পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬: ফল ঘোষণার পর—জয়, না রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতিষ্ঠা?
গতকাল ফল ঘোষণা হয়েছে—২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। সংখ্যার বিচারে এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বিজয়। কিন্তু এই ফলাফলকে কি নিছক ভোটের লড়াইয়ের স্বাভাবিক পরিণতি বলা যায়? নাকি এটি এমন এক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুসংগঠিত প্রয়োগের মাধ্যমে জয় নিশ্চিত করা হয়েছে—এই প্রশ্ন এখন অনিবার্যভাবে সামনে এসেছে।
এই নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন—এসআইআর—এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। প্রায় ৯০ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া, যাদের বড় অংশ সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, নির্বাচনের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। গণতন্ত্রের মূল নীতি—“প্রত্যেক নাগরিকই ভোটার”—এখানে উল্টে গিয়ে দাঁড়ায় “প্রত্যেক নাগরিককে তার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে” এই অবস্থানে।
এই প্রক্রিয়ায় ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর ভূমিকা নিরপেক্ষতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলেই বহু বিশ্লেষকের মত। প্রশাসনিক বদলি, নজিরবিহীন পর্যবেক্ষক নিয়োগ, এবং ভোটার তালিকা পুনর্গঠনের অস্বচ্ছতা—সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন যেন এক স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা নয়, বরং একটি কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর অস্বাভাবিক উপস্থিতি। প্রায় আড়াই লাখ নিরাপত্তাকর্মী একটি রাজ্যে মোতায়েন—যেখানে কোনো জরুরি অবস্থা ছিল না—এটি কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং একটি শক্তির প্রদর্শন। রাজ্য পুলিশের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ভোটের দিন নানা জায়গায় ভোটারদের ধীরগতিতে ভোট দিতে বাধ্য করা, পরিচয় যাচাইয়ের নামে সময়ক্ষেপণ—এসব অভিযোগও উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যও এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। অমিত শাহ প্রকাশ্যে বলেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী সর্বত্র থাকবে—এমনকি নির্বাচনের পরও। এই ধরনের ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে: রাষ্ট্রীয় শক্তি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রস্তুত।
অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তদন্ত সংস্থার অভিযান, গ্রেপ্তার তালিকা, এবং প্রশাসনিক চাপ—সব মিলিয়ে একটি অসম লড়াইয়ের চিত্র তৈরি হয়েছে।
ফলাফল ঘোষণার পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—এটি কি ভোটের মাধ্যমে অর্জিত একটি রাজনৈতিক বিজয়, নাকি এমন একটি প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ, যেখানে ফলাফল আগেই অনেকাংশে নির্ধারিত ছিল?
গণতন্ত্রে জয় শুধু সংখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি প্রক্রিয়ার বৈধতার ওপরও নির্ভর করে। যদি ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই জয়কে নিঃশর্ত গণরায় বলা কঠিন হয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬ তাই কেবল একটি নির্বাচনের ফল নয়—এটি একটি সংকেত। একটি এমন ব্যবস্থার সংকেত, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাজনৈতিক লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে নির্বাচনের চরিত্রই বদলে দিতে পারে।
এখন প্রশ্ন একটাই: যদি জয় নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় শক্তির এই মাত্রার প্রয়োগ প্রয়োজন হয়, তাহলে ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলো কতটা স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক থাকবে?
পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল সেই উদ্বেগকেই আরও গভীর করে তুলেছে।
Comments (4)