শীতের বিকেল। জানালার কাচে হালকা কুয়াশা জমেছে। বাইরে শুকনো পাতাগুলো বাতাসে উড়ছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
বারান্দায় বসে আছে অর্ণব। হাতে এক কাপ চা। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে তাকিয়ে আছে সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে। গাছটাতে এখন আর ফুল নেই। কয়েকটা শুকনো পাতা ডালে ঝুলে আছে। অর্ণবের গাছটাকে ভালো লাগে। গাছটার মধ্যে তার নিজের জীবনের সঙ্গে একটা মিল আছে।
একসময় তারও কত স্বপ্ন ছিল!
কত জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছা, কত কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। মনে হতো, জীবন মানেই ছুটে চলা। একটু ভালো থাকার জন্য আরও কিছু অর্জন করতে হবে। পৃথিবীর কাছে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।
এখন আর তেমন কিছু মনে হয় না।
বয়স বাড়লে মানুষের চাওয়াগুলো বোধহয় ছোট হয়ে আসে। আগে যে জিনিসটার জন্য সারারাত ঘুম হতো না, এখন সেটা মনে পড়লেও খুব একটা খারাপ লাগে না। অথচ ছোট্ট একটা বিষয় মন খারাপ করিয়ে দেয়।
যেমন, আজ বিকেলে মেঘলা তার সঙ্গে চা খেতে আসেনি।
মেঘলা অর্ণবের স্ত্রী। তাদের সংসারের বয়স অনেক হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কত রকম দিন যে গেছে! কখনো খুব ভালো, কখনো খুব খারাপ। কখনো দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ থেকেছে। আবার মাঝরাতে একজনের ঘুম ভেঙে গেলে অন্যজনের গায়ে হাত রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তাদের ভালোবাসার মধ্যে বিশেষ কোনো গল্প নেই। অন্তত বাইরে থেকে দেখলে তেমন মনে হবে না।
তবু অর্ণব জানে, তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটার নাম মেঘলা।
হঠাৎ ভেতরের ঘর থেকে মেঘলা বেরিয়ে এল। তার গায়ে একটা পুরোনো শাল। চুলগুলো এলোমেলো। বয়সের কারণে হাঁটতে একটু ধীর হয়ে গেছে।
মেঘলা এসে বলল, চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
অর্ণব চায়ের কাপের দিকে তাকাল।
হ্যাঁ।
তাহলে খাচ্ছ না কেন?
এমনি।
মেঘলা পাশের চেয়ারে বসে পড়ল। তারপর বলল, তোমার আজকাল এমনি কথাটা খুব বেড়েছে।
অর্ণব হাসল।
বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো। বুড়ো মানুষের কথা কমে যায়।
মেঘলা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, নিজেকে বুড়ো বলবে না তো! তোমার বয়স কত হয়েছে?
অর্ণব বলল, সেটা মনে নেই।
মিথ্যা কথা।
সত্যি। বয়স মনে রাখার দরকার কী? বয়স দিয়ে কী হবে?
মেঘলা আর কথা বাড়াল না। সে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর বলল, আজ বিকেলে তোমাকে একা বসে থাকতে দেখে মনে হলো, তোমার মন খারাপ।
অর্ণব মাথা নাড়ল।
না তো।
আবার এমনি?
অর্ণব এবার একটু হেসে ফেলল।
তারপর বলল, মেঘলা, একটা কথা বলি?
বলো।
আমাদের আর কতটা পথ বাকি আছে?
মেঘলা তার দিকে তাকাল। প্রশ্নটা শুনে সে একটু চুপ করে রইল।
হঠাৎ এমন কথা কেন?
এমনি জানতে ইচ্ছে হলো।
পথের হিসাব কেউ জানে?
অর্ণব বলল, জানে না। কিন্তু আমার মনে হয়, যতটুকু পথ বাকি আছে, তোমার সঙ্গে কাটিয়ে দিতে পারলে ভালো হতো।
মেঘলা কিছু বলল না।
অর্ণব আবার বলল, আগে কত কিছু করার ইচ্ছা ছিল। এখন আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। শুধু বিকেলে তোমার সঙ্গে বসে চা খেতে ইচ্ছে করে। সকালে ঘুম ভেঙে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে। রাতে ঘুমানোর আগে একবার তোমার মুখটা দেখতে ইচ্ছে করে।
মেঘলা হেসে বলল, এই তো প্রতিদিন দেখছ।
জানি।
তাহলে?
অর্ণব একটু চুপ করে থেকে বলল, প্রতিদিন দেখছি বলেই হয়তো আরও দেখতে ইচ্ছে করে।
কথাটা শুনে মেঘলা মুখ ফিরিয়ে নিল। অর্ণব বুঝতে পারল, তার স্ত্রী লজ্জা পেয়েছে। এত বছর সংসার করার পরও মেঘলা কিছু কিছু কথায় লজ্জা পায়। এই ব্যাপারটা অর্ণবের খুব ভালো লাগে।
সে মনে মনে ভাবল, মানুষকে ভালোবাসার জন্য নতুন কিছু সব সময় দরকার হয় না। একই মানুষকে বহু বছর পরেও নতুন করে ভালো লাগতে পারে।
মেঘলা বলল, চা খাবে?
খাব।
দাঁড়াও, আরেক কাপ বানিয়ে আনি।
মেঘলা উঠে চলে গেল।
অর্ণব তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ মনে হলো, এই যে মেঘলা চা বানাতে গেল, এই সাধারণ ঘটনাটাই একদিন তার কাছে খুব মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। হয়তো কোনো এক বিকেলে সে বারান্দায় একা বসে থাকবে। পাশে দ্বিতীয় চেয়ারটা খালি থাকবে। চায়ের কাপ থাকবে, কিন্তু মেঘলা থাকবে না।
ভাবনাটা আসতেই তার বুকের ভেতর কেমন যেন করল।
অর্ণব চোখ ফিরিয়ে নিল।
মানুষ বোধহয় যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তাকে হারানোর ভয়ও সবচেয়ে বেশি পায়। অথচ এই ভয়টা কাউকে বলা যায় না। বললে মানুষটা কষ্ট পাবে।
মেঘলা চা নিয়ে ফিরে এল।
দুটো কাপ টেবিলে রেখে বলল, কী ভাবছ?
অর্ণব বলল, তোমার কথা।
আমার কথা আবার কী?
অনেক কথা।
মেঘলা চায়ের কাপ হাতে নিল।
সব কথা বলো না কেন?
অর্ণব একটু হাসল। তারপর বলল, সব কথা কি বলা যায়?
মেঘলা উত্তর দিল না।
অর্ণব ধীরে ধীরে বলল, জানো মেঘলা, আগে ভাবতাম, তোমাকে সুখী করার জন্য আমাকে অনেক কিছু করতে হবে। একটা সুন্দর বাড়ি, ভালো জীবন, তোমার সব ইচ্ছে পূরণ করা। এসব নিয়ে কত চিন্তা করতাম। এখন বুঝি, তুমি পাশে থাকলে এই পুরোনো বারান্দাটাও আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।
মেঘলা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
তুমি কি আজকাল বেশি বেশি কথা বলছ?
হতে পারে।
কেন?
অর্ণব বলল, বয়স হচ্ছে। মনে হয়, কিছু কথা বলে রাখা দরকার।
মেঘলা তার দিকে তাকাল।
কী কথা?
অর্ণব মেঘলার হাতটা নিজের হাতে নিল।
এই যে তুমি আছ, এটা আমার খুব ভালো লাগে। তোমাকে নিয়ে আমার আর বিশেষ কোনো চাওয়া নেই। আমি চাই, সকালে ঘুম ভাঙলে তোমাকে দেখতে পাই। দুপুরে তুমি একবার জিজ্ঞেস করো, খেয়েছি কি না। বিকেলে আমরা একসঙ্গে চা খাই। আর রাতে ঘুমানোর আগে তুমি পাশে আছ কি না, সেটা একবার দেখে নিই।
মেঘলা মৃদু স্বরে বলল, এইটুকুই?
হ্যাঁ।
তুমি তাহলে খুব অল্পতেই সুখী।
অর্ণব বলল, আগে বুঝিনি। এখন বুঝেছি।
মেঘলা তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
আমিও তো তোমাকে ছাড়া থাকতে চাই না।
কথাটা শুনে অর্ণবের মনটা হঠাৎ ভালো হয়ে গেল। তার মনে হলো, এত বছর ধরে সে যে কথাটা শুনতে চেয়েছে, আজ মেঘলা সেটাই বলল।
অথচ কথাটা কত সহজ!
তারপর থেকে তাদের বিকেলগুলো আরও সুন্দর হয়ে উঠল।
প্রতিদিন বিকেলে তারা বারান্দায় বসত। কখনো চা খেতে খেতে পুরোনো দিনের গল্প করত। কখনো পাশের বাড়ির ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখত। কখনো কোনো কথাই হতো না। শুধু পাশাপাশি বসে থাকত।
একদিন মেঘলা বলল, মনে আছে, আমাদের বিয়ের পর তুমি একদিন আমাকে নিয়ে নদীর ধারে গিয়েছিলে?
অর্ণব বলল, মনে আছে।
সেদিন তুমি একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলে।
কী কথা?
বলেছিলে, একদিন আমরা বুড়ো হব। তখনও নাকি আমাকে নিয়ে নদীর ধারে যাবে।
অর্ণব একটু হেসে বলল, সেটা তো সত্যি।
মেঘলা বলল, এখন তো আর নদীর ধারে নিয়ে যাও না।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, চলো, আগামী শুক্রবার যাই।
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
সত্যি?
হ্যাঁ।
তোমার হাঁটতে কষ্ট হবে না?
অর্ণব বলল, একটু হবে।
তাহলে?
তুমি হাত ধরে হাঁটবে।
মেঘলা হেসে ফেলল।
তোমার সব কথার শেষ ওই এক জায়গায় এসে থামে কেন?
অর্ণবও হাসল।
কারণ, আমার হাত ধরার জন্য তুমি ছাড়া আর কেউ নেই।
মেঘলা আর কিছু বলল না। সে অর্ণবের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বসে রইল।
বাইরে তখন সূর্য ডুবছে।
অর্ণব ভাবল, মানুষের জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোকে ধরে রাখা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়। এই মুহূর্তটাও তেমন।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে মেঘলা অর্ণবকে জিজ্ঞেস করল, তুমি যদি আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পেতে, তাহলে কী করতে?
অর্ণব বলল, কেন?
এমনি। বলো না।
অর্ণব কিছুক্ষণ ভাবল।
তারপর বলল, আবার তোমাকেই বিয়ে করতাম।
মেঘলা হাসল।
আর কিছু না?
না।
কেন?
অর্ণব মেঘলার দিকে তাকাল।
কারণ, তোমাকে ভালোবেসে আমি বুঝেছি, জীবনটা কত বড় হলো, কত কিছু পেলাম—সেটা বড় কথা নয়। জীবনের শেষ দিকে এসে আমার পাশে কে বসে আছে, সেটাই আসল কথা।
মেঘলার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে অর্ণবের বুকে মাথা রাখল।
তুমি জানো, আমারও একটা ভয় হয়?
কী ভয়?
তুমি যদি আমার আগে চলে যাও?
অর্ণব চুপ করে রইল।
মেঘলা বলল, আমি জানি না, তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকব।
অর্ণব তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
এসব ভেবো না।
তবু ভাবি।
তাহলে একটা কাজ করো।
কী?
আমরা যত দিন একসঙ্গে আছি, তত দিন ভালো থাকি। ভবিষ্যতের কথা ভেবে আজকের সময়টা নষ্ট করি না।
মেঘলা মাথা তুলে তাকাল।
অর্ণব বলল, আমি তো আছি। তুমিও আছ। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের জানার দরকার নেই।
মেঘলা আবার তার বুকে মাথা রাখল।
ঘরের বাতি নিভে গেল। জানালার বাইরে শীতের বাতাস বইতে লাগল।
অর্ণব মেঘলার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবল, জীবনের কাছে তার আর কোনো দাবি নেই। সে জানে, সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। একদিন হয়তো তাদের এই বিকেলগুলোও স্মৃতি হয়ে যাবে। একদিন হয়তো পাশাপাশি হাঁটার পথটুকুও ফুরিয়ে আসবে।
তবু আজকের এই মুহূর্তটা তার কাছে পূর্ণ।
কারণ, মেঘলা তার পাশে আছে।
আর ভালোবাসা বোধহয় এটাই—পৃথিবীর সমস্ত অনিশ্চয়তার মাঝেও একজন মানুষের হাত ধরে নিশ্চিন্তে বলতে পারা, তুমি আছ, তাই আমার আর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।
পরদিন বিকেলে অর্ণব বারান্দায় এসে বসল।
দুটো চেয়ারের একটিতে সে, অন্যটি খালি।
মেঘলা তখনও ঘরের ভেতরে। অর্ণব আকাশের দিকে তাকাল। সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমে নেমে যাচ্ছে। বাতাসে শীতের গন্ধ।
কিছুক্ষণ পর মেঘলা এসে তার পাশে বসল। হাতে দুটো চায়ের কাপ।
একটা কাপ অর্ণবের হাতে দিয়ে বলল, কী দেখছ?
অর্ণব কাপটা হাতে নিয়ে মৃদু হাসল।
কিছু না। ভাবছি, এই বিকেলটা যদি অনেক দিন ধরে থাকত!
মেঘলা বলল, বিকেল কি আর কারও জন্য অপেক্ষা করে?
অর্ণব মাথা নাড়ল।
না। কিন্তু তুমি তো করতে পারো।
মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে অর্ণবের হাতটা ধরল।
আমি তো আছি।
অর্ণব আর কোনো কথা বলল না।
তার মনে হলো, এই ছোট্ট বাক্যটার মধ্যেই তার সমস্ত জীবনের উত্তর লুকিয়ে আছে।
পৃথিবীর কাছে তার অনেক কিছুই না-পাওয়া থেকে যেতে পারে। অনেক স্বপ্ন অপূর্ণ থাকতে পারে। তবু জীবনের শেষ হিসাবটা মেলাতে বসে সে যেন বলতে পারে—
আমি সবকিছু পাইনি, তবুও আমার জীবন বৃথা যায়নি। কারণ, আমার দীর্ঘ পথচলায় একজন মানুষ ছিল, যার কাছে ফিরে আসতে পেরেছি বারবার।
সেই মানুষটার নাম মেঘলা।
আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—শেষ বিকেল পর্যন্ত তাকে ভালোবেসে যেতে পারা।
সেদিন সূর্য ডুবে গেল। শীতের সন্ধ্যা নামল। অর্ণব আর মেঘলা পাশাপাশি বসে রইল। তাদের বলার মতো নতুন কোনো কথা ছিল না। তবু কেউ কারও হাত ছাড়ল না।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.