মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা।
নামটা তার সঙ্গে বেশ মানিয়ে গিয়েছিল। আকাশে মেঘ জমলে তার মন ভালো হয়ে যেত। বৃষ্টি হলে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত। আর খুব মন খারাপ হলে চুপচাপ জানালার কাচে আঙুল দিয়ে ছোট ছোট বৃত্ত আঁকত।
ছেলেটির নাম অয়ন।
অয়ন খুব সাধারণ একটা ছেলে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। মাসের শেষে বেতন পায়, বাড়িতে টাকা পাঠায়, আর নিজের জন্য কিছু টাকা জমিয়ে রাখে। তার জীবনে খুব বেশি চাওয়া ছিল না। শুধু একটা ছোট্ট সংসারের স্বপ্ন ছিল।
সেই সংসারে একজন মানুষ থাকবে।
যার কাছে দিনশেষে ফিরে আসা যায়।
মেঘলার সঙ্গে অয়নের প্রথম দেখা হয়েছিল এক বর্ষার বিকেলে, বইয়ের দোকানে।
বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মেঘলা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই। অয়ন দোকান থেকে বেরিয়ে দেখল, মেয়েটি বৃষ্টির মধ্যে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
অয়ন বলল,
— ছাতা নেই?
মেঘলা তাকাল।
— থাকলে কি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম?
অয়ন একটু হেসে বলল,
— আমার ছাতাটা নিতে পারেন।
— আপনি যাবেন কীভাবে?
— আমি বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করি।
মেঘলা মেয়েটির মতো হেসে ফেলল।
— মিথ্যা কথা। আপনার হাতে তো ফাইল আছে। ভিজে গেলে অফিসে বকা খাবেন।
অয়ন অবাক হলো। অপরিচিত একটা মেয়ে তার এতটুকু বিষয়ও খেয়াল করেছে!
সেদিন তারা একই ছাতার নিচে কিছুটা পথ হেঁটেছিল।
কেউ কারও নাম জিজ্ঞেস করেনি।
কিন্তু বাসায় ফিরে অয়নের মনে হলো, মেয়েটিকে আবার দেখলে মন্দ হয় না।
জীবনের কিছু গল্প এভাবেই শুরু হয়। কোনো ঘোষণা থাকে না। থাকে না কোনো বিশেষ মুহূর্তের আয়োজন। শুধু একজন অচেনা মানুষ হঠাৎ পরিচিত হয়ে ওঠে।
তারপর একসময় সেই মানুষটিকে ছাড়া দিন কাটানো কঠিন হয়ে যায়।
দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল সেই বইয়ের দোকানেই।
তৃতীয়বার দেখা হলো পাশের চায়ের দোকানে।
চতুর্থবার মেঘলা নিজেই অয়নকে বলল,
— আপনি কি সব সময় এই রাস্তায় আসেন?
অয়ন বলল,
— এখন আসি।
— আগে আসতেন না?
— আগে জানতাম না, এখানে আপনার সঙ্গে দেখা হতে পারে।
মেঘলা হেসে ফেলল।
সেই হাসির শব্দ অয়নের মনে অনেক দিন থেকে গিয়েছিল।
তারপর থেকে তাদের দেখা হতে লাগল। কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো চায়ের টেবিলে, কখনো কোনো ব্যস্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে।
মেঘলা অনেক কথা বলত। অয়ন মন দিয়ে শুনত।
মেঘলার একটা অভ্যাস ছিল। কথা বলতে বলতে হঠাৎ চুপ হয়ে যেত।
অয়ন জিজ্ঞেস করত,
— কী হলো?
মেঘলা বলত,
— কিছু না।
অয়ন জানত, এই ‘কিছু না’ কথাটার ভেতরেই অনেক কিছু লুকিয়ে আছে।
একদিন মেঘলা বলল,
— আচ্ছা, মানুষ কি সত্যিই সারাজীবন একজনকে ভালোবাসতে পারে?
অয়ন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
— পারে।
— কীভাবে বুঝলেন?
— আমি তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। এখন দেখি কত দিন পারি।
মেঘলা চুপ করে গেল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— আপনি এত সহজে ভালোবাসার কথা বলে ফেললেন?
অয়ন বলল,
— কঠিন করে বললে কি ভালোবাসা বেশি সত্যি হয়?
মেঘলা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু সেদিন বাড়ি ফিরে অয়নকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল।
আমিও আপনাকে একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলছি।
অয়ন মেসেজটা পড়ে অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত সুখ বোধ হয় খুব ছোট ছোট বাক্যের ভেতর লুকিয়ে থাকে।
এরপর তাদের প্রেমের দিনগুলো শুরু হলো।
মেঘলা অয়নকে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করত, খেয়েছে কি না। অয়ন অফিস থেকে ফেরার পথে মেঘলার জন্য কখনো ফুল, কখনো চকলেট, কখনো একটা বই কিনে আনত।
মেঘলা বলত,
— এত কিছু আনতে হবে না। শুধু সময়মতো ফোন করবেন।
অয়ন বলত,
— সময় তো তোমাকেই দিতে চাই।
মেঘলা তখন হাসত।
একদিন তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলছিল।
মেঘলা বলল,
— আমাদের বিয়ে হলে একটা ছোট্ট বারান্দা থাকবে। সেখানে অনেক গাছ লাগাব।
অয়ন বলল,
— আর?
— আর একটা বুকশেলফ থাকবে।
— আর?
মেঘলা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— আর আপনি থাকবেন।
অয়ন হেসে বলল,
— শুধু আমি?
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— না। আপনি, আমি আর আমাদের অনেকগুলো সাধারণ দিন।
অয়ন সেদিন বুঝেছিল, সে মেয়েটিকে শুধু ভালোবাসে না। তার সঙ্গে বুড়ো হয়ে যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছে।
মানুষের জীবনে বড় সুখ বোধ হয় এটাই—কেউ যখন তার ভবিষ্যতের ভেতর নিজের জন্য একটা জায়গা রেখে দেয়।
সব ভালোবাসার গল্পে তৃতীয় কোনো মানুষ থাকে না।
কখনো কখনো থাকে অভাব, পরিবারের চাপ, আর কিছু না-বলা কথা।
অয়নের বাবার হঠাৎ অসুস্থতার কারণে তাদের পরিবারে বড় সংকট নেমে এল। বাবার চিকিৎসার খরচ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, বাড়ির দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে অয়নের কাঁধে এসে পড়ল।
অয়ন আগের মতো মেঘলার সঙ্গে দেখা করতে পারত না। ফোনও কম করত।
মেঘলা প্রথমে বুঝেছিল। পরে তার ভেতরেও অভিমান জমতে শুরু করল।
এক রাতে সে অয়নকে ফোন করে বলল,
— তুমি কি বদলে গেছ?
অয়ন ক্লান্ত গলায় বলল,
— না তো।
— তাহলে আগের মতো কথা বলো না কেন?
— একটু সমস্যা চলছে, মেঘলা। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মেঘলা বলল,
— সব সময় তুমি বলো, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমার যে তোমাকে দরকার, সেটা কি বুঝতে পারো?
অয়ন চুপ করে রইল।
সেদিন তার সত্যিই কথা বলার শক্তি ছিল না।
সে জানত না, কখনো কখনো প্রিয় মানুষকে ভালোবাসার পাশাপাশি তার কষ্টটাও মন দিয়ে শুনতে হয়। শুধু সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলে হয় না।
অন্যদিকে মেঘলাও বুঝতে পারেনি, অয়নের নীরবতার পেছনে অবহেলা নয়, অসহায়ত্ব কাজ করছিল।
দিন কয়েক পর মেঘলার পরিবার তার বিয়ের কথা তুলল। পরিবারের পছন্দের একজন ছেলে বিদেশে থাকে। মেঘলার বাবা-মা মনে করতেন, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য এই প্রস্তাব ভালো।
মেঘলা অয়নকে জানাল।
অয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তুমি কী চাও?
মেঘলা বলল,
— আমি তোমাকে চাই।
— তাহলে ভয় পাচ্ছ কেন?
মেঘলা কেঁদে ফেলল।
— কারণ ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু হয় না, অয়ন। তোমার পরিবার, আমার পরিবার, আমাদের ভবিষ্যৎ—কিছুই তো ঠিক নেই।
অয়ন বলতে চেয়েছিল, সব ঠিক করে ফেলবে। কিন্তু সে জানত, এই মুহূর্তে তার হাতে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মেঘলা বলল,
— তুমি যদি আমাকে একটু নিশ্চয়তা দিতে পারতে!
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাকে সুখী করার মতো সামর্থ্য আমার নেই।
কথাটা সত্যি ছিল।
কিন্তু সব সত্যি সব সময় ঠিকভাবে বলা হয় না।
মেঘলা ফোন রেখে দিল।
এরপর তাদের মধ্যে কয়েক দিন কোনো কথা হলো না।
অয়ন অপেক্ষা করেছিল, মেঘলা আবার ফোন করবে।
মেঘলা অপেক্ষা করেছিল, অয়ন এসে বলবে, ‘সব বাধা পেরিয়ে তোমাকে নিয়ে যাব।’
কেউ কারও কাছে গেল না।
দুজনেই ভালোবাসত। দুজনেই কষ্ট পেত। অথচ দুজনেই ভেবেছিল, অন্য মানুষটি হয়তো আর আগের মতো ভালোবাসে না।
একদিন মেঘলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
খবরটা অয়ন অন্য একজনের কাছ থেকে জানতে পারল।
সেদিন সে অফিস থেকে ফিরে ঘরে বসে ছিল। জানালার বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল।
ফোনের গ্যালারিতে মেঘলার একটা ছবি ছিল। বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তোলা। হাতে সেই বই, চোখে হাসি।
অয়ন ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
‘তুমি যদি একবার বলতে, অপেক্ষা করো, আমি সবকিছু ঠিক করে নিতাম।’
কিন্তু মানুষ চলে যাওয়ার পর আমরা এমন অনেক কথা ভাবি, যেগুলো চলে যাওয়ার আগেই বলা দরকার ছিল।
মেঘলার বিয়ে হয়ে গেল।
অয়ন বিয়েতে যায়নি।
সে ভেবেছিল, মেঘলাকে অন্য কারও পাশে দেখলে নিজেকে সামলাতে পারবে না।
বিয়ের কয়েক মাস পর মেঘলা বিদেশে চলে গেল স্বামীর সঙ্গে।
অয়নের জীবনে তখন কাজের চাপ বেড়েছে। বাবার চিকিৎসা চলছে। ছোট ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
জীবন তাকে বসে কাঁদারও খুব বেশি সময় দেয়নি।
তবু রাত হলে মেঘলার কথা মনে পড়ত।
কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না। শুধু তাদের ছাড়া বেঁচে থাকার অভ্যাস তৈরি হয়।
অয়ন সেই অভ্যাস তৈরি করেছিল।
বছরখানেক পর সে বাবাকে হারাল।
বাবার মৃত্যুর রাতে অয়ন হাসপাতালের করিডরে বসে ছিল। আশপাশে অনেক মানুষ ছিল, তবু তার নিজেকে ভীষণ একা মনে হচ্ছিল।
হঠাৎ তার মেঘলার কথা মনে পড়ল।
এই মুহূর্তে যদি মেঘলা পাশে থাকত, হয়তো কিছু বলত না। শুধু হাতটা ধরে বসে থাকত।
অয়ন ফোন হাতে নিল।
মেঘলার পুরোনো নম্বরটা এখনো তার ফোনে ছিল।
সে অনেকক্ষণ নম্বরটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনটা বন্ধ করে দিল।
সব কষ্টের কথা সবাইকে বলা যায় না। আর কিছু মানুষকে বলা যায় না, কারণ একসময় তারা ছিল আমাদের সবচেয়ে আপন।
মেঘলাও নিজের জীবনে সুখী হতে পারেনি।
তার স্বামী খারাপ মানুষ ছিল না। কিন্তু তাদের সম্পর্কের ভেতর ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্ব বেশি ছিল। মেঘলা চেষ্টা করেছিল সংসারটাকে আপন করে নিতে। কিন্তু যে মেয়েটি ছোট্ট একটা বারান্দা, কিছু গাছ আর সাধারণ দিনের স্বপ্ন দেখত, সে নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না।
একদিন রাতে সে পুরোনো ফোনের ব্যাকআপ থেকে অয়নের একটা মেসেজ খুঁজে পেল।
‘তোমার সঙ্গে আমার একটা ছোট্ট সংসার করতে ইচ্ছে করে। খুব বড় কিছু চাই না। শুধু দিনশেষে তুমি থাকবে।’
মেঘলা মেসেজটা পড়ে কেঁদেছিল।
তারপর অনেক দিন পর প্রথমবার নিজের কাছে স্বীকার করেছিল—সে অয়নকে ভুলে যায়নি।
সে শুধু ভেবেছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা কমে যাবে।
কিন্তু কিছু ভালোবাসা কমে না।
তারা শুধু চুপ করে থাকে।
সাত বছর পর মেঘলা দেশে ফিরল।
তার বিয়ে তখন ভেঙে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও সম্পর্কটা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না, কিন্তু মেঘলা বুঝেছিল, শুধু সমাজের ভয়ে একটা অসুখী সম্পর্ক টেনে নেওয়া কারও জন্যই ভালো নয়।
সে এবার দেশে ফিরেছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।
ঢাকায় একটা ছোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়েছে। বই নিয়ে কাজ করতে তার ভালো লাগত। বইয়ের পাতায় সে এখনো এমন সব মানুষের গল্প খুঁজত, যারা দেরিতে হলেও নিজেদের সত্যিটা বুঝতে পারে।
একদিন অফিস থেকে বেরিয়ে সে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
দোকানের এক পাশে দাঁড়িয়ে একজন বই দেখছিল।
মেঘলা প্রথমে খেয়াল করেনি।
লোকটি মুখ তুলে তাকাতেই তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অয়ন।
চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। চুলে দু-একটা পাকা রেখা।
তবু সেই চোখ দুটো একই রকম।
মেঘলা কথা বলতে পারল না।
অয়নও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর মৃদু হেসে বলল,
— কেমন আছ?
মেঘলার মনে হলো, সাত বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত কথা এই তিনটি শব্দের সামনে এসে থেমে গেছে।
সে বলল,
— ভালো আছি। তুমি?
অয়ন বলল,
— আমিও।
দুজনেই জানত, কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়।
দোকান থেকে বের হওয়ার সময় বৃষ্টি আরও বেড়ে গেল।
অয়ন একটা ছাতা খুলল।
মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,
— যাবে? রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিই?
মেঘলা একটু হেসে বলল,
— তোমার ছাতাটা এখনো আছে?
অয়নও হেসে ফেলল।
— ছাতা আছে। মানুষটা একটু বদলে গেছে।
মেঘলা নিচের দিকে তাকাল।
কত সহজে বলা যায় একটা কথা! অথচ তার ভেতরে কত বছরের অভিমান লুকিয়ে থাকে।
তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
সেদিন কেউ পুরোনো প্রেমের কথা তুলল না। কেউ জানতে চাইল না, কে কাকে কতটা কষ্ট দিয়েছিল।
রাস্তার মোড়ে এসে মেঘলা বলল,
— তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে ভাবিনি।
অয়ন বলল,
— আমিও না।
মেঘলা একটু থেমে জিজ্ঞেস করল,
— তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?
অয়ন অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন করব?
— আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— তুমিও তো একা ছিলে, মেঘলা। আমিও তোমাকে বুঝতে পারিনি। শুধু তোমার চলে যাওয়াটাই মনে রেখেছিলাম। তোমার ভয়গুলো মনে রাখিনি।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সাত বছর আগে যে কথাগুলো তাদের বলা উচিত ছিল, সেগুলো তারা অবশেষে বলতে শুরু করেছে।
কিন্তু এবার তাদের জীবনে তাড়াহুড়ো নেই।
কেউ কাউকে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না।
শুধু দুজন মানুষ নিজেদের অতীতকে বুঝতে শিখছে।
এরপর মাঝে মাঝে তাদের দেখা হতো।
কখনো বইয়ের দোকানে, কখনো ছোট্ট কোনো রেস্তোরাঁয়। তারা কথা বলত কাজ নিয়ে, জীবন নিয়ে, পরিবার নিয়ে।
একদিন মেঘলা অয়নকে জিজ্ঞেস করল,
— তুমি বিয়ে করোনি কেন?
অয়ন বলল,
— করিনি।
— আমার জন্য?
অয়ন একটু হেসে বলল,
— একসময় হয়তো ভেবেছিলাম, আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না। পরে বুঝেছি, মানুষ কাউকে ভালোবেসে থেমে যায় না। তবে সবার জীবনে নতুন করে শুরু করার সাহস আসে না।
মেঘলা নিচু গলায় বলল,
— তোমার কি এখনো আমাকে ভালো লাগে?
অয়ন জানালার বাইরে তাকাল।
— তোমাকে ভালো লাগার কথাটা খুব সহজ। কিন্তু সাত বছর আগের সেই মানুষটা আর আমরা দুজনের কেউই নেই।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— জানি।
— আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাই কি না, সেটা বুঝতে আমার সময় লাগবে।
মেঘলা বলল,
— তোমার যত সময় লাগে, নাও। এবার আমি কোনো উত্তর তাড়াতাড়ি চাইব না।
অয়ন তার দিকে তাকাল।
এই মেয়েটি একসময় তার কাছ থেকে নিশ্চয়তা চেয়েছিল। আজ সে সময় দিতে শিখেছে।
আর অয়ন, যে একসময় নিজের অসহায়ত্বকে নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে রাখত, সে এবার নিজের কথা বলতে শিখছে।
তারা আবার কাছাকাছি আসছিল।
তবে আগের মতো নয়।
আগে তাদের ভালোবাসা ছিল স্বপ্নের ওপর দাঁড়ানো। এবার সেই ভালোবাসা দাঁড়াচ্ছিল সত্যের ওপর।
একদিন মেঘলা অয়নকে নিয়ে গেল একটা ছোট্ট নার্সারিতে।
সেখানে নানা রকম গাছ ছিল।
মেঘলা বলল,
— মনে আছে, আমি বলেছিলাম আমাদের বাসার বারান্দায় গাছ লাগাব?
অয়ন বলল,
— মনে আছে।
— তখন ভাবতাম, সবকিছু খুব সহজ হবে।
অয়ন একটা ছোট্ট জুঁইগাছ হাতে নিয়ে বলল,
— এবার কঠিন হলেও আমরা আগে কথা বলব। চুপ করে থাকব না।
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
— তুমি কি আবার আমার সঙ্গে একটা জীবন শুরু করতে পারবে?
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
মেঘলার হাতটা ধরে বলল,
— পারব। তবে একটা শর্ত আছে।
— কী?
— এবার কোনো কথা মনে জমিয়ে রাখব না। কষ্ট হলে বলব। ভয় পেলে বলব। ভালোবাসলে সেটাও বলব।
মেঘলার চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
— আর কাঁদলে কারণটা বলতে হবে।
মেঘলা হাসতে হাসতে চোখ মুছল।
— তোমাকে এত বছর পর পেয়েও যদি কাঁদতে না পারি, তাহলে কাঁদব কখন?
অয়ন তাকে কাছে টেনে নিল।
সাত বছর আগে যে আলিঙ্গন অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল, সেদিন তার পূর্ণতা পেল।
তাদের বিয়েটা খুব সাধারণভাবে হয়েছিল।
কোনো বড় আয়োজন ছিল না। কাছের কিছু মানুষ, পরিবারের কয়েকজন সদস্য, আর অনেক দিনের জমে থাকা আনন্দ।
মেঘলা বিয়ের দিন অয়নকে একটা ছোট্ট চিঠি দিয়েছিল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
অয়ন
একসময় তোমার কাছে ভালোবাসা চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার অসহায়ত্ব বুঝিনি। নিজের ভয়কে এত বড় করে দেখেছিলাম যে তোমার ভালোবাসাটাই দেখতে পাইনি।
তারপর অনেক বছর কেটে গেছে।
জীবন আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে নিজের কাছে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে তার পাশে দাঁড়ানোর সাহস, তার নীরবতার কারণ জানার চেষ্টা, আর ভুল হলে নিজের ভুল স্বীকার করা।
আমি জানি না, আমাদের সামনে কতটা সময় আছে। শুধু জানি, এবার তোমার সঙ্গে সেই সময়টুকু সত্যি করে বাঁচতে চাই।
কোনো স্বপ্ন ভেঙে গেলে আমরা আবার স্বপ্ন দেখব। অভিমান হলে কথা বলব। আর কোনো দিন যদি পথ হারিয়ে ফেলি, একে অপরের হাত ধরে পথ খুঁজব।
তোমার মেঘলা।
চিঠিটা পড়ে অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর মেঘলাকে বলেছিল,
— একটা কথা বলব?
— বলো।
— আমাদের বিয়ের পর প্রথম বৃষ্টিতে তোমাকে নিয়ে হাঁটতে যাব।
মেঘলা হেসে বলেছিল,
— এত বছর পরেও তোমার সেই ছাতার কথা মনে আছে?
অয়ন বলেছিল,
— ছাতার কথা না। তোমাকে প্রথম দেখার কথা।
মেঘলা তার হাত শক্ত করে ধরেছিল।
কিছু ভালোবাসা প্রথমবারে পূর্ণতা পায় না। তবু সময়, অনুশোচনা আর সত্যের ভেতর দিয়ে তারা দ্বিতীয়বার জন্ম নিতে পারে।
অয়ন আর মেঘলার ভালোবাসা তেমনই ছিল।
বিয়ের এক বছর পরের কথা।
সেদিন বিকেল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল।
অয়ন অফিস থেকে ফিরে দেখল, মেঘলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দায় বেশ কয়েকটি গাছ। জুঁইগাছটিতে সাদা ফুল ফুটেছে।
মেঘলা পেছন ফিরে বলল,
— জানো, আজ একটা অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছিল।
— কী কথা?
— সাত বছর আগে যদি আমরা আলাদা না হতাম, তাহলে হয়তো আজও একসঙ্গে থাকতাম। কিন্তু আমরা কি তখন একে অপরকে এতটা বুঝতাম?
অয়ন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
— জানি না। তবে এখন বুঝি, শুধু ভালোবাসলেই হয় না। ভালোবাসার মানুষটাকে বুঝতেও হয়।
মেঘলা তার কাঁধে মাথা রাখল।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ।
দূরে কোথাও একটা গান বাজছিল।
মেঘলা হঠাৎ বলল,
— অয়ন?
— হুম?
— তুমি যদি সেদিন আমাকে ক্ষমা না করতে?
অয়ন তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
— তাহলে হয়তো আমরা দুজনেই আমাদের জীবনের একটা সুন্দর সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলতাম।
— তুমি কি কখনো ভেবেছিলে, আমি আবার ফিরব?
অয়ন মৃদু হাসল।
— না। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো।
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
— আর এখন?
অয়ন বলল,
— এখন চাই, তুমি আমার পাশে থেকে ভালো থেকো।
মেঘলা চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু কিছু সুখ এত সাধারণ যে, সেগুলো পেয়ে গেলে মানুষ বুঝতেই পারে না সে কত বড় সৌভাগ্যবান।
এক কাপ চা।
বারান্দায় বৃষ্টি।
পাশে প্রিয় মানুষটি।
আর বুকের ভেতর কোনো ভয় নেই।
মেঘলা আস্তে করে বলল,
— অয়ন, একটা কথা বলব?
— বলো।
— আমি তোমাকে আবার ভালোবেসেছি।
অয়ন হেসে তার কপালে চুমু খেল।
— আমিও। তবে এবার তোমাকে হারানোর ভয়ে নয়, তোমার সঙ্গে জীবন কাটানোর আনন্দে।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।
জুঁইফুলের গন্ধে বারান্দাটা ভরে উঠেছিল।
অয়ন মেঘলার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মনে পড়ল, বহু বছর আগে এমনই এক বৃষ্টির দিনে একটা মেয়ে ছাতা ছাড়া বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
সেদিন সে মেয়েটিকে ছাতা দিয়েছিল।
আজ সেই মেয়েটিই তার ঘরের মানুষ।
জীবন কখনো কখনো মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। ভুল করায়, কাঁদায়, একা করে দেয়। তারপর কোনো এক অপ্রত্যাশিত সন্ধ্যায় ফিরিয়ে দেয় সেই মানুষটির কাছেই, যার পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীটাকে আবার নিজের বলে মনে হয়।
অয়ন জানত না, তাদের জীবনে সামনে আর কী কী অপেক্ষা করছে।
তবে এবার সে ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি ভয় পেত না।
কারণ সে শিখেছিল, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা কোনো প্রতিশ্রুতি নয়।
সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা হলো—দুজন মানুষ যখন কঠিন সময়েও একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে, ভুল স্বীকার করতে আর পাশাপাশি দাঁড়াতে রাজি থাকে।
মেঘলা তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
— অয়ন, বৃষ্টি থেমে গেলে আমরা একটু হাঁটতে যাব?
অয়ন বলল,
— বৃষ্টি থামার অপেক্ষা কেন?
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
অয়ন ছাতাটা হাতে নিয়ে বলল,
— চলো। এবার একসঙ্গে ভিজি।
মেঘলা হেসে উঠল।
সেই হাসির শব্দ অয়নের খুব চেনা।
শুধু পার্থক্য একটাই—একসময় এই হাসি শোনার জন্য তাকে বাড়ি ফিরে অপেক্ষা করতে হতো। এখন সেই হাসি তার ঘরের ভেতর, তার জীবনের ভেতর, প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তে বেঁচে থাকে।
দুজন এক ছাতার নিচে বেরিয়ে গেল।
রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসছিল।
মেঘলা অয়নের কাঁধে মাথা রেখে হাঁটছিল।
আর অয়ন ভাবছিল, কিছু গল্পের শেষ হয়তো বিচ্ছেদে লেখা থাকে না। কখনো কখনো বিচ্ছেদই মানুষকে শেখায়, ফিরে পাওয়া ভালোবাসাটাকে কীভাবে আগলে রাখতে হয়।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.