সাদুল্লাপুরের দিনগুলি

এক

সাদুল্লাপুর স্টেশনের এই প্ল্যাটফর্মটায় সময়ের কোনো কাঁটা নেই। এখানে সময় ঘড়ির নিয়মে ঘোরে না, ঘোরে রেললাইনের সমান্তরালে বয়ে যাওয়া ওই শ্যাওলা-ধরা খালের মন্থর স্রোতের নিয়মে।

বিকেলের ঘোলাটে আলোয় প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে, ছাল ওঠা কংক্রিটের পিলারে হেলান দিয়ে বসে আছে এক যুবক। তার পরনে একটা সাধারণ নীল শার্ট। শার্টের পিঠের দিকটা ঘামে আর স্যাঁতসেঁতে বাতাসে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে নেই; তার দৃষ্টি আটকে আছে কংক্রিটের সীমানা পেরিয়ে খালের শান্ত জলে, আর তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো গম্বুজ আর বিবর্ণ দালানগুলোর দিকে।

স্টেশনের নামফলকে কালো কালিতে স্পষ্ট লেখা—‘সাদুল্লাপুর’।

কিছুক্ষণ পরপর দূরে প্ল্যাটফর্মের টিনের চালের নিচে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ছায়াগুলো নড়ে উঠছে। তারা হয়তো কোনো লোকাল ট্রেনের অপেক্ষায়। কিন্তু নীল শার্ট পরা এই যুবকটি কোনো ট্রেনের অপেক্ষায় বসে নেই। সে খুব ভালো করেই জানে, যে ট্রেনের জন্য সে অপেক্ষা করছে, সেটি পনেরো বছর আগে এই সাদুল্লাপুর স্টেশন ছেড়ে চিরকালের মতো চলে গেছে।

দুই

পনেরো বছর আগের এমনি এক গুমোট বিকেলে সাদুল্লাপুর ছেড়েছিল সে।

শহরের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ, বুকভরা উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর চোখে এক পৃথিবী স্বপ্ন নিয়ে যেদিন সে এই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিল, সেদিন তার মনে হয়েছিল—সাদুল্লাপুর একটা খাঁচা। এই খালের পচা জল, এই মরচে ধরা টিনের চাল, এই পুরোনো গম্বুজওয়ালা মসজিদ আর এই ধীরলয়ের জীবন তাকে আটকে রাখছে। সে পালাতে চেয়েছিল।

সেদিন এই কংক্রিটের পাটাতনে বসেই তাকে বিদায় জানাতে এসেছিল একজন। তার নাম ছিল রুচিরা।

রুচিরার চোখে কোনো জল ছিল না। সে কেবল খালের জলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলেছিল, "শহরের ট্রেন মানুষকে কেবল দূরেই নিয়ে যায় না, শহরের ট্রেন মানুষের শেকড়টাও কেটে দেয়। তুই ফিরে আসবি তো?"

সে সেদিন হেসেছিল। বলেছিল, "অবশ্যই আসব। সাদুল্লাপুর তো আমার রক্তে।"

কিন্তু শহরের কংক্রিটের জঙ্গল, ক্যারিয়ারের ইঁদুর দৌড়, আর সাফল্যের নেশা তাকে এমনভাবে গিলে খেল যে, সাদুল্লাপুরের দিনগুলি ধীরে ধীরে পুরোনো অ্যালবামের ধুলোপড়া ছবির মতো অস্পষ্ট হতে শুরু করল। চিঠি আসা বন্ধ হলো। রুচিরার বিয়ে হয়ে গেল অন্য কোথাও। আর সে পরিণত হলো যন্ত্রের মতো নিখুঁত, আবেগহীন এক সফল মানুষে।

তিন

আজ পনেরো বছর পর সে ফিরে এসেছে।

তার পকেটে শহরের সবচেয়ে দামি কোম্পানির ভিজিটিং কার্ড, হাতে দামী ঘড়ি। কিন্তু আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে হঠাৎ আবিষ্কার করেছে, আয়নার ওপাশের মানুষটাকে সে আর চিনতে পারছে না। তার সমস্ত সাফল্য, সমস্ত সম্পদ যেন একটা বিশাল শূন্যতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

তাই সে ছুটে এসেছে এই সাদুল্লাপুরে। সে খুঁজতে এসেছে সেই ছেলেটাকে, যে পনেরো বছর আগে এই প্ল্যাটফর্মে নিজের আত্মাকে ফেলে রেখে শুধু একটা রক্তমাংসের শরীর নিয়ে শহরের ট্রেনে চেপে বসেছিল।

তার ডান হাতটা কংক্রিটের রুক্ষ মেঝের ওপর স্থির হয়ে আছে। খালের জলে বিকেলের ম্রিয়মাণ রোদ পড়ে একটা হলদেটে আভা তৈরি করেছে, ঠিক যেন পুরোনো ক্যানভাসে আঁকা কোনো জলরঙের ছবি। ডানপাশের পুরনো পিলারে সাঁটানো পোস্টারগুলো ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু দেয়ালের স্মৃতিগুলো একটুও ছেঁড়েনি।

চার

দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল।

প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর ভেতর একটা চাঞ্চল্য দেখা দিল। সিগন্যাল পোস্টের লাল আলোটা সবুজ হয়েছে। ট্রেন আসছে।

যুবকটি বসা থেকে উঠল না। তার ঘাড় ফেরানোরও কোনো তাগিদ নেই। খালের জলের দিকে তাকিয়ে সে আজ প্রথমবারের মতো অনুভব করল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এটা নয় যে সে তার প্রিয়জনকে হারিয়ে ফেলে; সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, মানুষ সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে একসময় নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।

ট্রেনটা প্রচণ্ড শব্দ করে স্টেশনে এসে থামল। যাত্রীদের ওঠানামার কোলাহলে সাদুল্লাপুরের নৈঃশব্দ্য কিছুক্ষণের জন্য ভেঙে পড়ল। তারপর একসময় ভারী চাকার শব্দ তুলে ট্রেনটা আবার শহরের দিকে রওনা হয়ে গেল।

প্লাটফর্ম আবার শান্ত।

যুবকটি তার নীল শার্টের হাতা গুটিয়ে খালের জলের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, রুচিরা ঠিকই বলেছিল। শহরের ট্রেন কেবল শেকড় কাটে। কিন্তু আজ আর তার ফেরার কোনো তাড়া নেই। পনেরো বছর পর, আজ এই শেষ বিকেলে, সাদুল্লাপুর স্টেশনের এই নীরব প্ল্যাটফর্মে সে অবশেষে নিজের শেকড়টা খুঁজে পেয়েছে।

সাদুল্লাপুরের দিনগুলি আর কেবল অতীত নয়; আজ থেকে এই কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম আর খালের শান্ত জলই তার অনন্ত বর্তমান।