ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামলে শহরটাকে কেমন অচেনা মনে হয়। রাস্তায় জমে থাকা পানিতে নিয়ন আলোর প্রতিচ্ছবি কাঁপতে থাকে, বাসের জানালায় মুখ রেখে মানুষগুলো দূরের কোনো স্মৃতি খুঁজে বেড়ায়। আর কিছু মানুষ থাকে, যারা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে এমন কাউকে মনে করে, যার সঙ্গে হয়তো কোনোদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি।

অর্ণব সেই মানুষগুলোর একজন।

ছেলেটার বয়স আটাশ। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। মাসের শেষে বেতন পায়, বাড়িভাড়া দেয়, মাকে টাকা পাঠায়, আর রাত হলে নিজের ছোট্ট ঘরে ফিরে জানালার পাশে বসে চা খায়। তার জীবনটা খুব সাধারণ। এতটাই সাধারণ যে, জীবনে কোনো বড় ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল।

প্রেম সম্পর্কে অর্ণবের ধারণা ছিল অদ্ভুত।

তার বিশ্বাস, মানুষ প্রেমে পড়ে মূলত নিজের একাকিত্ব ঢাকার জন্য। একসময় সেই একাকিত্ব অন্য মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়, তারপর অভ্যাস ভেঙে গেলে মানুষ সেটাকে ভালোবাসার মৃত্যু বলে।

অর্ণব একদিন তার বন্ধুকে বলেছিল,
— ভালোবাসা বলে কিছু নেই রে। আছে কিছুদিনের মায়া, আর সেই মায়া কেটে যাওয়ার পর দীর্ঘদিনের অভ্যাস।

বন্ধু হেসে বলেছিল,
— তুই প্রেমে পড়িসনি বলে এমন কথা বলছিস।

অর্ণব সেদিন উত্তর দেয়নি।

সে জানত না, খুব শিগগিরই এমন একজন মানুষ তার জীবনে আসবে, যে তার এত দিনের বিশ্বাসগুলোকে একটা একটা করে মিথ্যা প্রমাণ করে দেবে।

আর সেই মেয়েটি আসবে এক বর্ষার বিকেলে।

সেদিন অফিস থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। আকাশজুড়ে কালো মেঘ। অর্ণব বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা পুরোনো ছাতা। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। মানুষজন দৌড়ে দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে লাগল।

অর্ণবের পাশে এসে দাঁড়াল একটি মেয়ে।

সাদা সালোয়ার-কামিজ, নীল ওড়না, কাঁধে বাদামি রঙের ব্যাগ। চুলের ডগা থেকে বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে। মেয়েটি একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর অর্ণবের হাতে থাকা ছাতার দিকে।

— শুনছেন?

অর্ণব তাকাল।

— জি?

— আপনার ছাতাটা কি দুজনের জন্য যথেষ্ট?

অর্ণব একটু অবাক হলো। তারপর ছাতার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ছাতাটা ছোট। তবে চেষ্টা করলে দুজনেরই হয়ে যাবে।

মেয়েটি হেসে ফেলল।

কিছু কিছু হাসি আছে, যেগুলো কানে শোনা যায় না; সরাসরি মানুষের ভেতরে গিয়ে পৌঁছায়।

মেয়েটির হাসিটা ছিল তেমন।

— তাহলে একটু চেষ্টা করেই দেখি।

সেদিন তারা একই ছাতার নিচে পাশাপাশি হেঁটেছিল প্রায় দশ মিনিট। অথচ অর্ণবের মনে হয়েছিল, এই দশ মিনিটের মধ্যে তার জীবনের কোনো একটা পুরোনো দরজা খুলে গেছে।

মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা।

বিদায় নেওয়ার আগে মেঘলা বলেছিল,

— আচ্ছা, আপনার নামটা তো জানা হলো না।

— অর্ণব।

— সুন্দর নাম।

— আপনার নামটাও।

মেঘলা মৃদু হেসে বলেছিল,

— আমার নামের সঙ্গে কিন্তু বৃষ্টির বেশ মিল আছে।

— কেন?

— কারণ আমি যখনই কারও জীবনে আসি, তার কিছু না কিছু এলোমেলো করে দিয়ে যাই।

কথাটা বলে মেঘলা চলে গিয়েছিল।

অর্ণব দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ।

তারপর নিজের অজান্তেই হেসে ফেলেছিল। সে জানত না, মেয়েটি সেদিন মজা করে কথাটা বলেছিল, নাকি নিজের জীবন সম্পর্কে কোনো গোপন সত্য জানিয়ে গিয়েছিল।

শুধু এটুকু জানত, বাসায় ফিরে সেদিন তার চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।

কারণ, জানালার পাশে বসেও সে বারবার একটা মুখ মনে করার চেষ্টা করছিল।

একটি মেয়ে।

একটি বৃষ্টির বিকেল।

আর একটি ছোট্ট ছাতা, যার নিচে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ প্রথমবারের মতো একে অপরের জীবনের দিকে একটু এগিয়ে এসেছিল।

পরের কয়েকটা দিন অর্ণব নিজের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করল।

কিন্তু মানুষের মন বড় অদ্ভুত। যে মানুষকে জীবনে মাত্র দশ মিনিট দেখা হয়েছে, কখনো কখনো তার জন্যই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে।

অর্ণবেরও তা-ই হচ্ছিল।

বাসস্ট্যান্ডে গেলে সে অকারণে চারপাশে তাকাত। সাদা পোশাক আর নীল ওড়না দেখলেই বুকের ভেতর কেমন একটা শব্দ হতো। তারপর কাছে গিয়ে দেখত, মেয়েটি অন্য কেউ।

নিজের এই আচরণে সে বিরক্ত হতো।

একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সেই একই বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটি কণ্ঠ ভেসে এল।

— কী ব্যাপার, অর্ণব সাহেব? আজও কি ছাতা নিয়ে মানুষের উপকার করতে এসেছেন?

অর্ণব ঘুরে তাকাল।

মেঘলা।

আজ তার পরনে হালকা হলুদ কামিজ। চুল খোলা। চোখে এমন একটা হাসি, যেন পৃথিবীর সমস্ত দুষ্টুমি সে একাই জানে।

অর্ণব বলল,

— আপনি এখানে?

— না, আমি আসলে চাঁদ থেকে এসেছি। বাসের অপেক্ষা করছি।

অর্ণব হেসে ফেলল।

— আপনার কথাবার্তা এমন কেন?

— কেমন?

— একটু অদ্ভুত।

— ভালো। অদ্ভুত মানুষদেরই মনে রাখা যায়।

কথাটা বলে মেঘলা রাস্তার ওপাশের একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে বলল,

— চলুন, চা খাওয়ান।

অর্ণবের মনে হলো, জীবনে প্রথমবার কোনো মেয়ে তাকে চা খাওয়ানোর প্রস্তাব না দিয়ে চা খাওয়াতে বলেছে, আর সে তাতে একটুও আপত্তি করতে পারছে না।

তারা দোকানের বেঞ্চে পাশাপাশি বসল।

মেঘলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

— আপনি খুব চুপচাপ, তাই না?

— সব সময় না।

— তাহলে এখন চুপ কেন?

অর্ণব একটু ভেবে বলল,

— কিছু মানুষকে প্রথম দেখায় কী বলতে হয়, সেটা বুঝতে সময় লাগে।

মেঘলা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।

— আর দ্বিতীয়বার দেখলে?

— তখন মনে হয়, প্রথম দিনই এত কথা বলা উচিত ছিল।

মেঘলা কিছুক্ষণ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

— আপনি কিন্তু মাঝে মাঝে ভালো কথা বলতে পারেন।

সেদিন তাদের অনেক কথা হয়েছিল।

মেঘলা বই পড়তে ভালোবাসে। পুরোনো বাংলা গান শুনলে তার মন খারাপ হয়। সে সমুদ্র দেখতে চায়, কিন্তু সমুদ্রের কাছে গেলে নাকি কান্না পায়। তার একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে—মন খারাপ হলে সে অপরিচিত মানুষদের গল্প কল্পনা করে।

অর্ণব জানতে চেয়েছিল,

— নিজের গল্প কল্পনা করেন না?

মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর বলেছিল,

— নিজের গল্প তো আমি জানি। সেখানে নতুন করে কল্পনা করার কী আছে?

কথাটার মধ্যে কেমন একটা বিষণ্নতা ছিল।

অর্ণব আর প্রশ্ন করেনি।

সেদিন বিদায় নেওয়ার সময় মেঘলা নিজের ফোন বের করে বলল,

— আপনার নম্বরটা দিন।

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

— কেন?

— আবার চা খাব।

— শুধু চা?

মেঘলা চোখ ছোট করে বলল,

— বেশি আশা করবেন না, অর্ণব সাহেব। চা থেকে মানুষ অনেক কিছু কল্পনা করে ফেলে।

অর্ণব নম্বরটা দিয়ে দিয়েছিল।

সেই রাতে তার ফোনে একটি বার্তা এসেছিল।

বাসায় পৌঁছেছেন? আজ ছাতাটা সঙ্গে ছিল তো?

অর্ণব বার্তাটা পড়ে অনেকক্ষণ হাসল।

তারপর লিখল,

পৌঁছেছি। তবে আজ ছাতা ছিল না।

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

তাহলে সাবধানে থাকবেন। সব সময় তো আর আমি থাকব না।

অর্ণব জানালার বাইরে তাকাল।

শহরের আকাশে সেদিন বৃষ্টি ছিল না।

তবু তার মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন খুব আস্তে আস্তে বৃষ্টি পড়ছে।

ভালোবাসা ঠিক কখন শুরু হয়, কেউ কি বলতে পারে?

প্রথম দেখায়?

প্রথম কথায়?

নাকি সেই রাতে, যখন ঘুমাতে যাওয়ার আগে মানুষটা অকারণে ফোনের পর্দা জ্বালিয়ে দেখে—কোনো বার্তা এসেছে কি না?

অর্ণব জানত না।

শুধু বুঝতে পারছিল, মেঘলা তার দৈনন্দিন জীবনের ভেতরে এমনভাবে ঢুকে পড়েছে, যেন সে বরাবরই সেখানে ছিল।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মেঘলার বার্তা দেখার অপেক্ষা।

দুপুরে অফিসের ফাঁকে তার পাঠানো কোনো হাসির ইমোজি দেখে একা একা হেসে ওঠা।

বিকেলে চা খেতে বসে মনে হওয়া, মেয়েটি পাশে থাকলে হয়তো চায়ের স্বাদটা একটু অন্য রকম হতো।

আর রাতে ঘুমানোর আগে মেঘলার কণ্ঠ শোনার অজুহাত খোঁজা।

এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।

একদিন মেঘলা ফোন করে বলল,

— অর্ণব, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

— বলো।

সেদিন প্রথমবার মেঘলা তাকে আপনি না বলে তুমি বলেছিল।

অর্ণবের বুকের ভেতর ছোট্ট একটা আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল।

— তুমি কি কখনো কাউকে খুব বেশি ভালোবেসেছ?

অর্ণব চুপ করে রইল।

— কী হলো? উত্তর দিচ্ছ না কেন?

— ভালোবাসিনি। তবে একজনকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মেঘলা বলল,

— তাকে বলেছ?

অর্ণব জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

— সে যদি বুঝতে না পারে?

— তাহলে বুঝিয়ে বলতে হয়।

— আর যদি বুঝেও না বোঝার ভান করে?

এবার মেঘলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

— তাহলে তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না, অর্ণব। ভালোবাসা ভিক্ষা করে নিতে হয় না।

অর্ণবের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

সে বলতে চেয়েছিল, মেঘলা, আমি তোমাকেই ভালোবাসতে শুরু করেছি।

কিন্তু কথাটা বলা হলো না।

কিছু অনুভূতি মানুষের ভেতরে জন্ম নেয় খুব নিঃশব্দে। তাদের প্রকাশ করার জন্য সাহস লাগে, আর সেই সাহস জোগাড় করতে করতে কখনো কখনো সময় ফুরিয়ে যায়।

এর কয়েক দিন পর মেঘলা অর্ণবকে নিয়ে গেল ধানমন্ডির একটি ছোট্ট বইয়ের দোকানে।

একটি বই হাতে নিয়ে বলল,

— জানো, আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, বড় হয়ে এমন একজন মানুষকে বিয়ে করব, যে আমাকে প্রতিদিন একটা করে চিঠি লিখবে।

অর্ণব হেসে বলল,

— এখনো সেই ইচ্ছে আছে?

মেঘলা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল,

— ইচ্ছে আছে। কিন্তু এখন মনে হয়, মানুষ চিঠি লেখার সময় পায় না। সবাই ব্যস্ত।

— সবাই না।

মেঘলা তাকাল।

— তুমি লিখবে?

অর্ণব কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— তুমি চাইলে প্রতিদিন লিখব।

মেঘলা হেসেছিল।

সেই হাসির ভেতর আনন্দ ছিল, নাকি কোনো চাপা কষ্ট—অর্ণব বুঝতে পারেনি।

সে শুধু জানত, সেদিন বাড়ি ফিরে প্রথমবার একটি চিঠি লিখতে বসেছিল।

চিঠির শুরুতে লিখেছিল—

প্রিয় মেঘলা,

তোমাকে কী বলে সম্বোধন করব, বুঝতে পারছি না। বন্ধু বললে মনে হয়, শব্দটা খুব ছোট হয়ে যায়। আর ভালোবাসার মানুষ বলার মতো সাহস এখনো হয়নি। শুধু জানি, তুমি আসার পর আমার সাধারণ দিনগুলোও বিশেষ হয়ে উঠেছে।

তুমি হয়তো জানো না, তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমি প্রতিদিন কত অজুহাত খুঁজি। তুমি হয়তো বুঝতে পারো না, তোমার একটা ছোট্ট বার্তা আমার সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিতে পারে।

আমি জানি না, আমাদের গল্পের শেষ কোথায়। শুধু চাই, কোনো একদিন তুমি আমার পাশে বসে এই চিঠিটা পড়বে। আর পড়া শেষে মৃদু হেসে বলবে—অর্ণব, এত দিনে কথাটা বলতে পারলে?

চিঠিটা লেখা শেষ করে অর্ণব খামে ভরে রাখল।

সে জানত না, এই চিঠি কোনোদিন মেঘলার হাতে পৌঁছাবে কি না।

কিন্তু সে এটুকু বুঝেছিল—যে মানুষ একদিন ভালোবাসাকে নিছক অভ্যাস বলেছিল, সেই মানুষটাই এখন একটি মেয়ের জন্য নিজের হৃদয়ের সমস্ত অগোছালো কথা সাজিয়ে লিখছে।

প্রেম বোধহয় এমনই।

মানুষকে বদলে দেয়।

কখনো কখনো এতটাই বদলে দেয় যে, নিজের পুরোনো মানুষটাকে আর চিনতেই পারা যায় না।

এক শুক্রবার বিকেলে মেঘলা অর্ণবকে ফোন করে বলল,

— আজ তোমার সঙ্গে একটা জায়গায় যেতে চাই।

— কোথায়?

— গেলে বুঝবে।

তারা বিকেলবেলা হাতিরঝিলের ধারে দেখা করল। আকাশ মেঘলা ছিল। পানির ওপর বাতাসের ঢেউ উঠছিল ছোট ছোট করে। দূরে কয়েকজন তরুণ ছবি তুলছিল, এক পাশে বসে ছিল একটি বৃদ্ধ দম্পতি।

মেঘলা রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

— অর্ণব, তোমার কি কখনো মনে হয়, জীবনে কিছু মানুষ আসে শুধু আমাদের সুখী করার জন্য নয়, আমাদের কিছু শিখিয়ে দেওয়ার জন্যও?

অর্ণব বলল,

— হয়তো। তবে মানুষ কষ্ট দিয়ে শিক্ষা দিলে সেই শিক্ষার খুব একটা দরকার নেই।

মেঘলা হাসল না।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলল,

— ধরো, তুমি কাউকে খুব ভালোবাসো। কিন্তু তুমি জানো, তার সঙ্গে তোমার ভবিষ্যৎ নেই। তখন তুমি কী করবে?

অর্ণবের মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ থেমে গেছে।

সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ভবিষ্যৎ নেই কেন?

মেঘলা উত্তর দিল না।

— মেঘলা, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।

মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।

অর্ণবের বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক ঝড়। এত দিন ধরে জমিয়ে রাখা কথাগুলো গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছিল।

শেষ পর্যন্ত সে বলল,

— আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।

মেঘলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

অর্ণব আবার বলল,

— জানি না কখন, কীভাবে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া এখন আমার দিনগুলো কল্পনা করতে কষ্ট হয়। তোমার সঙ্গে কথা না হলে কিছু একটা অসম্পূর্ণ লাগে। তুমি পাশে থাকলে মনে হয়, জীবনের সব সমস্যার সমাধান না থাকলেও বেঁচে থাকা যায়।

মেঘলা চোখ নামিয়ে নিল।

— তুমি কিছু বলছ না কেন?

মেঘলা খুব আস্তে বলল,

— অর্ণব, তুমি আমাকে ভুল বুঝো না।

এই একটি বাক্য মানুষের জীবনে কত রকমের বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে, অর্ণব সেদিন প্রথম বুঝেছিল।

মেঘলা বলল,

— তুমি খুব ভালো একজন মানুষ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগে। তোমার পাশে থাকলে আমার মনটা শান্ত হয়। কিন্তু...

— কিন্তু কী?

মেঘলা এবার তার দিকে তাকাল।

চোখ দুটো ভেজা।

— আমার জীবনে এমন কিছু আছে, যেটা তোমাকে আমি এখনো বলতে পারিনি।

অর্ণব চুপ করে গেল।

মেঘলা বলল,

— আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।

অর্ণব অনেক কষ্টে হাসল।

— কষ্ট দেওয়ার সিদ্ধান্তটা কি তুমি আমার হয়ে নিয়ে নিলে?

মেঘলা কোনো উত্তর দিল না।

সেদিন তারা পাশাপাশি হেঁটে ফিরেছিল। কিন্তু তাদের মাঝখানে অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যেটা অর্ণবের পক্ষে অতিক্রম করা সম্ভব হচ্ছিল না।

বাসায় ফিরে সে চিঠিটা বের করল।

খামের ওপর লেখা ছিল—‘প্রিয় মেঘলা’।

অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর চিঠিটা আবার ড্রয়ারে রেখে দিল।

কিছু চিঠি লেখা হয় ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য।

আর কিছু চিঠি লেখা হয়, মানুষ যখন বুঝতে পারে, তার ভালোবাসার গল্পটা হয়তো শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অর্ণব জানত না, তার চিঠিটা কোন শ্রেণিতে পড়বে।

পরবর্তী কয়েক দিন মেঘলা খুব কম কথা বলল।

আগের মতো সকালে বার্তা আসত না। রাতের ফোনালাপগুলোও ছোট হয়ে এল। অর্ণব বুঝতে পারছিল, মেয়েটি ইচ্ছা করেই দূরত্ব তৈরি করছে।

সে একদিন মেঘলাকে জিজ্ঞেস করল,

— তুমি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছ?

মেঘলা বলল,

— না তো।

— তাহলে আগের মতো কথা বলছ না কেন?

— সব সময় কি আগের মতো থাকা যায়?

অর্ণব চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— তুমি যদি আমাকে ভালো না বাসো, সরাসরি বলো। আমি কষ্ট পাব, কিন্তু তোমাকে অসম্মান করব না।

মেঘলার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

— বিষয়টা এত সহজ নয়, অর্ণব।

— তাহলে কঠিন বিষয়টা আমাকে বুঝিয়ে বলো।

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

শেষে মেঘলা বলল,

— আমাকে কিছুদিন সময় দাও।

অর্ণব আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

সে জানত, ভালোবাসার মানুষকে সময় দেওয়া যায়। অপেক্ষা করা যায়। তার দুঃখের পাশে নীরবে বসে থাকা যায়।

কিন্তু তার মনের দরজায় দাঁড়িয়ে জোর করে ঢুকে পড়া যায় না।

এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেল।

এক সন্ধ্যায় অর্ণব অফিস থেকে ফিরে দেখল, মেঘলার একটি বার্তা এসেছে।

আগামীকাল বিকেলে দেখা করবে? তোমাকে কিছু কথা বলার আছে।

অর্ণবের বুকের ভেতর আবার আশার ছোট্ট একটা আলো জ্বলে উঠল।

পরদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই সে সেই চায়ের দোকানে পৌঁছে গেল, যেখানে প্রথমবার তারা একসঙ্গে বসেছিল।

মেঘলা এল প্রায় বিশ মিনিট পরে।

আজ তার পরনে নীল শাড়ি। মুখে কোনো প্রসাধন নেই। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।

বসে প্রথমেই সে বলল,

— অর্ণব, আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। তুমি পুরোটা শোনার পর আমাকে যা ইচ্ছে বলো।

অর্ণব মাথা নাড়ল।

মেঘলা ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ছবি বের করল।

ছবিতে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে একটি ছেলের পাশে। দুজনের মুখে হাসি।

অর্ণব ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।

মেঘলা বলল,

— ছেলেটির নাম রুদ্র।

অর্ণব কোনো কথা বলল না।

— আমাদের পাঁচ বছরের সম্পর্ক ছিল। কলেজে পড়ার সময় থেকে। আমি ভেবেছিলাম, ওকেই বিয়ে করব। আমাদের পরিবারও সব জানত।

মেঘলা একটু থামল।

— কিন্তু তিন বছর আগে একটা দুর্ঘটনায় রুদ্র মারা যায়।

অর্ণবের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

মেঘলা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

— ওর মৃত্যুর পর আমি অনেক দিন কারও সঙ্গে কথা বলিনি। কাউকে বিশ্বাস করতে পারতাম না। মনে হতো, যাকে ভালোবাসব, সে-ই একদিন চলে যাবে। তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছি। চাকরি পেয়েছি, মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখেছি। কিন্তু ভেতরের একটা জায়গা কখনো ঠিক হয়নি।

তার চোখ থেকে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।

— তোমার সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রথমবার মনে হয়েছিল, আবার হয়তো কারও সঙ্গে হাসতে পারব। আবার হয়তো কোনো মানুষের জন্য অপেক্ষা করতে পারব। তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার মনে হতো, আমি এখনো বেঁচে আছি।

অর্ণব নিঃশব্দে শুনছিল।

মেঘলা বলল,

— কিন্তু যখন তুমি বললে, তুমি আমাকে ভালোবাসো, তখন আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মনে হলো, আমি যদি তোমাকে আমার জীবনে আসতে দিই, তাহলে একদিন তোমাকেও হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে।

অর্ণব ধীরে বলল,

— তুমি কি মনে করো, ভালোবাসলে মানুষকে হারাতেই হয়?

মেঘলা চোখ মুছল।

— জানি না।

— তাহলে আমার হয়ে সিদ্ধান্ত নিও না, মেঘলা। আমি তোমাকে ভালোবাসি মানে এই নয় যে, তোমাকে তোমার অতীত ভুলে যেতে হবে। আমি তোমার জীবনে রুদ্রের জায়গা নিতে আসিনি। আমি শুধু তোমার বর্তমানের পাশে একটু জায়গা চেয়েছি।

মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে রইল।

অর্ণব বলল,

— তুমি চাইলে আমরা ধীরে ধীরে এগোব। কোনো তাড়া নেই। কোনো প্রতিশ্রুতির চাপ নেই। তুমি যখন কষ্ট পাবে, আমাকে বলবে। যখন রুদ্রের কথা মনে পড়বে, সেটাও বলবে। আমি তোমার অতীতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চাই না। আমি শুধু চাই, তুমি আবার নিজের ভবিষ্যৎটাকে ভালোবাসতে শেখো।

মেঘলা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

কাঁদতে কাঁদতে বলল,

— তুমি এত ভালো কেন, অর্ণব?

অর্ণব মৃদু হেসে উত্তর দিল,

— আমি ভালো কি না জানি না। তবে তোমার কষ্টটা বুঝতে চাই।

সেদিন মেঘলা প্রথমবার অর্ণবের হাত ধরেছিল।

হাতটা ছিল ঠান্ডা।

অর্ণব তার হাতের ওপর নিজের হাত রেখে চুপ করে বসে ছিল।

কোনো প্রেমের ঘোষণা ছিল না।

কোনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি ছিল না।

ছিল শুধু দুটি মানুষের নীরবতা, আর সেই নীরবতার মধ্যে জন্ম নেওয়া একটুখানি বিশ্বাস।

কখনো কখনো ভালোবাসা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না।

শুরু হয় যখন একজন মানুষ আরেকজনের ভাঙা জায়গাগুলো দেখে পালিয়ে যায় না।

এরপরের ছয় মাস অর্ণব আর মেঘলার জীবনে ধীরে ধীরে বসন্তের মতো নেমে এসেছিল।

তারা একসঙ্গে বইমেলায় গিয়েছে। বৃষ্টির দিনে চা খেয়েছে। রাস্তার পাশের দোকান থেকে ফুচকা খেয়েছে। এক বিকেলে মেঘলা অর্ণবকে বলেছিল, সে সমুদ্র দেখতে চায়।

অর্ণব বলেছিল,

— একদিন নিয়ে যাব।

মেঘলা হেসে জিজ্ঞেস করেছিল,

— কথা দিচ্ছ?

— কথা দিলাম।

মেঘলা তার হাত ধরে বলেছিল,

— জানো, তোমার একটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগে।

— কী?

— তুমি কোনো কিছু সহজ করে দেওয়ার চেষ্টা করো না। আমি কাঁদলে তুমি আমাকে হাসানোর চেষ্টা করো না। শুধু পাশে থাকো।

অর্ণব বলেছিল,

— সব কান্নার সান্ত্বনা হয় না, মেঘলা। কিছু কান্নার শুধু একজন সাক্ষী লাগে।

মেঘলা কথাটা মনে রেখেছিল।

সেই প্রথম অর্ণবের মনে হয়েছিল, হয়তো তাদের গল্পটা সত্যিই সুন্দর হতে চলেছে।

একদিন মেঘলা নিজেই বলল,

— অর্ণব, তোমার সেই চিঠিটা কোথায়?

অর্ণব অবাক হয়ে তাকাল।

— কোন চিঠি?

— যে চিঠিটা তুমি আমাকে লেখার কথা বলেছিলে।

অর্ণবের মনে পড়ে গেল ড্রয়ারে রাখা খামটার কথা।

সেই রাতে বাসায় ফিরে সে চিঠিটা খুঁজে বের করল। কাগজের ভাঁজে সময়ের ছাপ পড়েছে। কয়েকটি শব্দের কালি সামান্য ছড়িয়ে গেছে।

পরদিন চিঠিটা মেঘলার হাতে দিল।

মেঘলা চুপচাপ পুরো চিঠিটা পড়ল।

পড়া শেষ করে কাগজটা বুকের কাছে ধরে রাখল কিছুক্ষণ।

তারপর বলল,

— অর্ণব, তোমাকে একটা কথা বলব?

— বলো।

— আমি তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছি।

অর্ণবের মনে হলো, পৃথিবীর সব শব্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেছে।

সে মেঘলার দিকে তাকিয়ে বলল,

— আরেকবার বলবে?

মেঘলা হেসে বলল,

— না। একবার বলেছি। এতেই চলবে।

অর্ণব তার হাত ধরল।

তার চোখ ভিজে উঠেছিল। অথচ সে হাসছিল।

সেদিন রাতে অর্ণব ডায়েরিতে লিখেছিল,

আজ বুঝলাম, ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সব সময় নিখুঁত মানুষ হতে হয় না। কখনো কখনো শুধু এমন একজন মানুষ হতে হয়, যার পাশে অন্য মানুষটি নিজের অসম্পূর্ণতা নিয়ে নিশ্চিন্তে বসতে পারে।

মেঘলা আজ আমাকে ভালোবাসার কথা বলেছে। আমার খুব ইচ্ছে করছিল, পৃথিবীকে জানিয়ে দিই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউকে কিছু বলিনি। কিছু সুখ আছে, যেগুলো খুব আস্তে উপভোগ করতে হয়। জোরে বললে যেন ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে।

কিন্তু মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে, তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা পেরিয়ে গেছে, তখনই জীবন কখনো কখনো নতুন কোনো পরীক্ষা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়।

মেঘলার জীবনেও তেমনই একটি দিন আসছিল।

যে দিনটির কথা সে অর্ণবকে বলতে পারছিল না।

যে সত্যের মুখোমুখি হতে গিয়ে তার চোখে আবার সেই পুরোনো ভয় ফিরে এসেছিল।

আর যে সত্য জানার পর অর্ণব বুঝতে পারবে—ভালোবাসা শুধু কাউকে কাছে পাওয়ার গল্প নয়।

কখনো কখনো ভালোবাসা মানে, কাউকে মুক্ত করে দেওয়ার সাহসও।