সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। মেঘ জমেছে দিগন্তজুড়ে, অথচ বৃষ্টির কোনো দেখা নেই। বাতাসে জলীয় বাষ্পের ভার, চারদিকে অসহ্য গরম। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও যেন আগুনের হলকা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।

তবু ঘরের মধ্যে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না মেঘলার। পুরোনো কাঠের আলমারি থেকে অসমাপ্ত নকশিকাঁথাটা বের করে বারান্দায় এসে বসল সে। রঙিন সুতোয় ফুটিয়ে তুলতে লাগল ফুল, পাতা আর ছোট ছোট পাখির নকশা।

কাঁথাটার একপাশে একটা শিউলি ফুলের গাছ আঁকা হয়েছে। তার নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি পাখি। পাখি দুটির একটি নীল, অন্যটি সাদা। মাঝখানে ফাঁকা জায়গা। সেখানে কী আঁকবে, অনেক দিন ধরেই ভেবে উঠতে পারেনি মেঘলা।

জীবনের অনেকটা সময় কেটে গেছে তার। অথচ নিজের জন্য দেখা স্বপ্নগুলো আজও অসমাপ্ত। একসময় ভেবেছিল, ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে সে নিজের মতো একটা পৃথিবী সাজাবে। ছোট্ট সংসার হবে, বিকেলবেলা বারান্দায় বসে চা খাবে, ছুটির দিনে দুজনে কোথাও বেড়াতে যাবে।

স্বপ্নগুলো খুব বড় ছিল না।

কিন্তু জীবনে কিছু কিছু স্বপ্ন আছে, যেগুলো পূরণ না হলেও মানুষকে সারা জীবন তাড়া করে বেড়ায়।

মেঘলার জীবনেও তেমন কিছু স্বপ্ন ছিল।

—মেঘলা! ও মেঘলা, একটু রান্নাঘরে আয় তো মা!

মায়ের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল সে।

—কী হয়েছে, মা?

—এই শাকগুলো একটু বেছে দে তো। রান্না করতে হবে।

মেঘলা আকাশের দিকে তাকাল।

—এমন গরমের মধ্যে আবার শাক রান্না করবে? বৃষ্টি তো দূরের কথা, বাতাসটুকুও নেই।

মেয়ের কথা শুনে রওশন আরা মুখ তুলে তাকালেন।

—বৃষ্টি হবে কি না, সেটা আকাশ জানে। তুই শাক খেতে ভালোবাসিস, তাই বাজার থেকে এনেছি। না হয় থাক, রাঁধতে হবে না।

মেঘলা আর কথা বাড়াল না। ছোট্ট টুলটা টেনে নিয়ে শাক বাছতে বসল।

শাকের নরম ডগা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পুটপুট শব্দ হচ্ছিল। পাশে চুলার ওপর কড়াই বসিয়ে খুন্তি নাড়ছিলেন রওশন আরা। মাঝেমধ্যে আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।

মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে আছে। মুখে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অভিমান নেই। অথচ এই নীরব মুখটার আড়ালে কতখানি কষ্ট জমে আছে, তা মা হয়ে বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয় না।

এই বয়সে মেয়ের স্বামী-সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা। ঘরে ফিরলে হয়তো স্বামী দরজা খুলে দেবে, একটু দেরি হলে অভিমান করবে, কখনো দুজনে ঝগড়া করবে, আবার রাতের খাবারের টেবিলে সব মিটেও যাবে।

অথচ তাঁর মেয়েটা এখনো মা-বাবার সংসারে বসে শাক বাছে।

রওশন আরার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস চাপতে গিয়ে নিজেই বুঝতে পারলেন, সেটা চাপা থাকল না।

ঠিক তখন পাশের ঘর থেকে স্বামীর কণ্ঠ ভেসে এল—

—রওশন, কোথায় গেলে?

কণ্ঠে সেই চেনা মায়া। এত বছর সংসার করার পরও মানুষটার ডাক শুনলে তাঁর মনটা কেমন নরম হয়ে যায়।

—এই তো রান্নাঘরে। কী হয়েছে?

—এক কাপ চা দিতে পারবে? একটা লেখা শেষ করছি। চা না খেলে মাথাটা কাজ করছে না।

রওশন আরা হেসে ফেললেন।

—এই বয়সেও তোমার চায়ের নেশা গেল না! দুপুর হয়ে গেছে, ভাত খাবে না?

—খাব তো। আগে চা দাও।

—ঠিক আছে। তবে আধঘণ্টার মধ্যে উঠে আসবে।

—আচ্ছা, ম্যাডাম।

স্বামীর কথায় মৃদু হেসে ফেললেন রওশন আরা।

মানুষটার সঙ্গে কত বছর কাটিয়ে দিলেন! সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটন, অসুখ-বিসুখ—সবকিছুর মধ্যেও একটা জিনিস কখনো বদলায়নি। মানুষটা তাঁকে সম্মান করতে জানে, তাঁর অভিমান বুঝতে পারে। সংসারে টাকা কম ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না।

এই মানুষটার পাশে বসে জীবনের শেষ বিকেলগুলো কাটিয়ে দেওয়ার স্বপ্নই তো দেখেছিলেন তিনি।

মেয়ের জীবনটাও যদি এমন হতো!

কিন্তু ভাগ্য বোধহয় সবার জন্য একই রকম গল্প লেখে না।

মেঘলার বাবা আবদুল কাদের একসময় ফরিদপুরের একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে বহু ছাত্রছাত্রীকে মানুষ করেছেন। নিজের প্রয়োজনের চেয়ে ভাইবোনদের প্রয়োজনকে বড় করে দেখেছেন সব সময়। ছোট ভাইদের পড়াশোনা, বোনদের বিয়ে, আত্মীয়স্বজনের বিপদ—যেখানে পেরেছেন, নিজের সাধ্যমতো সাহায্য করেছেন।

অনেকে বলত, কাদের সাহেব মানুষ হিসেবে অসাধারণ। কিন্তু সংসার চালানোর হিসাব করতে গেলে তাঁর উদারতাই একসময় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াত।

জীবনে ভালো উপার্জন করেছেন, কিন্তু সঞ্চয় করতে পারেননি। অবসরে যাওয়ার পর পেনশনের টাকা আর গ্রামের কিছু জমির আয় দিয়ে সংসার চলে। তার ওপর বয়সের ভার, নিয়মিত ওষুধ, ডাক্তারের খরচ।

একমাত্র ছেলে সায়েম চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকে। বিয়ের পর নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যোগাযোগ হয়, খোঁজখবরও নেয়, কিন্তু দূরত্বের একটা দেয়াল তৈরি হয়েছে অজান্তেই।

আর মেঘলা?

সে যেন বাবার সংসারের সবচেয়ে নীরব দুঃখ।

মেয়ের জীবনে কী ঘটেছিল, সে কথা আবদুল কাদের জানেন। কিন্তু মেয়ের মুখে সেই ঘটনার বিস্তারিত কখনো শোনেননি। মেঘলা শুধু একদিন বলেছিল, সে আর স্বামীর বাড়ি ফিরে যেতে চায় না। তার সিদ্ধান্ত বদলানোর জন্য মা-বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত আর জোর করতে পারেননি।

তারপর থেকে মেঘলা এই বাড়িতেই আছে।

কখনো বই পড়ে, কখনো নকশিকাঁথা সেলাই করে, কখনো বাবার লেখার কাগজপত্র গুছিয়ে দেয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, মেয়েটা বেশ স্বাভাবিক আছে। কিন্তু রাত গভীর হলে তার ঘরের আলো অনেকক্ষণ জ্বলে থাকে।

আবদুল কাদের জানেন না, সেই আলোয় মেঘলা কী খোঁজে।

শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা বুঝি এখনো কাউকে অপেক্ষা করে।

যে মানুষটা একদিন তার পৃথিবী ছিল, সেই মানুষটার জন্যই কি?

দুপুরের দিকে বাড়ির দরজায় সাইকেলের ঘণ্টা বাজল।

মেঘলা উঠে গিয়ে দরজা খুলল। ডাকপিয়ন একটা রেজিস্ট্রি খাম এগিয়ে দিল।

—মেঘলা রহমান?

—জি।

—আপনার নামে চিঠি।

খামটা হাতে নিয়ে মেঘলা অবাক হলো। তার নামে চিঠি আসে না বললেই চলে। মাঝে মাঝে ব্যাংকের কাগজপত্র কিংবা পুরোনো কোনো পরিচিতের শুভেচ্ছা কার্ড আসে, তাও খুব কম।

খামটা বেশ ভারী। ওপরের দিকে প্রেরকের নাম লেখা নেই।

সই করে খামটা হাতে নিয়ে দরজা বন্ধ করল সে।

মনে হলো, বহুদিন পর কেউ তাকে মনে করেছে। বুকের মধ্যে অকারণ একটা আনন্দ জেগে উঠল। হয়তো কোনো বান্ধবীর চিঠি, হয়তো কোনো সুখবর।

কিন্তু খাম খুলতেই আনন্দটা মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল।

ভেতরে ছিল দুটি কাগজ।

একটি সুদৃশ্য বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র।

অন্যটি আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ।

মেঘলা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। হাতে ধরা কাগজ দুটির দিকে তাকিয়ে রইল নির্বাক হয়ে।

বিয়ের কার্ডে লেখা—তুষার রহমান ও নওরীন আহমেদের শুভবিবাহ।

কার্ডের তারিখ দেখে মেঘলার ঠোঁট কেঁপে উঠল।

বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশটিও তুষারের পাঠানো। তাতে স্পষ্ট করে লেখা, তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক আর বজায় রাখা সম্ভব নয়। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য মেঘলাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

কী অদ্ভুত!

একই খামে একজন মানুষ তার পুরোনো স্ত্রীকে জানিয়েছে, সে অন্য একজনকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। যেন একটা সম্পর্কের শেষ আরেকটা সম্পর্কের শুরু—দুটোই তার কাছে একই রকম স্বাভাবিক।

মেঘলা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।

তারপর কাগজগুলো বুকে চেপে ধরল।

কাঁদতে ইচ্ছে করছিল খুব। কিন্তু চোখ দিয়ে পানি বেরোল না। কিছু কষ্ট এত গভীর হয় যে কান্নাও সেখানে পৌঁছাতে পারে না।

তার দৃষ্টি চলে গেল অনেক পেছনে।

সেই সময়ে, যখন সে বিশ্বাস করত—ভালোবাসার মানুষ কখনো তার ভালোবাসাকে অপমান করতে পারে না।

সেই সময়ে, যখন তার পৃথিবীর নাম ছিল তুষার।

মেঘলার সঙ্গে নওশীন নামের এক মেয়ের পরিচয় হয়েছিল কলেজে পড়ার সময়। দুজনের বন্ধুত্ব ছিল গভীর। ক্লাসের ফাঁকে গল্প, ক্যানটিনে চা, পরীক্ষার আগের রাতে নোট আদান-প্রদান—সবকিছুতেই তারা একসঙ্গে।

মেঘলা ছিল শান্ত স্বভাবের। নওশীন ছিল চঞ্চল, কথা বলতে ভালোবাসত, আর নিজের উপস্থিতি দিয়ে চারপাশের পরিবেশ বদলে দিতে পারত।

একদিন কলেজের করিডরে বসে গল্প করছিল তারা। হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল—

—নওশীন! এত ডাকছি, শুনতে পাচ্ছিস না?

নওশীন ঘুরে তাকিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

—আরে, তুষার ভাই! তুমি এখানে?

ছেলেটি হেসে বলল, কী ব্যাপার, এত অবাক হচ্ছিস কেন? তোকে সারপ্রাইজ দিতে এলাম।

মেঘলা একটু সরে বসল। নওশীনের আত্মীয়, নিশ্চয়ই। সে নিজেকে আড়াল করে বইয়ের পাতায় চোখ রাখার চেষ্টা করল।

কিন্তু নওশীন তাকে ছাড়ল না।

—এই মেঘলা, এদিকে আয়। পরিচয় করিয়ে দিই। তুষার ভাই, আমার খালাতো ভাই। আর ভাইয়া, এ হচ্ছে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, মেঘলা।

তুষার মেঘলার দিকে তাকাল।

—মেঘলা? নামটা সুন্দর।

মেঘলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ধন্যবাদ।

—শুধু নাম সুন্দর বললে তো হবে না। নামের মালিকের মতামতও জানতে হবে।

নওশীন হেসে বলল, ভাইয়া, তুমি আবার শুরু করেছ!

তুষার মুচকি হাসল।

—আমি তো ভদ্রভাবে কথা বলছি। তোমরা এত ভয় পাচ্ছ কেন?

মেঘলাও হেসে ফেলল।

সেদিনের সেই হাসিটাই হয়তো তুষারের মনে গেঁথে গিয়েছিল।

পরদিন আবার দেখা হলো। তারপর তার পরের দিনও।

তুষার কোনো না কোনো অজুহাতে কলেজে আসত। কখনো নওশীনের সঙ্গে দেখা করতে, কখনো বই দিতে, কখনো শুধু একটু চা খাওয়ার জন্য।

কিন্তু তার চোখ বারবার খুঁজে নিত মেঘলাকে।

মেঘলাও বুঝতে পারছিল, এই মানুষটার উপস্থিতি তার ভালো লাগতে শুরু করেছে।

একদিন কলেজ ছুটির পর তুষার বলল—

—আপনি কি একটু হাঁটবেন?

মেঘলা অবাক হলো।

—কোথায়?

—সামনের লেকের ধারে। বেশি দূর নয়। কথা আছে।

সেদিন তারা লেকের পাশে অনেকক্ষণ বসেছিল। পড়াশোনা, বই, গান, ভবিষ্যৎ—কত বিষয় নিয়ে কথা হয়েছিল।

তুষার বলেছিল, বিদেশে পড়াশোনা করেছে সে। দেশে ফিরে একটা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করবে। জীবনে অনেক কিছু করার ইচ্ছে তার।

মেঘলা নিজের স্বপ্নের কথা বলেছিল। একটা ছোট্ট সংসার, বইয়ে ভরা ঘর, জানালার পাশে ফুলের টব। এমন একটা জীবন, যেখানে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দুজন মানুষ একে অপরের সঙ্গে দিনের গল্প ভাগ করে নেবে।

তুষার তার কথা শুনে বলেছিল—

—আপনার স্বপ্নগুলো খুব ছোট।

মেঘলার মুখটা মলিন হয়ে গিয়েছিল।

তুষার সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল—

—ছোট বলেছি বলে খারাপ বলিনি। বরং আমার মনে হয়, এত সুন্দর স্বপ্ন পূরণ করাই সবচেয়ে কঠিন। বড় বাড়ি বানানো সহজ, কিন্তু একটা ঘরকে বাড়ি বানানো কঠিন।

মেঘলা সেদিন প্রথমবার বুঝেছিল, এই মানুষটার সঙ্গে কথা বলতে তার ভালো লাগে শুধু নয়—সে মানুষটাকে বিশ্বাসও করতে শুরু করেছে।

ভালোবাসা ঠিক কখন শুরু হয়, কেউ বলতে পারে না।

হয়তো একটা সাধারণ কথার ভেতর দিয়ে। হয়তো কারও চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের সমস্ত অস্থিরতা ভুলে যাওয়ার মুহূর্তে।

মেঘলার ভালোবাসাও শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে।

একদিন তুষার তাকে বলেছিল—

—আপনাকে একটা কথা বলব?

—বলুন।

—আপনার সঙ্গে কথা না বললে দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগে।

মেঘলা মুখ নামিয়ে ফেলেছিল।

তুষার আবার বলেছিল—

—আপনি কিছু বলছেন না কেন?

মেঘলা খুব আস্তে বলেছিল—

—কিছু কথা শুনলে উত্তর দিতে সময় লাগে।

তুষার হেসেছিল।

—তাহলে আমি অপেক্ষা করব।

সেই অপেক্ষা খুব বেশি দিনের ছিল না।

কিছুদিন পর তুষার নিজেই বিয়ের কথা বলল। নওশীনের পরিবারের মাধ্যমে প্রস্তাব গেল মেঘলার বাড়িতে। আবদুল কাদের ছেলেটিকে পছন্দ করেছিলেন। শিক্ষিত, ভদ্র, প্রতিষ্ঠিত—মেয়ের জন্য এমন একজনকেই তো চেয়েছিলেন তিনি।

বিয়েটা হয়ে গেল।

মেঘলার মনে হয়েছিল, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় শুরু হলো।

কিন্তু সে জানত না, কোনো কোনো গল্পের শুরু যত সুন্দর হয়, শেষটা ততটাই নির্মম হতে পারে।

বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস বেশ ভালোই কেটেছিল।

তুষার তাকে নিয়ে ঘুরতে যেত, পছন্দের বই কিনে দিত, মাঝেমধ্যে রান্নাঘরে এসে মজা করত। মেঘলা বিশ্বাস করত, তার স্বামী একটু ব্যস্ত হলেও ভেতরে ভেতরে তাকে খুব ভালোবাসে।

তুষার ছিল প্রতিষ্ঠিত, উচ্চাভিলাষী এবং নিজের সামাজিক অবস্থান নিয়ে সচেতন। তার বন্ধুদের জীবনযাপন, পার্টি, অফিসের অনুষ্ঠান—সবকিছুর সঙ্গে মেঘলার অভ্যস্ত হতে সময় লাগছিল।

প্রথম দিকে তুষার বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবেই নিত।

কিন্তু ধীরে ধীরে তার কথাবার্তায় বিরক্তি বাড়তে লাগল।

—তুমি এত চুপচাপ কেন থাকো?

—আমি তো সবার সঙ্গে কথা বলি।

—কথা বলো? আমার অফিসের লোকজন আসে, তুমি ঠিকমতো মিশতে পারো না। একটু স্মার্ট হতে হয়, মেঘলা।

মেঘলা চেষ্টা করেছিল।

তুষারের পছন্দের পোশাক পরেছে, তার বন্ধুদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছে, পার্টিতে গিয়ে অস্বস্তি লুকিয়ে রেখেছে।

তবু কোথাও যেন তার কমতি থেকেই যেত।

একদিন তুষার অফিসের এক নারী সহকর্মীকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। মেয়েটি বেশ রাত পর্যন্ত তাদের সঙ্গে বসে গল্প করল। তুষার তাকে নিয়ে এমনভাবে হাসছিল, যেন তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কোনো ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

মেঘলা কিছু বলেনি।

পরদিন শুধু জিজ্ঞেস করেছিল—

—মেয়েটি কি তোমার খুব কাছের?

তুষার বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল।

—কোন মেয়ে?

—গতকাল যে এসেছিল।

—অফিসের সহকর্মী। কেন?

—না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।

তুষার ঠান্ডা গলায় বলেছিল—

—তোমার এই সন্দেহ করার অভ্যাসটা বাদ দাও। আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার সঙ্গে মিশব, সেটা কি তোমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে করতে হবে?

মেঘলা চুপ করে গিয়েছিল।

সে অনুমতি দিতে বা নিতে চায়নি। শুধু নিজের স্বামীর জীবনে নিজের জায়গাটা বুঝতে চেয়েছিল।

কিন্তু এরপর থেকে বিষয়টা আরও জটিল হতে লাগল।

তুষারের ফোনে রাতবিরেতে বার্তা আসত। মাঝেমধ্যে সে বাড়ি ফিরত অনেক রাতে। কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর মিলত বিরক্তি আর তাচ্ছিল্যে।

একদিন মেঘলা সাহস করে বলেছিল—

—তুষার, আমি কি তোমার জীবনে আর আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ নই?

তুষার ল্যাপটপ থেকে চোখ না তুলেই বলেছিল—

—এসব আবেগী কথা আমার ভালো লাগে না।

—আমি শুধু জানতে চেয়েছি।

—তোমার সমস্যা কী জানো? তুমি ভাবো বিয়ে মানেই একজন মানুষ সারাক্ষণ তোমার চারপাশে ঘুরবে। জীবন এত সহজ নয়, মেঘলা। আমার কাজ আছে, বন্ধু আছে, নিজের একটা জগৎ আছে।

মেঘলা শান্ত গলায় বলেছিল—

—আমারও তো একটা জগৎ আছে। কিন্তু সেই জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটা তুমি।

তুষার এবার তার দিকে তাকিয়েছিল।

—সেটা তোমার সমস্যা। আমার নয়।

সেদিন মেঘলা আর কথা বলতে পারেনি।

কিছু কথা মানুষের কানে লাগে না শুধু, তার আত্মসম্মানের গভীরেও গিয়ে আঘাত করে।

তবু সে সংসারটা বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল।

ভাবত, হয়তো তুষারের কাজের চাপ বেশি। হয়তো সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো সে নিজেই বেশি প্রত্যাশা করছে।

মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে, তখন অনেক সময় অন্যায়ের কারণও নিজের ভেতরে খুঁজতে শুরু করে।

মেঘলাও তাই করেছিল।

কিন্তু একটা সময়ের পর বুঝল, তুষারের দূরত্ব কেবল ব্যস্ততা নয়। সে যেন ইচ্ছে করেই এমন একটা পৃথিবী তৈরি করেছে, যেখানে মেঘলার অনুভূতির কোনো গুরুত্ব নেই।

একদিন অনেক সাহস সঞ্চয় করে নওশীনের কাছে গেল মেঘলা।

নওশীন তখন বেশ ব্যস্ত। নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, পার্টি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি—তার জীবন যেন প্রতিদিন আরও রঙিন হয়ে উঠছে।

মেঘলা সব কথা খুলে বলল।

তুষারের আচরণ, তার রাত করে ফেরা, অন্য নারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, মেঘলার প্রশ্নের উত্তরে অপমান—সব।

নওশীন মন দিয়ে শুনল। তারপর হেসে বলল—

—মেঘলা, তুই এখনো আগের মতোই আছিস।

মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।

—মানে?

—মানে, তুই সবকিছু খুব সিরিয়াসলি নিস। এখনকার দিনে নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করে, ঘোরে, বন্ধুত্ব করে। এসব নিয়ে এত মাথা ঘামালে সংসার করা যায়?

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

—আমি তো ওকে বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে নিষেধ করছি না। কিন্তু আমার সঙ্গে মিথ্যা বললে, আমাকে অসম্মান করলে, সেটা কি মেনে নিতে হবে?

নওশীন বিরক্ত হয়ে বলল—

—তুই সবকিছুর মধ্যে ভালো-মন্দ খুঁজিস কেন? তুষার ভাই প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তাঁর নিজের জীবন আছে। একটু ছাড় দিতে শিখ।

মেঘলার বুকটা কেমন শূন্য হয়ে গেল।

এই সেই নওশীন, যার সঙ্গে একসময় নিজের সব কথা ভাগ করে নিত সে। যে বন্ধুকে নিজের সুখের সাক্ষী ভেবেছিল, সেই বন্ধুই আজ তার কষ্টকে তুচ্ছ করে দেখছে।

মেঘলা উঠে দাঁড়াল।

নওশীন বলল—

—কোথায় যাচ্ছিস?

মেঘলা মৃদু হেসে বলল—

—বাড়ি।

—চা খেয়ে যা।

—আজ থাক।

নওশীন আর জোর করল না।

বাড়ি ফেরার পথে মেঘলা বুঝতে পারল, মানুষের সবচেয়ে বড় একাকিত্ব বোধহয় তখনই আসে, যখন সে নিজের কষ্টের কথা বলে, অথচ কেউ সেই কষ্টকে সত্যি বলে স্বীকার করে না।

সেদিন থেকে নওশীনের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে গেল।

তুষারের সঙ্গে সম্পর্কও ক্রমশ ঠান্ডা হতে লাগল।

তবু মেঘলা সংসার ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছিল না।

কারণ সে শুধু তুষারকে ভালোবাসেনি। সে ভালোবেসেছিল তাদের একসঙ্গে গড়ে তোলা জীবনটাকে, বিয়ের পরের প্রথম কয়েকটা মাসকে, একসঙ্গে দেখা ছোট ছোট স্বপ্নগুলোকে।

মানুষ কখনো কখনো একজন মানুষকে ছেড়ে যেতে পারে না বলে নয়, বরং সেই মানুষটার সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলোকে মিথ্যে বলে মেনে নিতে পারে না বলে থেকে যায়।

মেঘলাও থেকে গিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত।

সেদিন সকাল থেকেই মেঘলার মন ভালো ছিল।
তাদের বিয়ের তৃতীয় বছর পূর্ণ হবে। আগের দুই বছর তুষার ব্যস্ততার কারণে দিনটাকে বিশেষভাবে পালন করেনি। কিন্তু মেঘলা এবার ঠিক করেছিল, নিজের হাতে সব রান্না করবে। তুষারের পছন্দের খাবার, তার প্রিয় মিষ্টি, আর একটা ছোট্ট উপহার।

কয়েক দিন আগে একটা পাঞ্জাবি কিনেছিল সে।

তুষার একবার দোকানে দেখে পছন্দ করেছিল, কিন্তু দাম বেশি বলে কেনেনি। মেঘলা নিজের জমানো টাকা দিয়ে সেটাই কিনে রেখেছিল।

সকালে তুষার অফিসে যাওয়ার সময় মেঘলা বলেছিল—

—আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে?

তুষার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলেছিল—

—কেন?

—আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী।

তুষার কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্ত গলায় বলল—

—ওহ, হ্যাঁ। চেষ্টা করব।

মেঘলা মৃদু হেসে বলেছিল—

—আমি তোমার পছন্দের সব রান্না করব।

—ঠিক আছে, দেখি।

দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

মেঘলা জানত না, এই দেখি শব্দটার ভেতরে কতখানি অবহেলা লুকিয়ে ছিল।

দুপুরে রান্না শেষ হলো। ঘর গুছিয়ে টেবিল সাজাল সে। তুষারের পাঞ্জাবিটা একটা সুন্দর কাগজে মুড়ে বিছানার ওপর রাখল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো।

তুষার এল না।

ফোন করল মেঘলা।

ফোন বেজে গেল, কেউ ধরল না।

আরেকবার করল।

এবার ফোন বন্ধ।

মেঘলা নিজেকে বোঝাল, হয়তো জরুরি মিটিং। হয়তো কাজের চাপ। একটু দেরি তো হতেই পারে।

সন্ধ্যা নামল।

বাড়ির কাজের মহিলা খাওয়ার কথা বললে মেঘলা বলল, “তুমি খেয়ে নাও। আমি পরে খাব।”

মহিলা যাওয়ার আগে বলেছিল—

—ভাবি, ভাই সাহেব কি আজ আসবেন না?

মেঘলা কড়া গলায় বলেছিল—

—আসবেন। তুমি তোমার কাজ করো।

কথাটা বলার পর নিজেই বুঝেছিল, সে যেন অন্য কাউকে নয়, নিজের মনকেই বোঝাচ্ছে।

রাত বাড়ল।

দরজার ঘণ্টা বাজতেই মেঘলা প্রায় দৌড়ে গেল।

মনে হলো, তুষার এসেছে। হয়তো দেরি হয়েছে, কিন্তু ফিরে এসেছে তো!

দরজা খুলে সে দেখল, তুষার দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে একজন অপরিচিত তরুণী। পরনে দামি পোশাক, হাতে ছোট্ট ব্যাগ, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।

তুষার খুব স্বাভাবিকভাবে বলল—

—মেঘলা, সরো তো। নওরীন এসেছে। একটা কাজ আছে।

মেঘলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

নওরীন?

এই নামটাই কি সেই কার্ডে লেখা ছিল?

না, তখনো সে জানত না।

তুষার মেঘলাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। নওরীনও তার পেছনে।

তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা এই বাড়িতে আগেও বহুবার এসেছে।

তুষার সরাসরি শোবার ঘরের দিকে গেল।

মেঘলা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ চলে গেল খাবার সাজানো টেবিলের দিকে। মোমবাতিগুলো জ্বালানো হয়নি। পাঞ্জাবির প্যাকেটটা বিছানায় পড়ে আছে।

সে ধীরে ধীরে শোবার ঘরের দরজার কাছে গেল।

ভেতর থেকে নওরীনের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল।

তারপর তুষারের কণ্ঠ—

—তোমাকে বলেছিলাম না, আজ আসতে?

নওরীন হেসে বলল—

—তোমার স্ত্রী কিছু মনে করবে না তো?

তুষার উত্তর দিল—

—ও এসব নিয়ে কিছু বলতে পারবে না। বললেও আমি শুনব না।

মেঘলার মনে হলো, ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে।

সে দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

আর এক মুহূর্তও নয়।

আজ যদি সে কিছু না বলে, তাহলে হয়তো সারা জীবন নিজের কাছেই ছোট হয়ে থাকবে।

সে ঘরে ঢুকে দাঁড়াল।

তুষার অবাক হয়ে তাকাল।

—কী হয়েছে?

মেঘলা প্রথমে নওরীনের দিকে তাকাল। তারপর তুষারের দিকে।

—আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী।

তুষার কপাল কুঁচকে বলল—

—হ্যাঁ, জানি তো।

—তাহলে তুমি এভাবে একজন নারীকে নিয়ে বাড়িতে এলে কেন?

তুষার ঠান্ডা গলায় বলল—

—নওরীন আমার পরিচিত। ওর একটা কাজ ছিল।

—কী কাজ?

—তোমাকে সবকিছু জানাতে হবে?

মেঘলা এবার একটু জোরে বলল—

—আমি তোমার স্ত্রী। তোমার কাছে এই প্রশ্নটুকু করার অধিকার কি আমার নেই?

তুষার উঠে দাঁড়াল।

—আবার শুরু করলে? তোমার এই মানসিকতা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

মেঘলা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।

—আমার মানসিকতা?

তুষার এবার এমন একটা কথা বলল, যা মেঘলা কোনো দিন ভুলতে পারেনি।

—হ্যাঁ, তোমার মানসিকতা। তুমি একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তোমার কাছে সংসার মানে স্বামী, রান্নাঘর আর বিবাহবার্ষিকী। আমার জীবনটা এত ছোট নয়, মেঘলা। আমি এক নারীতে সুখী নই। এটা আমার জীবন। তুমি মানিয়ে নিতে পারলে থাকো, না পারলে চলে যাও।

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।

নওরীনও এবার অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে তুষারের দিকে তাকিয়ে বলল—

—তুষার, আমার মনে হয়, আজ আমার যাওয়া উচিত।

তুষার বলল—

—তুমি বসো। এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার।

মেঘলা আর কিছু শুনতে পেল না।

তার কানে শুধু একটা কথাই বাজছিল—

এক নারীতে সুখী নই।

যে মানুষটার জন্য সে নিজের সমস্ত স্বপ্ন, বিশ্বাস আর আত্মসম্মানকে বারবার ছোট করেছে, সেই মানুষটাই আজ তাকে জানিয়ে দিল—তার ভালোবাসা যথেষ্ট নয়।

মেঘলা চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

বিছানায় রাখা পাঞ্জাবিটার দিকে তাকাল।

হাত দিয়ে একবার ছুঁয়ে দেখল।

তারপর আলমারি থেকে একটা কাগজ বের করল।

কলম হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। কী লিখবে, বুঝতে পারছিল না। মনের মধ্যে হাজারটা কথা, অথচ কোনো কথাই যেন কাগজে নামতে চাইছিল না।

শেষ পর্যন্ত লিখল—

তুষার,

তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম বলে তোমার অনেক অন্যায় মেনে নিয়েছি। ভেবেছি, একদিন তুমি বুঝবে। ভেবেছি, আমার অপেক্ষা, আমার যত্ন, আমার নীরবতা—একদিন তোমার কাছে মূল্য পাবে।

কিন্তু আজ বুঝলাম, তুমি আমার নীরবতাকে ভালোবাসা ভাবোনি। ভেবেছ, আমার কোনো প্রতিবাদ নেই। তুমি আমাকে হারানোর ভয় পাও না, কারণ তুমি নিশ্চিত—আমি কোথাও যাব না।

আজ আমি যাচ্ছি। তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, তোমার জীবনে অন্য কারও জায়গা কেড়ে নেওয়ার জন্যও নয়। আমি যাচ্ছি, কারণ তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে গেছি।

তোমার জীবনে সুখ থাকুক। আমি শুধু চাই, কোনো একদিন তুমি বুঝতে পারো—যে মানুষটা তোমার জন্য অপেক্ষা করত, সে তোমার কাছে খুব বেশি কিছু চায়নি। শুধু চেয়েছিল, তুমি তাকে নিজের মানুষ বলে সম্মান করো।

ভালো থেকো।

মেঘলা।

চিঠিটা টেবিলের ওপর রেখে সে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে নিল।

দরজার কাছে এসে একবার পেছনে তাকাল।

এই বাড়িতেই সে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। এই ঘরেই তুষারের সঙ্গে প্রথম রাত কাটিয়েছিল। এই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির দিনে দুজনে চা খেয়েছিল।

সেই স্মৃতিগুলো মিথ্যে ছিল না।

কিন্তু স্মৃতির সত্যতা দিয়ে বর্তমানের অপমানকে আর ঢেকে রাখা যায় না।

মেঘলা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

সেদিন রাতে বাইরে বৃষ্টি হয়েছিল কি না, সে খেয়াল করেনি।

শুধু মনে আছে, বাড়ি ছাড়ার সময় আকাশে মেঘ ছিল।

আর তার বুকের ভেতরেও।

পরদিন সকালে মেঘলা চলে গেল ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়িতে, মা-বাবার কাছে।
তাকে এভাবে দেখে রওশন আরা প্রথমে কিছু বুঝতে পারেননি।

—কী হয়েছে মা? হঠাৎ চলে এলি কেন?

মেঘলা শুধু বলেছিল—

—মা, আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। একটু থাকতে দাও।

আবদুল কাদেরও প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু মেয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে আর কথা বাড়াতে পারেননি।

কয়েক দিন পর তুষার ফোন করেছিল।

মেঘলা ফোন ধরেনি।

তারপর নওশীন ফোন করেছিল।

মেঘলা সেটাও ধরেনি।

সে জানত, একবার কথা বলতে শুরু করলে হয়তো আবার নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাবে। হয়তো তুষার কিছু কথা বলবে, কিছু প্রতিশ্রুতি দেবে, আর সে আবার বিশ্বাস করতে শুরু করবে।

তাই সে নিজেকে দূরে রাখল।

তুষার একবারও তার বাড়িতে আসেনি।

একবারও জানতে চায়নি, মেঘলা কেমন আছে।

কয়েক মাস পর এক পরিচিতের মাধ্যমে মেঘলা জানতে পেরেছিল, তুষার আবার নওরীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

তারপর ধীরে ধীরে খবর পাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল।

মেঘলা আর খোঁজ করেনি।

সে শুধু নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

বাবার লেখার কাজে সাহায্য করত, মায়ের সঙ্গে রান্না করত, বিকেলে নকশিকাঁথা সেলাই করত। কখনো গ্রামের স্কুলের কয়েকজন মেয়েকে পড়াত।

বাইরে থেকে তার জীবন শান্ত হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু মানুষের ভেতরের জীবন তো বাইরে থেকে দেখা যায় না।

রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, মেঘলা কখনো কখনো পুরোনো ছবিগুলো বের করত। বিয়ের দিনের ছবি, তুষারের সঙ্গে প্রথম বেড়াতে যাওয়ার ছবি, আর একটা ছবি—যেখানে তুষার তার কাঁধে হাত রেখে হাসছে।

ছবিগুলো সে ফেলে দিতে পারেনি।

ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলেও তার স্মৃতিগুলোকে সব সময় ঘৃণা করা যায় না।

কিছু স্মৃতি কষ্ট দেয়, তবু মানুষ সেগুলো আগলে রাখে। কারণ সেগুলো একসময় তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্য ছিল।

শাক বাছতে বাছতে মেঘলার চোখ আবার ভিজে উঠল।
মায়ের ডাকে সে খাওয়ার ঘরে গেল। কিন্তু খেতে বসে কিছুই গলায় নামছিল না।

রওশন আরা বুঝতে পারছিলেন, মেয়ের কিছু হয়েছে।

—কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ লাগছে?

মেঘলা মাথা নাড়ল।

—না, মা।

—তাহলে এমন মুখ করে বসে আছিস কেন?

মেঘলা একটু থেমে বলল—

—মা, একটা চিঠি এসেছে।

—কার চিঠি?

মেঘলা ব্যাগ থেকে কাগজ দুটি বের করে মায়ের হাতে দিল।

রওশন আরা বিয়ের কার্ডটা পড়লেন। তারপর বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ।

তাঁর মুখের রং বদলে গেল।

—এত দিন পর? এই লোকটা আবার এসব কী শুরু করেছে?

মেঘলা শান্ত গলায় বলল—

—ওর বিয়ে।

—কী বললি?

—তুষার আবার বিয়ে করছে, মা। আর আমাকে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়েছে।

রওশন আরা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলেন না।

তারপর মেয়ের হাত ধরে বললেন—

—তুই কষ্ট পাচ্ছিস?

মেঘলা মায়ের দিকে তাকাল।

প্রশ্নটা এত সহজ ছিল, অথচ উত্তরটা এত কঠিন।

সে একটু হেসে বলল—

—কষ্টটা কি কোনো দিন পুরোপুরি চলে যায়, মা?

রওশন আরা মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।

মেঘলা মায়ের কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।

অনেক দিন পর তার কান্না এল।

সেদিন সে শুধু তুষারের জন্য কাঁদেনি। কেঁদেছিল নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোর জন্য, নিজের ভুল বিশ্বাসের জন্য, আর সেই মেয়েটার জন্য—যে একদিন ভেবেছিল, ভালোবাসা থাকলে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।

বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

সকাল থেকে জমে থাকা মেঘ অবশেষে ঝরে পড়ছে।

বারান্দার কোণে অসমাপ্ত নকশিকাঁথাটা পড়ে আছে। রঙিন সুতোয় আঁকা দুই পাখির মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা বৃষ্টির বাতাসে একটু উড়ে উঠল।

মেঘলা চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল।

মা বললেন—

—কোথায় যাচ্ছিস?

—বারান্দায়। কাঁথাটা ভিজে যাবে।

মেঘলা কাঁথাটা তুলে এনে কোলে রাখল। তারপর সুইয়ে সুতো পরিয়ে বসে পড়ল।

অনেকক্ষণ ধরে সে ফাঁকা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

আজ সে সেখানে কী আঁকবে?

আরেকটা পাখি?

নাকি একটা ছোট্ট বাড়ি, যার জানালা খোলা থাকবে, দরজায় কোনো তালা থাকবে না?

সে জানত না।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল বিয়ের কার্ডটার ওপর। কার্ডটা টেবিলে রাখা। তুষারের নামের পাশে অন্য একজনের নাম।

মেঘলা ধীরে ধীরে কাগজটা ভাঁজ করে সরিয়ে রাখল।

তারপর নকশিকাঁথায় একটা ছোট্ট শিউলি ফুল সেলাই করতে শুরু করল।

বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে।

বহু বছর পর মেঘলার মনে হলো, হয়তো জীবনের সব অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য কাউকে ফিরে আসতে হয় না। কিছু কাজ নিজের জন্যও শেষ করা যায়।

কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে আবদুল কাদেরের ডাক শোনা গেল—

—মেঘলা, মা! তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।

মেঘলা সুইটা কাঁথায় গুঁজে রেখে ভেতরে গেল।

বাবা বিছানার পাশে বসে আছেন। তাঁর হাতে একটা পুরোনো খাম।

—এটা আজ সকালে তোর নামে এসেছে। তুই তখন রান্নাঘরে ছিলি, তাই দিতে পারিনি।

মেঘলা অবাক হয়ে খামটা নিল।

খামের ওপর পরিচিত হাতের লেখা।

তুষার রহমান।

তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

—বাবা, তুমি খুলেছ?

—না মা। তোর নামেই এসেছে।

মেঘলা কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে খুলল।

ভেতরে একটা চিঠি।

কাগজের ওপর তুষারের হাতের লেখা—

মেঘলা,

তুমি হয়তো ভাবছ, আমার জীবনে তোমার আর কোনো জায়গা নেই। হয়তো সেটাই সত্যি। কিন্তু একটা কথা না বলে আমি বিয়ে করতে পারছি না।

যে সত্যিটা তুমি এত দিন জানোনি, সেটা জানার অধিকার তোমার আছে।

তুমি যেদিন বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, সেদিন আমি তোমাকে আটকাইনি। কারণ আমি ভেবেছিলাম, তুমি কয়েক দিন পর ফিরে আসবে। তুমি ফিরে আসোনি।

তারপর অনেক কিছু ঘটেছে। এমন কিছু, যা তোমাকে বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমি সাহস পাইনি।

বিয়ের কার্ডটা তোমাকে পাঠিয়েছি, কারণ আমি চাইনি তুমি অন্য কারও কাছ থেকে খবরটা জানো। কিন্তু ডিভোর্সের কাগজের সঙ্গে যে সত্যিটা তোমাকে জানানো দরকার ছিল, সেটা আইনজীবীর কাগজে লেখা যায় না।

আমি জানি না, তুমি আমাকে ক্ষমা করবে কি না। আমি এটাও জানি না, তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইবে কি না।

তবু যদি পারো, একবার আমার সঙ্গে দেখা কোরো।

কারণ তোমার চলে যাওয়ার রাতের পর থেকে এমন একটা প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, যার উত্তর শুধু তোমার কাছেই আছে।

—তুষার।

মেঘলা চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইল।

তার চোখে এবার শুধু কষ্ট ছিল না।

ছিল বিস্ময়।

তুষার তাকে এত দিন পর কেন লিখল? কোন সত্যের কথা বলছে সে? আর মেঘলার চলে যাওয়ার রাতের সঙ্গে এমন কী জড়িয়ে আছে, যার উত্তর তুষার তার কাছেই খুঁজছে?

সে তো সেই রাতের সবকিছু জানে।

অথবা, সে কি সত্যিই সব জানে?

মেঘলা চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল।

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশের মেঘ ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। বারান্দার নকশিকাঁথায় বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা জমে আছে।

মেঘলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

তার মনে হলো, জীবনের কিছু দরজা বন্ধ করে দিলেও সেগুলোর ওপাশে জমে থাকা গল্পগুলো শেষ হয় না।

কখনো কখনো বহু বছর পর একটা চিঠি এসে সেই দরজায় আবার কড়া নাড়ে।

আর তখন মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—সে দরজা খুলবে, নাকি নিজের শান্তির জন্য চিরদিনের মতো বন্ধ রাখবে।

মেঘলা জানত না, সে কী করবে।

শুধু জানত, তার জীবনের গল্পটা হয়তো এখনো শেষ হয়নি।

কিন্তু তুষার যে সত্যির কথা লিখেছে, সেটা কী?

আর মেঘলা চলে যাওয়ার সেই রাতে এমন কী ঘটেছিল, যার উত্তর তুষার আজও খুঁজে বেড়াচ্ছে?

সেই উত্তর কি মেঘলার ভালোবাসাকে আবার জাগিয়ে তুলবে, নাকি বহু বছর ধরে চাপা পড়ে থাকা এমন এক সত্য সামনে আনবে, যা তাদের দুজনের জীবনকেই বদলে দেবে?

বাইরে আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে।

আর মেঘলা—সে এখনো বারান্দায় বসে অসমাপ্ত নকশিকাঁথাটায় সুতো বুনছে।

দুটি পাখির মাঝখানে এবার সে একটি ছোট্ট দরজা আঁকতে শুরু করেছে।

দরজাটা খোলা থাকবে, নাকি বন্ধ—সেটা সে এখনো ঠিক করেনি।