মায়াপরী—
জানো, একটা মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে যে নিজের ভেতরটাও এভাবে হারিয়ে ফেলা যায়, তা আগে কখনো বুঝিনি। ভাবতাম, ভালোবাসা মানে দুটো মানুষের পাশাপাশি হাঁটা, একে অন্যের হাত ধরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা। কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার পর বুঝলাম, ভালোবাসা কখনো কখনো একাই একটা পৃথিবী গড়ে তোলার নাম, যেখানে একজন মানুষ থাকে, অথচ তার জন্য তৈরি করা পৃথিবীটাতে অন্য মানুষটির কোনো অস্তিত্বই থাকে না।
তোমার সঙ্গে আমার গল্পটাও বোধহয় তেমনই।
সেদিন বিকেলে জানালার পাশে বসে ছিলাম। আকাশজুড়ে মেঘ জমেছিল, বাতাসে কেমন একটা বিষণ্ন গন্ধ। চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও আমার ভেতরটা অস্থির হয়ে ছিল। বারবার মুঠোফোনের পর্দায় চোখ রাখছিলাম। যদি তোমার একটা বার্তা আসে! যদি হঠাৎ তুমি লিখে বসো,
কী করছ?
কত সামান্য একটা প্রশ্ন, তাই না?
অথচ তোমার কাছ থেকে এই সামান্য প্রশ্নটা পাওয়ার জন্যই আমার সমস্ত অপেক্ষা জমে থাকত। পৃথিবীর অন্য কেউ আমার খোঁজ নিল কি না, তা নিয়ে খুব একটা ভাবতাম না। শুধু তোমার কাছ থেকে একটুখানি খোঁজ পাওয়ার ইচ্ছেটা বুকের ভেতর কেমন করে যেন বেঁচে থাকত।
তুমি হয়তো জানতে না, মায়াপরী—তোমার একটা ছোট্ট বার্তা আমার বিষণ্ন দিনটাকে কত সহজে সুন্দর করে দিতে পারত। তোমার সামান্য অভিমান আমার সারাটা দিন এলোমেলো করে দিত। আর তোমার নীরবতা?
সেই নীরবতা আমাকে এমন এক শূন্যতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিত, যেখানে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেতাম না।
তবুও তোমার ওপর রাগ করতে পারতাম না।
বারবার নিজেকেই বোঝাতাম, তুমি হয়তো ব্যস্ত। হয়তো তোমারও অনেক কষ্ট আছে, অনেক না-বলা কথা আছে। হয়তো তুমি নিজের মতো করে জীবন সামলাতে গিয়ে আমার দিকে তাকানোর সময়টুকু পাচ্ছ না। তোমার প্রতিটি অবহেলার পেছনে একটা করে অজুহাত খুঁজে নিতাম, শুধু তোমাকে দোষী ভাবতে আমার কষ্ট হতো বলে।
কারণ, ভালোবাসলে মানুষ বোধহয় এমনই হয়ে যায়। প্রিয় মানুষটার ভুলগুলোও নিজের মনের মতো করে ব্যাখ্যা করতে শেখে।
কিন্তু একটা সময়ের পর বুঝতে পারলাম, তোমার প্রতিটি নীরবতার ব্যাখ্যা খুঁজতে খুঁজতে আমি নিজের কাছেই কেমন অপরিচিত হয়ে যাচ্ছি। যে মানুষটা একসময় নিজের আনন্দে হাসত, সে এখন তোমার একটু মনোযোগ পেলে হাসে। যে মানুষটা নিজের মতো করে বাঁচতে জানত, সে এখন তোমার উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির হিসাব মেলাতে মেলাতে দিন পার করে।
নিজেকে প্রশ্ন করতাম, এ কেমন ভালোবাসা, মায়াপরী?
যে ভালোবাসায় তোমাকে হারানোর ভয় এত বেশি যে, নিজের কষ্টের কথাটুকুও তোমাকে বলতে পারি না! যদি তুমি বিরক্ত হও, যদি আমার অনুভূতিগুলো তোমার কাছে বাড়তি বোঝা মনে হয়, যদি আমার ভালোবাসার গভীরতা তোমাকে আমার কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়!
তাই চুপ করে থাকতাম।
তোমার কাছে আমার অনেক কথা জমে থাকত, কিন্তু সেগুলো বলার সাহস হতো না। তোমাকে বলতে ইচ্ছে করত, তোমার সঙ্গে কথা না হলে আমার দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগে। বলতে ইচ্ছে করত, মাঝেমধ্যে ভীষণ একা লাগে, তখন শুধু তোমার কণ্ঠটা শুনতে ইচ্ছে করে। তোমাকে বলতে ইচ্ছে করত, সবকিছু ঠিক থাকার পরও তোমার অভাবে আমার পৃথিবীটা কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।
কিন্তু বলা হতো না।
কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম। আর তোমার কাছে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে তোমাকে কখনো আমার কষ্টের দায়ে বাঁধতে চাইনি।
আমি চেয়েছিলাম, তুমি নিজের ইচ্ছেতেই আমার কাছে আসো। কোনো অনুরোধে নয়, কোনো অভিযোগের ভয়ে নয়, শুধু তোমার মন চায় বলে। একদিন হঠাৎ তুমি আমাকে খুঁজবে, আমার অনুপস্থিতি অনুভব করবে, আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করবে।
আমি চেয়েছিলাম, তোমার ব্যস্ত পৃথিবীতে আমার জন্য ছোট্ট একটা জায়গা থাকুক। যেখানে আমি কোনো প্রতিযোগী হব না, কারও সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে হবে না। যেখানে আমাকে বারবার বোঝাতে হবে না যে আমিও তোমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারি।
আমি শুধু তোমার আপন মানুষ হতে চেয়েছিলাম, মায়াপরী।
তোমার সব সমস্যার সমাধান হতে চাইনি, তোমার সমস্ত দুঃখ মুছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিইনি। শুধু চেয়েছিলাম, তোমার খারাপ দিনগুলোতে তুমি যেন জানো—পৃথিবীতে একজন মানুষ আছে, যে তোমার কথা শুনবে। তোমার এলোমেলো কথাগুলোও মন দিয়ে শুনবে। তুমি চুপ করে থাকলেও তোমার পাশে বসে থাকবে।
তুমি হাসলে তোমার হাসিতে আনন্দ খুঁজবে, আর তুমি কাঁদলে তোমার চোখের জল থামানোর আগে তোমার কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করবে।
কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝলাম, কাউকে নিজের সমস্তটুকু দিয়ে ভালোবাসলেই তার হৃদয়ে নিজের জন্য জায়গা তৈরি হয় না।
কেউ কেউ আমাদের জীবনে আসে, আমাদের অনুভূতিগুলোকে জাগিয়ে তোলে, আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়; তারপর এমনভাবে দূরে সরে যায়, যেন কোনো দিন আমাদের গল্পের অংশই ছিল না।
তোমার ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই হলো?
জানি না।
আমি শুধু জানি, তোমাকে খুঁজতে গিয়ে আমার হৃদয়ের প্রতিটি অলিগলিতে তোমার দেখা পেয়েছি। অথচ তোমার হৃদয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের জন্য একটুখানি জায়গা খুঁজে পাইনি। ভালোবাসা খুঁজতে গিয়ে তোমাকেই আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বসেছি। আর তোমাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বুঝেছি, কিছু স্বপ্নের সৌন্দর্য শুধু দূর থেকে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তবুও তোমাকে ভালোবাসার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই।
তুমি আমার হওনি বলে তোমাকে ভালোবাসাটা মিথ্যে হয়ে যায়নি। তুমি আমার অপেক্ষার মূল্য বোঝোনি বলে আমার অপেক্ষাগুলো অর্থহীন হয়ে যায়নি। তোমাকে ঘিরে যে অনুভূতিগুলো জন্ম নিয়েছিল, সেগুলোও কোনো ভুল ছিল না।
ভুল শুধু এটুকুই ছিল—আমি হয়তো মনে মনে বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম, আমার ভালোবাসার গভীরতা একদিন তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে।
অথচ ভালোবাসা দিয়ে কাউকে আপন করা যায়, কিন্তু তার ইচ্ছেকে নিজের করে নেওয়া যায় না।
আজকাল তাই তোমাকে নিয়ে আর আগের মতো অভিযোগ জমাই না। তোমার কাছে কিছু দাবি করার ইচ্ছেটাও ধীরে ধীরে কমে এসেছে। শুধু মাঝেমধ্যে খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি কখনো আমার নীরবতার ভেতর লুকিয়ে থাকা কথাগুলো বুঝতে পেরেছিলে? কখনো কি অনুভব করেছিলে, তোমার একটু অবহেলায় কেউ একজন সারাটা রাত নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটিয়েছে?
কখনো কি তোমারও মনে হয়েছে, মানুষটা হয়তো তোমাকে খুব ভালোবাসে?
নাকি তোমার কাছে আমি শুধুই এমন একজন, যে সবসময় থাকবে বলে তুমি কখনো তার থেকে দূরে সরে যাওয়ার ভয় পাওনি?
জানো, মায়াপরী, মানুষের অভাব সবসময় তার চলে যাওয়ার পর বোঝা যায় না। কখনো কখনো মানুষ পাশে থেকেও অনুপস্থিত হয়ে যায়। তার সঙ্গে কথা হয়, অথচ মনের কথা বলা হয় না। তার নাম মুঠোফোনে থাকে, অথচ তাকে নিজের মানুষ বলে ডাকার অধিকার থাকে না। তার জন্য হৃদয় কাঁদে, অথচ সেই কান্নার খবর দেওয়ার মতো সম্পর্কটুকুও থাকে না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তখন কাউকে হারানোর কথাও বলা যায় না। কারণ, যাকে হারানোর ভয় বুকের ভেতর এতদিন ধরে লালন করে এসেছি, সে তো কোনো দিন পুরোপুরি আমার ছিলই না।
তুমি আমার জীবনের সেই মানুষ, মায়াপরী।
যাকে নিয়ে আমি অনেক গল্প লিখতে পারব, কিন্তু যার সঙ্গে আমার নিজের গল্পটা কখনো সম্পূর্ণ হবে না। যার জন্য আমার বুকের ভেতর এত কথা জমে আছে, অথচ যার সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো একদিন বলার মতো কোনো কথাই খুঁজে পাব না।
তবুও যদি কোনো একদিন খুব একা লাগে তোমার, যদি চারপাশের সমস্ত কোলাহল থেমে যাওয়ার পর নিজের ভেতরটাকে ভীষণ ফাঁকা মনে হয়, যদি মনে হয়—কেউ একজন থাকলে ভালো হতো, যে কোনো প্রশ্ন না করেই তোমার পাশে বসে থাকত, তাহলে একবার আমার কথা মনে কোরো।
আমি জানি না, সেদিনও তোমাকে একইভাবে ভালোবাসব কি না। সময় মানুষের অনুভূতিকে বদলে দেয়, দূরত্ব অনেক কিছু শিখিয়ে দেয়। হয়তো আমিও একদিন নিজের কষ্টগুলোকে সামলে নিতে শিখব। তোমার অপেক্ষা না করেও দিন পার করতে পারব, তোমার বার্তার আশায় বারবার মুঠোফোনের পর্দায় তাকাব না।
কিন্তু কোনো এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে, পরিচিত কোনো গানের সুরে, কিংবা হঠাৎ বুকের ভেতর জমে ওঠা অকারণ বিষণ্নতায় তোমার কথা মনে পড়ে যেতেই পারে।
কারণ, কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, কিন্তু তাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনুভূতিগুলোকে ইচ্ছেমতো মুছে ফেলা যায় না।
আর তুমি তো শুধু একজন মানুষ নও আমার কাছে।
তুমি আমার কিছু না-বলা কথার নাম, কিছু অপূর্ণ স্বপ্নের নাম, কিছু অপেক্ষার নাম, আর এমন এক ভালোবাসার নাম—যে ভালোবাসা পূর্ণতা পায়নি, তবুও মিথ্যে হয়ে যায়নি।
মায়াপরী, তোমাকে না পাওয়ার কষ্টটা হয়তো একদিন সহ্য করতে শিখে যাব। কিন্তু তোমাকে যে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম, সেই সত্যটাকে কোনো দিন অস্বীকার করতে পারব না।
তুমি আমার জীবনে থেকে যাও কিংবা হারিয়ে যাও, আমার গল্পের একটা অধ্যায়ে তুমি চিরকাল থাকবে। সেখানে কোনো অভিযোগ থাকবে না, কোনো অভিমান থাকবে না—থাকবে শুধু একজন মানুষের নীরব স্বীকারোক্তি।
যে মানুষটা তোমাকে নিজের করে পায়নি, অথচ হৃদয়ের সমস্ত মায়া দিয়ে তোমাকেই ভালোবেসেছিল।
আর সেই গল্পের শেষ পাতায়, যেখানে আমাদের একসঙ্গে থাকার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, যেখানে ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেখানে শুধু কয়েকটি শব্দ লিখে রেখে যাব—
ভালোবাসে তোমাকে, মায়াপরী।
কোনো অধিকার থেকে নয়, কোনো প্রতিদানের আশায় নয়—শুধু হৃদয়ের গভীরে তোমার জন্য যে মায়াটুকু জন্মেছিল, তার টানেই।
হয়তো তুমি কোনো দিন আমার হবে না, হয়তো আমাদের গল্পটা কোনো দিন পূর্ণতা পাবে না। তবুও এই পৃথিবীর কোথাও, কোনো এক নিঃশব্দ বিকেলে, একজন মানুষ তোমার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলবে।
সেই মানুষটা আমি।
আর তুমি—আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে মায়াময়, অথচ সবচেয়ে অসমাপ্ত গল্প।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.