অরণ্য ছেলেটা একটু অদ্ভুত ধরনের।
তার ধারণা, পৃথিবীতে মানুষ দুই রকমের। একদল মানুষ কষ্ট পেলে দূরে সরে যায়, আরেক দল কষ্ট পেয়েও সেই মানুষটার কাছেই ফিরে যায়, যে তাকে কষ্ট দিয়েছে।
অরণ্য দ্বিতীয় দলের মানুষ।
তানিয়া নামের একটা মেয়ে তাকে যতবার কষ্ট দিয়েছে, অরণ্য ততবার ভেবেছে, এই শেষ। আর না। এবার সত্যি সত্যি নিজেকে সরিয়ে নেবে। মেয়েটার সঙ্গে কথা বলবে না, তার ফোনের অপেক্ষায় থাকবে না, রাতে ঘুমানোর আগে পুরোনো কথোপকথনগুলো পড়বে না।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, তানিয়া একটু হেসে কথা বললেই অরণ্যের সব প্রতিজ্ঞা বাতিল হয়ে যায়।
মেয়েটা শুধু জিজ্ঞেস করে, কী করো, অরণ্য?
অরণ্য তখন এমনভাবে উত্তর দেয়, যেন তার জীবনে এর চেয়ে সুন্দর প্রশ্ন আর কেউ কখনো করেনি।
কিছু না। তুমি?
তানিয়া বলে, আমিও কিছু না।
ব্যস। অরণ্যের দিন ভালো হয়ে যায়।
অথচ এই মেয়েটাই একদিন তার চোখে জল এনেছিল। এই মেয়েটার একটা ছোট্ট অবহেলায় অরণ্যের সারারাত ঘুম হয়নি। এই মেয়েটার একটা উত্তর না পাওয়ার জন্য সে কতবার ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থেকেছে, তার কোনো হিসাব নেই।
তবু তানিয়া যখন ফিরে আসে, অরণ্য তাকে কিছুই বলতে পারে না।
শুধু ভাবে, মেয়েটা ফিরে এসেছে। এই তো অনেক।
তানিয়ার সঙ্গে অরণ্যের পরিচয় হয়েছিল একটা বৃষ্টির বিকেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে অরণ্য দাঁড়িয়ে ছিল। বৃষ্টি তখন বেশ জোরে হচ্ছে। আশপাশের সবাই ছুটোছুটি করছে। কেউ রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
অরণ্য বৃষ্টি দেখছিল।
তার বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে। বৃষ্টি হলে তার মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কাউকে প্রশ্ন করবে না, কেউ কারও কাছে কোনো ব্যাখ্যা চাইবে না।
ঠিক সেই সময় পাশে এসে দাঁড়াল একটা মেয়ে।
মেয়েটার হাতে নীল মলাটের একটা বই। কপালের কাছে কয়েকটা চুল ভিজে আছে।
সে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলল, “বৃষ্টি হলে আপনার মন খারাপ হয়?”
অরণ্য একটু অবাক হলো।
সব সময় না। তবে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মন খারাপ করার একটা আলাদা আনন্দ আছে।
মেয়েটা হেসে ফেলল।
আপনি খুব অদ্ভুত কথা বলেন।
অরণ্য বলল, এটা আমার একটা বদভ্যাস।
নাম কী আপনার?
অরণ্য।
বাহ! মানুষের নাম অরণ্য হয়?
অরণ্য মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার নাম কী?
তানিয়া।
অরণ্য মনে মনে নামটা একবার উচ্চারণ করল। তানিয়া।
কিছু কিছু নাম প্রথমবার শুনেই মনে হয়, নামটা আগে কোথাও শুনেছি। হয়তো কোনো পুরোনো স্বপ্নে, হয়তো এমন কোনো গল্পে, যার শেষটা এখনো লেখা হয়নি।
তানিয়ার নাম শুনে অরণ্যের ঠিক তেমনই মনে হয়েছিল।
সেদিন বৃষ্টি থামার পর তারা আলাদা পথে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে তানিয়া বলেছিল, আচ্ছা, আবার দেখা হবে তো?
অরণ্য বলেছিল, হবে।
কেন বলেছিল, সে জানত না।
তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, তাদের আবার দেখা হয়েছিল।
তারপর আরও কয়েকবার।
তারপর পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে অপেক্ষা, আর অপেক্ষা থেকে এমন এক ভালো লাগা—যার কোনো নাম অরণ্য প্রথম দিকে দিতে চায়নি।
কারণ, নাম দিয়ে ফেললে হারানোর ভয়টা বেড়ে যায়।
তানিয়া কথা বলতে ভালোবাসত। তবে সব সময় অরণ্যের সঙ্গে নয়।
কোনো দিন সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত। তার ছোটবেলার গল্প, বাসার বিড়ালটার গল্প, তার মায়ের রান্না, তার প্রিয় গান—সবকিছু।
অরণ্য মন দিয়ে শুনত।
তানিয়া যখন হাসত, অরণ্যের মনে হতো, এই পৃথিবীতে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলোর জন্য বেঁচে থাকা যায়।
আবার কোনো দিন তানিয়া এমনভাবে চুপ করে থাকত, যেন অরণ্য তার পরিচিত কেউ নয়।
অরণ্য তখন নিজেকে বোঝাত, মেয়েটা হয়তো ব্যস্ত। সবারই তো নিজের জীবন আছে। সব সময় কথা বলার সুযোগ হয় না।
কিন্তু গভীর রাতে যখন ফোনের পর্দায় তানিয়ার নামটা দেখা যেত না, তখন যুক্তিগুলো আর কাজে লাগত না।
সে পুরোনো কথোপকথন খুলে বসত।
তানিয়া একদিন লিখেছিল, তুমি থাকলে আমার মন ভালো হয়ে যায়।
অরণ্য কথাটা কতবার পড়েছে, তার হিসাব নেই।
কখনো কখনো মনে হতো, মেয়েটা হয়তো সত্যিই তাকে ভালোবাসে। শুধু প্রকাশ করতে পারে না।
আবার কখনো মনে হতো, কথাটা সে এমনিই বলেছিল। মানুষ তো কত কথাই বলে।
এক রাতে অরণ্য তানিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি কি আমাকে কখনো মিস করো?”
তানিয়া উত্তর দিয়েছিল, হঠাৎ এসব প্রশ্ন কেন?
অরণ্য লিখেছিল, এমনি জানতে ইচ্ছে করল।
তানিয়া বলেছিল, তুমি অনেক বেশি ভাবো, অরণ্য।
অরণ্য আর কিছু লেখেনি।
সেদিন রাতে সে অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল।
বাইরে চাঁদ ছিল না। পাশের বাড়ির ছাদে একটা বিড়াল বসে ছিল। বিড়ালটা মাঝেমধ্যে অকারণে ডাকছিল।
অরণ্যের মনে হলো, বিড়ালটারও হয়তো কারও জন্য মন খারাপ।
তারপর নিজের এই ভাবনা শুনে সে নিজেই একটু হেসেছিল।
মানুষ প্রেমে পড়লে অদ্ভুত হয়ে যায়। নিজের কষ্টের সঙ্গে পৃথিবীর সবকিছুর মিল খুঁজে পায়।
একদিন তানিয়া অরণ্যের সঙ্গে কথা দেওয়ার পরও কথা বলেনি।
সেদিন অরণ্যের মন এমনিতেই খারাপ ছিল। অফিসে ঝামেলা হয়েছে, বাসায় ফিরে মায়ের সঙ্গে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছে। তার ওপর তানিয়ার সঙ্গে একটু কথা বলার ইচ্ছে ছিল।
তানিয়া বলেছিল, রাতে ফোন করবে।
অরণ্য রাত আটটা থেকে অপেক্ষা করতে শুরু করল।
নয়টা বাজল।
দশটা বাজল।
রাত এগারোটার দিকে সে একটা বার্তা পাঠাল।
ব্যস্ত আছ?
কোনো উত্তর নেই।
আরেকটা বার্তা লিখল।
সব ঠিক আছে তো?
সেটাও পাঠাল না। মনে হলো, বারবার বার্তা পাঠালে তানিয়া বিরক্ত হতে পারে।
রাত বারোটার পর অরণ্য ফোনটা পাশে রেখে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম এল না।
তার মনে হতে লাগল, সে হয়তো কোনো ভুল করেছে। হয়তো আগের দিন বেশি কথা বলেছে। হয়তো তানিয়া তার কোনো কথায় কষ্ট পেয়েছে।
অরণ্য নিজের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করল।
কোথায় ভুল হয়েছে?
কিছুই মনে পড়ল না।
তবু সে মনে মনে ক্ষমা চাইল।
এই ব্যাপারটা তার নিজের কাছেও হাস্যকর লাগত। যে ভুলটা সে করেনি, সেই ভুলের জন্যও তানিয়ার কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করত তার।
কারণ, সে তানিয়াকে হারাতে চাইত না।
পরদিন দুপুরে তানিয়ার বার্তা এল।
কী করো, বোকা?
অরণ্য তখন অফিসে বসে ছিল। বার্তাটা পড়ে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? এত হাসছ কেন?
অরণ্য বলল, কিছু না।
তানিয়া আবার লিখল, রাগ করেছ?
অরণ্য অনেক কিছু বলতে চেয়েছিল।
বলতে চেয়েছিল, হ্যাঁ, রাগ করেছি। গতকাল তোমার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করেছি জানো? একটা ফোনের জন্য আমার রাত কেটে গেছে। তুমি জানো না, তোমার নীরবতা আমাকে কতটা অসহায় করে তোলে।
কিন্তু সে লিখল, না, রাগ করিনি।
তানিয়া একটা হাসির ইমোজি পাঠাল।
অরণ্য ফোনটা বুকে চেপে ধরেনি, সিনেমার মতো জানালার দিকে তাকিয়েও থাকেনি। সে শুধু নিজের কাজে ফিরে গেল।
তবু সেদিন অনেক দিন পর তার মনে হলো, দিনটা বোধহয় ভালোই যাবে।
বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে সে নিজের ওপর খুব রাগ করল।
এই রাগটা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
বাসায় ফিরে ডায়েরি খুলে লিখল—
জানো তানিয়া, আমি কতটা বোকা?
তুমি আমাকে কষ্ট দাও, আমি কাঁদি। তুমি কথা না বললে আমার পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যায়। অথচ তুমি যখন একটু হেসে কথা বলো, তখন মনে হয়, পৃথিবীতে কোনো কষ্টই নেই।
তুমি কি জানো, তোমার এই সামান্য হাসির কাছে আমি কতবার হেরে গেছি?
আমার কষ্টগুলো কি সত্যিই এত সস্তা, তানিয়া? নাকি তোমার একটু ভালো ব্যবহারই আমার কাছে এত দামি?”
লেখাটা শেষ করে অরণ্য ডায়েরি বন্ধ করল।
তারপর অনেকক্ষণ বসে রইল।
কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানে না। শুধু প্রশ্নগুলো বুকের মধ্যে নিয়ে বেঁচে থাকে।
এরপর কয়েক দিন তানিয়ার সঙ্গে অরণ্যের কথা হয়নি।
অরণ্য এবার ঠিক করল, সে আর আগে থেকে ফোন করবে না। কোনো বার্তা পাঠাবে না। তানিয়া যদি কথা বলতে চায়, তাহলে সে কথা বলবে।
প্রথম দিন খুব কষ্ট হলো।
দ্বিতীয় দিন আরও বেশি।
তৃতীয় দিন অরণ্য একটু স্বাভাবিক হলো।
সে অফিস করল, বন্ধুদের সঙ্গে চা খেল, রাতে একটা বই পড়তে চেষ্টা করল। কিন্তু বইয়ের একই পৃষ্ঠা বারবার পড়তে হলো।
তানিয়ার কথা মনে পড়ছিল।
তবে এবার সে নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করল।
ঠিক সেই সময় সন্ধ্যায় তানিয়ার ফোন এল।
অরণ্য ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল।
ফোনটা বেজে যাচ্ছে।
তার ইচ্ছে করছিল সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলে। আবার ইচ্ছে করছিল, না ধরতে। তানিয়া বুঝুক, তারও অভিমান হয়। তারও কষ্ট লাগে।
ফোন কেটে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোন এল।
অরণ্য এবার ধরল।
হ্যালো।
ওপাশ থেকে তানিয়া বলল, কী ব্যাপার? ফোন ধরছ না কেন?
অরণ্য বলল, একটু ব্যস্ত ছিলাম।
তুমি ব্যস্ত?
তানিয়ার কণ্ঠে এমন বিস্ময় ছিল, যেন অরণ্যের নিজের কোনো কাজ থাকতে পারে, এটা সে কখনো ভাবেনি।
অরণ্য একটু হেসে বলল, হ্যাঁ, আমারও মাঝে মাঝে কাজ থাকে।
তানিয়া হেসে ফেলল।
তুমি না, সত্যিই একটা বোকা!
অরণ্যও হেসে ফেলল।
তারপর তারা অনেকক্ষণ কথা বলল। তানিয়া তার দিনের গল্প করল। অরণ্য শুনল। মাঝেমধ্যে দু-একটা কথা বলল।
ফোন রাখার পর অরণ্য বুঝতে পারল, তার সমস্ত অভিমান আবার নরম হয়ে এসেছে।
কিন্তু এবার একটা প্রশ্ন তাকে অস্বস্তিতে ফেলল।
তানিয়া কি সত্যিই তাকে ভালোবাসে?
নাকি সে জানে, অরণ্যকে ফিরে পেতে খুব বেশি কিছু করতে হয় না? একটা ফোন, একটা হাসি, দুটো আদরের কথা—ব্যস, অরণ্য আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।
অরণ্য প্রশ্নটার উত্তর জানত না।
শুধু জানত, সে তানিয়াকে ভালোবাসে।
আর এই ভালোবাসার মধ্যে তার নিজের একটা দুর্বলতা আছে, যে দুর্বলতাকে সে বহু দিন ধরে ভালোবাসা বলে মেনে এসেছে।
একদিন বিকেলে তানিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গেল অরণ্য।
তারা একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁয় বসেছিল। জানালার পাশে টেবিল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। অরণ্যের হঠাৎ সেই প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে গেল।
তানিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, কী ভাবছ?
কিছু না।
তোমার এই কিছু না কথাটা আমার একদম ভালো লাগে না।
অরণ্য হাসল।
তাহলে কী বলব?
যা ভাবছ, তা-ই বলো।
অরণ্য কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তানিয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
করো।
আমি কি তোমাকে বিরক্ত করি?
তানিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
এমন কথা কেন?
এমনি।
তুমি সব সময় এমন করো কেন? একটা সাধারণ কথাকেও কত জটিল করে ফেলো!
অরণ্য মাথা নিচু করল।
তানিয়া আবার বলল, তুমি জানো, তোমার একটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগে?
অরণ্য তাকাল।
কী?
তুমি আমার ওপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারো না। আমি একটু ভালো করে কথা বললেই সব ভুলে যাও।
তানিয়া কথাটা বলে হেসে ফেলল।
অরণ্যও হাসল।
কিন্তু তার হাসিটা বেশিক্ষণ থাকল না।
সে ভাবল, তানিয়া কি জানে, এই কথাটা শুনে তার কেমন লাগছে?
যে মানুষটার একটা হাসি তার কাছে এত মূল্যবান, সেই মানুষটাই যদি তার দুর্বলতাকে খুব সাধারণ একটা ব্যাপার মনে করে, তাহলে কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কী করার থাকে?
অরণ্য ধীরে ধীরে বলল, তানিয়া, আমি তোমার ওপর রাগ করে থাকতে পারি না। এটা সত্যি।
জানি তো।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমার কষ্ট হয় না।
তানিয়া চুপ করে গেল।
অরণ্য বলল, তুমি যখন কথা দিয়ে কথা রাখো না, আমার খারাপ লাগে। তুমি যখন আমার বার্তার উত্তর না দিয়ে দিনের পর দিন চুপ করে থাকো, আমার মনে হয় আমি হয়তো তোমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নই। তারপর তুমি যখন একটু হেসে কথা বলো, আমি সব ভুলে যাই। তোমাকে আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। আবার আশা করতে ইচ্ছে করে।
সে একটু থামল।
আমি জানি না, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। কিন্তু আমি তোমাকে যতটা ভালোবাসি, তার মধ্যে অনেক ভয় আছে। তোমাকে হারানোর ভয়। তোমার কাছে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাওয়ার ভয়।
তানিয়া কাপের দিকে তাকিয়ে রইল।
অরণ্য বলল, আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। শুধু চাই, কোনো দিন আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে না করলে সেটা বলে দিও। ব্যস্ত থাকলে বলে দিও। কিন্তু আমাকে এমনভাবে অপেক্ষা করিয়ে রেখো না, যেন আমি বুঝতেই না পারি, তোমার জীবনে আমার জায়গাটা কোথায়।
তানিয়া অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
রেস্তোরাঁর এক কোণে একটা ছোট ছেলে তার মায়ের কাছে আইসক্রিম চাইছিল। মা তাকে বোঝাচ্ছিলেন, বৃষ্টির মধ্যে আইসক্রিম খেলে ঠান্ডা লাগবে।
অর্ণ্যের দৃশ্যটা দেখে অকারণে মন খারাপ হয়ে গেল।
কিছু মানুষকে বোঝানোর জন্য আমাদের এত কথা বলতে হয় কেন?
যে মানুষটাকে ভালোবাসি, সে কি একবারও বুঝতে পারে না, তার সামান্য অবহেলায় আমাদের কতটা কষ্ট হয়?
তানিয়া ধীরে বলল, আমি জানতাম না, তুমি এত কষ্ট পাও।
অরণ্য মৃদু হেসে বলল, আমি তো কখনো ঠিক করে বলিনি।
কেন বলোনি?
ভয় পেতাম।
কীসের ভয়?
অরণ্য জানালার বাইরে তাকাল।
তুমি যদি ভাবো, আমি খুব বেশি ভালোবাসি। তুমি যদি বিরক্ত হয়ে যাও।
তানিয়া এবার তার দিকে তাকাল।
অরণ্য বলল, মানুষ কখনো কখনো যাকে হারাতে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, তার কাছেই নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে না।
তানিয়া চুপ করে রইল।
সেদিন তাদের কথা শেষ হয়েছিল। কিন্তু কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি হয়নি। তানিয়া বলেনি, সে আর কখনো অরণ্যকে কষ্ট দেবে না। অরণ্যও বলেনি, সে সব সময় অপেক্ষা করবে।
তারা শুধু পাশাপাশি বসে বৃষ্টি দেখেছিল।
কখনো কখনো একটা সম্পর্ককে বাঁচানোর জন্য বড় কোনো কথা লাগে না। লাগে একটু সত্যি কথা বলার সাহস।
সেদিনের পর তানিয়া বদলে গিয়েছিল কি না, অরণ্য নিশ্চিত ছিল না।
কিছু দিন সে আগের চেয়ে বেশি খোঁজ নিত। কখনো নিজে ফোন করত। অরণ্যের মন খারাপ বুঝতে পারলে জানতে চাইত, কী হয়েছে?
অরণ্য অবাক হতো।
মনে মনে ভাবত, এই তো সেই তানিয়া, যাকে সে এত দিন ধরে খুঁজেছে।
আবার কোনো দিন তানিয়া নিজের জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। তখন অরণ্যের কষ্ট হতো। পুরোনো অভ্যাস ফিরে আসতে চাইত। কিন্তু সে নিজেকে বোঝাত, একজন মানুষকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি মুহূর্তের অধিকারী হয়ে যাওয়া নয়।
তানিয়ার নিজের জীবন আছে।
অরণ্যেরও আছে।
ভালোবাসা তাদের জীবনের সুন্দর একটা অংশ হতে পারে, কিন্তু একে অন্যের সমস্ত পৃথিবী হয়ে ওঠার চাপটা হয়তো সব সময় ভালোবাসার জন্যও ভালো নয়।
এক সন্ধ্যায় তানিয়া ফোন করে বলল, অরণ্য, তোমাকে একটা কথা বলব।
বলো।
তুমি কি আমার ওপর এখনো রাগ করে আছ?
অরণ্য একটু ভেবে বলল, কিছুটা।
তানিয়া অবাক হলো।
সত্যি?
হ্যাঁ।
তাহলে তো তুমি বদলে গেছ!
অরণ্য হেসে বলল, না। শুধু এখন রাগ হলেও সেটা লুকাই না।
তানিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তোমাকে একটা কথা বলি?
বলো।
তুমি আমার জীবনে আছ, এটা আমি অনেক সময় বুঝতে পারি না। কারণ, তুমি সব সময় আছ বলেই হয়তো তোমার থাকাটাকে সহজ মনে হয়। কিন্তু তুমি যখন একটু চুপ করে যাও, তখন বুঝতে পারি, তোমার সঙ্গে কথা না বললে আমার দিনটাও কেমন ফাঁকা লাগে।
অরণ্য কোনো উত্তর দিতে পারল না।
তানিয়া আবার বলল, আমি জানি না, আমি তোমাকে তোমার মতো করে ভালোবাসতে পেরেছি কি না। হয়তো পারিনি। কিন্তু আমি চেষ্টা করতে চাই।
অরণ্যের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো।
সে তানিয়াকে ভালোবাসত। এই কথাটা শুনে তার সমস্ত কষ্ট এক মুহূর্তে মুছে গেল না, কিন্তু কষ্টের পাশে ছোট্ট একটা আশার আলো জ্বলে উঠল।
সে বলল, আমিও চাই, তানিয়া।
কী চাও?
আমরা দুজনেই চেষ্টা করি। শুধু আমি একা যেন সবকিছু সামলাতে না যাই।
ওপাশ থেকে তানিয়া বলল, আচ্ছা।
একটা ছোট্ট শব্দ।
কিন্তু অরণ্য সেদিন শব্দটার মধ্যে কোনো প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি কিছু খুঁজে পেল—একটু বোঝার চেষ্টা, একটু কাছে আসার ইচ্ছা।
আর কখনো কখনো ভালোবাসার শুরুটা বোধহয় এখানেই।
অনেক দিন পর এক শীতের বিকেলে তারা আবার সেই পুরোনো লাইব্রেরির সামনে দেখা করল।
বৃষ্টি ছিল না। আকাশ পরিষ্কার। বাতাসে হালকা ঠান্ডা।
তানিয়া একটা শাল গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অরণ্য কাছে যেতেই সে হেসে বলল, দেরি করলে কেন?
অরণ্য বলল, রাস্তার জ্যাম।
মিথ্যা কথা।
কীভাবে বুঝলে?
তোমার মুখ দেখেই।
অরণ্য হাসল।
তানিয়া তার দিকে তাকিয়ে বলল, জানো, তোমার হাসিটা আমার খুব ভালো লাগে।
অরণ্য একটু অবাক হলো।
আমার হাসি?
হ্যাঁ। তুমি যখন হাসো, তখন মনে হয় তোমার কোনো দুঃখ নেই।
অরণ্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল, সব সময় হাসি মানেই যে মন ভালো, তা তো নয়।
তানিয়া এবার আর হাসল না।
সে অরণ্যের হাতটা ধরে বলল, জানি।
তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
রাস্তার পাশে শুকনো পাতা জমে আছে। একটা ছোট মেয়ে বাবার হাত ধরে হাঁটছে। দূরে চায়ের দোকানে কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছে।
তানিয়া হঠাৎ বলল, অরণ্য?
হুম?
তুমি আমাকে একটা কথা বলবে?
কী?
তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন?
অরণ্য হেসে বলল, জানি না।
কিছুই জানো না তুমি!
কিছু কিছু ব্যাপার না জানাই ভালো।
তানিয়া একটু অভিমানী গলায় বলল, তোমার সব কথার উত্তর এমন কেন?
অরণ্য এবার থেমে গেল।
তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, বলি। তোমার হাসি আমার ভালো লাগে। তুমি মন খারাপ করলে আমার খারাপ লাগে। তুমি কোনো একটা গল্প বলতে বলতে হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলে আমার হাসি পায়। তুমি রাগ করলে তোমাকে বোঝাতে ইচ্ছে করে। আর তুমি যখন অনেক দিন পর নিজের থেকে ফোন করে বলো, ‘কী করো, অরণ্য?’ তখন আমার মনে হয়, কেউ একজন পৃথিবীর কোথাও আমাকে মনে রেখেছে।
তানিয়া স্থির হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
অরণ্য বলল, তবে একটা কথা জানো? আমি তোমাকে ভালোবাসি বলে আমার কষ্টগুলো ছোট হয়ে যায় না। আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই চাই, তুমি আমার কষ্টগুলোও বুঝতে চেষ্টা করো।
তানিয়া ধীরে ধীরে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
চেষ্টা করব, অরণ্য।
অরণ্য জানত না, ভবিষ্যতে কী হবে। মানুষ সব সময় নিজের কথা রাখতে পারে না। ভালোবাসার মানুষও ভুল করে, কষ্ট দেয়, কখনো কখনো দূরে সরে যায়।
তবু সেদিন তানিয়ার কথাটা শুনে তার ভালো লাগল।
কারণ, ভালোবাসার জন্য সব সময় নিশ্চয়তা দরকার হয় না। কখনো কখনো দরকার হয় দুজন মানুষের একসঙ্গে চেষ্টা করার ইচ্ছা।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে অরণ্য ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা ছিল সেই পুরোনো কথাগুলো—
জানো, আমি কতটা বোকা? এতটাই বোকা যে, কেউ একটু হেসে কথা বললেই সব ভুলে যাই। অথচ সেই মানুষটাই অনেকবার আমার চোখে জল এনেছে, আমার মন ভেঙেছে।
অরণ্য লেখাটা অনেকক্ষণ পড়ল।
তারপর নিচে নতুন করে লিখল—
হ্যাঁ, আমি বোকা।
তানিয়া একটু হেসে কথা বললে এখনো আমার মন ভালো হয়ে যায়। তার কণ্ঠ শুনলে এখনো মনে হয়, পৃথিবীটা বোধহয় এত খারাপ নয়। সে নিজের থেকে খোঁজ নিলে এখনো আমার ভেতরে ছোট্ট একটা আনন্দ হয়।
আমি জানি, এই ভালোবাসায় আমার দুর্বলতা আছে।
কিন্তু আমি আর নিজের কষ্টকে অস্বীকার করতে চাই না।
আমি তানিয়াকে ভালোবাসব। তার জন্য অপেক্ষাও করব। তার হাসিতে আনন্দ পাব, তার মন খারাপ হলে পাশে থাকতে চাইব। তবে নিজের মন খারাপের দিনেও তার কাছে সত্যি কথাটা বলতে চাই।
আমি চাই না, তানিয়া শুধু আমার ভালো থাকার মানুষ হোক। আমি চাই, আমার খারাপ থাকার দিনগুলোতেও সে আমাকে চিনুক।
কারণ, আমি সব সময় শক্ত থাকতে পারি না।
কখনো কখনো আমারও খুব ইচ্ছে করে, কেউ একজন আমার কণ্ঠ শুনেই বুঝে ফেলুক—আজ অরণ্যের মন ভালো নেই।
কেউ একজন বলুক, কী হয়েছে? বলো, আমি শুনছি।
আমি তানিয়ার কাছে খুব বেশি কিছু চাই না।
শুধু চাই, আমার ভালোবাসাটাকে সে কখনো এত সহজ ভেবে না বসুক যে, আমাকে কষ্ট দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায়।
আমি বোকা হতে পারি, কিন্তু আমার হৃদয়টা খেলনা নয়।
এই হৃদয়ও যত্ন চায়।
এই হৃদয়ও একটু আশ্বাস চায়।
আর সবচেয়ে বেশি চায়, যাকে ভালোবাসে, তার কাছেই যেন নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে না হয়।
লেখা শেষ করে অরণ্য কলমটা রেখে দিল।
বাইরে তখন রাত গভীর হয়েছে। পাশের বাড়ির বাতি নিভে গেছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।
অরণ্য ফোনটা হাতে নিল।
তানিয়ার কোনো বার্তা নেই।
আগে হলে হয়তো সে পুরোনো কথোপকথন খুলে বসত। শেষ কবে তানিয়া নিজে থেকে কথা বলেছে, সেটা হিসাব করত। ভাবত, আজ কেন ফোন করল না? তার কি অরণ্যের কথা মনে পড়েনি?
আজও তার তানিয়ার কথা মনে পড়ল।
খুব মনে পড়ল।
কিন্তু সে ফোনটা নামিয়ে রাখল। নিজেকে বোঝাল, তানিয়াকে ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের রাতটুকুও তার নিজের।
ঠিক তখনই ফোনের পর্দায় একটা বার্তা জ্বলে উঠল।
তানিয়া লিখেছে—
ঘুমিয়ে পড়েছ, বোকা?
অরণ্য বার্তাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হাসল।
সেই পুরোনো হাসি। সেই পরিচিত আনন্দ।
তার আঙুল উত্তর লেখার জন্য এগিয়ে গেল। সে লিখল—
না। তোমার কথা ভাবছিলাম।
কিছুক্ষণ পর আবার লিখল—
তবে আজ একটা কথা বলব, তানিয়া। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু কোনো দিন আমার মন খারাপ থাকলে, সেদিনও যেন তোমাকে বলতে পারি। তোমার হাসির আড়ালে আমার কান্নাটুকুও যেন লুকিয়ে রাখতে না হয়।
বার্তাটা পাঠিয়ে অরণ্য ফোনটা পাশে রাখল।
কয়েক মিনিট পর তানিয়ার উত্তর এল।
আচ্ছা, অরণ্য। বলবে। আমি শুনব।
অরণ্য বার্তাটা পড়ল।
দ্বিতীয়বার পড়ল।
তারপর ফোনটা বুকের কাছে ধরে চোখ বন্ধ করল।
না, সে জানত না এই কথাটা তানিয়া কত দিন মনে রাখবে। জানত না, তাদের গল্পের শেষটা কোথায়। শুধু এইটুকু জানত, এই মুহূর্তে তার মনটা একটু ভালো লাগছে।
মানুষ বোধহয় এমনই।
একটু যত্ন পেলে আবার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। একটু ভালোবাসা পেলে আবার স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে।
অরণ্যও স্বপ্ন দেখল।
খুব বড় কোনো স্বপ্ন নয়।
একদিন তানিয়া তার কণ্ঠ শুনেই বুঝবে, তার মন ভালো নেই। কোনো প্রশ্ন না করেই পাশে বসবে। তার হাতটা ধরে বলবে, আজ তোমার কথা আমি শুনব।
সেদিন অরণ্য হয়তো কিছুই বলবে না।
শুধু তানিয়ার হাতটা ধরে বসে থাকবে।
কারণ, সব দুঃখের গল্প মুখে বলতে হয় না। কখনো কখনো একজন মানুষের পাশে নিশ্চিন্তে চুপ করে বসে থাকতে পারাটাই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
আর অরণ্য?
সে হয়তো সারাজীবনই একটু বোকা থেকে যাবে।
তানিয়া হাসলে তার মন ভালো হবে। তানিয়া কষ্ট দিলে তার চোখে জল আসবে। তানিয়া দূরে গেলে তাকে মনে পড়বে।
তবে সে একটা জিনিস শিখে ফেলেছে।
ভালোবাসার মানুষকে ক্ষমা করা যায়, তার জন্য অপেক্ষা করা যায়, তার ভুল বোঝাবুঝিও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ভালোবাসার নামে নিজের সমস্ত কষ্টকে মিথ্যা বলে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
কারণ, যে হৃদয় অন্য একজনকে এতটা ভালোবাসতে পারে, সেই হৃদয় নিজের কাছেও একটু ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য।
তানিয়া হয়তো কোনো দিন অরণ্যের সব বোকামির মানে বুঝবে। হয়তো বুঝবে না।
তবু অরণ্য তার জন্য ভালোবাসার একটা দরজা খোলা রাখবে।
তবে এবার দরজার পাশে নিজের জন্যও একটা ছোট্ট জানালা রাখবে।
যেখান দিয়ে আলো আসবে।
যেখান দিয়ে বাতাস আসবে।
আর কোনো দিন মন খারাপ হলে, অরণ্য সেই জানালাটা খুলে নিজেকেও বলবে—
কষ্ট পেয়েছ, অরণ্য? আচ্ছা, আজ একটু কাঁদো। সব সময় হাসতে হয় না।
কারণ, ভালোবাসার গল্পে শুধু তানিয়ার হাসি থাকলেই হবে না।
অরণ্যের চোখের জলটুকুরও একটা জায়গা থাকতে হবে।
আর যদি কোনো দিন তানিয়া সত্যিই অরণ্যকে ভালোবাসে, তাহলে সে শুধু সেই বোকা ছেলেটার হাসিটাই ভালোবাসবে না—তার অভিমান, তার নীরবতা, তার ভেঙে পড়া মনটাকেও একটু মায়া দিয়ে আগলে রাখবে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.