শীতের বিকেল।
শহরের পুরোনো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হলো—কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না, শুধু মানুষগুলো বদলে যায়।
স্টেশনের নামটা চোখে পড়তেই বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা খেলাম—মাধবপুর।
নামটা আমার কাছে শুধু একটা জায়গার নাম নয়।
এই প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চটাতেই সাত বছর আগে মেঘলার সঙ্গে শেষবার বসেছিলাম।
সাত বছর।
সময়টা উচ্চারণ করতেই নিজের কাছেই অবাক লাগল।
মানুষ সাত বছরে কতটা বদলে যায়!
আমি বদলেছি।
চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। চাকরি, সংসার, দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে জীবন আমাকে অনেকটাই অন্য মানুষ বানিয়েছে।
কিন্তু মেঘলা?
ওকে দেখার পর বুঝলাম, কিছু মানুষ বদলায় না।
শুধু তাদের চোখের ভেতর কয়েকটা নতুন গল্প জমে।
প্ল্যাটফর্মের ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।
একাই।
ধূসর শাল জড়ানো। হাতে একটা ছোট ব্যাগ। চুলগুলো আগের চেয়ে একটু ছোট। মুখটা আগের মতোই শান্ত।
আমাকে দেখেই ও থমকে গেল।
আমিও।
দুজনের চোখের মধ্যে সাত বছরের দূরত্বটা হঠাৎ যেন মাত্র সাত হাত হয়ে গেল।
মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
—কেমন আছ?
কত সহজ একটা প্রশ্ন!
অথচ এই একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার সাত বছর লেগে গেল।
আমি বললাম,
—ভালো আছি। তুমি?
—আমিও।
তারপর নীরবতা।
যে মেয়েটার সঙ্গে একসময় রাতভর কথা বলেও কথা শেষ হতো না, আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে দুটো বাক্যের বেশি বলতে পারলাম না।
আমার চোখ বারবার ওর হাতের দিকে চলে যাচ্ছিল।
সেই হাত।
যে হাতটা ধরার জন্য একসময় কত অস্থির ছিলাম!
আমাদের প্রেমটা অদ্ভুত ছিল।
ভালোবাসা ছিল, অভিমান ছিল, অপেক্ষা ছিল—শুধু স্পর্শ ছিল না।
একদিন নদীর ধারে বসে আমি মেঘলার হাতের খুব কাছে নিজের হাতটা রেখেছিলাম।
মেঘলা হাত সরিয়ে নেয়নি।
আবার ধরতেও দেয়নি।
শুধু বলেছিল,
—আর একটু সময় দাও।
আমি হেসে বলেছিলাম,
—কতটা?
মেঘলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—যতদিন না তোমাকে হারানোর ভয়টা আমার কাছে তোমাকে পাওয়ার চেয়েও ছোট হয়ে যায়।
তখন কথাটার মানে বুঝিনি।
আমি শুধু চেয়েছিলাম ওর হাতটা একবার ধরতে।
খুব বেশি কিছু না।
একটা হাত।
একটু উষ্ণতা।
একটা নিশ্চয়তা যে, এতদিন ধরে যে ভালোবাসাটাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছি, তার একটা বাস্তব অস্তিত্বও আছে।
কিন্তু মেঘলা বলেছিল,
—ভালোবাসা শুধু ছোঁয়ার নাম নয়, অয়ন।
আমি রাগ করেছিলাম।
ভীষণ রাগ।
শেষবার যখন ওকে এই স্টেশন থেকে বিদায় দিয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—যে ভালোবাসায় একটা হাত ধরার অধিকারও নেই, সেই ভালোবাসা রেখে কী লাভ?
ট্রেন ছাড়ার আগে মেঘলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
—আমাকে একটু সময় দিও।
আমি উত্তর দিইনি।
সেদিনই ফোনের সিমটা খুলে ফেলেছিলাম।
তারপর সাত বছর।
আজ হঠাৎ এই প্ল্যাটফর্মে মেঘলাকে দেখে মনে হলো, সময় কখনো কখনো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে।
আমি ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম।
—মেঘলা...
ও তাকাল।
—হুম?
আমি অনেক কষ্টে বললাম,
—তুমি কি আমাকে এখনও মনে রেখেছ?
মেঘলা কিছু বলল না।
শুধু মৃদু হাসল।
তারপর বলল,
—কিছু মানুষকে মনে রাখতে হয় না। তারা থেকে যায়।
আমার বুকটা কেমন করে উঠল।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
—তাহলে সেদিন আমাকে থামালে না কেন?
মেঘলার চোখ দুটো হঠাৎ একটু ভিজে উঠল।
—তুমিই তো চলে যেতে চেয়েছিলে।
—আমি রাগ করেছিলাম।
—জানি।
—আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
মেঘলা এবার খুব আস্তে বলল,
—আর আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে বুঝবে।
কথাটা শুনে মাথা নিচু হয়ে গেল আমার।
সাত বছর ধরে যে প্রশ্নটা আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, তার উত্তর আজ এত সহজ!
আমি বললাম,
—এখন যদি আবার শুরু করতে চাই?
মেঘলা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের বাম হাতটা ধীরে ধীরে শালের ভেতর থেকে বের করল।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
হাতের অনামিকায় একটা সরু সোনার আংটি।
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
তবু নিজেকে সামলে নিয়ে হাসলাম।
—বিয়ে করেছ?
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
—হ্যাঁ।
—কতদিন?
—চার বছর।
আমি কিছু বললাম না।
প্ল্যাটফর্মে তখন ট্রেন আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
দূর থেকে হেডলাইট দেখা যাচ্ছে।
মেঘলা ব্যাগটা শক্ত করে ধরল।
হঠাৎ একটা ছোট্ট ছেলে দৌড়ে এসে ওর হাত ধরে বলল,
—মা, ট্রেন এসে গেছে!
মেঘলা নিচু হয়ে ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মা!
একটা শব্দ।
অথচ সেই এক শব্দের ভেতরেই যেন আমার সাত বছরের সমস্ত অপেক্ষা, অভিমান আর কল্পনার মৃত্যু হয়ে গেল।
মেঘলা উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল।
চোখে অদ্ভুত এক মায়া।
বলল,
—ভালো থেকো, অয়ন।
আমি হাসার চেষ্টা করলাম।
—তুমিও।
মেঘলা চলে যেতে শুরু করল।
আমি তাকিয়ে রইলাম।
কিছুদূর গিয়ে ও হঠাৎ থেমে গেল।
পেছন ফিরে তাকাল।
আমার বুকের ভেতর অকারণে একটা আশা জেগে উঠল।
মেঘলা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের হাতটা সামান্য তুলল।
আমি বুঝতে পারলাম না—বিদায় জানাচ্ছে, নাকি সাত বছর আগের সেই অসমাপ্ত কথাটার শেষটুকু বলছে।
তারপর ও ছেলেটার হাত ধরে ট্রেনে উঠে গেল।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে স্টেশন ছাড়ল।
জানালার ফাঁক দিয়ে মেঘলাকে দেখা যাচ্ছিল।
কিন্তু এবার ও আমার দিকে তাকাল না।
আমি প্ল্যাটফর্মের সেই পুরোনো বেঞ্চটার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মনে হলো, সাত বছর আগে যে হাতটা ধরতে পারিনি, আজ সেটাই ধরার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু জীবন বড় অদ্ভুত।
কিছু হাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না।
কিছু ভালোবাসা আমাদের জন্য বেঁচে থাকে না।
আর কিছু মানুষ—
তারা চলে যাওয়ার পরও আমাদের ভেতরে থেকে যায়।
শুধু তাদের ছুঁয়ে দেখার অধিকারটা আর কখনো ফিরে আসে না।
সেদিন মেঘলা আমাকে একটা হাতের স্পর্শ দিতে পারেনি।
আজ বুঝলাম—
সে স্পর্শটা আসলে আমাকে বঞ্চিত করার জন্য তুলে রাখেনি।
সে শুধু চেয়েছিল, আমি যেন একদিন ভালোবাসার অর্থটা বুঝি।
কিন্তু আমি বুঝলাম—
সাত বছর দেরিতে।

Comments (2)