আমি তোমার অভাববোধ করি।
ভীষণ রকমের অভাব।
এই অভাবের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ঘড়ির কাঁটা দেখে সে আসে না, কোনো বিশেষ দিনের অপেক্ষাও করে না। হঠাৎ করে আসে। কখনো সকালের আলোয়, কখনো বিকেলের শেষ রোদে, কখনো গভীর রাতে—যখন চারপাশের সবাই ঘুমিয়ে থাকে, অথচ আমার ঘুম আসে না।
তখন তোমাকে খুব মনে পড়ে।
অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো?
তুমি পাশে না থেকেও আমার এত কাছে কীভাবে থাকো, আমি আজও বুঝতে পারিনি।
সকালে ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করে না। চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারপর হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ে। মনে হয়, তুমি যদি এই মুহূর্তে পাশে থাকতে!
ঘুমজড়ানো চোখে তোমাকে একবার দেখতাম।
হয়তো কিছুই বলতাম না।
শুধু দেখতাম।
তুমি হয়তো বিরক্ত হয়ে বলতে,
এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?
আমি হাসতাম।
বলতাম না যে, তোমাকে দেখার এই সামান্য সুযোগটুকুর জন্যই হয়তো এতদিন অপেক্ষা করেছি।
তারপর দিন শুরু হয়ে যায়।
মানুষজন আসে, কথা বলে, কাজের ব্যস্ততা বাড়ে। আমিও স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করি। কেউ বুঝতে পারে না—একজন মানুষ সারাদিনের এত ভিড়ের মধ্যেও কী ভীষণ একা হয়ে থাকতে পারে।
কখনো কাজের মাঝখানে হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ে।
কোনো কারণ ছাড়াই।
মনে হয়, এখন যদি তোমার একটা ছোট্ট মেসেজ আসত—
কী করছ?
শুধু এইটুকু।
বিশ্বাস করো, এই দুই শব্দও কখনো কখনো একটা মানুষের পুরো দিনটা বদলে দিতে পারে।
তোমার সঙ্গে আমার হয়তো এখন নিয়মিত কথা হয় না। হয়তো অনেক কিছুই বদলে গেছে। আগের মতো অপেক্ষা নেই, আগের মতো কথা নেই, আগের মতো অভিমানও নেই।
কিন্তু মায়াটা আছে।
কিছু কিছু মায়া খুব জেদি হয়। মানুষকে ছেড়ে যায় না।
তুমিও যাওনি।
দিনের শেষে যখন একা ঘরে ফিরি, তখন তোমার অনুপস্থিতিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চারপাশে সবকিছু ঠিকঠাক থাকে—জানালা, বিছানা, টেবিল, বাতি—শুধু একটা মানুষ থাকে না।
আর সেই একজন মানুষের না থাকাটাই পুরো ঘরটাকে অসম্পূর্ণ করে দেয়।
রাতে মাঝে মাঝে ফোনটা হাতে নিই।
তোমার নামের দিকে তাকিয়ে থাকি।
মেসেজ লিখি।
আবার মুছে ফেলি।
কিছু কথা পাঠানো যায় না। কারণ কিছু কথা পাঠিয়ে দিলে নিজের ভেতরের দুর্বলতাটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়।
তাই চুপ করে থাকি।
তুমি হয়তো ভাবো, আমি ভালো আছি।
হ্যাঁ, আছি।
মানুষ বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু ভালো থাকা প্রয়োজন, ততটুকু ভালো আছি।
কিন্তু যে ভালো থাকার মধ্যে তুমি নেই, সে ভালো থাকা আর কতটুকু ভালো থাকা বলো?
কখনো কখনো খুব ইচ্ছে করে তোমাকে বলি—
ফিরে এসো।
কিন্তু বলি না।
কারণ ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার চেয়েও কখনো কখনো তার ইচ্ছেটাকে সম্মান করা বড় হয়ে যায়।
তাই তোমাকে ডাকিও না।
শুধু মনে মনে অপেক্ষা করি।
অপেক্ষা—যার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তবুও অপেক্ষা আছে।
হয়তো কোনো একদিন হঠাৎ তুমি ফিরে এসে বলবে,
অনেকদিন পর কথা হলো।
আমি হয়তো তখনও আগের মতোই চুপ করে থাকব।
হয়তো শুধু মৃদু করে হাসব।
তোমাকে বলব না—এই একটা কথার জন্য আমি কত রাত জেগেছি।
বলব না—কতবার তোমাকে মনে করে বুকের ভেতরটা হঠাৎ খালি হয়ে গেছে।
বলব না—তোমাকে ভুলে যাওয়ার অভিনয় করতে করতে কতবার নিজের কাছেই হেরে গেছি।
শুধু তোমার দিকে তাকিয়ে থাকব।
কারণ কিছু ভালোবাসার গল্পের শেষ হয় না।
শুধু মানুষগুলো দূরে সরে যায়।
আর ভালোবাসাটা থেকে যায়—
একটা পুরোনো চিঠির মতো,
একটা অসমাপ্ত কথার মতো,
একটা বৃষ্টিভেজা বিকেলের মতো।
তুমি জানো না, তোমার অভাবটা আমার কাছে কতটা গভীর।
এটা শুধু তোমাকে কাছে না পাওয়ার অভাব নয়।
এটা তোমাকে কিছু বলতে না পারার অভাব।
তোমার পাশে বসে চুপ করে থাকতে না পারার অভাব।
তোমার মন খারাপ হলে পাশে গিয়ে দাঁড়াতে না পারার অভাব।
হঠাৎ তোমার হাতটা ধরে বলতে না পারার অভাব—
আমি আছি।
হয়তো কোনোদিন তোমাকে পাওয়া হবে না।
হয়তো আমাদের গল্পটা কোনোদিন পূর্ণ হবে না।
তবুও আমার মনের খুব গোপন একটা জায়গায় তুমি থেকে যাবে।
সেখানে তোমার কোনো বিকল্প থাকবে না।
কেউ তোমার জায়গাটা নিতে পারবে না।
কারণ মানুষ চলে গেলে তার জায়গাটা শূন্য হয় না—
কিছু মানুষ চলে যাওয়ার পর
তাদের জায়গায় শূন্যতাটাই থেকে যায়।
আর সেই শূন্যতার নাম যদি কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করে—
আমি খুব আস্তে করে তোমার নামটা বলব।
তারপর হয়তো চুপ করে যাব।
কারণ তোমার নাম উচ্চারণ করার পর
আমার বলার মতো আর কিছু থাকে না।
শুধু বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
আর সেই দীর্ঘশ্বাসটা খুব পরিচিত।
তার নাম—
তোমার অভাব।

Comments (2)