ফেরাউনরা তো বনী ইসরাইল তথা ইহুদিদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করেছিল তবুও কেন মুসলমানরা ফেরাউন নামক শব্দটিকে ঘৃণা করে? হয়তো বলবে- হযরত মুসা (আ.)-এর কথা। কিন্তু বনী ইসরাইল তথা ইহুদীরা মুসা নবীর উম্মত, তাহলে ইহুদীদের কেন মুসলমানরা ঘৃণা করে? হয়তো বলবে- ইহুদীরা মূল ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাই আল্লাহ লানত দিয়েছে বলে ঘৃণা করে। যদি তাই হয় তাহলে বনী ইসরাইল তথা ইহুদীরা ধর্মের মূল বিষয় থেকে কি বিচ্যুত হয়েছে? হয়তো বলবে- তাদের নিষেধ করা হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ কাউকে না ভাবা, কিন্তু তারা ভেবেছে। তাদের নিষেধ করা হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার নামে অযথা কসম করো না, কিন্তু তারা করে। বিশ্রামবারে পবিত্রভাবে পালন করতে, কিন্তু তারা করে না। পিতামাতাকে সম্মান করতে বলা হয়েছিল কিন্তু তারা করে না, নরহত্যা করার জন্য নিষেধ করা হয়েছিল কিন্তু তারা নরহত্যা করে। ব্যভিচার করতে নিষেধ করা হয়েছিল কিন্তু তারা ব্যভিচারে লিপ্ত। চুরি না করার জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু তারা চুরি করে। মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু প্রতিনিয়ত মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়। অন্যের সম্পদ হরণ না করার জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু তারা অন্যের সম্পদ দখল করে। নারীর প্রতি লোভ করতে নিষেধ করা হয়েছিল কিন্তু তারা নারীর প্রতি লোভী, তাই তারা এইভাবে তাওরাতের অবমাননা করার কারণে আল্লাহ তাদের লানত দিয়েছিলেন বলে বনী ইসরাইলকে ঘৃণা করে। কিন্তু বনী ইসরাইল তথা ইহুদীদের যা যা করতে বলা হয়েছে বা নিষেধ করা হয়েছে তা তো বর্তমান মুসলিম সমাজের চরিত্রে সম্পূর্ণ বিদ্যমান। যেমন- সৃষ্টিকর্তার সমকক্ষ কাউকে ভাবা নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু অনেকেই যাকে তাকে শহীদ বলে, কাফের বলে, মোরতাদ বলে এবং কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী তা তারা ঠিক করে, অথচ এইসবের একমাত্র এখতেয়ার একমাত্র আল্লাহর। এইরকম সবকাজেই বনী ইসরাইল তথা ইহুদীদের মত পাকিবাঙ্গুরা করে যাচ্ছে, তাহলে তারা কি মূল ইসলাম ধর্ম থেকে বিচ্যুত নয়? ইহুদিরাও ধর্ম কর্ম করে নিজেদের ধার্মিক মনে করে, যেমনটা বর্তমান মানুষরা নিজেদের ধার্মিক মনে করে কিন্তু প্রকৃত ধর্মীয় জ্ঞান চর্চা করে না। কারো ধর্ম বা সম্প্রদায় বা ব্যক্তি নিয়ে ঘৃণা করার আগে নিজের চরিত্রের বিচার করা প্রত্যেকটা মানুষের জন্য অত্যাবশ্যক।
জেনে রাখা ভালো- ঈশ্বর হযরত মুসা (আ.)-কে পর্বতের চূড়ায় আহ্বান করেন এবং সেখানে বনি ইসরাইলদের(ইহুদী) জীবন পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে 'দশটি আদেশ' (দুটি পাথরের ফলকে লিখিত) প্রদান করেন। দশটি আদেশের মূল কথা: ১. একমাত্র এক ইলাহ ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা, ২. কোনো প্রকার মূর্তি বা প্রতিমা পূজা না করা, ৩. ইলাহ নাম বৃথা বা অপব্যবহার না করা, ৪. বিশ্রামবার (Sabbath) পবিত্রভাবে পালন করা, ৫. পিতামাতাকে সম্মান করা, ৬. নরহত্যা না করা, ৭. ব্যভিচার না করা, ৮. চুরি না করা, ৯. মিথ্যা সাক্ষ্য না দেওয়া, ১০. অন্যের সম্পদ বা স্ত্রীর ওপর লোভ না করা।
উপরের বিষয়বস্তু থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে মুসা নবীর উম্মত ইহুদীদের উপর আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এইসব কারনে নাসারা ধর্ম তথা খৃস্টান থেকে আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রেরন করেছেন। আর ইসলাম ধর্ম সেদিন বিলুপ্ত হবে যেদিন ঐসব বিষয়বস্তু থেকে মুসলামান বিচ্যুত হবে। প্রশ্ন রেখে গেলাম- উপরের বিষয়বস্তুগুলো থেকে কি পাকি বাঙ্গু ধর্মব্যবসায়ী ও তাদের লোক দেখানো অনুসারীরা বর্তমানে বিচ্যুত নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বর্তমান সমাজের তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ীদের দিকে তাকালে তাদের চরম দ্বিচারিতা অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা মুখে ধর্মের বাণী ছড়ায়, কিন্তু তাদের নিজেদের জীবন গড়ে ওঠে অধর্ম, লোভ আর শোষণের ওপর। অতীত ইতিহাসের অন্যায়কারী বা অন্য ধর্মের অনুসারীদের পাপের হিসাব মেলাতে তারা বেশ পারদর্শী, কিন্তু নিজেরা যে প্রতিনিয়ত ধর্মের নীতিগুলো বিক্রি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে- সেটা যেন তাদের চোখেই পড়ে না। ধর্মের পবিত্রতাকে পুঁজি করে তারা নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়, অথচ ধর্মীয় আদর্শের মৌলিক সত্যগুলো নিজেরা পালন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও তারা কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে- তা নিজেরাই ঠিক করে দেয়। স্রষ্টার নাম ভাঙিয়ে মানত ও ঝাড়ফুঁকের ফাঁদ পেতে টাকা হাতিয়ে নেয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্বলতার সুযোগে মিথ্যার পসরা সাজায়। ওয়াজ-নসীহতে হারাম বর্জনের বুলি ফুটালেও নিজেদের ব্যবসা ও লেনদেনে ঘুষ, দুর্নীতি এবং চুরির মাধ্যমে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে। পবিত্রতার পোশাকের আড়ালে গোপনে ব্যভিচার ও অনৈতিকতায় লিপ্ত হয়, আবার প্রতিপক্ষকে দমাতে হরহামেশাই মিথ্যা অপবাদ ও গীবত ছড়ায়। মুখে পিতামাতার হকের কথা বললেও নিজের বৃদ্ধ পিতামাতাকে অবহেলা করে এবং সামাজিক স্বার্থে সম্পর্কের ইতি টানে। এমনকি ইসলামের মূল শিক্ষা না বুঝেই সমাজে সহিংসতা, দাঙ্গা ও নরহত্যা উসকে দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে। মূলত শাস্ত্রের মৌলিক দশটি আদেশ ও নৈতিকতাকে তোয়াক্কা না করে কেবল অন্ধ আবেগ ছড়িয়ে মানুষকে মূর্খ বানিয়ে রাখাই এদের মূল কাজ। এই চরম কপটতা, অজ্ঞতা ও ভণ্ডামিই আজ সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে।
অথচ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো সম্প্রদায় যখনই ধর্মের মূল নির্যাস- যেমন সততা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ বাদ দিয়ে কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, অহংকার এবং ধর্মকে স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানায়, তখনই তাদের চূড়ান্ত অবক্ষয় ঘটে। বনি ইসরাইলদের বিচ্যুতি কোনো একক জনগোষ্ঠীর অতীত ইতিহাস মাত্র নয়, বরং তা যেকোনো যুগের মানুষের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। ধর্ম যখন আত্মশুদ্ধির পথ না হয়ে অন্যকে হেয় করার, জান্নাত-জাহান্নামের সার্টিফিকেট বিলানোর বা সামাজিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তি পুরোপুরি ধসে পড়ে।
সুতরাং, অন্যের বিচ্যুতি বা ত্রুটি খুঁজে বের করে বিচারকের আসনে বসার আগে নিজের ভেতরের চরিত্র ও নৈতিকতা পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ছিল সর্বদা নিজের ভুল সংশোধনের দিকে নজর দেওয়া। ধর্মকে ব্যবসা বা বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যম না বানিয়ে যদি তাওহীদের মূল নৈতিক দিকগুলো বাস্তব জীবনে লালন করা না হয়, তবে তা হবে স্পষ্ট নৈতিক দেউলিয়াত্ব। নিজেদের ভেতরের এসব বিচ্যুতি দূর না করে কেবল মুখে নিজেদের শ্রেষ্ঠ বা ধার্মিক দাবি করা কোনো জাতিকে কখনো মুক্তি দিতে পারে না এবং ধার্মিকও হতে পারে না।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.