জানো, আজকাল তোমাকে খুব মনে পড়ে। আগের মতো নয়—যখন তোমার কথা মনে পড়লেই মুখে হাসি ফুটে উঠত। এখন তোমার কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন একটা শূন্যতা জমে যায়। মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা হয়তো আমার ভাগ্যে লেখা হয়েছিল, কিন্তু তার শেষ পাতাটা পড়ার অধিকার আমার ছিল না।
কিছু মানুষ জীবনে আসে ভালোবাসা শেখাতে, আর কিছু মানুষ আসে ভালোবাসার অর্থ বুঝিয়ে দিয়ে হারিয়ে যেতে। তুমি আমার জীবনে এসেছিলে কোন দলে, আজও বুঝতে পারিনি। শুধু এটুকু জানি, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি আর আগের সেই মানুষটা নেই।
মায়াপরী, তোমাকে কখনো বলেছি কি—তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি কত অজুহাত খুঁজতাম? তোমার একটা ছোট্ট বার্তা, তোমার কণ্ঠের সামান্য একটু মায়া, কিংবা তোমার বলা সাধারণ কোনো কথা—আমার কাছে কতটা অসাধারণ ছিল! তুমি হয়তো বুঝতে পারোনি, তোমার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার আনন্দ নিয়ে আমি কত দীর্ঘ একটা রাত পার করে দিতে পারতাম।
তোমার কাছে হয়তো সেসব ছিল জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত। অথচ আমার কাছে সেগুলোই ছিল বেঁচে থাকার মতো কিছু স্মৃতি।
আজও মনে পড়ে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে সময় ফুরিয়ে যেত, বুঝতেই পারতাম না। মনে হতো, পৃথিবীটা যদি একটু থেমে যেত! ঘড়ির কাঁটা যদি আর না এগোত! তাহলে হয়তো তোমার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোকে আরও একটু বেশি করে নিজের কাছে রাখতে পারতাম।
কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না, তাই না?
আমাদের ভালোবাসাটাও একসময় সময়ের কাছে হেরে গেল।
জানো মায়াপরী, বিচ্ছেদ সবসময় ঝগড়া করে হয় না। কখনো কখনো দুজন মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও দূরে চলে যায়। তাদের মধ্যে কোনো বড় অপরাধ থাকে না, থাকে না কোনো ঘৃণা কিংবা প্রতিশোধের গল্প। শুধু পরিস্থিতি বদলে যায়, জীবনের দায়িত্ব বেড়ে যায়, আর একসময় পাশাপাশি হাঁটার মানুষ দুটো আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করে।
আমাদের বিচ্ছেদটাও বোধহয় তেমনই ছিল।
শেষবার তোমার সঙ্গে কথা বলার সময় যদি জানতাম, সেই কথাটাই একদিন আমার কাছে এত মূল্যবান হয়ে উঠবে, তাহলে হয়তো আরও কিছুক্ষণ কথা বলতাম। তোমার কণ্ঠটা আরও একটু মন দিয়ে শুনতাম। হয়তো বলতাম, ‘মায়াপরী, থেকো না আর একটু! তোমাকে ছাড়া আমার দিনগুলো কেমন হবে, তা আমি জানি না।’
কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না। তাই সাধারণ মুহূর্তগুলোকে সাধারণ ভেবেই বিদায় জানায়। পরে সেই মুহূর্তগুলোই স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে, আর মানুষ নীরবে নিজের ভুলগুলো খুঁজতে থাকে।
আমিও খুঁজি।
ভাবি, কোথায় ভুল হয়েছিল আমাদের? কোন কথাটা বলা হয়নি? কোন অভিমানটা একটু আদর দিয়ে ভাঙানো যেত? কোন একটা ফোনকল, কোন একটা দেখা, কিংবা কোন একটা সাহসী সিদ্ধান্ত হয়তো আমাদের গল্পটাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারত?
প্রশ্নগুলো আজও রয়ে গেছে। উত্তরগুলো আর পাওয়া হয়নি।
তোমার ওপর আমার কোনো অভিযোগ নেই, মায়াপরী। সত্যি বলছি, নেই। তোমাকে দোষ দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ইচ্ছেও নেই। কারণ ভালোবাসা তো কোনো আদালত নয়, যেখানে একজনকে অপরাধী আর অন্যজনকে নির্দোষ ঘোষণা করতে হবে।
তবু মাঝেমধ্যে অভিমান হয়।
অভিমান হয় এই ভেবে, যে মানুষটা একসময় আমার নীরবতার অর্থ বুঝত, সে-ই একদিন আমার নীরবতার ভেতর হারিয়ে গেল। যে মানুষটা আমার মন খারাপের কারণ জানতে চাইত, সে-ই একদিন আমার মন খারাপের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে রইল।
তোমার কি কখনো মনে পড়ে আমাকে?
কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে? কোনো পুরোনো গান শুনতে শুনতে? কিংবা হঠাৎ কোনো পরিচিত জায়গায় গিয়ে, যেখানে একদিন আমরা পাশাপাশি হেঁটেছিলাম?
কখনো কি মনে হয়, একজন মানুষ ছিল—যে তোমার সামান্য মন খারাপেও অস্থির হয়ে উঠত? যে তোমার হাসির মধ্যে নিজের আনন্দ খুঁজে পেত? যে তোমাকে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন দেখত, অথচ শেষ পর্যন্ত তোমাকে স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেনি?
হয়তো মনে পড়ে। হয়তো পড়ে না।
আমি জানি না।
তোমার মনের দরজায় আজ আর আমার কোনো অধিকার নেই। তোমার বর্তমান জীবনের ভেতর পুরোনো দিনের দাবি নিয়ে দাঁড়ানোর মতো স্বার্থপর আমি হতে চাই না। ভালোবাসি বলেই তোমার শান্তি নষ্ট করতে চাই না। তোমাকে মনে পড়ে বলেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে—এমন কোনো দাবি আমার নেই।
শুধু কখনো কখনো খুব ইচ্ছে করে, তুমি যদি একবার জানতে—তোমাকে ভুলে যাওয়ার অভিনয় করতে করতে আমি কতবার নিজের কাছেই হেরে গেছি!
মানুষ ভাবে, সময় সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। আমার মনে হয়, সময় আসলে কিছুই ভোলায় না; শুধু স্মৃতিগুলোর সঙ্গে বেঁচে থাকার অভ্যাস তৈরি করে দেয়। আগে তোমার কথা মনে পড়লে তোমাকে খুঁজতে ইচ্ছে করত। এখন মনে পড়লে চুপ করে থাকি। আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত, এখন তোমার কথা মনে মনে বলেই থেমে যাই।
এই যে নিজেকে থামিয়ে রাখা, এটাই হয়তো বড় হয়ে ওঠা। কিংবা এটাই নিয়তি মেনে নেওয়া।
মায়াপরী, তোমাকে নিয়ে আমার কোনো পূর্ণতার গল্প নেই। নেই একসঙ্গে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন, নেই পাশাপাশি বসে শেষ বিকেলের চা খাওয়ার নিশ্চয়তা। আছে শুধু কিছু স্মৃতি, কিছু না-বলা কথা, আর বুকের ভেতর এমন একটা জায়গা—যেখানে আজও তোমার নাম লেখা আছে।
আমি জানি, শুধু ভালোবাসলেই সব মানুষকে পাওয়া যায় না। কিছু ভালোবাসাকে দূর থেকে সম্মান করতে হয়, কিছু মানুষকে নিজের না হয়েও ভালো থাকতে দিতে হয়। আর কিছু সম্পর্ককে কোনো নাম না দিয়েই মনের গভীরে রেখে দিতে হয়।
তুমি আমার কাছে তেমনই একজন।
তোমাকে হয়তো আর কোনোদিন আগের মতো করে পাব না। হয়তো কোনোদিন তোমার পাশে বসে বলতে পারব না, ‘জানো, তোমাকে ছাড়া আমার খুব কষ্ট হয়।’ হয়তো তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের সমস্ত না-বলা কথা বলার সুযোগও আর আসবে না।
তবু তুমি আমার জীবনের একটি সুন্দর অধ্যায় হয়ে থাকবে। যে অধ্যায়ের কিছু পৃষ্ঠা আনন্দে ভরা, কিছু পৃষ্ঠা অশ্রুতে ভেজা, আর শেষ পাতায় লেখা আছে—‘এখানেই শেষ নয়, তবু এখানেই থামতে হলো।’
যদি কোনোদিন খুব একা লাগে, মনে রেখো—পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ ছিল, যে তোমাকে পাওয়ার চেয়েও তোমাকে ভালো রাখতে চেয়েছিল। যে তোমার জীবনে নিজের জায়গা না পেলেও তোমার ভালো থাকার খবর শুনে স্বস্তি খুঁজতে চাইত। যে তোমাকে ভুলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি, শুধু তোমার অনুপস্থিতিকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
সেই মানুষটা হয়তো আমি।
আজ এই চিঠির শেষে এসে বুঝতে পারছি, তোমাকে বলার মতো কথা ফুরিয়ে যায়নি। ফুরিয়ে গেছে শুধু তোমাকে বলার অধিকার।
তাই আর কিছু বলব না।
শুধু দূর থেকে তোমার জন্য প্রার্থনা করব—তোমার আকাশে যেন কখনো অন্ধকার নেমে না আসে, তোমার চোখে যেন অকারণে জল না জমে, আর তোমার হাসিটা যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।
আর আমার কথা?
আমাকে নিয়ে ভেবো না, মায়াপরী। আমি ঠিকই বেঁচে থাকব। কাজের ভিড়ে, মানুষের ভিড়ে, প্রতিদিনের ব্যস্ততায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখব। শুধু কিছু নির্জন রাতে, যখন চারপাশের সব শব্দ থেমে যাবে, তখন হয়তো তোমার স্মৃতির কাছে ফিরে যাব।
কাউকে বিরক্ত করব না। কোনো অভিযোগ জানাব না। শুধু মনে মনে তোমাকে একবার ডাকব—
মায়াপরী...
তারপর নিজেই নিজের নীরবতার উত্তর দেব।
কারণ এখন আমি জানি, সব ডাকের উত্তর আসে না। সব ভালোবাসার পরিণতি মিলন হয় না। আর সব গল্পের শেষ পাতায় ‘সমাপ্ত’ লেখা থাকে না।
কিছু গল্প অসমাপ্তই থেকে যায়—কোনো বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের বুকের ভেতর।
ভালো থেকো, আমার একসময়ের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।
তোমাকে না-পাওয়ার কষ্ট নিয়েও তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, আজও সেই ভালোবাসার কিছুটা রয়ে গেছে। তবে সেই ভালোবাসা এখন আর তোমাকে পাওয়ার অপেক্ষা নয়—এটা তোমাকে একদিন সত্যি করে ভালোবেসেছিলাম, সেই সত্যটুকু আগলে রাখার নাম।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.