মানবতার কল্যাণে এ বিশ্ব সৃষ্টির প্রথম থেকে যে জীবন বিধান সমুহ চলে আসছিল ইসলাম হল তার সর্বশেষ সংস্করণ। আর ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ (সঃ)। যিনি মানব জাতির জন্য রহমত স্বরুপ প্রেরিত হয়ে মানুষের জীবন বিধানকে পূর্ণাঙ্গ রুপ দান করেছেন। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে মানব গোষ্ঠী বিভিন্ন ভাবে ছিল উপেক্ষিত ও অবহেলিত। মুহাম্মদ (সঃ)ই তাদেরকে মানবতার ঐশ্বর্যে মহিমান্বিত করে সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত করেন। বর্ণ-ধর্ম ও ভাষার পার্থক্যের কারণে আজ বিশ্ব জুড়ে দ্বন্ধ-সংঘাত নতুন রুপ নিয়েছে। সভ্যতার দাবিদার হয়েও নির্দয় ভাবে মানুষ মানুষের হাতে প্রাণ সংহারে উদ্যত হচেছ। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে মানবতাবোধ জাগ্রত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মানবতার মুক্তিদূত, বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ) এর প্রদর্শিত পন্থাই একমাত্র সমাধান।
বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধের প্রতিষ্ঠাঃ
দুনিয়ার সকল মানুষ একই আদমের সন্তান। একজন অপরজনের উপর প্রভুত্ব করবে, একে অপরের প্রতি যুলুম করবে,-এতো মানবতা বিরোধী। কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে, “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, অতঃপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।”(৪৯:১৩)
মহানবী (সঃ) আল্লাহ প্রদত্ত এই মূলনীতিকে সামনে রেখে মানুষে মানুষে সাম্য-শৃঙ্খলা-ঐক্য ও সমন্বয় সাধন করে, মানবতা ও সম্প্রীতির এক অনুপম নিদর্শন রেখে গেছেন। মহানবী (সঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার, আল্লাহর নিকট অধিকতর প্রিয়, ঐ ব্যক্তি যে তার (আল্লাহর) পরিবারের প্রতি দয়ালু”। তিনি আরো বলেছেন, “মানুষের মাঝে সেই শ্রেষ্ঠ যে মানুষের উপকার করে।”
ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি বলেছেন, “তোমরা সবাই আদম সন্তান। একমাত্র তাক্ওয়া ছাড়া অনারবদের উপর আরবদের, কিংবা আরবদের উপর অনারবদের কোন প্রাধান্য নেই”। মহানবীর এ আদর্শ গোত্রভিত্তিক সমাজের কৃত্রিম আভিজাত্য বোধের মুলে কুঠারাঘাত করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বে উজ্জীবিত একটি প্রেমময় সমাজের উদ্ভব ঘটায়।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাঃ
ইসলামের পূর্বে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এমন কি প্রাচ্যের ভারতবর্ষেও নারীদেরকে সম্পদ ও আহার্যের মতই ভোগ্য বস্তু মনে করা হত। যথেচ্ছ বিবাহ- তালাক, নারী হরণ ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার ছিলনা। পরিবারে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে কোথাও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিলনা। তাই জাহেলী যুগে আরবগণ কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলত। নব্য জাহেলী যুগে যেমনিভাবে মহিলাদেরকে ঘরের বাইরেও কাজ করিতে বাধ্য করা হয়, তেমনিভাবে ঘরের গার্হস্থ্য কাজ ছাড়াও তাদেরকে বাইরের কাজে তথা পশু পালন, দোহন, পশম ছাড়ানো ইত্যাদি কাজে কলুর বলদের মত খাটানো হত। এমনকি বেশ্যা বৃত্তি করে উপার্জনে বাধ্য করা হত। নারী জাতিকে এই অপমানকর দূঃখজনক পরিস্থিতি হতে সম্মানজনক অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ)। আল কোরানের নির্দেশ হল-“তারা তোমাদের জন্য অঙ্গাবরণ এবং তোমরা তাদের জন্য অঙ্গাবরণ স্বরুপ”। মহানবী (সঃ) বলেছেন “জান্নাত তোমাদের মায়ের পায়ের তলায়”। স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন “ তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ, যারা আপন স্ত্রীদের কাছে শ্রেষ্ঠ”। কন্যা সন্তানের সম্মান উঁচু করে দিয়ে তিনি বলেন, “তোমাদের কেউ দুটি কন্যা সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে সৎপাত্রে পাত্রস্থ করলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্র“তি”। মোট কথা সমগ্র পাশ্চত্য ও প্রাচ্য ভুখন্ডে অধুনা সংগ্রাম করে নারীদের স্বাধীনতা ভোগের যে অধিকার আদায় করা হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশী গুনে নারী জাতিকে সম্মানিত করেছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ)।
দাস প্রথার উচ্ছেদঃ
প্রাচীনকাল থেকেই গোটা আরব সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই দাস প্রথা বিদ্যমান ছিল। সাধারণত পরাজিত গোত্র বা যুদ্ধ বন্দিদেরকে দাসে পরিণত করা হত। মনিবদের হাতে অকথ্য নিযার্তনই ছিল এদের প্রাপ্য। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে মানবতার এ রকম অবমাননা বহুদিন যাবত চলে আসছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষ, ইউরোপ ও আমেরিকার সর্বত্র দাস প্রথার বিধান হিন্দু, খ্রীষ্টান ও আর্যদের কাছে বিধি সম্মত বলে স্বীকৃত ছিল। এক কথায় সম্ভ্রান্তদের আভিজাত্য রক্ষার জন্য উপরের স্তরের মানুষের সেবায় নীচের স্তরের মানুষের সেবা পশু সীমা ছাড়িয়ে গেলে ও তা বিহিত ছিল।
মহানবী (সঃ) নিপীড়িত এ দাসদের মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন। মানুষের সমাজে মানুষ অমানুষিক যাতনা ভোগ করবে, এ হতে পারেনা। দাস প্রথার উচ্ছেদ কল্পে তিনি ঘোষণা করেছেন, “গোলামরাতো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তায়া’লা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন সুতরাং তোমাদের উচিত, তোমরা যা খাবে, তাদেরকেও তাই খাওয়াবে। তোমরা যা পরিধান করবে, তাদেরকেও তাই পরিধান করাবে”। তিনি দাসদের উচ্ছ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বলেছেন, “কোন হাবশী গোলাম যদি (যোগ্যতার বলে) তোমাদের নেতৃত্ব পায় তবে তাকে মান্য করবে”। এ কেবল তাঁর মুখের কথাই ছিলনা, বাস্তবে প্রমাণ করে তিনি তা দেখিয়ে গেছেন। হযরত বেলাল এর মত হাবশী গোলালকে তিনি ইসলামের প্রথম মুয়ায্যিন নিয়োগ দিলেন। আযাদ কৃত দাস যায়েদ (রাঃ) এর ছেলে উসামাকে তিনি সেনাপতি পদে নিয়োগ করেছিলেন। মোটকথা বিশ্ব শান্তির কামনায় ক্রীতদাসদেরকে মানুষ্যত্বের মর্যাদাবোধে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি এক শান্তিময় সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
অমুসলিমদের প্রতি ব্যবহারঃ
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা সর্বাত্মক নিরাপত্তা সহকারে বাস করবে- এটাই ইসলামী বিধান। ইসলাম গ্রহণে কেউ তাদেরকে বাধ্য করতে পারবেনা। এমনকি তাদের দেব- দেবী, পুরোহিত ইত্যাদিকে গাল-মন্দ করা যাবে না। মহানবী (সঃ) বলেন, “তোমরা আল্লাহ ও রাসুল কে গালি দিও না, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, একজন মুসলিম কিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে গালি দেবে? তিনি বললেন তোমরা তাদের উপাস্য কে গালি দিলে তারাও তোমাদের আল্লাহর ও রাসুল কে গালি দেবে”। তিনি ঘোষণা করেছেন, “অমুসলিমদের জান-মাল এবং আমাদের জান-মাল একÑ অভিন্ন।” তিনি আরো বলেন, “যে মুসলিম অমুসলিম (যিম্মি) কে সামান্য যুলুম করবে, তার বিরুদ্ধে আমি কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে অভিযোগ আনব।” ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে আজ বিশ্বে যে মারাত্মক সংঘাত সমস্যা-এসবই মহানবী (সঃ) এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব।
যুদ্ধ বন্দিদের প্রতি ব্যবহারঃ
জাহেলি যুগের সামরিক বিধান অনুযায়ী যুদ্ধ বন্দিদের নিধন বা দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হতো। মুসলিম তো যুদ্ধ করে শান্তির জন্য, রাজ্য দখল বা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নয়। যুদ্ধ করে যাদেরকে বন্দি হিসেবে আনা হলো তাদের সাথে উত্তম আচরণ করাই মানবতার দাবী। এ ব্যপারে মহানবী (সঃ) বলেছেন, “বন্দিদের সাথে তোমরা সৌজন্যমুলক আচরণ কর।” তার সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বদরের অনেক যুদ্ধ বন্দি মুক্তি পাওয়ার পরে স্বেচছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মক্কা বিজয়ের পর চিরশত্র“ কুরাইশদের প্রতি যে দয়া ও সহানুভূতির পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। ঐতিহাসিক গীবন বলেছেন,“ পদানত সমস্ত শত্র“কে ক্ষমা করে দিয়ে মুহাম্মদ (সঃ) যে ক্ষমাশীলতার আদর্শ স্থাপন করেছেন, জগতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত নেই।
শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাঃ
শ্রমিক পেটের দায়ে কাজ করে। পুঁজিপতিরা অনেক সময় সুযোগ বুঝে মেহনতী মানুষকে তার নুন্যতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন শ্রমিকদের দাবী আদায়ের অগ্রনায়ক। তিনি তাদের অধিকার রক্ষার্থে ঘোষণা করলেন, “তোমরা শ্রমিকদের মজুরি শোধ করে দিবে তাদের ঘাম শুকানোর আগেই।” তিনি আরো বলেন, “কেয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে”। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন আমি একাধারে দশটি বছর নবী (সঃ) এর খেদমত করেছি, তিনি কখনো (ধমক দিয়ে) বলেননি ‘তুমি এ কাজটি কেন করলে বা এ কাজ কেন করনাই?’ কাপড় ধোয়া, বকরি দোহন করা ইত্যাদি সাংসারিক কাজে তিনি অপমান বোধ করতেন না। মসজিদে নববী নির্মাণকালে তিনি পাথর টানার কাজ করে, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কাজে অংশ গ্রহণ করে, তিনি শ্রমের মর্যাদাকে উৎসাহিত করেছেন। এভাবে শ্রমের প্রতি তিনি সকলকে উৎসাহিত করেছেন এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য সচেষ্ট থেকে বিশ্বে নজিরবিহীন আদর্শ স্থাপন করেন।
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সঃ) সমগ্র মানব জাতির জন্য রহমত স্বরুপ প্রেরিত হয়েছেন। তিনি আদর্শ পিতা আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ স্বামী, আদর্শ মনিব, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ সেনাপতি, পথ প্রদর্শক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক। আল্লাহ তায়া’লা বলেন, “নিশ্চয় রাসুল (সঃ) এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।” আজ যখন ধর্মে ধর্মে হানাহানি, বর্ণে বর্ণে সংঘাত তখন মহানবী (সা.) এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের আবশ্যকতা অনুভুত হচ্ছে তীব্রভাবে। বস্তুতঃ কেবল মাত্র তার আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই এই অশান্ত বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবতা, কাংখিত শান্তি ও সম্প্রীতি। তাই আসুন আমরা রাসুলের (সাঃ) আদর্শ শিখি এবং আদর্শ মোতাবেক জীবন গড়ি।
বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধের প্রতিষ্ঠাঃ
দুনিয়ার সকল মানুষ একই আদমের সন্তান। একজন অপরজনের উপর প্রভুত্ব করবে, একে অপরের প্রতি যুলুম করবে,-এতো মানবতা বিরোধী। কুরআনুল কারীমে ঘোষণা করা হয়েছে, “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, অতঃপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার।”(৪৯:১৩)
মহানবী (সঃ) আল্লাহ প্রদত্ত এই মূলনীতিকে সামনে রেখে মানুষে মানুষে সাম্য-শৃঙ্খলা-ঐক্য ও সমন্বয় সাধন করে, মানবতা ও সম্প্রীতির এক অনুপম নিদর্শন রেখে গেছেন। মহানবী (সঃ) বলেছেন, “সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার, আল্লাহর নিকট অধিকতর প্রিয়, ঐ ব্যক্তি যে তার (আল্লাহর) পরিবারের প্রতি দয়ালু”। তিনি আরো বলেছেন, “মানুষের মাঝে সেই শ্রেষ্ঠ যে মানুষের উপকার করে।”
ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণে তিনি বলেছেন, “তোমরা সবাই আদম সন্তান। একমাত্র তাক্ওয়া ছাড়া অনারবদের উপর আরবদের, কিংবা আরবদের উপর অনারবদের কোন প্রাধান্য নেই”। মহানবীর এ আদর্শ গোত্রভিত্তিক সমাজের কৃত্রিম আভিজাত্য বোধের মুলে কুঠারাঘাত করে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বে উজ্জীবিত একটি প্রেমময় সমাজের উদ্ভব ঘটায়।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠাঃ
ইসলামের পূর্বে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে এমন কি প্রাচ্যের ভারতবর্ষেও নারীদেরকে সম্পদ ও আহার্যের মতই ভোগ্য বস্তু মনে করা হত। যথেচ্ছ বিবাহ- তালাক, নারী হরণ ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে তাদের উত্তরাধিকার ছিলনা। পরিবারে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে কোথাও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিলনা। তাই জাহেলী যুগে আরবগণ কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলত। নব্য জাহেলী যুগে যেমনিভাবে মহিলাদেরকে ঘরের বাইরেও কাজ করিতে বাধ্য করা হয়, তেমনিভাবে ঘরের গার্হস্থ্য কাজ ছাড়াও তাদেরকে বাইরের কাজে তথা পশু পালন, দোহন, পশম ছাড়ানো ইত্যাদি কাজে কলুর বলদের মত খাটানো হত। এমনকি বেশ্যা বৃত্তি করে উপার্জনে বাধ্য করা হত। নারী জাতিকে এই অপমানকর দূঃখজনক পরিস্থিতি হতে সম্মানজনক অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ)। আল কোরানের নির্দেশ হল-“তারা তোমাদের জন্য অঙ্গাবরণ এবং তোমরা তাদের জন্য অঙ্গাবরণ স্বরুপ”। মহানবী (সঃ) বলেছেন “জান্নাত তোমাদের মায়ের পায়ের তলায়”। স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন “ তোমাদের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ, যারা আপন স্ত্রীদের কাছে শ্রেষ্ঠ”। কন্যা সন্তানের সম্মান উঁচু করে দিয়ে তিনি বলেন, “তোমাদের কেউ দুটি কন্যা সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে সৎপাত্রে পাত্রস্থ করলে তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের প্রতিশ্র“তি”। মোট কথা সমগ্র পাশ্চত্য ও প্রাচ্য ভুখন্ডে অধুনা সংগ্রাম করে নারীদের স্বাধীনতা ভোগের যে অধিকার আদায় করা হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশী গুনে নারী জাতিকে সম্মানিত করেছেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ)।
দাস প্রথার উচ্ছেদঃ
প্রাচীনকাল থেকেই গোটা আরব সহ পৃথিবীর অনেক দেশেই দাস প্রথা বিদ্যমান ছিল। সাধারণত পরাজিত গোত্র বা যুদ্ধ বন্দিদেরকে দাসে পরিণত করা হত। মনিবদের হাতে অকথ্য নিযার্তনই ছিল এদের প্রাপ্য। বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে মানবতার এ রকম অবমাননা বহুদিন যাবত চলে আসছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষ, ইউরোপ ও আমেরিকার সর্বত্র দাস প্রথার বিধান হিন্দু, খ্রীষ্টান ও আর্যদের কাছে বিধি সম্মত বলে স্বীকৃত ছিল। এক কথায় সম্ভ্রান্তদের আভিজাত্য রক্ষার জন্য উপরের স্তরের মানুষের সেবায় নীচের স্তরের মানুষের সেবা পশু সীমা ছাড়িয়ে গেলে ও তা বিহিত ছিল।
মহানবী (সঃ) নিপীড়িত এ দাসদের মুক্তির বাণী শুনিয়েছেন। মানুষের সমাজে মানুষ অমানুষিক যাতনা ভোগ করবে, এ হতে পারেনা। দাস প্রথার উচ্ছেদ কল্পে তিনি ঘোষণা করেছেন, “গোলামরাতো তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তায়া’লা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন সুতরাং তোমাদের উচিত, তোমরা যা খাবে, তাদেরকেও তাই খাওয়াবে। তোমরা যা পরিধান করবে, তাদেরকেও তাই পরিধান করাবে”। তিনি দাসদের উচ্ছ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বলেছেন, “কোন হাবশী গোলাম যদি (যোগ্যতার বলে) তোমাদের নেতৃত্ব পায় তবে তাকে মান্য করবে”। এ কেবল তাঁর মুখের কথাই ছিলনা, বাস্তবে প্রমাণ করে তিনি তা দেখিয়ে গেছেন। হযরত বেলাল এর মত হাবশী গোলালকে তিনি ইসলামের প্রথম মুয়ায্যিন নিয়োগ দিলেন। আযাদ কৃত দাস যায়েদ (রাঃ) এর ছেলে উসামাকে তিনি সেনাপতি পদে নিয়োগ করেছিলেন। মোটকথা বিশ্ব শান্তির কামনায় ক্রীতদাসদেরকে মানুষ্যত্বের মর্যাদাবোধে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি এক শান্তিময় সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
অমুসলিমদের প্রতি ব্যবহারঃ
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা সর্বাত্মক নিরাপত্তা সহকারে বাস করবে- এটাই ইসলামী বিধান। ইসলাম গ্রহণে কেউ তাদেরকে বাধ্য করতে পারবেনা। এমনকি তাদের দেব- দেবী, পুরোহিত ইত্যাদিকে গাল-মন্দ করা যাবে না। মহানবী (সঃ) বলেন, “তোমরা আল্লাহ ও রাসুল কে গালি দিও না, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, একজন মুসলিম কিভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে গালি দেবে? তিনি বললেন তোমরা তাদের উপাস্য কে গালি দিলে তারাও তোমাদের আল্লাহর ও রাসুল কে গালি দেবে”। তিনি ঘোষণা করেছেন, “অমুসলিমদের জান-মাল এবং আমাদের জান-মাল একÑ অভিন্ন।” তিনি আরো বলেন, “যে মুসলিম অমুসলিম (যিম্মি) কে সামান্য যুলুম করবে, তার বিরুদ্ধে আমি কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে অভিযোগ আনব।” ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে আজ বিশ্বে যে মারাত্মক সংঘাত সমস্যা-এসবই মহানবী (সঃ) এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব।
যুদ্ধ বন্দিদের প্রতি ব্যবহারঃ
জাহেলি যুগের সামরিক বিধান অনুযায়ী যুদ্ধ বন্দিদের নিধন বা দাসত্ব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হতো। মুসলিম তো যুদ্ধ করে শান্তির জন্য, রাজ্য দখল বা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নয়। যুদ্ধ করে যাদেরকে বন্দি হিসেবে আনা হলো তাদের সাথে উত্তম আচরণ করাই মানবতার দাবী। এ ব্যপারে মহানবী (সঃ) বলেছেন, “বন্দিদের সাথে তোমরা সৌজন্যমুলক আচরণ কর।” তার সুমহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বদরের অনেক যুদ্ধ বন্দি মুক্তি পাওয়ার পরে স্বেচছায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মক্কা বিজয়ের পর চিরশত্র“ কুরাইশদের প্রতি যে দয়া ও সহানুভূতির পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। ঐতিহাসিক গীবন বলেছেন,“ পদানত সমস্ত শত্র“কে ক্ষমা করে দিয়ে মুহাম্মদ (সঃ) যে ক্ষমাশীলতার আদর্শ স্থাপন করেছেন, জগতের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত নেই।
শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠাঃ
শ্রমিক পেটের দায়ে কাজ করে। পুঁজিপতিরা অনেক সময় সুযোগ বুঝে মেহনতী মানুষকে তার নুন্যতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন শ্রমিকদের দাবী আদায়ের অগ্রনায়ক। তিনি তাদের অধিকার রক্ষার্থে ঘোষণা করলেন, “তোমরা শ্রমিকদের মজুরি শোধ করে দিবে তাদের ঘাম শুকানোর আগেই।” তিনি আরো বলেন, “কেয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেককেই অধীনস্থদের সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে”। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন আমি একাধারে দশটি বছর নবী (সঃ) এর খেদমত করেছি, তিনি কখনো (ধমক দিয়ে) বলেননি ‘তুমি এ কাজটি কেন করলে বা এ কাজ কেন করনাই?’ কাপড় ধোয়া, বকরি দোহন করা ইত্যাদি সাংসারিক কাজে তিনি অপমান বোধ করতেন না। মসজিদে নববী নির্মাণকালে তিনি পাথর টানার কাজ করে, খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কাজে অংশ গ্রহণ করে, তিনি শ্রমের মর্যাদাকে উৎসাহিত করেছেন। এভাবে শ্রমের প্রতি তিনি সকলকে উৎসাহিত করেছেন এবং শ্রমিকের অধিকার আদায়ের জন্য সচেষ্ট থেকে বিশ্বে নজিরবিহীন আদর্শ স্থাপন করেন।
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল মুহাম্মদ (সঃ) সমগ্র মানব জাতির জন্য রহমত স্বরুপ প্রেরিত হয়েছেন। তিনি আদর্শ পিতা আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ স্বামী, আদর্শ মনিব, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ সেনাপতি, পথ প্রদর্শক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক। আল্লাহ তায়া’লা বলেন, “নিশ্চয় রাসুল (সঃ) এর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ।” আজ যখন ধর্মে ধর্মে হানাহানি, বর্ণে বর্ণে সংঘাত তখন মহানবী (সা.) এর সুমহান আদর্শ অনুসরণের আবশ্যকতা অনুভুত হচ্ছে তীব্রভাবে। বস্তুতঃ কেবল মাত্র তার আদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়েই এই অশান্ত বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে মানবতা, কাংখিত শান্তি ও সম্প্রীতি। তাই আসুন আমরা রাসুলের (সাঃ) আদর্শ শিখি এবং আদর্শ মোতাবেক জীবন গড়ি।
Comments (13)