বিকেলের শেষ আলোটা নদীর জলে পড়ে ছিল। সূর্যটা যেন ধীরে ধীরে আকাশের বুক থেকে নেমে এসে পানির ভেতর ডুবে যেতে চাইছে। হালকা বাতাসে কাশফুল দুলছে। দূরে একটা নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। পৃথিবীটা এত শান্ত ছিল যে নিজের হৃদস্পন্দনও শোনা যাচ্ছিল।

অর্ণব নদীর পাড়ে বসে ছিল। হাতে একটা পুরোনো ফোন। ফোনের গ্যালারিতে হাজারটা ছবি, কিন্তু সে শুধু একটা ছবিতেই বারবার ফিরে আসে। ছবিটা প্রেমার।

একসময় দিনের শুরু হতো তার সুপ্রভাত দিয়ে। রাত শেষ হতো ঘুমিও, স্বপ্নে দেখা হবে শুনে। তখন মনে হতো পৃথিবীতে যত ব্যস্ততাই থাকুক, দুটো মানুষের জন্য একটু সময় সবসময় থেকে যায়।

প্রেমা একদিন হেসে বলেছিল,

— জানো, মানুষ হারিয়ে যায় না। মানুষ শুধু ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যায়।

অর্ণব হেসে বলেছিল,

— তুমি যদি কখনো চুপ হয়ে যাও, আমি সারাজীবন কথা বলে যাব।

কথাটা বলার সময় দুজনেই জানত না, জীবন মাঝে মাঝে নিজের মতো করে গল্প লিখে। সেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে সময়ের ক্ষমতা অনেক বেশি।

তারপর একদিন সত্যিই সব বদলে গেল।

প্রথমে উত্তর আসতে একটু দেরি হতো। তারপর সেই দেরি ঘণ্টা পেরিয়ে দিনে গিয়ে দাঁড়াল।

খেয়েছো?

প্রশ্নটার উত্তর আসত শুধু—হুম।

যে মানুষটা একসময় ছোট্ট একটা কষ্টও লুকিয়ে রাখতে পারত না, সে এখন নিজের পুরো জীবনটাই নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছে।

অদ্ভুত ব্যাপার, তাদের মধ্যে কোনো বড় ঝগড়া হয়নি। কেউ কাউকে অপমান করেনি। কেউ কাউকে দোষও দেয়নি।

শুধু কথাগুলো কমে গিয়েছিল।

তারপর একদিন কথাগুলো একেবারেই থেমে গেল।

অর্ণব অনেকবার ভেবেছে, সম্পর্ক ভাঙে কীভাবে?

চিৎকার করে?

নাকি দরজা বন্ধ করে?

পরে বুঝেছে, সম্পর্ক ভাঙার সবচেয়ে নিঃশব্দ উপায় হলো—একজন মানুষ ধীরে ধীরে আরেকজনের অভ্যাস থেকে হারিয়ে যাওয়া।

কিছু মানুষ বিদায় বলে না। শুধু একদিন আর ফিরে আসে না।

অনেক মাস কেটে গেছে।

তবুও বৃষ্টি নামলে অর্ণবের মনে পড়ে যায় প্রেমার কথা। কারণ প্রেমা বৃষ্টি খুব ভালোবাসত। বৃষ্টি হলেই ছাদে উঠে দাঁড়াত। দুই হাত মেলে বলত,

— দেখো, আকাশও মাঝে মাঝে কাঁদে। তবু কেউ তাকে দুর্বল বলে না।

সেদিন অর্ণব মজা করে বলেছিল,

— তুমি থাকলে আমার জীবনে কোনো দুঃখ থাকবে না।

প্রেমা উত্তর দিয়েছিল,

— আমি না থাকলেও আমাকে মনে রেখো। ভালোবাসা কখনো মানুষকে ছেড়ে যায় না, মানুষই ভালোবাসার কাছ থেকে দূরে চলে যায়।

সেই কথাগুলো আজও কানের ভেতর বাজে।

রাত গভীর হলে অর্ণব মাঝে মাঝে পুরোনো মেসেজ পড়ে। কিছু শব্দ পড়ে হাসে। কিছু শব্দ পড়ে চোখ ভিজে ওঠে।

তবু সে কোনো অভিযোগ করে না।

কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়, সেখানে অভিমান থাকতে পারে, ঘৃণা নয়।

একদিন সাহস করে সে প্রেমার নম্বরে একটা বার্তা লিখল—

ভালো থেকো, প্রেমা। তোমাকে আর ফিরিয়ে আনতে চাই না। শুধু চাই, তুমি যেখানেই থাকো, হাসতে শিখো। কারণ তোমার হাসিটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটা ছিল।

অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বার্তাটা পাঠাল না।

মুছে ফেললও না।

কিছু কথা মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য লেখা হয় না। নিজের বুকের ভেতরের ঝড়টাকে একটু শান্ত করার জন্য লেখা হয়।

সূর্য ডুবে গেল।

আকাশের রঙ বদলে ধীরে ধীরে নীল থেকে গাঢ় অন্ধকার হয়ে গেল। নদীর জলে আলো কমে এল। বাতাসে সন্ধ্যার গন্ধ।

অর্ণব ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার মনে হলো, কিছু মানুষ আমাদের জীবনে চিরদিন থাকার জন্য আসে না। তারা আসে ভালোবাসা কাকে বলে, অপেক্ষা কাকে বলে, আর নীরবতারও যে একটা ভাষা আছে—সেটা শিখিয়ে দিতে।

প্রেমা হয়তো অনেক দূরে চলে গেছে।

তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে দাঁড়ালে আজও মনে হয়, বাতাসের ভেতর কেউ খুব আস্তে করে তার নাম ধরে ডাকছে।

হয়তো সেটা প্রেমা নয়।

হয়তো সেটা স্মৃতি।

আর কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। তারা নীরবে মানুষের ভেতর বেঁচে থাকে—এক ফোঁটা অশ্রুর মতো, এক টুকরো অসমাপ্ত ভালোবাসার মতো।