সেদিন বিকেলটা অদ্ভুত সুন্দর ছিল।
আকাশে রোদ ছিল না, আবার বৃষ্টিও নামেনি। চারপাশে একটা নরম ধূসর আলো ছড়িয়ে ছিল। দূরের গাছগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে দুলছিল, আর শুকনো পাতাগুলো মাটির ওপর এমনভাবে ঘুরছিল, যেন তারা কোনো অদৃশ্য সুরের সঙ্গে নাচছে।
অয়ন নদীর পাড়ের ঘাসের ওপর চুপচাপ শুয়ে ছিল।
অনেকক্ষণ ধরে।
তার পাশে একটা খোলা বই পড়ে ছিল। বইয়ের পাতাগুলো বাতাসে বারবার উল্টে যাচ্ছিল। কিন্তু অয়ন সেদিকে তাকাচ্ছিল না।
তার চোখ ছিল আকাশে।
প্রেমা একসময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
—আপনি এত আকাশের দিকে তাকিয়ে কী দেখেন?
অয়ন হেসে বলেছিল,
—যেগুলো মাটিতে খুঁজে পাই না।
প্রেমা বলেছিল,
—যেমন?
অয়ন উত্তর দেয়নি।
কারণ সে জানত, কিছু উত্তর মুখে বলা যায় না।
আজও সেই কথাটা মনে পড়ছিল।
প্রেমা নেই।
কিন্তু তার প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।
কখনো কখনো মানুষ চলে যায়, অথচ তার বলা ছোট ছোট কথাগুলো আমাদের জীবনে থেকে যায়। তারা কোনো দরজা দিয়ে আসে না, কোনো অনুমতিও নেয় না। হঠাৎ কোনো বিকেলে, কোনো গানের লাইনে, কিংবা বাতাসে ভেসে আসা পরিচিত কোনো গন্ধে তারা ফিরে আসে।
প্রেমাও সেভাবেই ফিরে আসে।
অয়নের কাছে।
প্রতিদিন নয়।
কিন্তু ঠিক যখন অয়ন সবচেয়ে বেশি একা থাকে, তখন।

প্রেমার সঙ্গে অয়নের পরিচয় হয়েছিল এক শীতের সকালে।
শহরের পুরোনো একটা বইয়ের দোকানে।
অয়ন একটা বই খুঁজছিল। একই বইয়ের দিকে একই সময়ে দুজনের হাত এগিয়ে গিয়েছিল।
প্রেমা হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল,
—আপনি নিন।
অয়ন বলেছিল,
—না, আপনি নিন।
—আপনি আগে ধরেছেন।
—আপনি আগে দেখেছেন।
প্রেমা হেসে বলেছিল,
—তাহলে বইটা আমাদের দুজনেরই।
অয়ন হেসে বলেছিল,
—বই ভাগ করা যায়, কিন্তু গল্প?
প্রেমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিল,
—গল্প ভাগ করা যায় না। গল্প শুধু কাউকে শোনানো যায়।
সেদিন অয়ন জানত না, এই মেয়েটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় গল্প হয়ে উঠবে।

তাদের সম্পর্কটা খুব ধীরে তৈরি হয়েছিল।
কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
ছিল ছোট ছোট অভ্যাস।
প্রেমা জানত অয়ন চায়ে চিনি কম খায়।
অয়ন জানত প্রেমা বৃষ্টির দিনে একা হাঁটতে পছন্দ করে।
প্রেমা জানত অয়ন মন খারাপ করলে বেশি কথা বলে না।
অয়ন জানত প্রেমা মন খারাপ করলে আরও বেশি কথা বলে।
একদিন প্রেমা হঠাৎ বলেছিল,
—আপনি আমাকে এত সহজে বুঝে ফেলেন কীভাবে?
অয়ন হেসে বলেছিল,
—আপনাকে বুঝতে খুব বেশি চেষ্টা করতে হয় না।
প্রেমা চোখ সরিয়ে নিয়ে বলেছিল,
—একদিন যদি আমাকে বুঝতে না পারেন?
অয়ন বলেছিল,
—তাহলে সেদিন আপনাকে আরও বেশি করে বুঝতে চাইব।
প্রেমা সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি।
শুধু হাসছিল।
অয়নের মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব কবিতা হয়তো মানুষের মুখের সেই এক মুহূর্তের হাসির কাছেও খুব ছোট।

তারপর একসময় অয়ন বুঝতে পারল—
সে প্রেমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
কিন্তু ভালোবাসা বুঝতে পারা আর ভালোবাসা স্বীকার করা এক জিনিস নয়।
সে ভয় পেত।
প্রেমা যদি দূরে সরে যায়?
প্রেমা যদি বলে,
আপনাকে আমি শুধু বন্ধু হিসেবেই দেখি?
তাহলে?
এই একটা ভয় অয়নকে বহুবার থামিয়ে দিয়েছে।
প্রেমাও হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল।
কিন্তু সেও চুপ করে থাকত।
দুজনের মাঝখানে ভালোবাসা ছিল।
শুধু তার নাম ছিল না।

একদিন বিকেলে প্রেমা বলেছিল,
—অয়ন, আপনি কি কখনো কাউকে এতটা ভালোবেসেছেন যে তাকে হারানোর ভয়েই ভালোবাসার কথা বলতে পারেননি?
অয়ন চমকে তার দিকে তাকিয়েছিল।
তার মনে হয়েছিল, আজ হয়তো সব বলে দেওয়া যায়।
আজ হয়তো আর ভয় পাওয়ার দরকার নেই।
কিন্তু সে শুধু বলেছিল,
—হয়তো।
প্রেমা ধীরে বলেছিল,
—তাহলে মানুষটা খুব দুর্ভাগা।
—কেন?
—কারণ সে হয়তো কোনোদিন জানতেই পারবে না, কেউ তাকে এতটা ভালোবাসত।
অয়ন চুপ করে গিয়েছিল।
প্রেমাও।
সেদিন তাদের দুজনের মাঝখানে অনেক কথা ছিল।
শুধু কোনো শব্দ ছিল না।

তারপর হঠাৎ প্রেমা চলে গেল।
কোনো ঝগড়া হয়নি।
কোনো বিচ্ছেদও হয়নি।
শুধু একদিন অয়ন জানতে পারল, প্রেমা তার পরিবারের সিদ্ধান্তে অন্য শহরে চলে যাচ্ছে।
শেষবার দেখা করতে এসে প্রেমা বলেছিল,
—আমাকে কিছু বলবেন না?
অয়ন তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তার ভেতরে তখন একটা সমুদ্র ভাঙছিল।
সে বলতে পারত—
থেকে যাও।
সে বলতে পারত—
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সে বলতে পারত—
তোমাকে ছাড়া আমি ভালো থাকব না।
কিন্তু মুখ দিয়ে বের হলো,
—ভালো থেকো।
প্রেমা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসেছিল।
সেই হাসির মধ্যে অয়ন এমন একটা কষ্ট দেখেছিল, যেটার অর্থ সে বহু বছর পর বুঝবে।
প্রেমা চলে যাওয়ার আগে শুধু বলেছিল,
—আপনিও।
তারপর চলে গিয়েছিল।
অয়ন দাঁড়িয়ে ছিল।
অনেকক্ষণ।
যতক্ষণ না রাস্তার শেষ প্রান্তে প্রেমাকে আর দেখা যাচ্ছিল না।

সেই ঘটনার পর অয়ন বদলে গেল।
সে আগের মতো মানুষের সঙ্গে কথা বলত না।
আগের মতো হাসত না।
বন্ধুরা বলত,
—তোমার কী হয়েছে?
অয়ন হেসে বলত,
—কিছু হয়নি।
কিন্তু সে জানত, অনেক কিছু হয়ে গেছে।
তার ভেতর থেকে যেন একটা ঋতু চলে গেছে।
বসন্ত আসে।
বর্ষা আসে।
শীত আসে।
শুধু প্রেমা আসে না।
কখনো কখনো অয়নের মনে হতো, সে বুঝি সত্যিই পাথর হয়ে গেছে।
কোনো আনন্দ তাকে পুরোপুরি ছুঁতে পারে না।
কোনো দুঃখ তাকে পুরোপুরি ভাঙতে পারে না।
সে শুধু বেঁচে থাকে।
অভ্যাসের মতো।

সেদিন নদীর পাড়ে শুয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ একটা ছোট পাখি এসে তার কাছের ডালে বসল।
অয়ন তাকাল।
পাখিটা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার উড়ে গেল।
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—তুমিও চলে গেলে?
বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দিল।
সে চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ মনে হলো, চারপাশের প্রকৃতিটা যেন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে।
নদী তার নিজের ভাষায় কিছু বলছে।
গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দে যেন তাকে ডাকছে।
দূরের ফুলের গন্ধ বাতাসে ভেসে এসে তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
অয়ন মনে মনে বলল,
তোমরা সবাই আমাকে এত আপন করে ডাকছ কেন? আমি তো আর কারও আপন নই।
বাতাস যেন আরও জোরে বয়ে গেল।
তার মনে হলো, প্রকৃতি তাকে একটা কথাই বলছে—
কেউ চলে গেলেই তুমি একা হয়ে যাও না।
অয়ন চোখ খুলল।
আকাশ তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে যাচ্ছে।
সে উঠে বসল।
তার বুকের ভেতর বহুদিন পর একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
প্রেমাকে সে ফিরে পাবে না।
হয়তো কোনোদিনই না।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রেমার ভালোবাসা তার জীবন থেকে মুছে গেছে।
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থেকে যায় না।
তারা থেকে যায় আমাদের অনুভূতিতে।
আমাদের কথায়।
আমাদের লেখায়।
আমাদের নীরবতায়।

সেই রাতেই অয়ন একটা চিঠি লিখেছিল।
প্রেমার কাছে নয়।
নিজের কাছে।
সে লিখেছিল—
আমি তোমাকে ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি না।
আমি শুধু চাই, কোনো একদিন তুমি হাসতে হাসতে হঠাৎ থেমে যাও।
কোনো কারণ ছাড়াই আমার কথা মনে পড়ুক।
মনে হোক—কেউ একজন ছিল, যে তোমাকে পাওয়ার চেয়ে তোমাকে ভালো রাখতে বেশি চেয়েছিল।
কেউ একজন ছিল, যে তোমার কাছে কিছু চায়নি।
শুধু চেয়েছিল, তোমার জীবনের কোনো এক নীরব কোণে তার জন্য সামান্য জায়গা থাকুক।
চিঠিটা লিখে অয়ন জানালার পাশে রেখে দিল।
পাঠাল না।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—
সব অনুভূতির গন্তব্য একজন মানুষ নয়।
কিছু অনুভূতি শুধু নিজের ভেতরে বেঁচে থাকার জন্য জন্ম নেয়।

অনেক বছর পর একদিন প্রেমা ফিরে এসেছিল সেই শহরে।
অয়ন তখন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।
দূর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
—আপনি এখনও এখানে আসেন?
অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।
প্রেমা।
অনেক বছর পর।
চোখ দুটো এখনও একই রকম।
শুধু সময় সেখানে কিছু গল্প লিখে দিয়েছে।
অয়ন কিছু বলতে পারল না।
প্রেমাও চুপ।
তারপর প্রেমা ধীরে বলল,
—আপনি কি আমাকে ভুলে গেছেন?
অয়ন মৃদু হাসল।
—মানুষকে ভুলে যাওয়া যায়। কিন্তু কিছু অনুভূতিকে যায় না।
প্রেমা চোখ নামিয়ে বলল,
—তাহলে এতদিন কিছু বলেননি কেন?
অয়ন নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—কারণ একসময় বুঝেছিলাম, ভালোবাসা মানে সবসময় কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়।”
প্রেমার চোখ ভিজে উঠল।
—তাহলে ভালোবাসা কী?
অয়ন একটু হেসে বলল,
—কখনো কখনো দূরে দাঁড়িয়ে কারও ভালো থাকা দেখতে পারাটাও ভালোবাসা।
প্রেমা কোনো উত্তর দিল না।
শুধু পাশে এসে দাঁড়াল।
দুজনের মাঝখানে অনেক বছরের দূরত্ব।
তবু সেই মুহূর্তে অয়নের মনে হলো—
কিছু মানুষকে কাছে পেতে হয় না।
তারা পাশে দাঁড়ালেই পুরোনো পৃথিবীটা আবার একটু আলো পায়।
প্রেমা ধীরে বলল,
—আপনি কি এখনও আমাকে ভালোবাসেন?
অয়ন তার দিকে তাকাল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
—ভালোবাসা যদি চলে যাওয়ার সঙ্গে শেষ হয়ে যেত, তাহলে তোমাকে এত বছর পর দেখেও আমার বুকটা এভাবে কেঁপে উঠত না।
প্রেমা চোখ মুছে হেসে ফেলল।
অয়নও হাসল।
কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরল না।
কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দিল না।
শুধু দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল।
নদী বয়ে গেল।
বাতাস বয়ে গেল।
গাছের পাতাগুলো শব্দ করল।
আর অয়ন প্রথমবার বুঝল—
সে পাথর হয়ে যায়নি।
তার হৃদয় এখনও আছে।
শুধু সেই হৃদয়ের সবচেয়ে নরম জায়গাটায় একজন মানুষের নাম লেখা আছে।
প্রেমা।
যে হয়তো তার হয়নি।
কিন্তু যার জন্য ভালোবাসতে শেখার সৌভাগ্যটুকু অয়ন কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না।