রাত সাড়ে দশটার পর ছোট শহরের স্টেশনগুলো অদ্ভুত রকমের নির্জন হয়ে যায়।
দিনের কোলাহল তখন গুটিয়ে যায় প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে, বন্ধ চায়ের দোকানের শাটারে, আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা হলুদ বাতির নিচে। রেললাইনের ওপর অন্ধকার নেমে আসে ধীরে ধীরে। মাঝেমধ্যে দূর থেকে কোনো ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়, তারপর আবার সবকিছু নিস্তব্ধ।
সেদিনও স্টেশনটা প্রায় ফাঁকা।
অর্ণব তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ বেঞ্চটায় একা বসে ছিল।
সামনে রেললাইন।
তার ওপারে ঘন অন্ধকার।
আর হাতে একটা পুরোনো নীল ছাতা।
ছাতাটা তার নিজের নয়।
মৌয়ের।
প্রায় আট বছর আগে এক বর্ষার সন্ধ্যায় মৌ ছাতাটা তার হাতে দিয়েছিল।
বলেছিল,
—আপনি সবসময় ভিজে বাড়ি ফেরেন কেন?
অর্ণব হেসে বলেছিল,
—বৃষ্টি আমার ভালো লাগে।
মৌ একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
—বৃষ্টি ভালো লাগা আর সর্দি-জ্বর ভালো লাগা এক কথা নয়।
তারপর ছাতাটা তার হাতে এগিয়ে দিয়েছিল।
অর্ণব নিতে চায়নি।
মৌ জোর করে ছাতাটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল,
—রেখে দিন। ফেরত দিতে হবে না।
অর্ণব তখন বুঝতে পারেনি, কিছু মানুষ জিনিস দিয়ে আসলে নিজেদের একটা অংশ রেখে যায়।
মৌয়ের সঙ্গে অর্ণবের পরিচয় হয়েছিল কোনো সিনেমার মতো নয়।
প্রথম দেখাতেই প্রেম হয়নি।
তাদের গল্পের শুরুটাও ছিল খুব সাধারণ।
একদিন অফিসের জরুরি একটা মেইল পাঠাতে গিয়ে অর্ণব ভুল করে সেটা মৌকে পাঠিয়ে ফেলেছিল।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
আপনার মেইলটা আমার জন্য নয়। তবে এত রাতে কাজ করতে দেখে মনে হচ্ছে আপনার ঘুমের দরকার।
অর্ণব অবাক হয়ে লিখেছিল,
আপনি আমাকে চেনেন?
উত্তর এসেছিল,
না। তবে আপনার মেইল দেখে মনে হলো মানুষটা একটু বেশি চিন্তিত।
সেই ভুল মেইলটাই ধীরে ধীরে তাদের নিয়মিত কথোপকথনের কারণ হয়ে উঠেছিল।
প্রথমে কাজের কথা।
তারপর বই।
তারপর গান।
তারপর বৃষ্টি।
তারপর রাত।
তারপর এমন সব কথা, যেগুলোর কোনো শুরু ছিল না, শেষও ছিল না।
একসময় তারা বুঝতে পারল—
কথা বলার জন্য তাদের আর কোনো বিষয় লাগে না।
শুধু একজন আরেকজনের উপস্থিতিই যথেষ্ট।
মৌ খুব অদ্ভুত একটা মেয়ে ছিল।
সে রাগ করলে চুপ করে যেত।
অর্ণব জিজ্ঞেস করলে বলত,
—কিছু হয়নি।
অর্ণব জানত, কিছু হয়নি, মানে আসলে অনেক কিছু হয়েছে।
তবু সে আবার জিজ্ঞেস করত,
—তাহলে চুপ করে আছেন কেন?
মৌ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলত,
—সব কথা মুখে বলতে হয় নাকি?
অর্ণব হেসে বলত,
—তাহলে আমি কীভাবে বুঝব?
মৌ তখন তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলত,
—যে মানুষ সত্যি করে বুঝতে চায়, তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতে হয় না।
কথাটা অর্ণবের মনে গেঁথে গিয়েছিল।
কারণ সে সত্যিই মৌকে বুঝতে চাইত।
শুধু একটা জায়গায় এসে সে বারবার থেমে যেত।
মৌ তার কাছে কী?
বন্ধু?
অভ্যাস?
নাকি এমন একজন মানুষ, যার অনুপস্থিতিতে দিনের স্বাভাবিক শব্দগুলোও হঠাৎ অসহ্য লাগে?
এই প্রশ্নের উত্তর অর্ণব জানত।
কিন্তু উচ্চারণ করার সাহস ছিল না।
তাদের মধ্যে কখনো আনুষ্ঠানিক প্রেমের প্রস্তাব আসেনি।
অর্ণব বলেনি—
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
মৌও বলেনি—
আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তবু ভালোবাসা কখনো কখনো কথার চেয়ে আচরণে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মৌ অসুস্থ হলে অর্ণব সারারাত ফোনের ওপাশে থাকত।
অর্ণব কোনোদিন খাওয়া ভুলে গেলে মৌ রাগ করত।
অর্ণবের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে মৌ বলেছিল,
—চাকরি চলে গেলে আপনি ছোট হয়ে যাবেন না। মানুষকে একটা চাকরি দিয়ে মাপা যায় না।
অর্ণব সেদিন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
কারণ তার মনে হয়েছিল—
যে মানুষ আপনার ভেঙে পড়াকে আপনার ব্যর্থতা মনে করে না, তাকে কি শুধু বন্ধু বলা যায়?
আরেকদিন মৌ খুব মন খারাপ করে বলেছিল,
—আমার সঙ্গে কথা বলার মতো মানুষ খুব কম।
অর্ণব বলেছিল,
—আমি তো আছি।
মৌ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
—এই কথাটাই সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে।
—কেন?
মৌ ধীরে বলেছিল,
—কারণ মানুষ ‘আমি আছি’ খুব সহজে বলে। কিন্তু সবাই শেষ পর্যন্ত থাকে না।
অর্ণব তখনও কিছু বলেনি।
সে জানত না, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মতো সাহস তার নেই।
এক সন্ধ্যায় তারা নদীর ধারে বসেছিল।
শীতের শেষ সময়।
পানির ওপর ভাঙা ভাঙা আলো।
দূরে কোনো নৌকার মাঝি ধীরে ধীরে বৈঠা টানছিল।
মৌ হঠাৎ বলল,
—অর্ণব, মানুষ কি কাউকে ভালোবেসেও তার সঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে?
অর্ণব কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
—পারে।
—কেন?
—হয়তো সে জানে, শুধু ভালোবাসলেই সব সম্পর্ক টেকে না।
মৌ শুকনো একটা পাতা হাতে নিয়ে নদীর দিকে ছুড়ে দিল।
—আপনি হলে থাকতেন?
অর্ণবের মনে তখন একটা মাত্র উত্তর ছিল।
আপনি যদি থাকেন, আমি সবকিছু ছেড়ে আপনার পাশে থাকব।
কিন্তু সে বলল,
—পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
মৌ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ছোট করে হাসল।
সেই হাসির ভেতরে যে কতটা কষ্ট ছিল, অর্ণব সেদিন বুঝতে পারেনি।
মৌ হয়তো ভেবেছিল—
অর্ণব আমাকে এতটা চায় না।
অর্ণবও ভেবেছিল—
মৌ হয়তো আমাকে কখনোই নিজের মানুষ হিসেবে ভাবেনি।
দুজন মানুষ একই ভুলকে সত্যি ভেবে বসেছিল।
তারপর একদিন মৌ বলল,
—আমার বিয়ের কথা চলছে।
অর্ণবের মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে।
তবু সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখল।
—ভালো তো।
মৌ অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
—আপনি শুধু এটুকুই বলবেন?
অর্ণব মৃদু হাসল।
—আর কী বলব?
মৌ চোখ সরিয়ে নিল।
—কিছু না।
সেদিন ফেরার পথে দুজন পাশাপাশি হাঁটছিল।
চারপাশে শীতের নরম বাতাস।
অর্ণবের ভেতরে তখন ভয়ংকর একটা যুদ্ধ চলছিল।
সে থামতে চেয়েছিল।
মৌয়ের হাত ধরে বলতে চেয়েছিল—
আপনি অন্য কারও সঙ্গে চলে যাবেন না। আমি আপনাকে ভালোবাসি।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ভয় তাকে গ্রাস করল—
যদি মৌ অবাক হয়ে বলে,
আমি তো আপনাকে সেভাবে কখনো ভাবিনি।
তাহলে?
একটা বন্ধুত্ব হারানোর ভয় তার ভালোবাসা স্বীকার করার সাহসের চেয়ে বড় হয়ে গেল।
সে চুপ করে রইল।
কয়েক পা এগিয়ে মৌ নিজেই বলল,
—আপনি আমাকে আটকাবেন না?
অর্ণবের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল।
সে খুব ধীরে বলল,
—আপনি কি চান আমি আটকাই?
মৌ থেমে গেল।
তার চোখে পানি জমেছিল।
কিন্তু সে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
—থাক।
অর্ণবও আর কিছু বলল না।
দুজনেই অপেক্ষা করেছিল অন্যজনের শেষ কথাটার জন্য।
কেউ বলেনি।
সেদিন রাতে মৌ অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ফোনের স্ক্রিনে অর্ণবের নাম খোলা।
সে লিখেছিল—
আপনি যদি আজ একবার বলেন, ‘থেকে যান’, তাহলে আমি সবকিছু ছেড়ে দিতে পারি।
মৌ অনেকক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
তারপর পাঠায়নি।
মুছে ফেলেছিল।
অন্যদিকে অর্ণবও সেদিন রাতে একটা মেসেজ লিখেছিল—
আপনি যদি একবার বলেন যে আপনি আমাকে চান, তাহলে আমি কালই আপনার সামনে দাঁড়াব।
সেও পাঠায়নি।
দুজনের ফোনে দুটো না-পাঠানো বাক্য ছিল।
আর তাদের জীবনে ছিল একটা বিশাল ভুল বোঝাবুঝি।
মৌয়ের বিয়ের আগের দিন অর্ণব শেষবার তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।
মৌ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
খুব সাধারণ একটা পোশাক।
মুখে কোনো সাজ নেই।
তবু অর্ণবের চোখে সেদিনের মৌকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ মনে হয়েছিল।
অর্ণব বলল,
—কাল আপনার নতুন জীবন শুরু।
মৌ মৃদু হেসে বলল,
—হ্যাঁ।
—ভয় লাগছে?
মৌ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—জীবন বদলাতে ভয় লাগে না। ভুল মানুষকে হারানোর ভয় লাগে।
অর্ণব থমকে গেল।
তার বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন উঠল—
আমি কি সেই ভুল মানুষ?
কিন্তু সে জিজ্ঞেস করল না।
মৌও আর কিছু বলল না।
বিদায়ের সময় মৌ ঘরে গিয়ে সেই নীল ছাতাটা এনে অর্ণবের হাতে দিল।
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
—এটা?
—আপনার।
—আপনার তো।
—আজ থেকে আপনার।
—ফিরিয়ে দেব?
মৌ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসল।
—কিছু জিনিস ফেরত দিতে নেই।
অর্ণব ছাতাটা হাতে নিল।
সে জানত না, এই ছোট্ট নীল ছাতাটার সঙ্গে একটা সম্পূর্ণ ঋতু তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
মৌ চলে যাওয়ার পর অর্ণব অনেকবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল—
সে ভুল করেনি।
সে মৌয়ের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছে।
কিন্তু গভীর রাতে নিজের সঙ্গে একা হলে একটা প্রশ্ন তাকে তাড়া করত—
তুমি কি সত্যিই তাকে সম্মান করেছিলে, নাকি নিজের ভয়কে ভালোবাসার নাম দিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলে?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর অর্ণবের কাছে ছিল না।
কারণ সে জানত—
মৌ তাকে একবার নয়, অনেকবার সুযোগ দিয়েছিল।
কখনো সরাসরি।
কখনো চোখের ভাষায়।
কখনো অভিমানে।
কখনো নিঃশব্দ অপেক্ষায়।
কিন্তু প্রতিবারই অর্ণব ভেবেছিল—
আরও একটা দিন আছে।
আরও একটা সুযোগ আসবে।
আরও একটু সময় গেলে সব কথা বলা যাবে।
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হয়তো এখানেই।
আমরা প্রিয় মানুষটির জন্য সময়কে অসীম মনে করি।
ভাবি—
আজ না বললে কাল বলব।
আজ অভিমান ভাঙাতে না পারলে কাল ভাঙাব।
আজ হাতটা ধরে না রাখলে কোনো একদিন ঠিক ধরে রাখব।
কিন্তু সময় কারও জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না।
সে চলে যায়।
চুপচাপ।
কাউকে কিছু না জানিয়ে।
ঢাকায় যাওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস তাদের নিয়মিত কথা হতো।
প্রতিদিন।
তারপর একদিন পরপর।
তারপর সপ্তাহে।
তারপর শুধু বিশেষ দিনে।
অর্ণব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
মৌও নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।
কেউ কাউকে ছেড়ে দেয়নি।
কেউ সম্পর্ক শেষ করেনি।
শুধু দুজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজেদের ব্যস্ততার ভেতর এত দূরে চলে গেল যে, ফিরে আসার পথটা আর চোখে পড়ল না।
এক রাতে অর্ণব লিখেছিল—
মৌ, আমরা কি আগের মতো নেই?
অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে মেসেজটা পাঠায়নি।
পরদিন মৌ নিজেই লিখেছিল—
অনেকদিন কথা নেই। ভালো আছেন?
অর্ণব উত্তর দিয়েছিল,
ভালো আছি। আপনি?
মৌ লিখেছিল,
আমিও ভালো আছি।
দুটো মানুষ একই মিথ্যা বলেছিল।
কারণ দুজনেই জানত—
ভালো থাকা আর কাউকে ভুলে যাওয়া এক জিনিস নয়।
তারপর প্রায় পাঁচ বছর কোনো যোগাযোগ ছিল না।
এই পাঁচ বছরে অর্ণবের জীবনে অনেক কিছু বদলে গেল।
চাকরি বদলাল।
শহর বদলাল।
বাড়ি বদলাল।
কিছু মানুষ এল।
কিছু মানুষ চলে গেল।
জীবন তাকে ধীরে ধীরে শিখিয়ে দিল, মানুষের অনুপস্থিতির সঙ্গে কীভাবে অভ্যস্ত হতে হয়।
শুধু একটা জিনিস বদলায়নি।
তার আলমারির এক কোণে রাখা নীল ছাতাটা।
কখনো ব্যবহার করেনি।
ফেলে দিতেও পারেনি।
কারণ কিছু জিনিসের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু জিনিস আমাদের কাছে কোনো বস্তু নয়—
একটা সময়।
একটা মানুষ।
একটা অসমাপ্ত বাক্য।
মৌয়ের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল হঠাৎ।
বইমেলায়।
অর্ণব ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল—
—আপনি এখনও এত ভিড়ের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে থাকেন?
অর্ণব ঘুরে তাকাল।
মৌ।
আগের মতোই চোখ।
শুধু চোখের কোণে সামান্য ক্লান্তি।
চুল একটু ছোট।
হাসিটা আগের চেয়ে অনেক শান্ত।
অর্ণব কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না।
মৌ বলল,
—কেমন আছেন?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
—আপনি যেমন রেখে গিয়েছিলেন, তেমনই।
মৌও হেসে বলল,
—মানুষকে এত বছর পরেও কি একই রকম রাখা যায়?
অর্ণব উত্তর দিল না।
কারণ সে জানত—
মানুষ বদলায়।
শুধু কিছু অনুভূতি বদলায় না।
তারা সেদিন অনেকক্ষণ হাঁটল।
পুরোনো দিনের কথা হলো।
কে কোথায় ছিল।
কার জীবন কেমন গেল।
কীভাবে সময় তাদের দুজনকেই বদলে দিয়েছে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন কেউ করল না—
কেন আমরা একসঙ্গে হলাম না?
অর্ণবের খুব ইচ্ছে করছিল জিজ্ঞেস করতে।
কিন্তু ভয় হচ্ছিল।
কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর মানুষ আগের মতো থাকতে পারে না।
শেষে মৌ নিজেই বলল,
—আপনি কি কখনো আমাকে মিস করেছিলেন?
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—অনেকবার।
—তাহলে যোগাযোগ করেননি কেন?
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
—ভাবতাম আপনি হয়তো ভালো আছেন।
মৌ নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি ভালো থাকলে কি আপনাকে মনে পড়ত না?
অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল।
মৌয়ের চোখে পানি চিকচিক করছিল।
কিন্তু সে কাঁদল না।
শুধু বলল,
—আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলটা কী জানেন?
—কী?
—আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম, অন্যজন হয়তো আর আমাদের চায় না।
অর্ণবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।
এত বছর ধরে সে যে ভুলটাকে বাস্তব ভেবে বেঁচে ছিল—
সেটা আসলে দুজনেরই ভয় ছিল।
মৌ ধীরে বলল,
—আমি অনেকদিন আপনার ওপর রাগ করেছিলাম।
—কেন?
—কারণ আপনি কখনো আমাকে আটকাননি।
অর্ণবের গলা শুকিয়ে গেল।
মৌ বলল,
—আমি ভেবেছিলাম, আপনি আমাকে হারাতে ভয় পান না।
অর্ণব নিচু গলায় বলল,
—আমি ভয় পেয়েছিলাম।
মৌ তাকাল।
—কিসের?
অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—আপনাকে ভালোবাসি বলার পর যদি আপনাকে হারাতাম, তাহলে হয়তো নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারতাম না।
মৌয়ের চোখ বেয়ে এবার একটা অশ্রু নেমে এল।
সে ধীরে বলল,
—আর আমি ভেবেছিলাম, আপনি না বলছেন কারণ আপনি আমাকে ভালোবাসেন না।
দুজনেই চুপ করে রইল।
কত সহজ ছিল সত্যিটা।
তবু তারা দুজনেই সেটাকে কত কঠিন করে ফেলেছিল।
সেদিন বিদায়ের সময় মৌ হঠাৎ বলল,
—আপনার কাছে আমার ছাতাটা এখনও আছে?
অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।
—আপনি মনে রেখেছেন?
মৌ মৃদু হেসে বলল,
—কিছু জিনিস ভুলে যাওয়ার জন্য দেওয়া হয় না।
অর্ণব বলল,
—আছে।
—ফেলে দেবেন না।
—কেন?
মৌ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—জানি না।
তারপর চলে গেল।
অর্ণব দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো, আট বছর আগে যে বিদায়টা অসম্পূর্ণ ছিল, আজও তার শেষ হয়নি।
শুধু দুজন মানুষ নিজেদের জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে সেই অসমাপ্ত বিদায়টাকে মেনে নিতে শিখেছে।
আট বছর পর অর্ণব আবার সেই স্টেশনে বসে ছিল।
হাতে সেই নীল ছাতা।
আজ মৌ অন্য শহরে।
তার নিজের সংসার আছে।
অর্ণবেরও জীবন আছে।
তাদের মধ্যে কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
শুধু একটা অসমাপ্ত ভালোবাসা আছে, যেটাকে তারা দুজনেই নিজেদের জীবনের ভেতর খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছে।
দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।
অর্ণব উঠে দাঁড়াল।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল।
মানুষ উঠল।
নামল।
হুইসেল বাজল।
অর্ণব হঠাৎ বুঝতে পারল—
জীবনের কিছু ট্রেন সত্যিই শেষ ট্রেনের মতো।
একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না।
কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই যাত্রাটা অর্থহীন ছিল।
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে থাকার জন্য নয়।
তারা আসে আমাদের ভেতরে ভালোবাসার একটা ভাষা রেখে যেতে।
যে ভাষায় পরে আর কাউকে কিছু বলতে হয় না।
অর্ণব নীল ছাতাটা বুকের কাছে টেনে নিল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
—মৌ, তুমি আমার জীবনের অসমাপ্ত গল্প নও।
তুমি সেই গল্প—
যেটা শেষ হয়নি বলেই আজও এত সুন্দর।
ট্রেন চলে গেল।
প্ল্যাটফর্ম আবার ফাঁকা হয়ে গেল।
অর্ণব ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল।
তার হাতে নীল ছাতা।
আর বুকের ভেতর—
একটা ভালোবাসা।
যার কোনো দাবি নেই।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো ফিরে পাওয়ার অপেক্ষাও নেই।
শুধু আছে—
একজন মানুষকে কোনোদিন পুরোপুরি না পেয়েও,
সারাজীবন ভালোবেসে যাওয়ার এক অদ্ভুত শান্তি।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.