শীতের শুরু তখন।
বিকেলগুলো কেমন যেন অদ্ভুত দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল। সূর্য ডোবার আগেই চারপাশে নেমে আসছিল নরম কুয়াশা। দূরের গাছগুলোকে মনে হচ্ছিল ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পুরোনো স্মৃতি।
শহর থেকে একটু দূরে ছোট্ট এক মফস্বল শহর—পোড়াদহ।
শহরটা খুব বড় নয়। পুরোনো রেলস্টেশন, স্টেশনের পাশে কয়েকটা চায়ের দোকান, সরু মেঠোপথ, আর শহরের শেষ প্রান্তে বয়ে যাওয়া শান্ত একটি নদী—এই নিয়েই পোড়াদহের জীবন।
সন্ধ্যা নামলে স্টেশনের চায়ের দোকানগুলোতে আড্ডা জমত। দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা যেত। আর নদীর পাড়ে বসলে মনে হতো, পৃথিবীটা বুঝি একটু ধীর হয়ে গেছে।
সেই পোড়াদহেই থাকত অয়ন।
খুব সাধারণ একটা ছেলে।
বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না তার। শুধু একটা ভালো চাকরি করবে, মাকে ভালো রাখবে, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেবে আর নিজের মতো করে শান্ত একটা জীবন কাটাবে—এই ছিল তার ইচ্ছে।
কিন্তু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো অনেক সময় খুব সাধারণ কোনো বিকেলেই এসে দাঁড়ায়।
অয়নের জীবনেও এসেছিল এমন এক বিকেল।
সেদিন সে প্রথমবার দেখেছিল নীলাকে।
মেয়েটা স্টেশনের পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা বই। চোখেমুখে অদ্ভুত শান্ত একটা ভাব।
অয়ন দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।
নীলা হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—বইটা পড়েছেন?
অয়ন একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়ল।
—না।
—তাহলে হাতে নিয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—কিনব কি না ভাবছি।
নীলা বইটার দিকে তাকিয়ে বলল,
—যে বই কেনার আগে এত ভাবতে হয়, সে বই কেনা উচিত না ।
কথাটা বলে মেয়েটা চলে গেল।
অয়ন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর বইটা কিনে ফেলল।
সেদিন সে বুঝতে পারেনি—
সে শুধু একটা বই কিনছে না,
তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা অধ্যায়ের প্রথম পাতাটাও কিনে ফেলছে।
এরপর নীলার সঙ্গে অয়নের দেখা হতে লাগল।
কখনো পোড়াদহের ছোট্ট লাইব্রেরিতে।
কখনো স্টেশনের চায়ের দোকানে।
কখনো নদীর ধারে।
তাদের মধ্যে প্রেমের কোনো ঘোষণা ছিল না।
ছিল না কোনো প্রতিশ্রুতিও।
শুধু এক ধরনের অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
অয়ন জানত, বিকেল পাঁচটার দিকে নীলা লাইব্রেরি থেকে বের হয়।
নীলা জানত, সন্ধ্যার আগে অয়ন নদীর ধারে গিয়ে বসে।
কেউ কাউকে ডাকত না।
তবুও দুজনেই যেন জানত—
কোথায় গেলে অন্যজনকে পাওয়া যাবে।
একদিন সন্ধ্যায় নদীর ধারে পাশাপাশি বসেছিল তারা।
আকাশে তখন ফিকে চাঁদ উঠেছে।
অয়ন হঠাৎ বলল,
—তুমি কি কখনো কাউকে খুব মিস করেছ?
নীলা নদীর পানির দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বলল,
—যে মানুষকে কাছে পেয়েছি, তাকে মিস করিনি।
অয়ন হেসে বলল,
—তাহলে কাকে মিস করেছ?
নীলা ধীরে বলল,
—যাকে হারানোর ভয় হয়েছে, শুধু তাকেই।
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—আমাকে হারানোর ভয় হয়?
নীলা এবার তার দিকে তাকাল।
চোখে খুব অল্প হাসি।
তারপর বলল,
—তুমি খুব বেশি প্রশ্ন করো।
অয়নও হাসল।
সেদিন আর কোনো কথা হয়নি।
কিন্তু দুজনেই বুঝেছিল—
কিছু উত্তর মুখে বলতে হয় না।
কিছু উত্তর মানুষের চোখেই থেকে যায়।
চলে যাওয়ার দিন
অয়নের চাকরি হয়ে গেল রাজধানীতে।
চাকরিটা তার খুব প্রয়োজন ছিল।
সংসারের দায়িত্ব, মায়ের চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা—সব মিলিয়ে তাকে যেতেই হবে।
যেদিন যাওয়ার কথা, অয়ন নীলাকে কিছু বলতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত নীলাই বলল,
—তুমি চলে যাচ্ছ?
—হ্যাঁ।
—কতদিনের জন্য?
অয়ন একটু থেমে বলল,
—জানি না।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
—মানুষ যখন কোথাও যায়, তখন কি সবসময় ফিরে আসার কথা বলে?
অয়ন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমি ফিরব।
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—কথাটা মনে রেখো।
অয়ন সেদিন বুঝতে পারেনি—
একটা ছোট্ট বাক্যের ভেতরেও
কত দীর্ঘ অপেক্ষা লুকিয়ে থাকতে পারে।
রাজধানীর জীবন অয়নকে খুব দ্রুত বদলে দিল।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ।
অফিস, যানজট, মানুষের ভিড়, ছোট্ট একটা ভাড়া বাসা—দিনগুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
তবুও প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে সে নীলাকে মেসেজ করত।
আজ খুব ক্লান্ত।
নীলা উত্তর দিত,
ঘুমিয়ে পড়ো। কাল আবার নতুন দিন।
কখনো অয়ন লিখত,
আজ বৃষ্টি হয়েছে।
নীলা লিখত,
এখানেও।
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু অয়নের কাছে সেই সাধারণ কথাগুলোই ছিল দিনের সবচেয়ে সুন্দর সময়।
এক রাতে নীলা লিখল,
তুমি কি আমাকে মিস করো?
অয়ন অনেকক্ষণ উত্তর দিল না।
তারপর লিখল,
মিস করলে মানুষ কী করে জানো?
নীলা লিখল,
কী?
অয়ন লিখল,
যে মানুষটা পাশে নেই, তার সঙ্গে মনে মনে সারাদিন কথা বলে।
সেদিন নীলা আর কোনো উত্তর দেয়নি।
শুধু একটা ছোট্ট চাঁদের ছবি পাঠিয়েছিল।
অয়ন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
দূরত্ব
কয়েক মাস পর অয়নের কাজের চাপ বেড়ে গেল।
মেসেজের উত্তর দিতে দেরি হতে লাগল।
কথা কমে গেল।
আগের মতো রাত জেগে কথা বলা আর হতো না।
নীলা প্রথমে কিছু বলেনি।
তারপর একদিন ফোন করে বলল,
—তুমি বদলে গেছ।
অয়ন চুপ করে রইল।
নীলা আবার বলল,
—আগে তোমার দিনের সব কথা আমাকে বলতে। এখন তোমার দিনের মধ্যে আমার জন্য কোনো জায়গাই নেই।
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—আমি বদলাইনি, নীলা। শুধু জীবনটা একটু কঠিন হয়ে গেছে।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর নীলা বলল,
—কঠিন জীবনেও প্রিয় মানুষটার জন্য একটু জায়গা রাখতে হয়।
ফোনটা কেটে গেল।
সেদিন অয়ন অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাইরে শহরের হাজার হাজার আলো জ্বলছিল।
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—
এই বিশাল শহরে
একজন মানুষকে হারানোর ভয়টাই
সবচেয়ে বেশি অন্ধকার।
না বলা কষ্ট
কিছুদিন পর অয়নের মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
সে কাউকে কিছু না বলে ছুটে গেল পোড়াদহে।
মায়ের পাশে কয়েকদিন থাকার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলো।
কিন্তু নীলাকে সে কিছুই জানায়নি।
সে ভাবল,
জানালে নীলা চিন্তা করবে।
দুদিন পর নীলাই ফোন করল।
—তুমি পোড়াদহে?
অয়ন অবাক।
—তুমি জানলে কীভাবে?
নীলা শান্ত গলায় বলল,
—তোমার নীরবতা অনেক কিছু বলে।
অয়ন চুপ করে রইল।
নীলা আবার জিজ্ঞেস করল,
—তোমার মা কেমন আছেন?
—এখন ভালো।
—তুমি?
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—আমি তো ভালোই।
নীলা একটু রাগ করে বলল,
—সবসময় নিজের কষ্ট লুকাও কেন?
অয়ন কোনো উত্তর দিল না।
নীলা ধীরে বলল,
—তোমার দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার অধিকার যদি আমার না থাকে, তাহলে তোমার সুখে পাশে থাকার অধিকারটাও একদিন হারিয়ে ফেলব।
কথাটা অয়নের বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আটকে গেল।
সেদিন প্রথমবার সে নীলাকে তার সমস্ত ভয়, ক্লান্তি আর অসহায়তার কথা বলেছিল।
নীলা কোনো উপদেশ দেয়নি।
শুধু শুনেছিল।
শেষে বলেছিল,
—সব ঠিক হয়ে যাবে।
অয়ন জানত না সত্যিই সব ঠিক হবে কি না।
কিন্তু সেদিন তার মনে হয়েছিল—
কেউ একজন আছে, যে তার সমস্যার সমাধান করতে না পারলেও তার পাশে বসে থাকতে জানে।
আবার দেখা
কয়েক মাস পর অয়ন আবার পোড়াদহে ফিরল।
এবার কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে।
সন্ধ্যায় সে নদীর ধারে গিয়ে পুরোনো জায়গাটায় বসেছিল।
পেছন থেকে হঠাৎ পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
—এখনও এখানে বসো?
অয়ন ফিরে তাকাল।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে।
আগের মতোই।
শুধু চোখের কোণে একটু বেশি পরিণত নীরবতা।
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—তুমিও তো এসেছ।
নীলা নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—কিছু জায়গা ছেড়ে যাওয়া যায়, ভুলে যাওয়া যায় না।
দুজনেই চুপ করে রইল।
নদীর পানিতে তখন শেষ বিকেলের আলো ভাঙছিল।
অনেক কথা ছিল তাদের।
কিন্তু সেদিন কেউ পুরোনো হিসাব মেলাতে বসেনি।
নীলা হঠাৎ বলল,
—তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় ভুল কী?
অয়ন বলল,
—কী?
—তুমি ভাবো, ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে হলে তার কাছ থেকে কষ্ট লুকাতে হয়।
অয়ন চুপ।
নীলা বলল,
—সবসময় কাউকে রক্ষা করতে গিয়ে তাকে দূরে সরিয়ে দিতে নেই।
অয়ন ধীরে বলল,
—তাহলে কী করতে হয়?
নীলা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—হাতটা বাড়িয়ে দিতে হয়।
অয়ন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল।
নীলা একটু থেমে হাতটা ধরল।
খুব শক্ত করে নয়।
শুধু এতটুকু—
যাতে বোঝা যায়,
সে এখনো আছে।
জোছনার নিচে
সেদিন তারা অনেকক্ষণ নদীর ধারে বসেছিল।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে পূর্ণ চাঁদ উঠেছিল।
নদীর পানিতে চাঁদের আলো কাঁপছিল।
নীলা বলল,
—আবার চলে যাবে?
অয়ন বলল,
—হ্যাঁ।
—আবার ফিরবে?
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—এবার ঠিকানা রেখে যাব।
নীলা মাথা নাড়িয়ে বলল,
—ঠিকানা নয়, খবর রেখো।
অয়ন বলল,
—প্রতিদিন।
নীলা হেসে বলল,
—প্রতিদিন না হলেও চলবে। শুধু এমনভাবে হারিয়ে যেও না, যেন তোমাকে খুঁজতে গিয়ে আমার নিজের ভেতরটাই হারিয়ে ফেলি।
অয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—তোমাকে হারিয়ে ফেললে আমি নিজেকেও খুঁজে পাব না।
নীলা আর কিছু বলল না।
শুধু তার হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরে রাখল।
সেই মুহূর্তে অয়নের মনে হলো—
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে
থাকার জন্য নয়,
আমাদের ভেতরের একটা শূন্য জায়গাকে
চিরদিনের জন্য নিজের নামে রেখে যাওয়ার জন্য।
সেদিন রাতে পোড়াদহের আকাশ ছিল অদ্ভুত সুন্দর।
নদীর ওপর জোছনা নেমেছিল।
দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
নীলা বলল,
—শুনছ?
অয়ন বলল,
—হুম।
—ট্রেনটা কোথায় যাচ্ছে?
অয়ন মৃদু হেসে বলল,
—জানি না।
নীলা বলল,
—সব পথের গন্তব্য জানতে হয় না।
অয়ন তার দিকে তাকাল।
—কিছু পথ?
নীলা বলল,
—শুধু পাশে কাউকে নিয়ে হাঁটতে হয়।
অয়ন আর কিছু বলল না।
শুধু মনে মনে একটা কথা বলল—
তুমি পাশে থাকলে, পথ যত দীর্ঘই হোক, আমি হাঁটতে রাজি।
সময়ের সঙ্গে জীবন আবার ব্যস্ত হয়ে গেল।
অয়ন শহরে ফিরে গেল।
নীলা পোড়াদহেই রইল।
তাদের প্রতিদিন কথা হতো না।
কখনো দুদিন পর।
কখনো এক সপ্তাহ পর।
কখনো শুধু একটা ছোট্ট মেসেজ—
ভালো আছ?
উত্তর—
তুমি জিজ্ঞেস করেছ, তাই ভালো।
এভাবেই তাদের ভালোবাসা বড় কোনো ঘোষণায় নয়,
ছোট ছোট যত্নে বেঁচে রইল।
তারা বুঝে গিয়েছিল—
ভালোবাসা মানে প্রতিদিন কথা বলা নয়।
ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষ থাকা,
যার সঙ্গে কথা না হলেও
মনের ভেতর একটা আলো জ্বলে থাকে।
যার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য
কোনো বিশেষ কারণ লাগে না।
আর যার নাম মনে পড়লে
অকারণেই মুখে হাসি চলে আসে।
অয়ন জানত—
তার জীবনে অনেক মানুষ আসবে।
অনেক শহর বদলাবে।
অনেক রাস্তা পেরিয়ে যাবে।
কিন্তু পোড়াদহের সেই নদীর ধারে,
জোছনায় ভেজা সেই রাতে,
যে মেয়েটা তার হাত ধরে বলেছিল—
ঠিকানা নয়, খবর রেখো।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.