যমুনার চরে একদিন
মোঃ বুলবুল হোসেন
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পূর্ব আকাশে লালচে আভা। গ্রামের মেঠোপথে রাতের শিশির, দূরে মোরগের ডাক আর উঠানে হাঁস-মুরগির শব্দ। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরের এই সকাল যেন অন্য এক পৃথিবীর।
রায়হান কাঁধে ছোট ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। সঙ্গে পানির বোতল, কিছু শুকনো খাবার, গামছা আর মোবাইল ফোন। আজ সে যাবে যমুনার চরে। সঙ্গে থাকবে তার দুই বন্ধু সুমন আর নাঈম। তিনজনের বন্ধুত্ব ছোটবেলা থেকে। একই স্কুল, একই মাঠ, বর্ষার নদী আর শীতের সকালের কত স্মৃতি তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে।
বাঁশঝাড়ের কাছে সুমন অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর নাঈমও এসে হাজির হলো। তার মুখে চিরচেনা হাসি। নাঈম বলল, আজ যমুনার চর জয় করে আসব। সুমন হেসে বলল, আগে দেখি চরটা আমাদের জয় করে কি না। তিনজনের হাসিতে সকালের নীরবতা ভেঙে গেল।
ধানখেতের পাশ দিয়ে তারা এগিয়ে চলল। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। পুরোনো আমগাছের নিচে এসে রায়হানের মনে পড়ল ছোটবেলার কথা। এই গাছের নিচেই একদিন তারা ঠিক করেছিল বড় হয়ে সবাই শহরে যাবে। তারা গিয়েছিলও। কিন্তু শহরের ব্যস্ততা তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে, গ্রামের মতো শান্তি কোথাও নেই।
যমুনার কাছে পৌঁছাতেই সামনে খুলে গেল বিশাল জলরাশি। দূরে কয়েকটি নৌকা, নদীর ওপর নরম বাতাস আর বালুচরের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। চরে পা রাখতেই রায়হান এক মুঠো বালু হাতে তুলে নিল। বলল, এই বালুর ওপর মানুষ ঘর বানায়, ফসল ফলায়, স্বপ্ন দেখে। আবার একদিন নদী এসে সবকিছু নিয়ে যায়।
চরের ভেতরে তারা দেখল কাশবন, ছোট ছোট ঘর, গরু চরানো মাঠ আর কৃষকের চাষের জমি। এক বৃদ্ধ জাল মেরামত করছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানল, বর্ষায় কখনো কখনো নদীর পানি ঘরের ভেতর পর্যন্ত উঠে আসে। তবু মানুষ চরের মাটি ছেড়ে যায় না। বৃদ্ধ বললেন, নদীর সঙ্গে যারা থাকে তারা নদীকে ভয় করে না, তবে নদীকে অবহেলাও করে না।
তিন বন্ধু একটি উঁচু বালুর ঢিবিতে বসে মুড়ি, চানাচুর আর কলা খেতে লাগল। নাঈম মজা করে বলল, খোলা আকাশের নিচে এই খাবারই রাজকীয় খাবার। সুমন বেশি মরিচ দিয়ে ফেলায় কাশতে শুরু করলে দুজন হেসে উঠল। হাসির মধ্যে তারা যেন আবার ফিরে গেল সেই ছোটবেলার দিনে।
খাওয়া শেষে তারা বালুর ওপর বসে পুরোনো স্মৃতির কথা বলতে লাগল। নাঈম বলল, আগে সময় ছিল, টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কিন্তু সময় নেই। কথাটা শুনে কিছুক্ষণ সবাই চুপ করে রইল। নদী তখন আপন মনে বয়ে চলেছে। বাতাসে কাশবন দুলছে।
বিকেলের দিকে তারা নদীর কাছাকাছি গেল। রায়হান সাবধানে হাঁটতে বলেছিল। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই নাঈমের পা নরম বালুর মধ্যে ঢুকে গেল। সে ভারসাম্য হারিয়ে বসে পড়ল। উঠতে গেলে পা আরও নিচে ঢুকে যাচ্ছিল। চারদিকে কোনো মানুষ নেই। সামনে নদী, পেছনে বিশাল চর।
রায়হান দ্রুত বুঝতে পারল, এখানে নরম পলি জমেছে। সে নাঈমকে স্থির থাকতে বলল। সুমনকে নিরাপদ জায়গায় দাঁড় করিয়ে কাছ থেকে একটি বাঁশ এনে নাঈমের হাতে ধরিয়ে দিল। দুজন মিলে টানতে চেষ্টা করেও তাকে পুরোপুরি বের করতে পারল না। তখন সুমন সাহায্যের জন্য চরের দিকে দৌড়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর কয়েকজন কৃষক ও জেলে ছুটে এলেন। তারা চারপাশের নরম বালু সাবধানে সরিয়ে নাঈমকে মুক্ত করে শক্ত মাটিতে তুলে আনলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে নাঈম বলল, আজ বুঝলাম, চর বাইরে থেকে যত সুন্দর, ভেতরে ততটা সহজ নয়।
এক বৃদ্ধ হেসে বললেন, এই চরকে জানতে হলে এখানে থাকতে হয়। কোথায় শক্ত মাটি, কোথায় নরম পলি, কোথায় নদীর পুরোনো পথ, তা চরের মানুষ জানে। আর বিপদে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়ায়।বিপদ কেটে যাওয়ার পর তিন বন্ধু নিরাপদ একটি উঁচু জায়গায় বসে সূর্যাস্ত দেখতে লাগল। সূর্যের শেষ আলো যমুনার পানিতে সোনালি পথ তৈরি করেছে। দূরে একটি নৌকা ঘরে ফিরছে। মাঝির বৈঠার শব্দ বাতাসে ভেসে আসছে। কাশবনের মাথা দুলছে। পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। নাঈম ধীরে বলল, আজকের সূর্যাস্তটা অন্যরকম লাগছে। সুমন বলল, কারণ আজ আমরা এটাকে অন্য চোখে দেখছি। রায়হান নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু দেখার বিষয় নয়, তাকে বুঝতেও হয়। আর তাকে সম্মান করতে হয়।
আকাশ অন্ধকার হওয়ার আগেই তারা ফেরার পথ ধরল। চরের একজন মানুষ তাদের নিরাপদ পথ দেখিয়ে দিলেন। পেছনে তাকিয়ে রায়হান দেখল সন্ধ্যার আলোয় যমুনার চর যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। ফেরার পথে কেউ কিছুক্ষণ কথা বলল না। তারপর সুমন বলল, আজকের দিনটা মনে থাকবে। নাঈম মৃদু হেসে বলল, আমি কোনোদিন ভুলব না। রায়হান বলল, আমরাও ভুলব না।
বাড়ির কাছে এসে রায়হান থামল। বলল, আমরা ভেবেছিলাম আজ যমুনার চরে ঘুরতে এসেছি। কিন্তু আসলে চরটাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিল। শিখিয়েছে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে তাকে বুঝতে হয়। শিখিয়েছে, বন্ধুত্ব শুধু একসঙ্গে হাসার নাম নয়, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর নাম। আর শিখিয়েছে, যত ব্যস্ততাই থাকুক, মাঝে মাঝে নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়।
তিন বন্ধু একসঙ্গে হাসল। তারপর যে যার বাড়ির পথে চলে গেল।
পেছনে রয়ে গেল যমুনার চর। রয়ে গেল তাদের হাসি, ভয়ের মুহূর্ত, সূর্যাস্তের সৌন্দর্য আর এক দিনের অমূল্য স্মৃতি।
সেদিন থেকে যমুনার চর তাদের কাছে আর শুধু একটি বালুচর নয়। এটি হয়ে উঠল তাদের বন্ধুত্বের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে তারা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখেছে, বিপদের মুখোমুখি হয়েছে এবং নতুন করে চিনেছে জীবনকে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.