আবির খুব সাধারণ একটা ছেলে। অথচ তার ভেতরের পৃথিবীটা ছিল বড্ড অসাধারণ। মানুষের ভিড়ে থেকেও সে একা থাকতে পছন্দ করত। খুব বেশি কথা বলত না, নিজের অনুভূতিগুলো সহজে প্রকাশও করতে পারত না। বই পড়া, বৃষ্টির শব্দ শোনা, জানালার পাশে বসে চা খাওয়া—এসব ছোট ছোট অভ্যাসেই তার আনন্দ।

ঢাকার ব্যস্ত শহরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে আবির। প্রতিদিন একই রুটিন—সকালে ঘুম থেকে ওঠা, অফিসে যাওয়া, সারাদিন কাজের ব্যস্ততা, সন্ধ্যায় বাসায় ফেরা। বাইরে থেকে দেখলে তার জীবন বেশ গোছানো। কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে।

বন্ধুরা প্রায়ই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।

—আবির, তোর জীবনে প্রেম-ভালোবাসা বলে কিছু নেই?

আবির মুচকি হেসে বলে,

—সব মানুষের জীবনে প্রেম আসে না। কারও কারও জীবনে শুধু প্রেমের গল্পগুলো এসে দরজায় কড়া নাড়ে, তারপর ফিরে যায়।

বন্ধুরা হাসে। কিন্তু আবির জানে, তার এই কথার পেছনে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত একাকিত্ব।

সে তখনো জানত না, খুব শিগগিরই তার জীবনে এমন একজন আসবে, যার সঙ্গে পরিচয় হবে অল্প সময়ের, অথচ স্মৃতি থেকে যাবে অনেক দীর্ঘ।


নবনীতার সঙ্গে আবিরের পরিচয় হয়েছিল এক বর্ষার সন্ধ্যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

একটি বইয়ের গ্রুপে আবির তার প্রিয় উপন্যাস নিয়ে ছোট্ট একটি লেখা প্রকাশ করেছিল। লেখাটির নিচে অনেকেই মন্তব্য করেছিল। সেখানেই নবনীতা লিখেছিল—

কিছু বই শেষ হয়ে যায়, অথচ চরিত্রগুলো অনেক দিন মনের মধ্যে থেকে যায়।

মন্তব্যটি আবিরের ভালো লেগেছিল। সে উত্তর দিয়েছিল—

কিছু মানুষও হয়তো তেমন। পরিচয় শেষ হয়ে যায়, অথচ তাদের রেখে যাওয়া অনুভূতিগুলো শেষ হয় না।

এরপর খুব সাধারণ কিছু কথাবার্তা।

কেমন আছেন?
কী বই পড়েন?
বৃষ্টি ভালো লাগে?
চা নাকি কফি?

কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আবিরের কাছে অদ্ভুত সুন্দর মনে হতো।

নবনীতা খুব বেশি কথা বলত না। কখনো দীর্ঘ সময় পর উত্তর দিত, কখনো শুধু ছোট্ট একটি শব্দ লিখে কথার ইতি টানত। আবির তবুও অপেক্ষা করত।

কেন করত, সে নিজেও জানত না।

একদিন নবনীতা বলেছিল,

—আপনি এত বই পড়েন কেন?

আবির লিখেছিল,

—মানুষের সঙ্গে সব কথা বলা যায় না। বই অন্তত কাউকে বিচার করে না।

নবনীতা উত্তর দিয়েছিল,

—তাহলে আপনার অনেক না-বলা কথা জমে আছে নিশ্চয়ই।

আবির কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর লিখেছিল,

—হ্যাঁ। তবে সব কথা বলার মতো মানুষ তো আর পাওয়া যায় না।

সেদিন কথোপকথনটা সেখানেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু আবিরের মনে হয়েছিল, কেউ একজন হয়তো তার নীরবতার ভাষা একটু হলেও বুঝতে পেরেছে।


দিন যেতে লাগল।

আবিরের প্রতিদিনের রুটিনে ছোট্ট একটি পরিবর্তন এল। সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন দেখা, অফিসের ফাঁকে নবনীতার কোনো বার্তা এসেছে কি না খোঁজ নেওয়া, রাতে ঘুমানোর আগে তার সঙ্গে দু-একটি কথা বলা।

এই সামান্য বিষয়গুলোই ধীরে ধীরে তার দিনের সবচেয়ে আনন্দের অংশ হয়ে উঠল।

নবনীতার পছন্দ ছিল বৃষ্টি, পুরোনো গান আর সাদা রঙের ফুল। আবির এসব মনে রাখত।

একদিন বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশে এক দোকানে সাদা বেলি ফুল দেখে তার নবনীতার কথা মনে পড়ল। অকারণেই ফুল কিনে ফেলল সে। বাসায় ফিরে ফুলগুলো বইয়ের পাশে রেখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

নিজেই হেসে বলল,

—কী অদ্ভুত! যে মানুষটাকে কখনো সামনে থেকে দেখিনি, তার পছন্দের ফুল কিনে বসে আছি!

সেদিন রাতে নবনীতাকে লিখেছিল,

জানো, আজ একটা বেলি ফুল কিনেছি। তোমার পছন্দের কথা মনে পড়ল।

নবনীতা উত্তর দিয়েছিল,

আমার জন্য?

আবির লিখেছিল,

হয়তো। কিছু মানুষকে উপহার দিতে না পারলেও তাদের পছন্দগুলো নিজের জীবনে জায়গা দেওয়া যায়।

নবনীতা আর কোনো উত্তর দেয়নি।

আবির তবুও মন খারাপ করেনি। সে জানত, সব অনুভূতির উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না।

কিন্তু মানুষ যখন কাউকে একটু বেশি ভালোবেসে ফেলে, তখন সামান্য নীরবতাও তার কাছে অনেক বড় হয়ে ওঠে।


একসময় নবনীতার সঙ্গে কথা বলার সময় কমে আসতে লাগল।

আগে যেখানে প্রতিদিন কিছু না কিছু কথা হতো, এখন সেখানে দু-এক দিন পরপর ছোট্ট কিছু উত্তর আসত।

আবির প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো নবনীতা ব্যস্ত। হয়তো কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা নিজের কোনো সমস্যা আছে।

সে নিজেকে বোঝাত।

কিন্তু একদিন রাত বারোটার দিকে নবনীতার একটি বার্তা এল।

আবির, একটা কথা বলব?

বলো।

আপনি আমাকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবছেন বলে মনে হয়।

আবিরের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

কেন এমন মনে হলো?

আপনার কথাগুলো অনেক সময় আমার কাছে অস্বস্তিকর লাগে। আমি হয়তো আপনাকে সেভাবে ভাবি না। আপনি বিষয়টা অন্যভাবে নেবেন না, প্লিজ।

আবির অনেকক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লিখল,

আমি বুঝতে পেরেছি। তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। আমার অনুভূতি আমার নিজের, সেটার দায় তোমার নয়। ভালো থেকো।

সেদিন আর কোনো কথা হয়নি।

আবির জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। টেবিলের ওপর খোলা বইটি অনেকক্ষণ ধরে একই পাতায় পড়ে ছিল।

তার মনে হচ্ছিল, কিছু কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু এটুকু শেখাতে—ভালোবাসা মানেই কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়।

কখনো কখনো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো, প্রিয় মানুষটির ইচ্ছাকে সম্মান করে নীরবে সরে দাঁড়ানো।


পরবর্তী কয়েকটি দিন আবিরের জন্য সহজ ছিল না।

অভ্যাস বড় অদ্ভুত জিনিস। যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, হঠাৎ তার সঙ্গে কথা না বলাটা সহজ নয়।

সকালে ফোন হাতে নিয়েও সে আর কোনো বার্তা পাঠাত না। রাতে পুরোনো কথোপকথন খুলে পড়ত, আবার বন্ধ করে দিত।

একদিন তার বন্ধু সজীব দেখা করতে এল।

সজীব বলল,

—কী হয়েছে তোর? আগের মতো নেই কেন?

আবির হেসে বলল,

—মানুষ একটু একটু করে বদলায়, বুঝলি।

—কোনো সমস্যা হয়েছে?

—না। শুধু বুঝেছি, অন্য কারও জীবনে জায়গা পাওয়ার জন্য নিজের পুরো পৃথিবীটা থামিয়ে রাখা উচিত নয়।

সজীব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—তাহলে এখন কী করবি?

আবির জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল,

—নিজের মতো করে বাঁচব।

সেদিন অনেক দিন পর আবির নিজের জন্য একটি বই কিনল। পরদিন সকালে ছুটির দিনে একা বেরিয়ে পড়ল। পুরোনো ঢাকার সরু গলি ঘুরল, রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে বসে চা খেল, বিকেলে লেকের ধারে অনেকক্ষণ হাঁটল।

তার মনে হলো, পৃথিবীটা এখনো সুন্দর।

শুধু একজন মানুষের অনুপস্থিতি দিয়ে পুরো পৃথিবীর সৌন্দর্য মাপা যায় না।


কয়েক মাস কেটে গেছে।

আবির এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাভাবিক। নবনীতার কথা তার মনে পড়ে, কিন্তু সেই স্মৃতি এখন আর প্রতিদিনের জীবনকে এলোমেলো করে দেয় না।

এক বিকেলে বইয়ের তাক গোছাতে গিয়ে সে একটি পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পেল। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—

কিছু মানুষকে জীবনে পাওয়া যায় না, তবুও তারা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে যায়।

সে ডায়েরিটি খুলে শেষ পাতায় একটি চিঠি লিখতে শুরু করল।

প্রিয় নবনীতা,

জানি, এই চিঠি তোমার কাছে কখনো পৌঁছাবে না। তবুও লিখছি।

একসময় তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার দিন অপেক্ষা করত। তোমার একটি ছোট্ট বার্তা আমার মন ভালো করে দিত। হয়তো তোমার কাছে বিষয়গুলো খুব সাধারণ ছিল, কিন্তু আমার কাছে ছিল ভীষণ মূল্যবান।

আমি তোমাকে কোনো অভিযোগ করতে চাই না। তুমি তোমার মতো করে বেঁচে আছ, আমিও চেষ্টা করছি নিজের মতো করে বাঁচতে।

একটা সময় মনে হতো, তোমাকে ছাড়া আমার দিন অসম্পূর্ণ। এখন বুঝি, মানুষ আসলে নিজের ভেতরেই অনেকটা পূর্ণতা খুঁজে নিতে পারে।

তোমাকে ভালো লেগেছিল, হয়তো ভালোবাসাও হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুভূতির বিনিময়ে তোমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার অধিকার আমার ছিল না।

তাই আজ আর কোনো প্রত্যাশা নেই।

শুধু চাই, তুমি ভালো থেকো। তোমার পছন্দের সাদা ফুলগুলো যেন প্রতিটি বসন্তে ফুটে থাকে। তোমার জানালায় যেন প্রতিদিন সুন্দর সকাল এসে দাঁড়ায়।

আর আমি?

আমি হয়তো কোনো এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় আবার বই খুলে বসব। কোনো পরিচিত বাক্য পড়তে গিয়ে হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়বে। তারপর মৃদু হাসব।

কারণ, সব স্মৃতিকে ভুলে যেতে হয় না। কিছু স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়েই সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা যায়।

ইতি,
একসময়ের নীরব অনুভূতি।

চিঠিটি লেখা শেষ করে আবির ডায়েরি বন্ধ করল।

তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

বাইরে তখন গোধূলি। আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে। দূরে কোনো বাড়ির ছাদে একটি মেয়ে গাছের টবে পানি দিচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে।

আবিরের মনে হলো, জীবন আসলে থেমে থাকে না। কেউ চলে যায়, কেউ থেকে যায়, কেউ আবার নতুন করে নিজের সঙ্গে পরিচিত হয়।

সে টেবিলের ওপর রাখা বেলি ফুলের শুকনো পাপড়িগুলো হাতে তুলে নিল। একসময় যে ফুলগুলো কিনেছিল নবনীতার কথা ভেবে, আজ সেগুলো তার কাছে অন্য এক অর্থ বহন করে।

এগুলো আর কারও জন্য অপেক্ষার প্রতীক নয়।

এগুলো তার নিজের জীবনের একটি অধ্যায়।


রাত বাড়ছিল।

আবির বারান্দায় বসে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিল। ফোনে একটি নতুন বার্তা এল। পুরোনো কোনো পরিচিত নয়, নতুন একজন মানুষ।

বার্তাটি খুব সাধারণ—

আপনি কি বই পড়তে ভালোবাসেন?

আবির কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে উত্তর দিল—

হ্যাঁ, খুব ভালোবাসি।

এরপর সে আর কিছু লিখল না। কোনো গল্পের শুরু নিয়ে তাড়াহুড়ো করল না, কোনো অনুভূতির নামও দিল না।

কারণ, সে শিখে গেছে—জীবনে কাউকে ভালো লাগা সুন্দর, কিন্তু নিজের ভালো থাকাটাও জরুরি।

হয়তো কোনো একদিন আবার কারও সঙ্গে তার পরিচয় হবে। হয়তো আবার কোনো বিকেলে চায়ের কাপ হাতে গল্প জমবে। হয়তো কেউ তার নীরবতা বুঝতে চাইবে।

আবার হয়তো কিছুই হবে না।

তাতে কী!

জীবন তো শুধু কাউকে ভালোবাসার নাম নয়। জীবন নিজের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার নাম, নিজের ভেতরের মানুষটিকে হারিয়ে না ফেলার নাম।

আবির আকাশের দিকে তাকাল।

অনেক দিন পর তার মনে হলো, সে সত্যিই ভালো আছে।

তবে গল্পের একেবারে শেষ মুহূর্তে তার ফোনের গ্যালারিতে একটি পুরোনো ছবি ভেসে উঠল—নবনীতার পছন্দের সাদা বেলি ফুলের ছবি।

ছবিটির নিচে আবিরের নিজের লেখা একটি লাইন—

তোমাকে দেওয়ার জন্য কিনেছিলাম, অথচ শেষ পর্যন্ত ফুলগুলো আমাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে দিল।

আবির ছবিটি মুছে দিল না।

শুধু ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে দিল।

কিছু স্মৃতি মুছে ফেলতে হয় না। তাদের আর প্রতিদিন ছুঁয়ে দেখতে হয় না, এতটুকু শিখে নিতে পারলেই মানুষ বোধহয় বড় হয়ে যায়।