রাজায়-প্রজায় দ্বন্দ্বে 'দেশপ্রেম': ক্ষমতার রাজনীতি নাকি শোষণের হাতিয়ার?

রাজাও মনে করে সে দেশপ্রেমিক, প্রজা ও মনে করে দেশপ্রেমিক, কিন্তু রাজায়-প্রজায় যুদ্ধ হয়।"
— সৈয়দ শামসুল হক

ইতিহাসের পাতায় কিংবা বর্তমান সমাজে 'দেশপ্রেম' শব্দটির সংজ্ঞা সবসময় এক থাকে না। এক পক্ষ যখন শাসনতন্ত্র রক্ষা করাকে দেশপ্রেম বলে, অন্য পক্ষ তখন শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকেই প্রকৃত দেশপ্রেম মনে করে। এই দুই ভিন্ন আদর্শ ও স্বার্থের মুখোমুখি সংঘর্ষ থেকেই যুগ যুগ ধরে জন্ম নিয়েছে ইতিহাস কাঁপানো আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান।

১. দেশপ্রেমের আপেক্ষিকতা
ক্ষমতাসীন শাসক মনে করে সে যা করছে তা দেশের মঙ্গল ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, ফলে সে নিজেকে চরম দেশপ্রেমিক দাবি করে। অপরদিকে প্রজা বা সাধারণ মানুষ মনে করে শোষকের অন্যায় ও শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করাই প্রকৃত দেশপ্রেম।

২. স্বার্থের দ্বিমুখী সংঘাত
দেশপ্রেম শব্দটির সংজ্ঞা উভয়ের কাছে দুই রকম। শাসকের কাছে দেশপ্রেম হলো রাষ্ট্রযন্ত্র ও নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা; আর প্রজাদের কাছে দেশপ্রেম হলো শোষণ ও অবিচারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা।

৩. অনিবার্য সংঘাত
যখন শাসক ও প্রজা—দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদের সঠিক ও ‘দেশপ্রেমিক’ মনে করে, তখন দুই ভিন্ন আদর্শ ও স্বার্থের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলেই রাজায়-প্রজায় যুদ্ধ বা গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়।

৪. শাসকের মানসিকতা ও জনগণের অবস্থান
আমাদের প্রতিটি সরকারই জনগণের সাথে এইরকম আচরণ করে। আর জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে যুগ যুগ ধরে। শাসক নিজেকে বেশি দেশপ্রেমিক মনে করে, কারণ সে ক্ষমতার আসনে বসে রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি মনে করে। অথচ জনগণও নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবি করে, কারণ তারা রাষ্ট্রের প্রকৃত অস্তিত্ব রক্ষা করতে চায়।

দেশপ্রেম হলো, দরিদ্র মানুষকে ধনীদের জন্য প্রাণ দিতে রাজি করানোর এক কৌশল।"
— ফ্রেডরিক নিৎসে

৫. শোষণের হাতিয়ার হিসেবে জাতীয়তাবাদ ও মহাকালের চক্র
দেশের জন্য জীবন দেয় সাধারণ জনগণ, আর দেশ স্বাধীন হলে বা পুরোনো শাসক চলে গেলে আবার নতুন শাসক আসে। নিজেকে সেও দেশপ্রেমিক দাবি করে।
নিৎসের মতে, রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠী সাধারণ মানুষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য ‘দেশপ্রেম’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর চরম আবেগ তৈরি করে। শাসক ও ধনীশ্রেণী সমাজে ক্ষমতা ও সম্পদের সিংহভাগ ভোগ করে, কিন্তু যুদ্ধের সময় বলির পাঠা হতে হয় দরিদ্র ও সাধারণ মানুষকে। এরপর আবার সেই একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি ঘটে।

৬. রাজাই কি একমাত্র দেশপ্রেমিক?
একপর্যায়ে রাজা নিজেকে দেশপ্রেমিক ও একই সাথে দেশের মালিক মনে করে। সে ভাবে, সে-ই একমাত্র দেশপ্রেমিক এবং দেশের ভালো চায়; বাকি জনগণ দেশের ভালো চায়ও না, ভালো করতেও পারে না। আর যারা সত্যবাদী, যারা রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে—তাদেরকে বানিয়ে দেওয়া হয় 'দেশদ্রোহী'।

অবশেষে রাজার চোখে বা রাষ্ট্রের বয়ানে কেবল রাজাই থেকে যায় একমাত্র দেশপ্রেমিক।

৭. ক্ষমতার পালাবদল ও গণমানুষের ত্যাগ
দেশের মানুষ আন্দোলন করে পুরোনো শাসককে তাড়িয়ে নতুন শাসককে ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু ইতিহাস বলে—শাসক যায়, শাসক আসে, অবস্থা বদলায় না। যে সাধারণ জনগণ এবং সাধারণ ঘরের বিদ্রোহী সৈন্যরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে বা স্বৈরাচার পতন ঘটিয়েছে, নতুন শাসক ক্ষমতায় বসেই তাদের অবদান ভুলে যায়। নিজেকেই দেশের একমাত্র 'দেশপ্রেমিক' এবং ত্রাতা হিসেবে উপস্থাপন করে।

৮. কেন রাজায়-প্রজায় যুদ্ধ হয়?

"রাজাও মনে করে সে দেশপ্রেমিক, প্রজা ও মনে করে দেশপ্রেমিক, কিন্তু রাজায়-প্রজায় যুদ্ধ হয়।"
— সৈয়দ শামসুল হক

কেন এই যুদ্ধ?
কারণ শাসক ও প্রজাদের কাছে 'দেশপ্রেম'-এর অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত:
শাসকের চোখে দেশপ্রেম: ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা, নিজের শাসনকে চিরস্থায়ী করা এবং রাষ্ট্রের ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

প্রজার চোখে দেশপ্রেম: স্বৈরাচার মুক্ত হওয়া, সত্যের পক্ষে থাকা এবং নিজের ও দেশের অধিকার রক্ষা করা।
উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানকে 'দেশপ্রেম' মনে করে। ফলে দুই ভিন্ন আদর্শের সংঘাতের কারণে রাজায়-প্রজায় এই সংঘাত ও যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

৯. শোষণের কৌশল হিসেবে 'দেশপ্রেম'

দেশপ্রেম হলো, দরিদ্র মানুষকে ধনীদের জন্য প্রাণ দিতে রাজি করানোর এক কৌশল।"
— ফ্রেডরিক নিৎসে

কেন নিৎসে এই কথা বলেছেন?
শাসক ও ধনীশ্রেণী তাদের ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সাধারণ দরিদ্র মানুষের মনে 'জাতীয়তাবাদ' ও 'দেশপ্রেম'-এর আবেগ তৈরি করে।
সাধারণ মানুষ ভাবে তারা ‘দেশের জন্য’ প্রাণ দিচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে তারা প্রাণ দেয় শাসক ও ধনীশ্রেণীর সম্পদ, গদি এবং অবস্থানকে নিরাপদ রাখার জন্য।
দেশপ্রেমের আবেগকে হাতিয়ার বানিয়ে শাসকগোষ্ঠী দরিদ্রদের বলির পাঠা বানায়।

১০. এরপর কী ঘটে? (মহাকালের পুনরাবৃত্তি)
নতুন শাসক নিজেকে দেশপ্রেমিক দাবি করার পর ধীরে ধীরে পূর্বসূরীর মতোই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। যে জনগণ তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তাদেরকেই সে শোষণের পাত্র বানায়।
কিন্তু শোষণের মাত্রা যখন সীমাহীন হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ ও নিপীড়িত বিদ্রোহীরা আবার ঐক্যবদ্ধ হয়। শুরু হয় নতুন আন্দোলন, নতুন গণঅভ্যুত্থান। আবার শাসক গদি হারায়, আবার নতুন শাসক আসে—এবং দেশপ্রেমের এই প্রহসন ও চক্রাবর্ত যুগ যুগ ধরে চলতেই থাকে।

এতে করে জনগণের কি কোনো লাভ হয়? নাকি পুরোনো শাসকের স্থানে নতুন শাসক আসে? দেশ স্বাধীন হয় নতুন শাসকের জন্য, জনগণের জন্য না। এটাই কি সত্য? বাস্তবতা এরকমই। শাসক যায় আর আসে, কিন্তু জনগণ তার অবস্থান নিয়েই রয়ে যায়। সে না পায় দেশপ্রেমিক হওয়ার গৌরব, না পায় সুযোগ-সুবিধা। শাসক ক্ষমতায় বসতেই সে হয় সকল গৌরবের মালিক। সে-ই দাবি করে, 'আমিই একমাত্র যোদ্ধা, দেশপ্রেমিক। আমিই দেশ স্বাধীন করেছি।'"

১১. ক্ষমতার পালাবদলে জনগণের প্রাপ্তি শূন্য
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি নির্মম প্রশ্ন উঠে আসে—এতো সংগ্রাম ও বিপ্লবে সাধারণ জনগণের কি আদৌ কোনো লাভ হয়? নাকি কেবল পুরোনো শাসকের জায়গায় নতুন এক শাসকের পুনর্বাসন ঘটে? নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, দেশ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন যেন ঘটে কেবল নতুন শাসকের ভাগ্য ফেরানোর জন্য, গণমানুষের জন্য নয়।

১২. চিরন্তন বাস্তবতা ও গৌরবের একক মালিকানা
শাসক আসে আর যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের অবহেলিত জীবনযাত্রার কোনো পরিবর্তন ঘটে না; তারা সেই আগের স্থানেই রয়ে যায়। যে জনগণ নিজের রক্ত দিল, ত্যাগ স্বীকার করল—তারা না পায় ‘দেশপ্রেমিক’ হওয়ার ন্যূনতম সম্মান, না পায় নতুন ব্যবস্থার প্রকৃত সুযোগ-সুবিধা।

অথচ নতুন শাসক ক্ষমতায় বসামাত্রই সব ত্যাগ ও কৃতিত্বকে নিজের নামে কুক্ষিগত করে। সে হয়ে ওঠে সকল গৌরবের একক মালিক। ইতিহাসকে নিজের মতো করে তৈরি করে সে উচ্চকণ্ঠে দাবি করতে থাকে—‘আমিই একমাত্র বীর যোদ্ধা, আমিই পরম দেশপ্রেমিক এবং আমিই একাই এ দেশ স্বাধীন বা মুক্ত করেছি!’ ফলে সাধারণ মানুষের রক্ত আর আত্মত্যাগ চিরকাল ঢেকে যায় শাসকের আত্মম্ভরিতা ও অহংকারের আড়ালে।