ধর্মের মূল চেতনা যেখানে মানুষকে সত্য, ন্যায় এবং আত্মশুদ্ধির আলো দেখায়, সেখানে আজ আমাদের সমাজে ধর্মের কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে আঁকড়ে ধরে তার মূল নীতি ও নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার এক কদর্য প্রতিযোগিতা চলছে। বাহ্যিক ধার্মিকতার আড়ালে নিজেদের চরিত্রহীনতা, অন্যের হক হরণ এবং সীমাহীন সামাজিক বৈষম্য ঢেকে রাখার এই ধৃষ্টতা কেবল ধর্মীয় চেতনারই অবমাননা নয়, বরং একটি পুরো জাতির বিবেককে দেউলিয়া করে দেওয়ার সামিল। যখন কোনো সমাজে সত্য কথা বলা বা ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোকে ঢালাওভাবে ‘নাস্তিকতা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয় এবং ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে নিজস্ব হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করা হয়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সেই সমাজের নীতি-নৈতিকতার পচন কতটা গভীরে পৌঁছেছে। বর্তমান বাস্তবতায় ধর্মের অপব্যবহার, সামাজিক চরম দ্বিমুখী নীতি এবং ঐতিহাসিক সত্যকে সরাসরি অস্বীকার করার এই করুণ চিত্রই আজ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে।

আমাদের সমাজে ‘নব্বই ভাগ মুসলমানের দেশ’ বলে যে উচ্চকণ্ঠ এবং গর্বিত দাবি প্রতিনিয়ত শোনা যায়, তার অন্তরালে মূলত লুকিয়ে আছে চরম এক সামাজিক অজ্ঞতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ ইসলাম ধর্মের মৌলিক জ্ঞান এবং সঠিকভাবে ইবাদত পালনের মূল নিয়মকানুন সম্পর্কে একেবারেই অসচেতন। সহীহ ও শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত করা, সালাতের মৌলিক নিয়মকানুন জানা, সঠিক নিয়মে যাকাত প্রদান কিংবা সিয়াম সাধনার মতো মৌলিক ইবাদতগুলো নিখুঁতভাবে শেখার বিন্দুমাত্র সদ্বিচ্ছা বা প্রচেষ্টা অধিকাংশের মধ্যেই দৃশ্যমান নয়। বহু মানুষের কাছে ধর্ম পালনের অর্থ দাঁড়িয়েছে কেবল লোকদেখানো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরবানি এলে হাটে গিয়ে লাখ টাকায় গরু কেনার অন্ধ প্রতিযোগিতা আর সামর্থ্য হলে বারংবার সৌদি আরব সফর করে নিজেকে ধর্মানুরাগী হিসেবে জাহির করা। অথচ ইসলাম যে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং এতে অন্যের হক নষ্ট করা, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো কিংবা চোগলখোরি করার মতো অপরাধের কারণে ইবাদত কবুল হয় না, সে বিষয়ে তাদের ন্যূনতম কোনো ধারণা বা অনুশোচনা নেই। ধর্মের আসল শিক্ষা অনুধাবন না করে কেবল অন্ধ আবেগ আর পরশ্রীকাতরতাকে সম্বল করে অন্যদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠাই যেন এদের মূল আচরণে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা ও চরম সামাজিক ট্র্যাজেডি ঘটে তখন, যখন কোনো সচেতন বা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এই অন্ধ সমাজকে তাদের ধর্মীয় ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে যায়। নিজের গভীর দোষ ও অজ্ঞতা ঢাকার জন্য সমাজপতি ও নামধারী ধর্মানুরাগীরা সঙ্গে সঙ্গে সেই সমালোচককে ‘নাস্তিক’ তকমা দিয়ে জনসম্মুখে হেয় করার চেষ্টা করে। অথচ নাস্তিকতার প্রকৃত সংজ্ঞা কিংবা সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাসের দার্শনিক রূপ সম্পর্কে এই বিচারকদের নিজেদের ধারণাও সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায়। বংশপরম্পরায় বা কেবল জন্মসূত্রে কোনো ধর্মীয় পরিচয় বহন করলেই যে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকৃত আস্তিক বা খাঁটি ধর্মীয় অনুসারী হয়ে যায় না, এই সত্যটি তাদের অনুধাবনের বাইরে। নামমাত্র পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য ধর্মের মানুষের প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করা এবং নিজের প্রতিটি অন্যায় ও অপরাধ ঢাকতে ধর্মের পবিত্রতাকে অপব্যবহার করাই যেন এ সমাজের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্মকে তারা নিজেদের সামাজিক অন্যায়, পারিবারিক কলুষতা এবং ব্যক্তিগত পাপ ঢেকে রাখার শক্ত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, অথচ অন্তরের প্রকৃত আত্মশুদ্ধি বা চরিত্র গঠনের কোনো নামগন্ধও সেখানে থাকে না।

ধৰ্মীয় ভণ্ডামি এবং এই নৈতিকতার ভয়াবহ স্খলন আজ সমাজের প্রতিটি স্তরে বিষবৃক্ষের মতো ডালপালা মেলেছে। যেখানে একশ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ী নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল করতে ধর্মের ভুল ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে নানা অরাজকতা, বিদ্বেষ ও অন্যায়কে জায়েজ করার চেষ্টা করে, সেখানে সমাজে খুন, চুরি, রাহজানি, চরম সুদ, ঘুষের লেনদেন, জেনা ও পরকীয়ার মতো ঘৃণ্য কাজগুলো নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সামান্য বিঘা বা শতক জমিজমার লোভ সংবরণ করতে না পেরে নিজের ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রঞ্জিত হওয়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার কিংবা অন্যের ন্যায্য অধিকার হরণ করে রাতারাতি ধনকুবের বনে যাওয়া- এসব পাপাচার ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কোনো ধর্মই সমর্থন করে না। অথচ এই সমাজেই মানুষ রাতে পরম নিশ্চিন্তে অনৈতিক কাজ ও নেশায় বুঁদ হয়ে থেকে পরদিন সকালে উঠে ধর্মের বুলি আওড়ায়। তারা ভারতকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অহরহ বিষোদগার ও জঘন্য গালাগাল করলেও নিজেদের পারিবারিক উৎসব বা বিয়ের আসরে হিন্দি গান ছাড়া বিনোদন খুঁজে পায় না। বেশ্যাবৃত্তিকে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে আবার নিজেরাই রাতের অন্ধকারে নানা পাপাচারের আখড়ায় লিপ্ত হয়, আর সকাল হলেই চায়ের দোকানে বসে অন্যের ঘরের নারী বা প্রতিবেশী পরিবার নিয়ে গিবত, মিথ্যা অপপ্রচার ও কুৎসায় মেতে ওঠে। নিজের যাবতীয় পাপাচার ও চরিত্রের কলঙ্ক ঢেকে রেখে অন্যের পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ঢালাওভাবে ফতোয়া দেওয়ার এই দ্বিমুখী মানসিকতা চরম মূর্খতা ও সামাজিক ব্যাধি ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইসলাম ধর্মের মূল অনুশাসনে যেমন নারীর শালীনতা ও মর্যাদার নির্দেশ রয়েছে, তেমনি পুরুষদের জন্যও নিজের দৃষ্টি সংযত রাখার কঠোর ও সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু এই চরম দ্বিমুখী সমাজ কেবল নারীর পোশাক ও চলাফেরার ওপর ফতোয়া জারি করতেই দিনরাত ব্যস্ত থাকে, আর নিজেরা ক্রমাগত চোখের ও মনের জঘন্য ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে। প্রকৃত ধর্মীয় অনুশাসন এবং সৃষ্টিকর্তার স্পষ্ট আদেশ-নিষেধ পূর্ণাঙ্গভাবে না মেনে, সমাজে প্রতিনিয়ত নানা বেদাত আর বাতিল প্রথাকে দ্বীনের অংশ বানিয়ে যারা ধর্মকে অপমান করছে, তারাই আজ পরম সুখে সমাজপতি ও ধর্মের একক রক্ষক সেজে বসে আছে। অথচ মহান সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার না করে সমাজকে তাদের ভুল, কুসংস্কার ও ভণ্ডামিগুলো ধরিয়ে দেওয়া কোনো অবস্থাতেই নাস্তিকতা নয়; বরং তা সত্যের পাতাকাকে উঁচিয়ে ধরার পরম দায়িত্ব। বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ যেখানে প্রতিদিন ধর্মে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বহু কাজে লিপ্ত, সেখানে তারা নিজেদের অপরাধ আড়াল করে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে অন্যের নৈতিকতা নিয়ে বিচারক সেজে বসাটা চূড়ান্ত ও জঘন্য ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

একইভাবে এই দেশে ধর্মীয় ভণ্ডামির পাশাপাশি একশ্রেণীর মানুষের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভণ্ডামিও চরম ও জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মানসিকতার কিছু বিকৃত গোষ্ঠী আজও জিন্নাহ এবং শোষক পাকিস্তানের গুণগানে অন্ধ ও ব্যস্ত হয়ে আছে। তাদের আজব দাবি, জিন্নাহ যদি দ্বিজাতি তত্ত্ব না দিতেন, তবে নাকি এই অঞ্চলের আশি শতাংশ মুসলমান চিরতরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত, নির্যাতিত হতো, ধর্ষিত হতো এবং না খেয়ে মারা যেত। অথচ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তব সত্য হলো, বর্তমান পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার চেয়েও বহুগুণ বেশি- প্রায় ২৫ কোটি মুসলমান- আজও ভারতে পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করছেন। যদি তথাকথিত পাকিস্তান কেবল মুসলমানদের চিরন্তন সুরক্ষার জন্যই তৈরি হয়ে থাকত, তবে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ নিরপরাধ বাঙালি মুসলমানকে তারা নির্মমভাবে গণহত্যা করলো কেন এবং আমাদের লাখ লাখ মা-বোনকে কেন নির্যাতন করলো? কেবল তা-ই নয়, আজ পর্যন্ত তারা নিজেদের দখলে রাখা আজাদ কাশ্মীর কিংবা বেলুচিস্তানের মুসলমানদের মৌলিক মানবাধিকার না দিয়ে সেখানে প্রতিদিন হত্যা, গুম ও অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, এমনকি আফগানিস্তানের মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে অগণিত নারী-শিশুকে হত্যা করছে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার দীর্ঘ পাঁচ দশক পর আজও যাদের মনে এই অন্ধ ও ঘৃণ্য পাকি-প্রেম জাগ্রত থাকে, তাদের এই স্বাধীন ভূখণ্ডে বসবাসের কোনো ন্যূনতম নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার থাকতে পারে না। যেই পাকিস্তান আজ পুরো বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক ভিক্ষুকের দেশ হিসেবে পরিচিত এবং চরম রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনায় নিমজ্জিত, সেই একটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রতি এদেশের কিছু মানুষের এই বিকৃত ভালোবাসার মূল কারণ হলো ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত চেতনার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

ধর্মের নামে ছদ্মবেশী ভণ্ডামি, বিচারহীন অন্ধ আবেগ এবং মিথ্যা কাল্পনিক ইতিহাস প্রীতির ওপর ভর করে কোনো জাতি কখনো বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। জীবনের মূল আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক শিক্ষা ছাড়া কেবল নামমাত্র ধর্মীয় পরিচয় বহনের ভান করে কিংবা বাহ্যিক পোশাকের আড়ালে নিজেদের ভেতরের নৈতিক স্খলনকে কখনো চিরতরে লুকিয়ে রাখা যায় না; বরং এই ভণ্ডামি সমাজকে আরও গভীর অন্ধকার ও বিনাশের দিকে ঠেলে দেয়। একইসাথে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ও রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে একটি ব্যর্থ, দেউলিয়া ও শোষক দর্শনের প্রতি অন্ধ মোহ প্রদর্শন করা কেবল চরম রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনাই প্রকাশ করে। তাই আজ একটি সুস্থ, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন, বৈষম্যহীন ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে ধর্মকে লোকদেখানো প্রচারণার বা স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার না বানিয়ে তার আসল নৈতিক শিক্ষা- যেমন পরম সততা, পরমতসহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ব ও ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি- জীবনের সর্বস্তরে চর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজ থেকে ধর্মের নামে চলা এসব ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করা এবং যেকোনো মূল্যে সত্যকে সত্য বলাটাই হোক আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের প্রধান অঙ্গীকার।