বন্ধক রাখা শৈশব
সময়ের মহাজনের কাছে ঠিক কবে যে আমরা জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটা বন্ধক রেখে আসি, তা আমরা নিজেরাও জানতে পারি না।
ধুলোমাখা বিকেল, কাঁচের মার্বেল আর শর্তহীন হাসির বিনিময়ে
আমরা কিনে নিই ‘বড়ো হওয়া’-র এক দীর্ঘমেয়াদি, জটিল চুক্তিপত্র।
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের এই চুক্তিতে সই করতে হয় খুব সকালেই।
যাদের ছোট ছোট কাঁধে খেলার সামগ্রীর চেয়ে সংসারের অভাবের ওজন দ্রুত ভারী হয়ে ওঠে,
তারা খুব সহজেই শিখে যায়— পেটের ক্ষুধার কাছে রূপকথার কোনো বাজারদর নেই।
খুব দ্রুত তাদের চোখের দৃষ্টি থেকে মুছে যায় শৈশবের আদিম বিস্ময়,
আর সেখানে জায়গা করে নেয় বেঁচে থাকার রুক্ষ, ধারালো হিসাব-নিকাশ।
আবার যারা আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ ছাদের নিচে বড়ো হয়,
তাদের শৈশবও নিঃশব্দে বন্ধক থাকে এক অলিখিত প্রতিযোগিতার কাছে।
প্রথম হওয়ার দৌড়, চাপিয়ে দেওয়া স্বপ্ন আর সমাজের চোখে ‘যোগ্য মানুষ’ হয়ে ওঠার তাড়নায়
কখন যে তাদের নিজস্ব আকাশটা নিলামে ওঠে, তারা টেরও পায় না।
বন্ধকি কারবারের একটা নিষ্ঠুর নিয়ম আছে—
সুদ আর আসলের অঙ্ক মেলাতে না পারলে, গচ্ছিত সম্পদ চিরতরে বেহাত হয়ে যায়।
হিসাব-নিকাশে ঘেরা এই তথাকথিত 'মানুষ' হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় আমরা এত বেশি বয়স আর সময় সুদ হিসেবে চুকিয়ে ফেলি যে,
একদিন যখন সব দেনা শোধ হয়, তখন পেছনে ফিরে দেখি—
সেই সরল, অকৃত্রিম শৈশবটাকে ছাড়িয়ে আনার মতো কোনো সম্বলই আর আমাদের কাছে অবশিষ্ট নেই।
আমরা শুধু সফল আর পরিণত মানুষ হয়ে উঠি,
বুকের ভেতর এক চিরস্থায়ী দেউলিয়া সত্তা নিয়ে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.