কবিতায় ছন্দ
দীপঙ্কর বেরা

কবিতায় কেন ছন্দ থাকা দরকার?
প্রশ্ন সহজ উত্তরও সহজ। কেন না ছন্দই কবিতার ধারক ও বাহক। জীবনের শুরুতে আমরা আমাদের শিশুদের রাইমস ও ছড়া শেখাই। সেই রাইমস বা ছড়া ছন্দবিহীন হলে শিশু কি গ্রহণ করবে?
সুর করে বলতে গেলে, ঘুম পাড়ানি করে গাইতে হলে তবেই না শিশু শুনবে এবং মনে রাখবে। যত বেশি সহজ প্রাঞ্জল ও সহজাত হবে তত তা সহজে মনে থাকবে। আবার এই ছড়া বা ঘুম পাড়ানি শোনায় শেখায় বড়রা। তারা সেই ছড়া বা রাইমস বলতে গাইতে শোনাতে যদি ছন্দের সুরের তাল মিলের বোধগম্যতা খুঁজে পায় তবে সে শোনাতে পছন্দ করবে।
অর্থাৎ কবিতা ছড়া কাব্য পদ্য যাই বলো তার মধ্যে কাব্যময়তা তালে মিলে ছন্দে ভাষায় সম্ভব।
আপনি আপনার কবিতায় কিছু একটা তো বলতে চাইছেন। সেই বক্তৃব্যকে ভাবনাকে হৃদয় মথিত উচ্ছ্বাসকে ছন্দে উপস্থাপিত করার নামই তো কবিতা। সেখানেই তো কবিত্বের মুন্সিয়ানা। সহজাত পারদর্শিতা। সেখানের ব্যর্থতা, কাব্যময়তা থেকে সরে আসা।
কবি হওয়ার মূল কাঠামো হলো ভাষার উপর পুরো দখল রেখে ছন্দ তাল লয়ে ভাবনার বিস্তার ঘটিয়ে কাব্য সৃষ্টি করা। তখন কবিতা ছড়া ইত্যাদি কোনো আলাদা বিষয় নয়।
সুকুমার রায় এর লেখা শুধু তো ছড়া নয় কবিতার বিশাল ব্যাপ্তি। ভাষার ছন্দের তালের লয়ের ভাবনার এক অকল্পনীয় মিশ্রণ। আর রবীন্দ্রনাথ ছন্দ তাল লয়ের এক দার্শনিক চিন্তন।
তাছাড়া যেখানে যত আবৃত্তি ও কবিতা পাঠ হয় তার বেশিরভাগ ছন্দ কবিতাই নির্বাচিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জীবনানন্দের 'বনলতা সেন' জয় গোস্বামীর 'নুন', 'মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়' ভবানী প্রসাদ এর 'বাংলাটা ঠিক আসে না' ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথের 'বাঁশি''আফ্রিকা' নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর' উলঙ্গ রাজা' সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'ফুল ফুটুক না ফুটুক' সুবোধ সরকার এর 'শাড়ি' ইত্যাদিও পাঠ হয়। কিন্তু এই সব গদ্য কবিতার যে সহজাত স্বতস্ফূর্ত ভাষা ও ভাবনার সংমিশ্রণ তা অবশ্যই ছন্দের তালের লয়ের পরবর্তী ভাবধারার ফসল।
ছন্দের পদ্যের মাত্রার তালের লয়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তার অনুসারী গদ্য কাব্য সহজ সরল ও গুণগ্রাহী ও মনোগ্রাহী হয়।
না হলে বর্তমানে সুর সাধনা না করে প্রচুর গায়ক। ফেসবুকে স্টেজে ঘরোয়া অনুষ্ঠানে দিব্যি গান করছে। ছন্দ তাল লয় না শিখে লেখক লিখছে। আমরা শুনছি। আমরা পড়ছি। আসলে পছন্দ সেই হেমন্ত কিশোর লতা সন্ধ্যা মান্না। কবিতাও তাই। জীবনানন্দ জয় এ থেকে থেমে গেছে। আর আমরা লিখছি। গায়ক গাইছে।
নিজেরা নিজেদের মত কবি সম্মেলন করে বই প্রকাশ করে ফেসবুকে পোষ্ট করে হাজার হাজার কবি সাহিত্যিক ও গায়ক হয়ে উঠছি। তাতে টাইম পাস করা ছাড়া লাভ কিছুই হচ্ছে না।
তাই গায়ক হতে হলে আগে সুর সাধনা করুন, কবি হতে গেলে আগে ছন্দ তাল লয় মাত্রা শিখুন তার পরে সেই তাল ছন্দ ভাঙুন। নতুন মাত্রা যোগ করুন। গদ্য লিখুন পদ্য লিখুন। ভাব প্রকাশ করুন। ছন্দ তাল লয় ছাড়া যেমন গান হয় না তেমন কবিতাও হয় না।
না হলে গান কবিতা, জোয়ারের জলের মত সবই নোনা হয়ে যাচ্ছে। খেলো হয়ে যাচ্ছে। কবিতা ও কবি সম্পর্কে সাধারণের ধারণা খুব খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বহু কবি নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে তিনি স্বরবৃত্ত মাত্রাবৃত্ত অক্ষরবৃত্ত সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। অথচ নিজস্ব বই আছে পাঁচটা দশটা। একটাও গল্প লেখেন নি তিনিও অণুগল্প লেখক। সব কিছুই যেন ইজি ব্যাপার। কেউ যে কারোরটা পড়ছে না শুধু দারুণ অসাধারণ মন্তব্যে সবাই কুপোকাত। কেউ আবার ঘুরে পড়া তো দূরের কথা পুরোটাই পড়ে নি।
তাও বাছাই করা দু চারটে পত্রিকা ছাড়া ছন্দ কবিতা সহজবোধ্য কবিতা পত্রিকায় মনোনীত হচ্ছে।
কবিতা কঠিন বিষয় কি না জানি না তবে সহজ নয় সহজ করে বলা। বিশিষ্ট নয় এমন একজন বলেছিলেন আধুনিক নামের এরকম কবিতা রোজ লাখো লাখো লিখতে পারি। তিনি ক'টা লিখেছেন জানি না তবে আমি অন্তত রোজ এমন হাজার হাজার পড়ছি। দু এক লাইন তারপর আর পড়ি না ভাবি না। কেন পড়তে যাবো, কেন ভাবতে যাবো? আর খেয়ে দেয়ে কী কোনো কাজ নাই। যিনি লিখেছেন তিনিও কিছু না ভেবে শব্দ সাজিয়ে লিখেছেন। তার দায় শেষ। এবার নাকি পাঠক ভাববে? কেন হে?
তা একটু আধটু সময় পাই, আবার রবীন্দ্রনাথ পড়বো, জীবনানন্দ পড়বো? তোমাকে কেন? তুমি এগিয়ে নিয়ে যাবে? তাই নাকি? চর্চা করছো ভালো কথা। তা অন্যকে চর্বিতচর্বণ করছো কেন?
একবার এক সাহিত্যসভায় একজন কবি বললেন যে তিনি রাস্তায় আসতে আসতে এই কবিতাটি লিখেছেন। পড়ে শোনালেন। ছন্দ তাল লয় মাত্রা কোনো কিছু নাই। এ করেছে ঐ হয়েছে তাই দিয়েছি ঈশ্বর মানুষ ভস্ম শেষ। এবার কে কি ভাববে ভাবুক। একই বক্তব্য ছন্দে তালে মাত্রায় ব্যঞ্জনায় যদি লিখতো তাহলে তাঁর কালঘাম ছুটে যেত। তখন আর বাসে ট্রেনে বসতে বসতে, কথা বলতে বলতে, ঝগড়া করতে করতে মোবাইল আঙ্গুল চালিয়ে তখন আর কবিতা লিখতে পারতো না।
সবাই ভাবুন। মহাকবির মেডেল মোমেন্টো ইত্যাদি দিয়ে নিয়ে কবিতাকে কাব্যেকে পথে বসাবেন না? নিজেকে কাব্যেকে কবিকে খেলো করবেন না। জানি, আপনার লেখা ছাপা হচ্ছে। অন্যে শেয়ার করছে। বাহবা দিচ্ছে।
তবু কি লিখছি। আর কেনই বা লিখছি, ভাবুন। এ বছর কতগুলো পত্রিকায় লিখছি তার লিস্ট দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছি কিন্তু এ বছর ক'টা পত্রিকা পড়েছি তার কেউ কোন লিস্ট দেয় না। তার কারণ আমরা যারা লেখালেখি করি কেউ কারো লেখা খুব একটা পড়ি না। আগে হতো রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ত। ঈশ্বরচন্দ্রকে বোঝার চেষ্টা করতো। শীর্ষেন্দু সুনীল সবার মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় চলত। এখন দু একটা আলোচনা (সমালোচনা হয় না, হলে পাল্টা সমালোচনা সামলানো মুশকিল) পড়লেই বুঝতে পারবেন কিভাবে দায় সারা ও মন যোগানো লেখা।
তাই ছন্দে ফিরুন। তারপর তাকে ভেঙে প্রসারিত করে কবিতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনুন। কাব্য ও কবির মর্যাদা হোক অন্তর থেকে।