চর হাজীগঞ্জ বাজার, চরভদ্রাসন, ফরিদপুর।

জায়গাটা এমনিতেই শান্ত। বিকেল নামলে বাজারের কোলাহল ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। চায়ের দোকানগুলোতে তখনো দু-একজন মানুষ বসে থাকে, নদীর দিক থেকে ভেসে আসে মৃদু বাতাস, আর দূরের পথ ধরে বাড়ি ফেরে ক্লান্ত মানুষ।

সেদিনও তেমনই একটা বিকেল ছিল।

আকাশে রোদ ছিল, তবে সেই রোদে দুপুরের তেজ ছিল না। বাতাসে কেমন একটা বিষণ্নতা মিশে ছিল, যেন প্রকৃতি নিজেই জানত—আজ কারও জীবনে কিছু একটা শেষ হয়ে যাবে।

অরণ্য দাঁড়িয়ে ছিল চর হাজীগঞ্জ বাজারের পুরোনো চায়ের দোকানটার সামনে। হাতে আধখাওয়া চায়ের কাপ। চোখ রাস্তার দিকে, অথচ দৃষ্টি যেন কোথাও আটকে নেই।

আজ সে চলে যাবে।

চরভদ্রাসন থেকে ফরিদপুর শহর, তারপর ঢাকা। নতুন চাকরি, নতুন জীবন, নতুন ব্যস্ততা। সবাই বলছে, এমন সুযোগ বারবার আসে না। অরণ্যও জানে, কথাটা মিথ্যে নয়।

কিন্তু কেউ জানে না, এই চলে যাওয়ার সঙ্গে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা অধ্যায়ও পেছনে পড়ে থাকবে।

মেঘলা।

নামটা মনে আসতেই অরণ্যের বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো।

মেয়েটা কি আসবে?

আসার কথা নয়। গত তিন দিন ধরে তাদের কথা বন্ধ। ছোট্ট একটা ভুল বোঝাবুঝি, তার সঙ্গে দুজনেরই কিছুটা অহংকার, আর অনেকগুলো না বলা কথা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দুজনেই একে অপরকে চায়, অথচ কেউ কাউকে সেটা বোঝাতে রাজি নয়।

অরণ্য শেষবারের মতো ফোনটা বের করল।

মেঘলার নামটা স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে।

একটা মেসেজ লিখল—

আমি চলে যাচ্ছি। একবার দেখা করবে?

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মেসেজটা মুছে দিল।

তারপর নিজেকেই বোঝাল, যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় দূরে সরে গেছে, তাকে আর ডেকে কী লাভ!

অথচ সে জানত না, ঠিক তখনই চর হাজীগঞ্জ বাজারের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে মেঘলা তার ফোনের স্ক্রিনে অরণ্যের নামটার দিকে তাকিয়ে আছে।

মেয়েটাও একটা মেসেজ লিখেছিল।

তুমি কি সত্যিই চলে যাবে? একবার দেখা করে যাও না।

মেসেজটা পাঠানো হয়নি।

কারণ মেঘলার অভিমান তখনো তার ভালোবাসার চেয়ে একটু বেশি জোরে কথা বলছিল।

অথবা হয়তো ভালোবাসাটাই বেশি ছিল বলে অভিমানটা এত বড় হয়ে উঠেছিল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই অরণ্য রওনা হলো।

চরভদ্রাসনের পরিচিত পথগুলো পেছনে পড়ে যেতে লাগল। রাস্তার দুই পাশের গাছ, ছোট ছোট দোকান, নদীর দিকে চলে যাওয়া সরু পথ—সবকিছু তার কাছে হঠাৎ ভীষণ আপন মনে হতে লাগল।

মানুষ বোধহয় কোনো জায়গাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, ঠিক তখনই, যখন সে জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

অরণ্যের মনে পড়ছিল মেঘলার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা।

প্রথম দেখা হয়েছিল চর হাজীগঞ্জ বাজারের সেই চায়ের দোকানের পাশেই। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। মেঘলা একটা নীল ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, আর অরণ্য বৃষ্টিতে ভিজে দোকানের চালার নিচে আশ্রয় নিয়েছিল।

মেয়েটা হেসে বলেছিল,

— এভাবে ভিজছেন কেন? ছাতাটা দেখছেন না?

অরণ্য একটু অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।

— ছাতা তো আপনার হাতে।

— চোখ তো আপনারও আছে। চাইলে চাইতে পারতেন।

সেদিনের সেই কথাটুকু থেকেই শুরু।

তারপর ধীরে ধীরে পরিচয়, পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর বন্ধুত্বের আড়ালে অদ্ভুত এক টান। বাজারের সেই চায়ের দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা, বিকেলে নদীর পাড় ধরে হাঁটা, কোনো কারণ ছাড়াই একে অপরকে ফোন দেওয়া—সবকিছুই একসময় তাদের জীবনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।

মেঘলা প্রায়ই বলত,

— জানো অরণ্য, আমার খুব সাধারণ একটা স্বপ্ন আছে।

— কী স্বপ্ন?

— একদিন বিকেলে তুমি কাজ থেকে ফিরবে। আমি তোমার জন্য চা বানিয়ে রাখব। তুমি এসে বলবে, আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি বলব, আগে চা খাও, তারপর তোমার সব ক্লান্তি শুনব।

অরণ্য হেসে বলত,

— এতটুকুই?

— হ্যাঁ। মানুষের সুখের জন্য খুব বেশি কিছু লাগে না।

সেদিন অরণ্য মেঘলাকে বলেছিল,

— একদিন ঠিক এমন একটা বিকেল আমাদেরও আসবে।

মেঘলা বিশ্বাস করেছিল।

অরণ্যও করেছিল।

কিন্তু মানুষ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দিতে যতটা সহজে পারে, বর্তমানের অভিমান ভাঙতে ততটা পারে না।

বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে অরণ্য যখন গাড়িতে উঠল, তখন আকাশে শেষ বিকেলের আলো।

জানালার পাশে বসে সে বারবার পেছনের রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, মেঘলা হয়তো আসবে। হয়তো শেষ মুহূর্তে দৌড়ে এসে বলবে—

অরণ্য, যেয়ো না।

একবার শুধু এই কথাটা শুনতে চেয়েছিল সে।

একটা ছোট্ট ডাক।

একটা সামান্য অনুরোধ।

তাহলেই হয়তো চাকরি, শহর, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর হিসাব নতুন করে করতে পারত।

কিন্তু রাস্তা ফাঁকাই রইল।

কেউ এল না।

গাড়ি চলতে শুরু করল।

অরণ্য জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। পরিচিত বাড়িঘরগুলো পেছনে সরে যাচ্ছিল। চর হাজীগঞ্জ বাজারের পথটাও ধীরে ধীরে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

তার বুকের ভেতর তখন একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছিল—

মেঘলা কি একবারও আমাকে আটকাতে পারত না?

সে জানত না, একই সময়ে মেঘলা ছুটে এসেছিল সেই বাসস্ট্যান্ডে।

কিন্তু ততক্ষণে গাড়ি চলে গেছে।

মেয়েটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল। এলোমেলো চুল, কাঁপতে থাকা হাত, চোখভরা জল। তার হাতে ফোনটা শক্ত করে ধরা।

স্ক্রিনে অরণ্যের নাম।

সে কল করল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

কেউ ধরল না।

মেঘলা ঠোঁট কামড়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করল। তারপর নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,

— একবার যদি পেছনে ফিরে তাকাতে, অরণ্য! একবার যদি বুঝতে, আমি তোমাকে যেতে দিতে চাইনি!

কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে গেল।

অরণ্য শুনল না।

শোনার কথাও ছিল না।

কিছু কথা শুধু বলার জন্য জন্মায় না; কিছু কথা না বলার অপরাধবোধ হয়ে সারা জীবন বেঁচে থাকে।

ঢাকায় এসে অরণ্য নতুন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সকালের তাড়া, অফিসের চাপ, অপরিচিত রাস্তা, মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে দিনগুলো দ্রুত চলে যেতে লাগল। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিকই দেখাত। বন্ধুদের সঙ্গে হাসত, কাজ করত, রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফিরত।

শুধু রাত গভীর হলে সে আর স্বাভাবিক থাকতে পারত না।

মাঝেমধ্যে ফোনের পুরোনো ছবিগুলো খুলে দেখত। মেঘলার হাসিমুখ, নদীর পাড়ে তোলা একটা ছবি, আর সেই নীল ছাতাটা—যেটা নিয়ে তাদের প্রথম কথা হয়েছিল।

তারপর নিজেকে প্রশ্ন করত,

মেঘলা কি এখনো চর হাজীগঞ্জ বাজারের সেই পথ দিয়ে হাঁটে?

চায়ের দোকানটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি তারও আমার কথা মনে পড়ে?

সে কি কখনো ফোন হাতে নিয়ে আমার নামের ওপর আঙুল রাখে?

অরণ্য উত্তর জানত না।

শুধু জানত, কিছু মানুষ দূরে চলে গেলেও মনের ভেতর থেকে কোথাও যায় না।

ওদিকে মেঘলাও ভালো থাকার অভিনয় শিখে ফেলেছিল।

বাড়ির সবাই ভাবত, মেয়েটা আগের মতোই আছে। সকালে ঘুম থেকে ওঠে, কাজ করে, বিকেলে বাজারে যায়, পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলে।

কিন্তু চর হাজীগঞ্জ বাজারের সেই চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার পা একটু ধীর হয়ে আসত।

কোনো গাড়ি এসে থামলে সে অকারণে তাকিয়ে দেখত।

কোনো পরিচিত কণ্ঠ শুনলে বুকটা কেঁপে উঠত।

তারপর নিজেকেই বকত।

এভাবে আর কত দিন, মেঘলা?

কিন্তু মন কি আর বকুনি শোনে?

মন তো সেই মানুষটার কাছেই ফিরে যায়, যার কাছে একদিন নিজের সমস্ত অভিমান রেখে নিশ্চিন্তে হাসা যেত।

প্রায় ছয় মাস পর এক বর্ষার বিকেলে অরণ্য আবার চরভদ্রাসনে ফিরল।

কাজের সূত্রে নয়।

কোনো জরুরি প্রয়োজনেও নয়।

সে ফিরেছিল শুধু একবার সেই জায়গাগুলো দেখবে বলে, যেখানে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টুকু রেখে এসেছিল।

চর হাজীগঞ্জ বাজার তখন বৃষ্টিতে ভিজছে। দোকানের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, রাস্তার পাশে জমে থাকা পানি, আর বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।

অরণ্য সেই পুরোনো চায়ের দোকানে গিয়ে বসল।

চা এল।

সে কাপটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।

দোকানের বাইরে দিয়ে একটা নীল ছাতা হেঁটে গেল।

অরণ্য প্রথমে খেয়াল করেনি। তারপর কেন যেন বুকের ভেতর কেঁপে উঠল কিছু একটা।

সে মুখ তুলে তাকাল।

মেঘলা।

ছয় মাস আগের মতোই মুখটা। শুধু চোখের কোণে যেন একটু বেশি নীরবতা জমেছে।

মেঘলাও তাকে দেখে থমকে দাঁড়াল।

দুজনের চোখে চোখ পড়ল।

পৃথিবীর কত কথা যে এক মুহূর্তে ফিরে আসতে পারে, সেদিন তারা বুঝেছিল।

অরণ্য উঠে দাঁড়াল।

মেঘলা ছাতাটা শক্ত করে ধরল।

কেউ কিছু বলছিল না।

বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। দোকানের ভেতর চায়ের ধোঁয়া উঠছিল। আর সময় যেন আবার সেই পুরোনো দিনের মতো ধীর হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে অরণ্য বলল,

— কেমন আছ?

মেঘলা একটু হাসার চেষ্টা করল।

— ভালো।

অরণ্য মাথা নাড়ল।

— আমিও।

দুটো ছোট্ট উত্তর। অথচ তাদের ভেতরে লুকিয়ে ছিল ছয় মাসের অপেক্ষা, শত শত রাতের কান্না, অসংখ্য না-পাঠানো মেসেজ আর হাজারটা অনুচ্চারিত কথা।

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

— সেদিন তুমি একবারও ফিরে তাকাওনি।

অরণ্য চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

— আমি অপেক্ষা করছিলাম, তুমি একবার ডাকবে।

মেঘলা মুখ তুলে তাকাল।

— আমিও অপেক্ষা করছিলাম, তুমি একবার ফিরে তাকাবে।

দুজনেই চুপ হয়ে গেল।

কী অদ্ভুত!

দুজন মানুষ একে অপরকে এতটা ভালোবেসেও ঠিক একই জায়গায় ভুল করেছিল। দুজনেই ফিরে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু দুজনেই অপেক্ষা করেছিল অন্যজন আগে এগিয়ে আসবে বলে।

মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।

— তুমি জানো, সেদিন আমি বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিলাম?

অরণ্য বিস্ময়ে তাকাল।

— কখন?

— তুমি চলে যাওয়ার একটু পর। আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো তোমাকে পেয়ে যাব।

অরণ্যের গলা আটকে এল।

— আমি জানতাম না, মেঘলা।

— জানার কথাও ছিল না। তুমি তো পেছনে তাকাওনি।

অরণ্য এবার চোখ নামিয়ে ফেলল।

বৃষ্টির শব্দের মধ্যে অনেকক্ষণ কোনো কথা হলো না।

তারপর অরণ্য ধীরে ধীরে বলল,

— আমি কি খুব দেরি করে ফেলেছি?

মেঘলা উত্তর দিল না।

শুধু জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির পানিতে রাস্তার আলো ঝাপসা হয়ে আসছিল।

কিছুক্ষণ পর সে বলল,

— জানি না, অরণ্য। তবে একটা কথা জানি, সেদিন তুমি যদি একবার ফিরে তাকাতে, আর আমি যদি একবার ডাকতাম, তাহলে হয়তো আমাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত।

অরণ্য মৃদু স্বরে বলল,

— তাহলে আজ কি আমরা গল্পটা অন্য রকম করে লিখতে পারি না?

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

এই প্রথম ছয় মাস পর মেয়েটার চোখে অভিমানের পাশাপাশি একটু আশার আলো দেখা গেল।

— গল্প কি চাইলেই বদলানো যায়?

অরণ্য বলল,

— সব গল্প নয়। তবে কিছু গল্পে একটা নতুন বাক্য লেখার সুযোগ থাকে। আমি জানি না, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে কি না। শুধু এটুকু জানি, এবার আর তোমাকে আমার মনের কথা আন্দাজ করতে দেব না।

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

— আর আমিও তোমাকে না ডেকে অপেক্ষা করব না।

অরণ্য হাসল।

সেই হাসিতে ছয় মাসের ক্লান্তি ছিল, অনুশোচনা ছিল, আর ছিল নতুন করে শুরু করার একটুখানি সাহস।

মেঘলা তার পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।

চায়ের দোকানের বৃদ্ধ মালিক দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর কিছু না বলেই আরেক কাপ চা বানাতে গেলেন।

বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছিল।

আর চর হাজীগঞ্জ বাজারের সেই ছোট্ট দোকানে, দুজন মানুষ বহুদিন পর নিজেদের নীরবতার দরজা খুলে বসেছিল।

সেদিন তারা সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছিল কি না, তা জানা নেই।

ভালোবাসা মানেই যে সব বাধা একদিনে মুছে যাবে, এমন তো নয়।

তবে তারা একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—অভিমান হবে, ভুল বোঝাবুঝিও হবে, তবু কোনো দিন আর ভালোবাসার কথাগুলোকে নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে রাখবে না।

কারণ তারা বুঝেছিল, ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু দূরত্ব নয়।

সবচেয়ে বড় শত্রু সেই অপেক্ষা, যেখানে দুজনেই ফিরে আসতে চায়, অথচ কেউ কাউকে ডাকে না।

সেদিন সন্ধ্যায় অরণ্য যখন মেঘলাকে বাড়ির পথে এগিয়ে দিচ্ছিল, তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।

আকাশের পশ্চিম প্রান্তে মেঘের ফাঁক দিয়ে একটু আলো বেরিয়েছে।

মেঘলা হঠাৎ থেমে বলল,

— অরণ্য?

— বলো।

— সেদিন যদি আবার এমন হয়? যদি কোনো দিন তুমি চলে যেতে চাও?

অরণ্য তার দিকে তাকিয়ে বলল,

— তাহলে যাওয়ার আগে তোমাকে বলব। আর তুমি যদি আমাকে থাকতে বলো, তাহলে অন্তত তোমার কথাটা শুনে যাব।

মেঘলা মৃদু হেসে বলল,

— শুধু শুনে যাবে?

অরণ্য একটু কাছে এসে বলল,

— না। এবার তোমার হাতটা ধরে জিজ্ঞেস করব, সত্যিই কি আমাকে যেতে দিতে চাও?

মেঘলা আর কিছু বলল না।

শুধু নিজের হাতটা অরণ্যের হাতে রেখে দিল।

চরভদ্রাসনের সেই সন্ধ্যায় নদীর দিক থেকে আবার বাতাস আসছিল। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের শেষ আলো কাঁপছিল।

দূরে কোথাও একটা গাড়ি হর্ন দিল।

জীবন তার নিজের গতিতে চলছিল।

কিন্তু অরণ্য আর মেঘলার কাছে সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল অন্য রকম। কারণ তারা বুঝেছিল, সব চলে যাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার নাম নয়। কোনো কোনো ফিরে আসা শুরু হয় অনেক দেরিতে—যখন মানুষ নিজের অহংকারের চেয়ে প্রিয় মানুষটাকে একটু বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে।

আর চর হাজীগঞ্জ বাজারের সেই পুরোনো চায়ের দোকান?

সেখানে এখনো বিকেল হলে চা তৈরি হয়, বৃষ্টির দিনে টিনের চালে শব্দ ওঠে, আর রাস্তা দিয়ে কত মানুষ যে আসে-যায়, তার হিসাব কেউ রাখে না।

শুধু দোকানের বৃদ্ধ মালিক মাঝে মাঝে দুজন তরুণ-তরুণীকে একসঙ্গে চা খেতে দেখলে মুচকি হাসেন।

হয়তো তিনি জানেন, পৃথিবীর সব প্রেমের গল্পে ফুল থাকে না, বড় কোনো প্রতিশ্রুতিও থাকে না।

কিছু গল্পে থাকে শুধু একটা পুরোনো স্টেশন, একটা চলে যাওয়ার বিকেল, আর একটি প্রশ্ন—

তুমি কি সত্যিই চলে যেতে চাও, নাকি শুধু চাও আমি তোমাকে একবার ফিরে ডাকব?

যে মানুষটি এই প্রশ্নের উত্তর সময় থাকতে দিতে পারে, তার গল্প হয়তো অসমাপ্ত থাকে না।

আর যে পারে না, তার জীবনে হয়তো অনেকগুলো বিকেল আসে—তবু সেই একটি বিকেল আর ফিরে আসে না।