বাইরে হুগলি নদীর বুকে বাতাস বইছিল। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সদর দফতরের সেই বিশেষ কক্ষে বাতাস ঢোকার কোনো পথ ছিল না। ভারী পর্দা টানা, দরজা বন্ধ। মোমবাতির আলোয় তিনটি মুখ — তিনটি ভিন্ন দুনিয়ার মানুষ — একই টেবিলে বসে আছেন।
টেবিলের উপরে ছড়িয়ে আছে মানচিত্র, গোপন চিঠির বান্ডিল, স্থানীয় গুপ্তচরদের পাঠানো রিপোর্ট, এবং ঠিক মাঝখানে একটিমাত্র ফাইল। তার মলাটে লেখা মাত্র চারটি শব্দ:
His whereabouts are unknown

ফাইলটির উপর দীর্ঘক্ষণ চোখ রেখেছিলেন মেজর উইলিয়াম ফোর্সাইথ। জেনারেল হিউ রোজের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি, ভারতে বিদ্রোহ দমনের সময় যাঁর হাত রক্তাক্ত হয়েছিল বললে ভুল হবে না। যুদ্ধের ক্লান্তি তাঁর চোখের নিচের কালিতে এখনও লেগে আছে। হঠাৎ তিনি টেবিলে মুষ্টি ঠুকলেন। এতটাই জোরে যে মোমবাতির শিখা কেঁপে উঠল।

"এই লোকটাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কানপুর গণহত্যার জন্য সে দায়ী। বিবিঘরের রক্ত এখনও শুকায়নি।"
তাঁর ঠিক পাশে বসে ছিলেন ক্যাপ্টেন জেমস ফোর্বস। বয়স ত্রিশের কোঠায়, মুখে হালকা দাড়ি, চোখে বুদ্ধির দীপ্তি। কোম্পানির ইন্টেলিজেন্স বিভাগে তিনি কাজ করেন — তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, এবং প্রয়োজনে তথ্য তৈরি করাও। তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন। কিন্তু তাঁর মাথা নাড়ানোটা সম্মতির ছিল না, বরং সংশয়ের।

"কিন্তু সে কোথায়, মেজর? নেপালের জঙ্গলে? সমুদ্রপারে পালিয়ে গেছে? আমাদের কাছে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। বারোটি আলাদা রিপোর্ট এসেছে — বারোটি আলাদা জায়গার নাম। কোনটা সত্যি, কোনটা গুজব, আলাদা করা মুশকিল।

ফোর্বস একটু থামলেন। তারপর বললেন:
"অথচ পুরো ঘটনার শুরু একটি আইনি প্রশ্ন থেকে — সে আদৌ উত্তরাধিকারী কি না। সেই প্রশ্নের উত্তর যদি সেদিন অন্যরকম হতো, তাহলে হয়তো আজ এই ফাইলটাই থাকত না।"

কক্ষের কোণে একটি পুরনো চেয়ারে প্রায় নিঃশব্দে বসেছিলেন তৃতীয় জন। তাদের মধ্যে একজন বৃদ্ধ মানুষ, পরনে সাদা ধুতি-চাদর, কপালে চন্দনের তিলক। নাম রামচন্দ্র শাস্ত্রী — হিন্দু আইনের বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত, কোম্পানির দীর্ঘদিনের অনুবাদক ও আইন-পরামর্শদাতা। চল্লিশ বছর ধরে তিনি দুটি সভ্যতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন — ব্রিটিশ আইন বোঝার চেষ্টা করেছেন, নিজের দেশের আইন বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ কাউকে পুরোপুরি বোঝেনি।

তিনি ধীরে বললেন, কণ্ঠস্বরে কোনো উত্তেজনা নেই:

"সাহেব, আপনি যদি তাকে জানতে চান — তাহলে প্রথমে জানতে হবে সে কীভাবে তার নামটি পেল, সেটা জানতে হবে। সেই গল্পটাই আসল রহস্য।"

ফোর্সাইথ বিরক্ত হয়ে তাকালেন।

"পণ্ডিতজি, আমি জানি সে দত্তক পুত্র। এটা তো সবাই জানে।"

"সবাই জানে, কিন্তু কেউ বোঝে না।" শাস্ত্রী সামান্য হাসলেন। "আর যে বোঝে না, সে ঘটনার মূলে পৌঁছাতে পারে না।"

ফোর্বস সামনে ঝুঁকলেন। তাঁর চোখে আগ্রহ।

"বলুন, পণ্ডিতজি।"

শাস্ত্রী একটু সময় নিলেন। তারপর শুরু করলেন।

"১৮১৮ সাল। তৃতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধে মারাঠা সাম্রাজ্যের শেষ পেশোয়া, দ্বিতীয় বাজিরাও, যুদ্ধে পরাজিত হলেন। ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। কানপুর থেকে পনেরো মাইল উত্তরে, গঙ্গার ধারে বিঠুর নামক স্থানে তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হলো। সঙ্গে দেওয়া হলো বার্ষিক আট লক্ষ টাকার পেনশন।"

"এটুকু আমরা জানি," ফোর্সাইথ বললেন।

"জানেন। কিন্তু একবার ভাবুন — একজন মানুষ, যিনি একসময় পুণের রাজপ্রাসাদে বসে সমগ্র মারাঠা সাম্রাজ্যের পেশোয়া ছিলেন, তিনি এখন গঙ্গার ধারে একটি ছোট বাড়িতে বন্দীর মতো জীবন কাটাচ্ছেন। আট লক্ষ টাকা অনেক, কিন্তু ক্ষমতা হারানোর ক্ষত টাকায় ভরে না।"

শাস্ত্রী একটু থামলেন।

"বাজিরাওয়ের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। হিন্দু শাস্ত্রমতে, পুত্রহীন মানুষ মৃত্যুর পরে মুক্তি পায় না। পিতৃলোকে পিণ্ড দেওয়ার কেউ থাকে না। এই বিশ্বাস আমাদের সমাজে শিকড়ের মতো গভীর। পেশোয়া একজন ব্রাহ্মণ — ধর্মের প্রতি তাঁর আবদ্ধতা অসাধারণ গভীর ছিল। তাই ১৮২৭ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দত্তক পুত্র গ্রহণ করবেন।"

ফোর্বস মাথা নাড়লেন। "এবং বেছে নেওয়া হলো ধুন্দুপন্তকে।"

"হ্যাঁ। মাধবনারায়ণ ভট্ট নামক একজন সাধারণ ব্রাহ্মণের পুত্র, ধুন্দুপন্ত। তাঁর বয়স তখন তিন বছরের মতো। দত্তক গ্রহণের সমস্ত ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় বিধি পালন করা হলো। শাস্ত্রমতে, দত্তকগ্রহণের পর সেই শিশু সম্পূর্ণরূপে নতুন পিতার পুত্র হয়ে যায় — জন্মপিতার সঙ্গে আইনি সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ধুন্দুপন্ত হয়ে উঠলেন পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের পুত্র। তার নতুন নামকরন হলো।"

"এবং তারপর?" ফোর্সাইথ জিজ্ঞেস করলেন।

শাস্ত্রী একটু সময় নিলেন। তাঁর চোখে একটা গভীর বেদনার ছায়া এলো।

"তারপর সেই শিশু বড় হলো পেশোয়ার পুত্র হিসেবে। সর্বোত্তম শিক্ষা পেলেন — সংস্কৃত, ফার্সি, অশ্বারোহণ, তলোয়ার চালানো। বাজিরাও তাঁকে রাজপুত্রের মতো মানুষ করেছিলেন। কারণ বাজিরাওয়ের একটাই স্বপ্ন ছিল — তাঁর এই পুত্র একদিন পেশোয়ার সম্মান ফিরে পাবেন।"

"কিন্তু সেটা হয়নি।"

"হয়নি।" শাস্ত্রী এবার সরাসরি ফোর্সাইথের দিকে তাকালেন। "১৮৫১ সালে পেশোয়া বাজিরাও মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে উইল করে ধুন্দুপন্তকে সব সম্পদের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত করে গেলেন। পেনশন, সম্পত্তি, এবং পেশোয়ার পদমর্যাদা — সবকিছু।"

ফোর্বস বললেন, "এবং কোম্পানি সেই উইল অস্বীকার করল।"

"শুধু অস্বীকার নয়।" শাস্ত্রীর কণ্ঠে এবার একটু তিক্ততা এলো, যদিও তিনি সামলে নিলেন। "আট লক্ষ টাকার পেনশন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলো। পেশোয়া হিসেবে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হলো না। ধুন্দুপন্ত হয়ে গেলেন একজন সাধারণ জমিদার — এবং সেটুকুও টিকিয়ে রাখতে কোম্পানির অনুকম্পার উপর নির্ভর করতে হবে।"

"ডকট্রিন অব ল্যাপস," ফোর্বস বললেন।

"হ্যাঁ। লর্ড ডালহৌসির সেই নীতি। দত্তকপুত্র রাজত্ব পাবে না, পেনশন পাবে না। কিন্তু সাহেব, এখানে একটা কথা বলার আছে।" শাস্ত্রী সামান্য সামনে ঝুঁকলেন। "ডকট্রিন অব ল্যাপস দেশীয় রাজাদের দত্তকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু বাজিরাও কোনো রাজা ছিলেন না — তিনি ছিলেন একজন পরাজিত শাসক, যিনি পেনশনের বিনিময়ে সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার ছেড়ে দিয়েছিলেন। পেনশনটা ছিল একটি চুক্তি। সেই চুক্তি ভাঙা হলো।"

ফোর্সাইথ অস্বস্তি করলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।

"ধুন্দুপন্ত তখন কী করলেন?" ফোর্বস জিজ্ঞেস করলেন।

"তিনি আইনের পথে গেলেন।" শাস্ত্রী একটু থামলেন। "গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলে দরখাস্ত দিলেন — নামঞ্জুর হলো। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন লন্ডনে আপিল করবেন, কোর্ট অব ডাইরেক্টার্সের কাছে। এবং সেই কাজে পাঠালেন তাঁর বিশ্বস্ত সহচর আজিমুল্লা খানকে।"

ফোর্বস চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন।

"আজিমুল্লা খান।"

"হ্যাঁ।" শাস্ত্রীর মুখে একটু বিস্ময়ের ছায়া এলো। "অসাধারণ মানুষ। অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন। নিজের অধ্যবসায়ে ইংরেজি ও ফরাসি শিখেছিলেন। লন্ডনের সম্ভ্রান্ত মহিলা মহলে তাঁর যথেষ্ট প্রতিপত্তি হয়েছিল। কিন্তু কোর্ট অব ডাইরেক্টার্সকে ধুন্দুপন্তের পেনশনের বিষয়ে তাঁকে কিছুতেই রাজি করাতে পারেননি।"

"ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পথে," ফোর্বস ধীরে বললেন, "আজিমুল্লা ক্রাইমিয়ায় গিয়েছিলেন।"

শাস্ত্রী একটু চমকে তাকালেন।

"আপনি জানেন?"

"কিছুটা।" ফোর্বস একটি ফাইল খুললেন। "মোহাম্মদ আলি খান —কলেজে পড়া, বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক। ঐ বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসির আগে ফোরবস-মিচেলকে তিনি কিছু কথা বলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন — আজিমুল্লার সঙ্গে তিনিও ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। তারপর ক্রাইমিয়াতেও। ১৮ই জুন, সেখানে তাঁরা ব্রিটিশ বাহিনীর পরাজয় নিজের চোখে দেখেছিলেন। কনস্টান্টিনোপলে ফিরে কয়েকজন রুশ প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয়েছিল। ভারতে বিদ্রোহ হলে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।"

শাস্ত্রী নিঃশব্দে শুনলেন।

"সেই সব তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে," ফোর্বস যোগ করলেন। "কিন্তু একটা কথা নিশ্চিত — লন্ডনে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আজিমুল্লা এবং মোহাম্মদ আলি — এই দুজনের মনে একটা দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়েছিল।"

"কোম্পানিকে শেষ করে দেওয়ার সংকল্প," শাস্ত্রী ধীরে বললেন।

ঘরে নীরবতা নামল।

ফোর্সাইথ উঠে দাঁড়ালেন, ধীরে পায়চারি শুরু করলেন।

"তাহলে সূত্রটা স্পষ্ট হচ্ছে। ১৮১৮ সালে পরাজয়। ১৮২৭ সালে দত্তক। ১৮৫১ সালে পেনশন বন্ধ। তারপর লন্ডনে প্রত্যাখ্যান। এবং ১৮৫৭ সালে বিদ্রোহ।"

"তিরিশ বছরের ক্ষোভ," ফোর্বস বললেন।

"তিরিশ বছরের ক্ষোভ নয়," শাস্ত্রী সংশোধন করলেন। "তিরিশ বছরের অপমান। ক্ষোভ হয় যখন কেউ আপনার সম্পদ নেয়। অপমান হয় যখন কেউ আপনার পরিচয় অস্বীকার করে।"

শাস্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ মানুষ, কিন্তু মেরু দণ্ড সোজা।(চলবে)