্চন, মিঠুন চক্রবর্তী, বিনোদ খান্নার মতো আমাদেরও একটু ‘ফেসিয়ান’ করতে ইচ্ছে করত। তাই একটু বড় হয়ে ক্লাস এইট-নাইনে ওঠার পর লুকিয়ে ওদের কোয়ার্টারে গিয়ে নগদ পাঁচ টাকা গুনে চুল কিছুটা বড় করে কেটে আসতাম। তারপর টেরি বাগিয়ে চুল আঁচড়ানো।
আট বছর এইভাবে বাটি ছাঁট দিতে দিতে এমন বাটি ছাঁট দেওয়ার অভ্যেস হয়ে গেল যে এখন আর বড় চুল রাখতেই পারি না। ‘হাবিবস’-এ গিয়েও বলি জিরো ট্রিমার চালিয়ে দিতে।

এরপর এলো মহামারি কোভিড, সব সেলুন বন্ধ, এবার নিজের চুল নিজে কাটো, তাও করতে হলো, ছেলের চুল কাটা, আয়না দেখে নিজের চুল কাটা, তা করতে গিয়ে বিভ্রাট, শেষে ন‍্যাড়ামুন্ডি, বউয়ের সাহায্যে। ছোটবেলায় বন্ধুরা কিছু খারাপ করলে শাপ দিত-“বড়ো হয়ে নাপিত হবি” কোভিড যেন সেই শাপ পুরণ করলো।

কিন্তু এখন হয়েছে আরেক বিপদ, নিকষ-কালো প্রোমোটার ৪৫ মিনিট ধরে ফেসিয়াল করাবেন, সাদা চুলের আশি বছরের বুড়ো এক ঘণ্টা ধরে চুলে কলপ করবেন, কেও আবার আধঘণ্টা ধরে মাথা আর সারা শরীর মর্দন করাবেন ,আর আমি ১৫ মিনিটের চুল কাটার জন্য দেড় থেকে দুঘণ্টা বসে অপেক্ষা করবো কখন এদের কেশ চর্চা শেষ হয়ে আমার পালা আসে।

@কিছু বানান ইচ্ছাকৃত ভুল আছে, যেমন বলা হতো সেটা বোঝাতে