নিলামে ওঠা নৈঃশব্দ্য
সাতটা বাজতে তখনো দশ মিনিট বাকি। কিউবিকলের ওপাশ থেকে একটানা আসা কি-বোর্ডের খটখট শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। আমি ঘাড় না ঘুরিয়েই বুঝতে পারলাম, জালাল সাহেব তার ল্যাপটপের ফ্ল্যাপটা বন্ধ করেছেন।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কাচের দরজা ঠেলে ফ্লোরে ঢুকলেন ম্যানেজার। সোজা হেঁটে এসে দাঁড়ালেন জালাল সাহেবের ডেস্কের সামনে। গলাটা সামান্য নামিয়ে বললেন, "কাল শনিবার, জানি আপনার ডে-অফ। কিন্তু ক্লায়েন্ট ভিজিটটা কাল সকালে না করলেই নয়। আপনি একটু দেখে নেবেন?"
জালাল সাহেবের হাত তখন ব্যাগের চেইনের ওপর। তার ছোট মেয়েটা গত তিনদিন ধরে জ্বরে ভুগছে, কাল সকালে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা—কথাটা আমি জানি, কারণ দুপুরে খাওয়ার সময় তিনি বলছিলেন। জালাল সাহেব মুখ খুললেন। একটা দীর্ঘশ্বাস তার গলার কাছে এসে থমকে গেল। তিনি কিছু একটা বলতে চাইলেন। হয়তো একটা 'কিন্তু'। হয়তো একটা 'না'।
কয়েকটা সেকেন্ড মাত্র।
আমি দেখলাম, তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে আবার শিথিল হয়ে এল। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, "জি, আচ্ছা। আমি থাকব।"
ম্যানেজার হাসলেন। সন্তুষ্ট মুখে জালাল সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "দ্যাটস হোয়াই আই ভ্যালু ইউ, জালাল। নো এক্সকিউজ। অলওয়েজ প্রফেশনাল।"
ম্যানেজার নিজের কেবিনে ফিরে গেলেন।
আমি আমার মনিটরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এক্সেল শিটের সাদা ঘরগুলো চোখের সামনে ব্লার হয়ে আসছিল। আমি কেবল একটা অদ্ভুত লেনদেনের সাক্ষী হলাম। জালাল সাহেবের ওই গিলে ফেলা অভিমান, ওই আটকে রাখা 'না' শব্দটা—এগুলো যেন একটা অদৃশ্য টেবিলে সাজানো ছিল। আর কোম্পানি সর্বোচ্চ দর হাঁকিয়ে সেটা কিনে নিল। সমাজ যে সব সময় সত্যি কথা বলার জন্য মানুষকে শাস্তি দেয়, তা নয়। মাঝে মাঝে চুপ করে মেনে নেওয়ার জন্য সে মানুষকে পুরস্কৃত করে। যে যত নিখুঁতভাবে নিজের প্রতিবাদটুকু, নিজের নৈঃশব্দ্য নিলামে তুলতে পারবে, এই ফ্লোরে তার দাম তত বাড়বে।
আমি কি খুব আলাদা?
জালাল সাহেবের নীরবতার দিকে তাকিয়ে যখন আমার ভেতরে এই সূক্ষ্ম বিচারবোধ কাজ করছে, ঠিক তখনই আমার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের মেসেজ— "আজ কি রাতে আসবি? তোর জন্য ভাত রাখব?"
আমি জানি, এখন 'না' বললে ওপাশ থেকে আরেকটা মেসেজ আসবে, হয়তো একটু পর একটা কল আসবে। আমাকে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে, বোঝাতে হবে কেন গত কয়েক সপ্তাহ আমি বাড়ি যাইনি। একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর কথোপকথন।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। আমার হাতে এখন কথা বলার মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই।
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। মেসেজটা সিন করে নোটিফিকেশনটা ডানদিকে সোয়াইপ করে মুছে দিলাম। আমি কেবল মেপে নিলাম কোনটাতে আমার ক্লান্তি কম হবে। নিজের স্বস্তির কাছে আমিও তো এইমাত্র আমার না-বলা কথাগুলোকে নিলামে তুলে দিলাম। নীরব থাকাই এখানে সবচেয়ে সহজ।
অফিস প্রায় ফাঁকা হয়ে এসেছে। আমি ডেস্ক গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে করিডোর পেরিয়ে লিফটের দিকে এগোলাম।
নিচতলায় সিকিউরিটি গেটের কাছে টার্নস্টাইল মেশিন। বের হওয়ার জন্য পকেট থেকে আইডি কার্ডটা বের করে স্ক্যানারের ওপর রাখলাম।
ছোট্ট একটা 'বিপ' শব্দ হলো।
স্ক্রিনে সবুজ বাতির নিচে ভেসে উঠল আমার আইডি নম্বর। যেন আজকের মতো আমার সমস্ত নীরবতা সফলভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সংকেত।
নিলামে ওঠা নৈঃশব্দ্য

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.