হুমায়ুন আহমেদ
হুমায়ূন আহমেদকে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক বলা হয়। উনি কি শুধুই জনপ্রিয়? খেয়াল করে দেখবেন তার নামের আগে কখনো “শ্রেষ্ঠ " শব্দটা আসে না। তিনি তো শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি নাট্য নির্মাতা,নাট্য পরিচালক, চলচ্চিত্র পরিচালক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির প্রফেসর,গবেষক এবং একজন বিজ্ঞানীও!
তার সম্পর্কে আমাদের Elite বুদ্ধিজীবী, সাহিত্য সমালোচকরা বলেন হুমায়ূন আহমেদ সস্তা টাইপের লেখা লিখেন, যেন বাজারে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, যেন বইয়ের বিক্রি বেশি হয়, তার লেখায় সাহিত্যিক গভীরতা কম...... হেনতেন ইত্যাদি। একেকজনের সাহিত্যের গভীরতার সেন্স একেক রকম। হুমায়ূন আহমেদ সহজ সুন্দর ভাষায় লিখতেন যেটা পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটতো। বরং তার সহজ সরল ভাষাই তাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে।৷ হুমায়ূন আহমেদকে আমরা জনপ্রিয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি, তাঁর সাংস্কৃতিক প্রভাব ও অসাধারণ সৃষ্টিশীল ব্যাপ্তিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়নি।
আমরা অনেকেই হয়তো জানি বা জানিনা পুরো বিশ্ব সাহিত্যে হাতে গোনা কয়েকটা ঘটনা আছে যাদের সাহিত্য বা গল্পের কোনও একটা চরিত্রকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি হয়েছে এবং একসময় সেই কল্পিত চরিত্রের জন্য মানুষ মাঠে পর্যন্ত নেমে গেছে আন্দোলন করতে বা আবেগ প্রকাশ করতে। যেমন শার্লক হোমস চরিত্রের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল একবার শার্লক হোমস নিয়ে লেখা বন্ধ করে দিলেন। ইংল্যান্ডের মানুষ তখন তার বাড়ির সামনে আন্দোলন করা শুরু করল যেন মৃত শার্লক হোমস চরিত্রটি তিনি আবার ফিরিয়ে আনেন। ভক্তদের আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত আর্থার কোনান ডয়েল বাধ্য হলেন মৃত শার্লক হোমস চরিত্রটি আবার ফিরিয়ে আনতে! ভক্তদের নিয়ে সাহিত্যিকদের এ ধরনের ঘটনা আছে তবে সংখ্যায় খুব কম। আর বাংলা সাহিত্যে এই অভাবনীয় কান্ডটি ঘটিয়েছেন একমাত্র হুমায়ূন আহমেদ।
৯০ দশকের প্রথম দিকে তার “কোথাও কেউ নেই” নাটকের বাকের ভাই (যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর) চরিত্রটি ছিল এরকম একটা চরিত্র। এই গল্পটির নাটকের কাহিনী অনুযায়ী বাকের ভাই চরিত্রের ফাঁসির রায় হয়। কিন্তু বাকের ভাই চরিত্রটি সাধারণ মানুষের মনে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল, মানুষের আবেগে এতোটাই স্থান পেয়েছিল সারা বাংলাদেশে নাটকের কল্পিত চরিত্র বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে মিছিল সমাবেশ হয়!! চিন্তা করে দেখেছেন তার ক্ষমতাটা। কয়জন পারবেন নাটকের একটা কল্পিত চরিত্রের জন্য মানুষকে রাস্তায় নামাতে? আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এ ধারাবাহিক নাটকের শেষ পর্বের আগের দুই তিন দিন এদেশের প্রধান পত্রিকা গুলোর (তখন তো আর সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না) প্রধান খবর ছিল এটাই। বাকের ভাইয়ের কি ফাঁসি হবে? নাকি হবে না? নাকি বাকের ভাই মুক্ত হবে? যদি ফাঁসি হয়ে যায় তাহলে কি হবে! যেন কোনও বাস্তব চরিত্র নিয়ে কথা বলা হচ্ছে! ভক্তরা ক্ষেপে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বাসায় ইট পাটকেল মারা শুরু করল। বাকের ভাইয়ের ফাঁসি কিছুতেই মানা যাবে না। হুমায়ূন আহমেদও কম না। তিনি গোঁ ধরে বসে আছেন বাকের ভাইকে ফাঁসি তিনি দিবেনই। তার এক কথা তার উপন্যাসের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়। তাই ফাঁসি হবেই। স্যার আর্থার কোনাল ডয়েল ভক্তদের চাপে শার্লক হোমসকে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু হুমায়ুন সে ব্যক্তি নয়। সমস্ত ভক্তের রিকুয়েস্ট উপেক্ষা করে বাকের ভাইকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসি দিয়ে ছাড়লেন! নাটকটির শেষ পর্বের পরের দিন সমস্ত পত্রিকা গুলোর মন খারাপ! কারণ বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়ে গেছে! এটা আমার বানানো কোনও কথা নয়। যাদের ওই সময় জন্ম হয়নি বা খুব ছোট ছিল তারা এ ব্যাপারগুলো বয়স্ক মানুষদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন। তারপরও হুমায়ূন আহমেদকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থানটা দেয়া হলো না। আর তার জনপ্রিয়তা ভয়াবহ। সমস্ত দেশের মানুষ বসে থাকতো কখন হুমায়ুন আমাদের একটা নাটক শুরু হবে। তার ধারাবাহিক নাটক “এইসব দিনরাত্রি” “অয়োময়” “বহুব্রীহি” “কোথাও কেউ নেই” “আজ রবিবার” শুধু প্রচন্ড জনপ্রিয়ই ছিল না, ছিল এক নতুন ধাচের ক্লাসিক্যাল ইমেজ। বইমেলায় বই বের হলে বিদ্যুৎ,গ্যাস পানির বিলের মত লাইনে দাঁড়িয়ে তার বই কিনতে হতো। তার বই বিক্রির রেকর্ড তিনি নিজেই প্রতিবছর ভাঙ্গেন। আর অন্য লেখক সমালোচকরা হিংসায় কি একটা অবস্থা। কারণ তাদের বই তো এভাবে লাইন ধরে কেউ কিনছেনা! তাই আঙ্গুর ফল টকের মতো বলতেন এ সমস্ত সস্তা লেখায় পাবলিকরা যে কি পায়!! কিন্তু হিংসা করলে কি হবে শহরের অভিজাত ধনী থেকে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, গ্রামের দরিদ্র, সবার কাছেই হুমায়ুন খুব প্রিয়।
হুমায়ূন আহমেদ কি এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন?না, তার প্রভাব আরো ব্যাপক।
তিনি সৃষ্টি করেছিলেন "মিসির আলি" এবং “হিমু” নামের বিস্ময়কর দুই চরিত্র। দুটো চরিত্রই পাঠকের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়। মিসের আলী চলেন Logic দিয়ে। সবকিছু বিজ্ঞান, অবজারভেশন, গোয়েন্দাদের মতো দেখেন। অনেকটা সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা এবং স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের মতো। অন্যদিকে হিমু ঠিক তার বিপরীত, anti logic চরিত্র। হিমুর আছে এক বিশেষ ঐশ্বরিক ক্ষমতা যা বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। হিমু পথে পথে ঘুরে বেড়ায় হলুদ পাঞ্জাবি, প্যান্ট আর খালি পায়ে। এই হিমু চরিত্রটি বিস্ময়কর প্রভাব ফেলে এদেশের কিশোর, তরুণ,যুবকদের কাছে। সবাই হিমু হতে চায়। সেই প্রভাবে কিশোর তরুণরাও হলুদ পাঞ্জাবি পড়া শুরু করল। ঢাকা সহ সারা দেশে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে এক ঝাঁক কিশোর, কিশোরী, তরুণ, তরুণী বইমেলায় বা অন্য কোনও ফাংশনে একসাথে হলুদ পাঞ্জাবি,প্যান্ট আর খালি পায়ে পথে পথে হাঁটছে আর বলছে আমরা হিমু! যে চরিত্রের কোনো অস্তিত্বই নাই তার জন্য এদেশের তরুণ যুবকদের কি আবেগ! কয়জন লেখক দেখাতে পারবেন তার লেখা দিয়ে এরকম উদাহরণ সৃষ্টি করেছে? হুমায়ূন আহমেদ বাকের ভাই এবং হিমু, দুইটা চরিত্রের জন্য পাবলিককে মাঠে বা রাস্তায় নামিয়েছেন। কি ক্ষমতা তার লেখনীর! দুইটা চরিত্রের জন্য এরকম মানুষ আবেগে রাস্তায় নেমে পড়েছে এ ধরনের ঘটনা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল।
হুমায়ূন আহমেদ কি এই পর্যন্তই বিস্তৃত? না তো আরো আছে! তিনি সৃষ্টি করেছেন জরি,পরি, রুপা নারী চরিত্র। সবচেয়ে বিখ্যাত রুপা চরিত্রটা। কিশোর তরুণরা রুপার জন্য পাগল। রুপার মতো কারো সাথে প্রেম করার মজাই আলাদা! হুমায়ূন আহমেদের পরিধি আরো বিস্তৃত।
সাধারণত সাহিত্যিকরা আর্টস বা সোশ্যাল সায়েন্সের ছাত্র হয়। এটা সর্বক্ষেত্রে সত্য নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা যায় সাহিত্যিকরা আর্টস ব্যাকগ্রাউন্ড হয়। কিন্তু হুমায়ুন ছিলেন বিজ্ঞানের অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। বোর্ডে স্ট্যান্ড করা হুমায়ুন তার সাহিত্যে অসাধারণভাবে বিজ্ঞান, সাইন্স ফিকশন এনেছেন। একটা অসাধারণ বিজ্ঞানী চরিত্রও সৃষ্টি করলেন। তার নাম “ফিহা” যে একজন পদার্থবিজ্ঞানী।এই বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় সময়, স্থান, কাল। ফিহা চরিত্রটি হিমু, মিসির আলীর মত এতো পরিচিত নয় তবে খুব কমও নয়। বিজ্ঞান নিয়ে তার সাইন্স ফিকশন উপন্যাসগুলো পড়লে আপনি থমকে যাবেন! তার ফিহা সমীকরণ, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, অনন্ত নক্ষত্র বিথী, এই জাতীয় বইগুলো পড়লে ভাবতে বাধ্য হবেন একজন সাহিত্যিক কিভাবে এতো সুন্দরভাবে বিজ্ঞান এবং সাহিত্যকে একসাথে connect করে। এরপরেও হুমায়ুন শ্রেষ্ঠ নন!! হুমায়ূন খুব জনপ্রিয় এই আর কি!
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার অত্যন্ত উচ্চমানের অনেক গল্প, নাটক, উপন্যাস, সিনেমা আছে। বাংলাদেশে একটা সময় ছিল যখন ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বলা যেত না। কেউ মিডিয়ায় ভারতের বিরুদ্ধে পারতপক্ষে কিছু বলতোনা। বললেই অনেক সমস্যা। ঠিক একই ভাবে আশির দশকের শেষে ৯০ এর দশকে এরকম একটা সময় ছিল যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কিছু বলা যেত না। একটাই টিভি চ্যানেল ছিল। বিটিভি। সেখানে পাকিস্তানের সাথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এটাও বলা যেত না। পাকিস্তান নামের বদলে বলতে হতো “হানাদারবাহিনী!!” রাজাকার শব্দটা বলা যেত কিন্তু খুব সীমিতভাবে। এরকম একটা সময়ে হুমায়ূন আহমেদ এক অভিনব উপায়ে রাজাকার শব্দটি জনপ্রিয় করলেন। তিনি তার অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক “বহুব্রীহি ” তে একটা টিয়া পাখির মুখ দিয়ে “তুই রাজাকার” কথাটি বলালেন। এখন যেটাকে বলে ভাইরাল হয়ে যাওয়া, তার এই টিয়া পাখির মুখ দিয়ে “তুই রাজাকার” কথাটি সারা বাংলাদেশে ভাইরাল হয়ে যায়। পাবলিকের মুখে মুখে তুই রাজাকার কথাটি। আজকে আমরা এত যে রাজাকার রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করি এটি জনপ্রিয় করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ুন রাজাকার শব্দটি আবিষ্কার করেননি কিন্তু শব্দটিকে জনপ্রিয় করেছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদ একজন বিজ্ঞানীও। কথাটা একটু অদ্ভুত শোনালেও কথাটা পুরনো এবং সত্য। এটা তিনি তার নিজের বইতেই লিখেছিলেন (এই বইটার নাম আমার মনে নাই, সম্ভবত “এই আমি” বা “হোটেল গ্রেভার ইন”,মোট কথা তার আত্মজীবনীমূলক যে বইগুলো আছে সেখানে আছে)। আমেরিকায় পিএইচডি করার সময়ে রসায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আবিষ্কার করেন। তার প্রফেসর খুশি হয়ে তাকে নিয়ে যান বিশ্ব রসায়নবিদদের সম্মেলনে। সেখানে অনেক নোবেল লরিয়েট হুমায়ুনকে তার আবিষ্কারের জন্য অভিনন্দন জানান।
এত সর্বময় গুণের অধিকারী এই মানুষটিকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান
দেওয়া হয় না!
হুমায়ূন আহমেদের কি সমালোচনা,ভুল কাজ নেই? হা আছে, অনেক আছে, অবশ্যই আছে। তাকে নিয়ে সমালোচনা করার মতো অনেক কাজই আছে। পৃথিবীতে একমাত্র ধর্মীয় প্রফেট ছাড়া অখ্যাত, বিখ্যাত,প্রখ্যাত, সাধারণ মানুষ সবার জীবনেই অনেক ভুল, সমালোচনা, পাপ আছে। হুমায়ূন আহমেদ সবার মতোই রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। তাই তার জীবনে ভুল সমালোচনা পাপ কেন থাকবে না?
হুমায়ূন আহমেদ ইতিহাসের অংশ নয়।তিনি নিজেই একটা ইতিহাস। তারপরেও উনি শ্রেষ্ঠ নন, শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে আছে রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সত্যজিৎ রায় –এরা সবাই শ্রেষ্ঠ কোনও সন্দেহ নেই। হুমায়ূন আছেন তবে শ্রেষ্ঠত্বে নয় জনপ্রিয়তায়!!
কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা আসোলেই কেমন যেন। ঐদিন একটাকে দেখলাম বলছে অশিক্ষিত ফেসবুকার!
মানে হচ্ছে সেই সত্যিকারের শিক্ষিত! সবার চেয়ে বেশি বুঝে!!
আমাদের Elite বুদ্ধিজীবী সমাজ এবং সাহিত্য সমালোচক গোষ্ঠী অনেকটা যেন এই টাইপ। এরা অনেক শিক্ষিত এবং সবার চেয়ে বেশি বুঝে! উনারা হুমায়ুনের জনপ্রিয়তার জন্য হুমায়ুনকে অনেক সম্মান দিয়েছেন এটা ঠিক কিন্তু যেটা করা হয়েছে সেটা হলো অনেক শ্রেষ্ঠ কাজ করলেও তাকে শ্রেষ্ঠ বানানো হলো না। আমাদের elite ক্লাসের বুদ্ধিজীবী এবং সাহিত্য সমালোচকরা কেন হুমায়ূন আহমেদকে জনপ্রিয় বলেছেন কিন্তু শ্রেষ্ঠ স্থানটা দেয়নি সেটা আমার মতো সাধারন পাঠকের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। তবে প্রশ্ন জাগে শ্রেষ্ঠ হতে আর কি কি গুণ লাগে?!
Comments (1)