সদরপুরের আকোটের চর জায়গাটা সন্ধ্যার পর অদ্ভুত রকমের নীরব হয়ে যায়।

দিনের বেলায় যে রাস্তায় রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেল আর মানুষের ভিড় লেগে থাকে, রাত নামলেই সেই রাস্তা কেমন যেন নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়।

রাস্তার দুই পাশে পুরোনো বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। কোথাও জানালার ফাঁক দিয়ে টেলিভিশনের আলো বের হয়, কোথাও রান্নাঘরের শেষ ধোঁয়াটা বাতাসে মিলিয়ে যায়।

আর ঠিক রাস্তার শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো তিনতলা বাড়ি।

বাড়িটাকে সবাই ‘মজিদ সাহেবের বাড়ি’ বলে চেনে।

প্রায় ছয় মাস ধরে বাড়িটির তৃতীয় তলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটটি খালি পড়ে ছিল।

তারপর একদিন সেখানে একজন মেয়ে এসে উঠল।

নাম—নীলা।

কোথা থেকে এসেছে, কার সঙ্গে এসেছে, কতদিন থাকবে—এসব নিয়ে পাড়ায় প্রথম কয়েকদিন বেশ আলোচনা হলো।

তারপর মানুষের আগ্রহ কমে গেল।

শুধু আমার কমল না।

কারণ মেয়েটাকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম।

কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে।

কখনো রাস্তার দিকে।

আবার কখনো এমনভাবে দূরে তাকিয়ে থাকত, যেন এই শহরটা তার সামনে নেই—সে অন্য কোনো জায়গা দেখছে।

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার।

অফিস থেকে ফিরে দুপুরে খাওয়ার পর একটু ঘুমিয়েছিলাম।

বিকেল চারটার দিকে ঘুম ভাঙল।

ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখ চলে গেল মজিদ সাহেবের বাড়িটার দিকে।

নীলা দাঁড়িয়ে আছে।

আজ তার হাতে একটা বই।

বইয়ের পাতা খুলে রেখেছে, কিন্তু পড়ছে না।

শুধু তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে।

আমি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ঘরে ঢুকে গেলাম।

নিজেকেই বললাম,

‘মানুষের জীবন নিয়ে এত কৌতূহল দেখানোর কী আছে?’

কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার বারান্দায় এলাম।

নীলা তখনও দাঁড়িয়ে।

এবার তার হাতে বই নেই।

দুই হাত রেলিংয়ের ওপর রেখে মাথাটা সামান্য নিচু করে রেখেছে।

মনে হলো মেয়েটা কাঁদছে।

ঠিক তখন পাশের বাসার রতন ভাই এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন।

—কী দেখিস?

—কিছু না।

—ওই মেয়েটাকে?

আমি চুপ করলাম।

রতন ভাই হেসে বললেন,

—নতুন এসেছে তো, কৌতূহল হওয়াই স্বাভাবিক।

আমি বললাম,

—আপনি কি ওকে চেনেন?

—চেনার মতো কী আছে? তবে শুনেছি মেয়েটার স্বামী নেই।

—মানে?

—ডিভোর্স হয়েছে নাকি। তারপর এখানে এসে উঠেছে।

কথাটা শুনে আমার ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি হলো।

কেন জানি না।

রতন ভাই আবার বললেন,

—এইসব মেয়েদের জীবন সহজ হয় না।

আমি বললাম,

—এইসব মেয়ে বলতে?

তিনি একটু থেমে বললেন,

—না, কিছু না।

আমি আর কিছু বললাম না।

কিন্তু সেদিন প্রথমবার মনে হলো—

একজন মানুষের জীবনে কী ঘটেছে, সেটা না জেনেই আমরা তার জন্য একটা গল্প বানিয়ে ফেলি।

সন্ধ্যার পর বৃষ্টি নামল।

বৃষ্টির শব্দে ঘরটা বেশ শান্ত হয়ে গেল।

আমি জানালার পাশে বসে বই পড়ছিলাম।

হঠাৎ মোবাইলে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

মাত্র তিনটি শব্দ—

আপনি কি দেখেছেন?

আমি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তারপর লিখলাম—

কী?

কোনো উত্তর এল না।

দুই মিনিট।

পাঁচ মিনিট।

দশ মিনিট।

তারপর আবার মেসেজ।

বারান্দার আলোটা।

আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম।

মজিদ সাহেবের বাড়ির দিকে তাকালাম।

তৃতীয় তলার পূর্ব পাশের বারান্দার আলো জ্বলছে।

কিন্তু সেখানে কেউ নেই।

মোবাইলটা আবার হাতে নিলাম।

লিখলাম—

আপনি কে?

এবারও উত্তর এল না।

সেদিন রাতে আর ঘুম এল না।

পরদিন সকাল।

চায়ের দোকানে গিয়ে দেখি সবাই কোনো একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।

আমি চুপচাপ চা নিয়ে বসে পড়লাম।

রতন ভাই বললেন,

—শুনেছিস?

—কী?

—মজিদ সাহেবের বাড়ির মেয়েটা নাকি গতকাল রাতে একা ছিল না।

আমি চুপ করে রইলাম।

তিনি বললেন,

—রাত প্রায় বারোটার দিকে একজন লোককে বাড়িতে ঢুকতে দেখা গেছে।

আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

কেন জানি না, আমার মনে হলো—

লোকটা কে আমি জানি।

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখলাম।

ঠিক তখন দোকানের মালিক সালাম চাচা বললেন,

—মানুষের চরিত্র নিয়ে এত কথা বলিস না রতন। নিজের ঘরের খবর আগে রাখ।

রতন ভাই একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,

—আমি যা শুনেছি তাই বললাম।

সালাম চাচা আর কিছু বললেন না।

কিন্তু তার চোখে এমন একটা দৃষ্টি ছিল, যেন তিনি অনেক কিছু জানেন।

সেদিন বিকেলে নীলাকে আর বারান্দায় দেখা গেল না।

পরদিনও না।

তার পরদিনও না।

চতুর্থ দিন দুপুরে হঠাৎ বাড়িটার সামনে একটা সাদা গাড়ি এসে থামল।

দুজন লোক নেমে ভেতরে ঢুকল।

কিছুক্ষণ পর নীলা বের হলো।

তার হাতে একটি ছোট ব্যাগ।

চোখে কালো চশমা।

সে গাড়িতে উঠল।

গাড়ি চলে যাওয়ার আগে হঠাৎ সে আমার দিকে তাকাল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম।

কারণ তার চোখে ভয় ছিল।

আর সেই ভয়টা আমার জন্য নয়।

মনে হলো—

সে যেন আমাকে কোনো একটা কথা বলতে চাইছে।

গাড়ি চলে গেল।

আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।

সেদিন রাতে সেই অচেনা নম্বর থেকে আবার মেসেজ এল।

আপনি সত্যিটা জানতে চান?

আমি লিখলাম—

হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

তাহলে কাল রাত দশটায় পুরোনো কাঁঠালগাছটার নিচে আসবেন।

পরদিন রাত দশটা।

আমি কাঁঠালগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে।

চারপাশ অন্ধকার।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একজন মানুষ এগিয়ে এল।

মাথায় ক্যাপ।

মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না।

সে কাছে এসে দাঁড়াতেই আমি চিনতে পারলাম।

সালাম চাচা।

আমি অবাক হয়ে বললাম,

—আপনি?

তিনি কিছু না বলে আমার হাতে একটা খাম দিলেন।

—এটা নাও।

—এতে কী?

—যেটা এতদিন ধরে খুঁজছিস।

খাম খুললাম।

ভেতরে কয়েকটা ছবি।

প্রথম ছবিটা দেখে আমার হাত কেঁপে উঠল।

ছবিতে নীলা।

তার পাশে একজন পুরুষ।

লোকটাকে আমি চিনতাম।

রতন ভাই।

আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।

সালাম চাচা ধীরে ধীরে বললেন,

—নীলা রতনের স্ত্রী ছিল।

আমি তাকিয়ে রইলাম।

—তাহলে ডিভোর্স?

—ডিভোর্স হয়নি।

—তাহলে?

সালাম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—তিন মাস আগে রতন ওকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল।

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

—কেন?

—কারণ নীলা তার কিছু একটা জেনে গিয়েছিল।

—কী?

সালাম চাচা আমার চোখের দিকে তাকালেন।

—রতন যে মানুষটা বাইরে সবার কাছে, সে আসলে তেমন মানুষ নয়।

আমি কিছু বললাম না।

তিনি বললেন,

—নীলা পালিয়ে এসে এখানে উঠেছিল। আর রতন সবার কাছে গল্প ছড়িয়েছিল—মেয়েটা চরিত্রহীন, সংসার করতে পারে না, তাই তাকে ছেড়ে দিয়েছে।

আমি যেন হঠাৎ কয়েকদিনের পুরোনো সব কথাগুলো নতুন করে শুনতে পেলাম।

চায়ের দোকানের গল্প।

রতনের আত্মবিশ্বাসী কথা।

নীলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা।

তার চোখের ভয়।

আর সেই রাতের অচেনা মেসেজ।

আমি ফিসফিস করে বললাম,

—তাহলে ওই রাতে যে লোকটা ওর বাড়িতে ঢুকেছিল?

সালাম চাচা মাথা নিচু করে বললেন,

—রতন।

আমি অবাক হয়ে বললাম,

—তাহলে নীলা এতদিন সেখানে একা ছিল কীভাবে?

সালাম চাচা এবার আমার দিকে তাকালেন।

তার চোখে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

—সে একা ছিল না।

—মানে?

—আমি ছিলাম।

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না।

সালাম চাচা ধীরে ধীরে বললেন,

—নীলা আমাকে সব বলেছিল। রতন যেন ওকে খুঁজে না পায়, সেজন্য আমি ওকে ওই বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলাম।

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর জিজ্ঞেস করলাম,

—তাহলে আমাকে মেসেজ কে করেছিল?

সালাম চাচা বললেন,

—নীলা।

—কিন্তু ও আমার নম্বর পেল কোথায়?

সালাম চাচা মৃদু হাসলেন।

—তুই প্রতিদিন বারান্দা থেকে ওকে দেখতিস। সে-ও তোকে দেখত।

আমি কিছু বলতে পারলাম না।

সালাম চাচা শেষ কথাটা বললেন,

—ও বলেছিল, ওই ছেলেটা অন্যদের মতো করে আমার বিচার করে না। হয়তো ওকে সত্যিটা বলা যায়।’

পরদিন সকালে মজিদ সাহেবের বাড়ির সামনে আর কোনো ভিড় ছিল না।

বারান্দাটাও খালি।

শুধু রেলিংয়ের পাশে একটা ছোট্ট টব।

টবের মধ্যে সাদা একটা ফুল ফুটে আছে।

আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে সেটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

মানুষকে আমরা কত সহজে বিচার করি!

কারও হাসি দেখে চরিত্রের গল্প বানাই।

কারও নীরবতা দেখে অহংকারের নাম দিই।

কারও একাকিত্ব দেখে তাকে দোষী বানাই।

অথচ মানুষটার বুকের ভেতর হয়তো এমন কোনো যুদ্ধ চলছে, যার খবর পৃথিবীর কেউ জানে না।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় মজিদ সাহেবের বাড়িটার দিকে শেষবার তাকালাম।

বারান্দা খালি।

কিন্তু আমার মনে হলো—

সেখানে এখনও কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

হয়তো নীলা নয়।

হয়তো আমার নিজের বিবেক।

যে প্রতিদিন আমাকে মনে করিয়ে দেবে—

কাউকে বিচার করার আগে তার গল্পটা একবার শুনে নিও।