মাগুরার বিনোদপুর।
ছোট্ট একটা জায়গা। খুব বেশি ব্যস্ত নয়, আবার একেবারে নিরিবিলিও নয়। বিকেল নামলে রাস্তার দুপাশে ছায়া লম্বা হয়, দূরের গাছগুলো কেমন যেন ধূসর হয়ে আসে। শীতের সকালে কুয়াশা নামে, আর বর্ষায় রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে আকাশের টুকরো টুকরো ছবি দেখা যায়।
এই বিনোদপুরেই অর্ণবের বড় হয়ে ওঠা।
আর এই বিনোদপুরেই কোনো এক বিকেলে প্রিয়ন্তীর সঙ্গে তার পরিচয়।
তখন তারা কেউই জানত না—একটা সাধারণ পরিচয় একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ গল্প হয়ে উঠবে।
প্রথমদিকে তাদের সম্পর্কটা ছিল খুব সাধারণ।
কথা হতো প্রয়োজনের কারণে।
কখনো পড়াশোনা নিয়ে, কখনো কোনো ছোট্ট ঘটনা নিয়ে, কখনো আবার একেবারেই কোনো কারণ ছাড়াই।
অর্ণব প্রায়ই বলত,
— জানিস প্রিয়ন্তী, জীবনে অনেক মানুষ আসবে। কেউ থাকবে, কেউ চলে যাবে। কিন্তু তুই যদি থাকিস, আমার মনে হয় আর কাউকে আমার দরকার হবে না।
প্রিয়ন্তী তখন হেসে বলত,
— এত সহজে কাউকে জীবনের সবকিছু বানিয়ে ফেলতে নেই, অর্ণব।
অর্ণব মৃদু হেসে বলত,
— সব মানুষকে না। তোকে বানানো যায়।
প্রিয়ন্তী তখন আর কিছু বলত না।
শুধু চুপ করে থাকত।
হয়তো তার বুকের ভেতরেও তখন একই রকম কোনো কথা জন্ম নিচ্ছিল।
তাদের ভালোবাসার শুরুটা খুব নাটকীয় ছিল না।
কেউ কাউকে ফুল দিয়ে প্রপোজ করেনি।
কোনো বড় আয়োজন হয়নি।
কোনো সিনেমার মতো দৃশ্যও ছিল না।
ভালোবাসাটা ধীরে ধীরে তাদের জীবনে ঢুকে পড়েছিল।
একদিন প্রিয়ন্তী অর্ণবকে না জানিয়ে দুপুরের খাবার খায়নি।
অর্ণব জিজ্ঞেস করেছিল,
— খেয়েছিস?
প্রিয়ন্তী বলেছিল,
— না।
— কেন?
— মন চায়নি।
অর্ণব একটু রাগ করে বলেছিল,
— মন চাইলেই খেতে হবে এমন না। শরীরেরও তো একটা অধিকার আছে। যা, এখনই খেয়ে নে।
প্রিয়ন্তী হেসে বলেছিল,
— তুমি এত বকো কেন?
অর্ণব বলেছিল,
— কারণ তুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিন প্রিয়ন্তী আর কিছু বলেনি।
কিন্তু ফোনটা রেখে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল।
মানুষকে ভালোবাসা হয়তো বড় বড় কথা দিয়ে শুরু হয় না।
কখনো কখনো একটা—
খেয়েছ?
একটা—
সাবধানে যাস।
অথবা খুব সাধারণ একটা—
মন খারাপ করিস না, আমি আছি।
এসব দিয়েই ভালোবাসা জন্ম নেয়।
অর্ণব আর প্রিয়ন্তীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।
তাদের দিনগুলো ধীরে ধীরে একে অপরকে ঘিরে যেতে লাগল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রিয়ন্তীর মেসেজ না পেলে অর্ণবের দিন শুরু হতে চাইত না।
আর রাতে অর্ণবের সঙ্গে কথা না বলে প্রিয়ন্তীর ঘুম আসত না।
তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত।
কোথায় থাকবে।
কীভাবে সংসার করবে।
একদিন নিজেদের একটা ছোট্ট ঘর হবে।
জানালার পাশে প্রিয়ন্তীর জন্য একটা বুকশেলফ থাকবে।
আর অর্ণব বলত,
— সন্ধ্যায় আমি অফিস থেকে ফিরে আসব, আর তুই জানালার পাশে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করবি।
প্রিয়ন্তী হাসত।
— আর যদি কোনোদিন দেরি করো?
— ফোন করে জানাব।
— আর যদি ফোন না করো?
অর্ণব বলত,
— তুই রাগ করে দরজা খুলবি না।
প্রিয়ন্তী বলত,
— ঠিক আছে।
অর্ণব হেসে বলত,
— কিন্তু শেষে খুলবি তো?
প্রিয়ন্তী একটু চুপ থেকে বলত,
— হুম।
তখন তাদের কাছে এসব কথাই ছিল ভবিষ্যৎ।
তারা জানত না, ভবিষ্যৎ কখনো কখনো মানুষের পরিকল্পনা খুব সহজেই বদলে দেয়।
সময় গড়িয়ে গেল।
অর্ণব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো।
প্রিয়ন্তীও নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
দুজনের জীবন ধীরে ধীরে আলাদা ছন্দে চলতে শুরু করল।
অর্ণব পড়াশোনার পাশাপাশি একটা ছোট চাকরি নিল।
পরিবারের দায়িত্ব তার ওপর একটু বেশি ছিল।
বাবার বয়স হয়েছে।
সংসারের খরচ আছে।
ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা আছে।
অন্যদিকে প্রিয়ন্তীর জীবনেও নতুন কিছু মানুষ এলো।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিবেশ।
নতুন ব্যস্ততা।
প্রথমদিকে কেউ বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।
আগের মতো প্রতিদিন কথা না হলেও কথা হতো।
তারপর প্রতিদিন থেকে একদিন পরপর।
একদিন পরপর থেকে সপ্তাহে কয়েকবার।
তারপর সপ্তাহে একবার।
অর্ণব প্রথমদিকে নিজেকে বুঝিয়ে বলত,
মানুষ ব্যস্ত হয়।
প্রিয়ন্তী ব্যস্ত।
আমি ব্যস্ত।
জীবন বদলাচ্ছে।
তাই বলে ভালোবাসা বদলে যাবে কেন?
একদিন অর্ণব ফোন করল।
— কী করছিস?
প্রিয়ন্তী বলল,
— ব্যস্ত আছি। পরে কথা বলব।
— কখন?
— সময় পেলে ফোন দেব।
ফোন কেটে গেল।
অর্ণব অপেক্ষা করল।
এক ঘণ্টা।
দুই ঘণ্টা।
সন্ধ্যা।
রাত।
ফোন এল না।
পরদিনও না।
অর্ণব নিজেকে বলল,
হয়তো সত্যিই ব্যস্ত।
কয়েকদিন পর আবার ফোন করল।
প্রিয়ন্তী ধরল না।
কিছুক্ষণ পর একটা মেসেজ এল—
অর্ণব, আজ একটু ঝামেলায় আছি। কাল কথা বলব।
অর্ণব ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল।
তার মনে হলো,
কালটা নিশ্চয়ই আসবে।
কাল এল।
কিন্তু প্রিয়ন্তীর ফোন এল না।
এভাবে কয়েক মাস কেটে গেল।
অর্ণব বুঝতে পারছিল, কিছু একটা বদলে গেছে।
কিন্তু সে বিশ্বাস করতে চাইছিল না।
সে নিজেকে বারবার বলত,
মানুষ বদলায় না, পরিস্থিতি বদলায়।
একদিন অর্ণবের চাকরিটাও চলে গেল।
হঠাৎ করে।
কোনো প্রস্তুতি ছিল না।
কোনো সঞ্চয়ও খুব বেশি ছিল না।
সংসারের খরচ, বাবার ওষুধ, ভাইয়ের পড়াশোনা—সবকিছু একসঙ্গে তার মাথার ওপর এসে পড়ল।
সেদিন সন্ধ্যায় বিনোদপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণবের সবার আগে যার কথা মনে পড়ল, সে প্রিয়ন্তী।
সে ফোন করল।
অনেকক্ষণ পর প্রিয়ন্তী ফোন ধরল।
— হ্যালো।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— প্রিয়ন্তী, কেমন আছিস?
— ভালো। বল।
অর্ণবের গলা কেমন যেন ভারী হয়ে গেল।
— আমার চাকরিটা চলে গেছে। একটু বিপদে পড়েছি।
প্রিয়ন্তী চুপ করে রইল।
অর্ণব বলল,
— তুই যদি একটু কথা বলিস, কারও কাছে যদি একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারিস...
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর প্রিয়ন্তী বলল,
— আমি চেষ্টা করব। তবে এখন আমার নিজেরও অনেক ঝামেলা।
— আমি বুঝি। তুই শুধু একটু চেষ্টা করিস।
— আচ্ছা। দেখি।
ফোন কেটে গেল।
অর্ণব সেই ‘দেখি’ শব্দটার ওপর ভরসা করল।
একদিন গেল।
দুই দিন গেল।
এক সপ্তাহ গেল।
প্রিয়ন্তীর কোনো ফোন এল না।
অর্ণব নিজে ফোন করল।
ফোন বন্ধ।
পরের দিন আবার করল।
রিং হলো।
কেউ ধরল না।
তারপর আর ফোন করল না।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—
কিছু অপেক্ষার কোনো উত্তর আসে না।
কয়েক সপ্তাহ পর অর্ণব একটা ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়ে গেল।
বেতন আগের চেয়ে কম।
কাজ অনেক বেশি।
তবুও সে খুশি হলো।
অন্তত সংসারটা চলবে।
সেদিন সন্ধ্যায় বিনোদপুরের বাজারে হঠাৎ প্রিয়ন্তীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
প্রিয়ন্তীর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল।
তারা হাসছিল।
কথা বলছিল।
প্রিয়ন্তীও হাসছিল।
অর্ণব কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তারপর এগিয়ে গেল।
— কী রে, কেমন আছিস?
প্রিয়ন্তী একটু থেমে বলল,
— ভালো। তুমি?
এই প্রথম অর্ণব খেয়াল করল—
প্রিয়ন্তী তাকে ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’ বলে ফেলেছে।
অর্ণব মৃদু হেসে বলল,
— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।
— চাকরি পেয়েছ?
— হ্যাঁ।
— ভালো হয়েছে।
ব্যস।
কথা শেষ।
মাত্র কয়েকটা শব্দ।
অথচ একসময় তাদের কথা শেষ হতো না।
একটা রাত শেষ হয়ে যেত, কিন্তু কথা শেষ হতো না।
আজ কয়েক মিনিটও যেন অনেক বেশি।
অর্ণব প্রিয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বুঝল—
মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু আগের সেই প্রিয়ন্তী আর নেই।
সেদিন রাতে অর্ণব অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল।
বিনোদপুরের রাত তখন প্রায় নিস্তব্ধ।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছিল।
কোনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছিল।
অর্ণবের মনে হচ্ছিল,
সে কি কোনো ভুল করেছে?
সে কি প্রিয়ন্তীকে বেশি ভালোবেসেছিল?
সে কি কোনোদিন তাকে কষ্ট দিয়েছিল?
সে কি খুব বেশি আশা করেছিল?
নাকি ভালোবাসাটাই ছিল তার ভুল?
অনেক ভেবে কোনো উত্তর পেল না।
সেদিন অর্ণব প্রথম বুঝল—
সব সম্পর্ক ভাঙার জন্য সবসময় কোনো অপরাধ লাগে না।
কখনো কখনো মানুষ শুধু দূরে সরে যায়।
কোনো কারণ ছাড়াই।
কয়েকদিন পর অর্ণবের মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
— কী হয়েছে তোর?
— কিছু না।
— কিছু না হলে মানুষ এত চুপচাপ থাকে?
অর্ণব মৃদু হাসল।
তারপর বলল,
— মা, কখনো কখনো মানুষকে হারানো যায় না। শুধু তার সঙ্গে আগের সম্পর্কটা হারিয়ে যায়।
মা কিছু বললেন না।
শুধু ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
সেই হাতের স্পর্শে অর্ণবের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
সে বুঝল—
প্রিয়ন্তীকে হারানোর কষ্টের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছে এই সত্যটা মেনে নিতে যে, প্রিয়ন্তী আর তার জীবনের আগের জায়গাটায় নেই।
এরপর অর্ণব ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করল।
সকালে অফিস।
সন্ধ্যায় বাড়ি।
ছুটির দিনে মায়ের সঙ্গে বাজারে যাওয়া।
ভাইয়ের পড়াশোনা দেখা।
রাতে বই পড়া।
কখনো একা বিনোদপুরের রাস্তায় হাঁটা।
আগে এই রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটলে তার সঙ্গে প্রিয়ন্তীর কথা মনে পড়ত।
এখনও পড়ে।
তবে আগের মতো বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যায় না।
সময়ের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।
সে কোনো কষ্ট পুরোপুরি মুছে দেয় না।
শুধু কষ্টটার সঙ্গে বসবাস করতে শেখায়।
একসময় অর্ণব বুঝতে পারল—
প্রিয়ন্তী কেন বদলে গেল, এই প্রশ্নটার উত্তর জানা তার আর প্রয়োজন নেই।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলেও মানুষ ফিরে আসে না।
এক সন্ধ্যায় প্রিয়ন্তী ফোন করল।
অর্ণব ফোনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
অনেকদিন পর তার নাম স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে।
একসময় এই নামটা দেখলেই তার বুকের ভেতর আনন্দ হতো।
আজ হলো না।
শুধু একটা পুরোনো স্মৃতি এসে দরজায় দাঁড়াল।
অর্ণব ফোন ধরল।
— হ্যালো।
— অর্ণব?
— হুম।
— কেমন আছ?
— ভালো। তুমি?
— ভালো। অনেকদিন কথা হয় না।
অর্ণব মৃদু হাসল।
— হ্যাঁ, অনেকদিন।
প্রিয়ন্তী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।
— বলো।
— আমার একটু টাকা দরকার ছিল। কয়েক দিনের জন্য। তুমি যদি...
অর্ণব চুপ করে রইল।
তার চোখের সামনে এক মুহূর্তে অনেক পুরোনো ছবি ভেসে উঠল।
বিনোদপুরের রাস্তা।
একসঙ্গে হাঁটা।
বৃষ্টির দিন।
প্রিয়ন্তীর হাসি।
‘আমি আছি’ বলা রাতগুলো।
তারপর সেই দিন—
যেদিন সে চাকরি হারিয়ে সাহায্য চেয়েছিল।
অর্ণব খুব শান্ত গলায় বলল,
— প্রিয়ন্তী, এখন আমারও অনেক দায়িত্ব। এই মুহূর্তে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারব না। তবে অন্য কোনোভাবে যদি পারি, বলো।
ওপাশে নীরবতা।
তারপর প্রিয়ন্তী বলল,
— ঠিক আছে।
ফোন কেটে গেল।
অর্ণব ফোনটা টেবিলে রেখে দিল।
তার বুকের ভেতর কোনো রাগ হলো না।
কোনো অভিমানও হলো না।
বরং অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করল।
সে বুঝল—
ভালোবাসা আর নিজের আত্মসম্মান—দুটো একসঙ্গে থাকতে পারে।
কাউকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি চাওয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা নয়।
কাউকে ক্ষমা করা মানে তাকে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া নয়।
আর কাউকে ভালোবেসেছিলাম বলে সারাজীবন তার অপেক্ষায় বসে থাকা ভালোবাসার প্রমাণ নয়।
কয়েক বছর কেটে গেল।
অর্ণব নিজের কাজের দক্ষতা বাড়াল।
কিছু টাকা জমাল।
একসময় ছোট একটা ব্যবসা শুরু করল।
প্রথমদিকে অনেক সমস্যা হলো।
কখনো ব্যবসা ভালো গেল।
কখনো খারাপ।
কখনো মনে হলো সব ছেড়ে দেবে।
কিন্তু এবার সে জানত—
জীবনে কাউকে হারালেও নিজের জীবনকে হারানো যাবে না।
তার জীবনে নতুন মানুষ এল।
কেউ বন্ধু হলো।
কেউ খুব কাছের হলো।
কেউ আবার কিছুদিন পর দূরে চলে গেল।
কিন্তু আগের মতো কোনো বিচ্ছেদ তাকে ভেঙে ফেলল না।
কারণ সে শিখে গেছে—
কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় দীর্ঘদিনের জন্য।
কিছু মানুষ আসে কিছুটা পথ হাঁটতে।
আর কিছু মানুষ আসে আমাদের এমন শিক্ষা দিয়ে যেতে, যা কোনো বই শেখাতে পারে না।
প্রিয়ন্তী তাকে সেই শিক্ষাটাই দিয়ে গিয়েছিল।
একদিন অর্ণব পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করছিল।
হঠাৎ একটা পুরোনো খাম তার হাতে এলো।
খামের ভেতরে কয়েকটা ছবি।
একটায় অর্ণব আর প্রিয়ন্তী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
পেছনে বিনোদপুরের সেই পুরোনো রাস্তা।
প্রিয়ন্তীর মুখে হাসি।
অর্ণবও হাসছে।
ছবিটা হাতে নিয়ে অর্ণব অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তার চোখে পানি এল না।
অভিমানও হলো না।
শুধু মনে হলো—
কী সুন্দর ছিল সময়টা!
সে ছবিটা ছিঁড়ে ফেলল না।
আবার বুকের কাছে চেপেও ধরল না।
সযত্নে ছবিটা খামের মধ্যে রেখে আলমারির এক পাশে তুলে রাখল।
কারণ অতীতকে মুছে ফেলতে হয় না।
অতীতকে শুধু তার নিজের জায়গায় রাখতে হয়।
কয়েক মাস পর এক বিকেলে বিনোদপুরের সেই পুরোনো রাস্তায় আবার প্রিয়ন্তীর সঙ্গে দেখা হলো।
প্রিয়ন্তী একা ছিল।
দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
প্রিয়ন্তী বলল,
— তুমি কি আমার ওপর রাগ করে আছ?
অর্ণব মৃদু হাসল।
— না।
— তাহলে আগের মতো কথা বলো না কেন?
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— কারণ আগের মতো আমরা আর নেই।
প্রিয়ন্তী মাথা নিচু করল।
অর্ণব বলল,
— তুমি বদলেছ। আমিও বদলেছি। হয়তো আমাদের জীবনও বদলে গেছে। এটা নিয়ে কাউকে দোষ দিয়ে কী হবে?
প্রিয়ন্তী ধীরে ধীরে বলল,
— তুমি আমাকে এত সহজে ক্ষমা করে দিলে?
অর্ণব একটু হেসে বলল,
— ক্ষমা করা কঠিন ছিল না। কঠিন ছিল মেনে নেওয়া যে, যাকে আমি সারাজীবন একই জায়গায় ভেবেছিলাম, সে হয়তো আর সেখানে নেই।
প্রিয়ন্তীর চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু বলল না।
অর্ণবও না।
কিছু নীরবতা থাকে, যার মধ্যে অনেক বছরের কথা জমে থাকে।
অর্ণব ধীরে বলল,
— জানিস প্রিয়ন্তী, আগে ভাবতাম ভালোবাসা মানে কাউকে সারাজীবন নিজের পাশে রাখা। এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে কখনো কখনো কাউকে মুক্তিও দেওয়া।
প্রিয়ন্তী তাকিয়ে রইল।
— তাহলে আমাদের ভালোবাসাটা কী ছিল?
অর্ণব আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— ছিল। খুব সত্যি ছিল। শুধু চিরস্থায়ী ছিল না।
প্রিয়ন্তীর চোখ বেয়ে তখন একটা অশ্রু নেমে এলো।
অর্ণব দেখেও কিছু বলল না।
কারণ কিছু কান্নার সামনে কোনো সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না।
দুজন আবার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।
আগের মতো নয়।
তাদের মধ্যে আর সেই অধিকার নেই।
আগের মতো হাত ধরে হাঁটা নেই।
আগের মতো ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখাও নেই।
তবুও তারা একেবারে অপরিচিতও নয়।
কারণ কিছু মানুষ আমাদের জীবনের এমন জায়গায় থেকে যায়, যেখান থেকে তাদের পুরোপুরি অপরিচিত করে দেওয়া সম্ভব হয় না।
বিনোদপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণবের মনে হলো—
একসময় এই পথেই সে প্রিয়ন্তীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল।
আজ সেই একই পথে হাঁটছে দুজন মানুষ, যাদের ভবিষ্যৎ আলাদা।
কী অদ্ভুত!
একই রাস্তা।
একই আকাশ।
একই মানুষ দুজন।
শুধু সময়টা বদলে গেছে।
সেদিন রাতে অর্ণব জানালার পাশে বসে ছিল।
বাইরে বিনোদপুরের রাত।
দূরে কোনো একটা বাড়িতে আলো জ্বলছে।
বাতাসে শরতের গন্ধ।
অর্ণবের মনে কোনো অভিযোগ নেই।
প্রিয়ন্তীর প্রতিও নেই।
শুধু একটা মায়া আছে।
পুরোনো দিনের জন্য।
সেই প্রথম ভালোবাসার জন্য।
সেই বিশ্বাসের জন্য, যখন তারা ভেবেছিল—
তারা সারাজীবন একসঙ্গে থাকবে।
হয়তো তারা থাকেনি।
কিন্তু সেই সময়টা মিথ্যা ছিল না।
কারণ একটা সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেই তার ভেতরের ভালোবাসাগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না।
কিছু ভালোবাসা জীবনের শেষ পর্যন্ত থাকে না।
কিছু ভালোবাসা শুধু জীবনের একটা অধ্যায় হয়ে থাকে।
কিন্তু সেই অধ্যায়টিই হয়তো পুরো বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
অর্ণব জানত—
প্রিয়ন্তী তার জীবনের শেষ ভালোবাসা নয়।
কিন্তু সে ছিল এমন একজন, যার জন্য অর্ণব প্রথমবার বুঝেছিল—
কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তাকে কাছে পাওয়া নয়।
কখনো কখনো দূরে দাঁড়িয়ে তার ভালো থাকাটাও মেনে নেওয়া।
সেদিন থেকে অর্ণব আর কাউকে হারানোর ভয় নিয়ে ভালোবাসেনি।
যে এসেছে, তাকে সম্মান দিয়েছে।
যে থেকেছে, তাকে যত্ন করেছে।
যে চলে গেছে, তাকে তার পথের স্বাধীনতা দিয়েছে।
কারণ সে বুঝে গেছে—
ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়।
ভালোবাসা মানে তার জীবনে নিজের জায়গাটুকুকে সত্যি করে রাখা।
আর সম্পর্ক ভেঙে গেলে?
সবসময় মানুষটাকে ভুলে যেতে হয় না।
শুধু তাকে নিজের হৃদয়ের ঠিক জায়গাটায় রেখে দিতে হয়।
যেখানে স্মৃতি থাকবে।
মায়া থাকবে।
হয়তো একটু কষ্টও থাকবে।
কিন্তু থাকবে না কোনো দাবি।
থাকবে না কোনো অপেক্ষা।
থাকবে শুধু—
একসময় একজন প্রিয়ন্তী ছিল।
যাকে অর্ণব খুব ভালোবাসত।
আর হয়তো কোনো এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বিনোদপুরের সেই পুরোনো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অর্ণবের মনে হবে—
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে থাকার জন্য নয়,
আমাদের ভালোবাসতে শেখানোর জন্য।
প্রিয়ন্তীও তেমনই একজন।
সে অর্ণবের জীবনে আসেনি শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য।
এসেছিল তাকে একটা অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প দিয়ে যেতে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.