কিছু অভিমান দূরত্ব বাড়ায়, আবার কিছু অভিমান মানুষকে বুঝিয়ে দেয়—সে আসলে কতটা আপন হতে চেয়েছিল।
প্রতিমার ওপর আমার ভীষণ অভিমান হয়েছিল।
কেন হয়েছিল, তা ঠিক জানি না। হয়তো ওর সঙ্গে প্রত্যয়ের সহজ সম্পর্কটা আমার ভালো লাগছিল না। হয়তো নিজের মনের কথাগুলো কাউকে বলতে না পারার অসহায়ত্ব থেকেই সমস্ত রাগ গিয়ে পড়েছিল ওর ওপর। কিংবা এমনও হতে পারে, যাকে কোনো দিন নিজের করে পাওয়ার সাহস করিনি, তাকে হারানোর ভয়েই দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলাম।
অদ্ভুত না, পাঠক?
মানুষ কখনো কখনো কাউকে হারানোর ভয়ে এমন আচরণ করে, যেন সেই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য!
আলিফ ভাইয়ার কাছে পড়তে যেতাম ঠিকই, কিন্তু প্রতিমার সঙ্গে খুব একটা কথা বলতাম না। ও আর প্রত্যয় নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে থাকত। আমি খাতা খুলে বসে থাকতাম। বোর্ডের অঙ্কগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠত, অথচ মাথার ভেতর অন্য হিসাব চলত।
কয়েক দিন এভাবেই কেটে গেল।
বাইরে থেকে আমার বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল না। সেই নিলয়ই তো—কোচিংয়ে যায়, অঙ্ক করে, বাড়ি ফিরে গিটার বাজায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলাম।
সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপারটা জানো?
প্রতিমাকে আমি কোনো দিন নিজের করে পাইনি। অথচ মাঝেমধ্যে মনে হতো, ওকে হারিয়ে ফেলেছি।
যে সম্পর্কের কোনো নাম নেই, তার বিচ্ছেদেরও কোনো নাম হয় না। শুধু বুকের ভেতর একটা অস্বস্তি জমে থাকে, যার কারণ কাউকে বোঝানো যায় না।
এরই মধ্যে প্রত্যয় ঢাকায় চলে গেল। ওখানে কোচিং করবে, পড়াশোনার প্রস্তুতি নেবে—এসব কারণেই যাওয়া।
খবরটা শোনার পর আমার মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে এসেছিল।
কেন?
সত্যি বলতে, নিজেও জানি না।
হয়তো প্রতিমার সঙ্গে আবার একটু স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারব—এই ভেবেই। কথাটা মনে আসতেই নিজের ওপর লজ্জা হলো। নিজের ভাইয়ের চলে যাওয়ায় স্বস্তি পাচ্ছি, শুধু একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ বাড়বে বলে!
বাহ্, নিলয়! প্রেম তোকে বেশ ভালো মানুষ বানাচ্ছে দেখছি!
নিজেকে ধমক দিলাম। কিন্তু মনের ভেতর যে ছোট্ট মানুষটা প্রতিমার নাম শুনলেই খুশিতে লাফিয়ে ওঠে, তাকে আর কতক্ষণ ধমকে রাখা যায়?
প্রত্যয় চলে যাওয়ার পরও অবশ্য প্রতিমার সঙ্গে আমার দূরত্বটা পুরোপুরি কাটল না। ও কোচিংয়ে এসে বারবার আমার দিকে তাকাত। কখনো হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে গেলে আমি তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিতাম।
আমি ভেবেছিলাম, এভাবে এড়িয়ে চললে হয়তো ও কিছু বুঝবে না।
কিন্তু প্রতিমা মজুমদারকে আমি যতটা সহজ-সরল ভেবেছিলাম, মেয়েটা ততটা ছিল না।
একদিন কোচিং ছুটির পর ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, এমন সময় পেছন থেকে ডাক এল—
“নিলয়, দাঁড়াও!”
পেছনে ফিরে তাকালাম। প্রতিমা দ্রুত এগিয়ে আসছে।
“কিছু বলবে?” ব্যাগের ফিতাটা কাঁধে ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম।
ও আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”
আমি যথাসম্ভব নির্বিকার মুখে বললাম, “কেন মনে হলো?”
“তোমার ব্যবহার দেখে।”
“আমার ব্যবহার আবার কী হলো?”
“আগে কত কথা বলতে, কত হাসাতে! স্কুলে একসঙ্গে যেতাম, কত গল্প করতাম। আর এখন তুমি আমার সামনে পড়তেই চাও না। কখনো চোখে চোখ পড়লেও সরিয়ে নাও। কী হয়েছে তোমার? আজ কিন্তু বলতেই হবে।”
আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম, “তুমি ভুল ভাবছ। আমার কিছু হয়নি।”
প্রতিমা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“স্যারের এত অভিমান! আগে তো জানতাম না।”
আমি চুপ করে রইলাম।
ও আবার বলল, “কী ব্যাপার? অভিমান হয়েছে নাকি?”
কী উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,
“অভিমান তো শুধু নিজের মানুষের ওপরই করা যায়।”
কথাটা বলার পরই মনে হলো, নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছি।
প্রতিমার মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো। ও শান্ত গলায় বলল,
“সেটাই তো। আমি তো তোমার নিজের কেউই নই, তাই না?”
আমি থমকে গেলাম।
“আমি সেটা মিন করিনি।”
“তাহলে কী মিন করেছ?”
“প্রতিমা, তুমি কি আমাকে চেকমেট দিচ্ছ?”
“একদমই না।”
“তাহলে এভাবে কথা বলছ কেন?”
ও এবার হেসে ফেলল। “তুমি নিজেই একটা কথা বললে, আবার সেই কথার উত্তর দিতে গিয়েই এত অস্থির হয়ে পড়ছ কেন?”
আমি অসহায়ভাবে ওর দিকে তাকালাম।
মেয়েটার সঙ্গে তর্কে জেতা অসম্ভব। কারণ আমি যে কথাটা বলতে চাই, সেটা বলতে পারি না; আর যেটা বলে ফেলি, সেটাই ও ধরে বসে থাকে।
হঠাৎ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল,
“আচ্ছা, আমি কি তোমার নিজের কেউ?”
প্রশ্নটা শুনে প্রতিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর এমনভাবে বলল, যেন উত্তরটা ওর কাছে একেবারেই সহজ—
“এটা নিয়ে আবার সন্দেহ কীসের? তুমি আমার নিজের নও?”
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
প্রতিমা একটু নরম গলায় বলল, “শোনো, যা হওয়ার হয়েছে। আমি সত্যিই সরি। তোমার মতো ভালো একজন বন্ধুকে আমি হারাতে চাই না। বুঝলে?”
বন্ধু।
শব্দটা শুনে বুকের ভেতর কোথাও একটু ব্যথা হলো বটে, কিন্তু সেদিন সেই ব্যথাটাকে আর পাত্তা দিলাম না। অন্তত প্রতিমা আমাকে হারাতে চায় না—এইটুকুই তখন আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া।
আমার সমস্ত অভিমান বরফের মতো গলে গেল।
আমি মুখে গম্ভীর ভাব এনে বললাম, “আচ্ছা, ঠিক আছে। তবে আর এমন হবে না।”
প্রতিমা ভ্রু তুলে বলল, “কী এমন হবে না?”
“এই যে, আমাকে রাগাবে না।”
“আমি তোমাকে রাগাই?”
“না, আমি নিজেই নিজের ওপর রাগ করি। তুমি শুধু উপলক্ষ।”
প্রতিমা হেসে উঠল।
আর সেই হাসির শব্দে আমার কয়েক দিনের জমে থাকা মন খারাপটা কোথায় যেন একটু হালকা হয়ে গেল।
আবার আগের মতো কথা বলতে শুরু করলাম আমরা। স্কুলে যাওয়ার পথে গল্প, কোচিংয়ে খুনসুটি, মাঝেমধ্যে আমার অদ্ভুত সব কৌতুকে ওর হাসি—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে নিজের জায়গায় ফিরে আসছিল।
আমি অবশ্য তখনো জানতাম না, মানুষের জীবনে সবকিছু ঠিকঠাক হতে শুরু করলেই যে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়, এমন কোনো নিয়ম নেই।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বাবার কাছে বেশ ভালো রকম বকা খেলাম।
কারণ, কোচিংয়ের পরীক্ষায় পঞ্চাশে সাতচল্লিশ পেয়েছি।
শুনতে খুব খারাপ না, তাই না? কিন্তু আমার বাবার কাছে সাতচল্লিশ মানে সাতচল্লিশই। সেখানে তিন নম্বরের কোনো ক্ষমা নেই।
বাবা বিরক্ত গলায় বললেন, “কয়েক দিন বাদেই তোর চূড়ান্ত মডেল টেস্ট। এখনো যদি এই অবস্থা থাকে, তাহলে হবে কী করে? সারাক্ষণ কী নিয়ে থাকিস? পড়াশোনায় মন নেই কেন?”
আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
বাবা আবার বললেন, “তোর দ্বারা জীবনে কিছু হবে না। কথাটা মনে রাখিস।”
শেষ কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
বাবা রাগের মাথায় বলেছিলেন কি না, জানি না। কিন্তু কিছু কথা আছে, যেগুলো বলার পর মানুষ ভুলে যায়; আর যার উদ্দেশে বলা হয়, সে কথাগুলো অনেক দিন বয়ে বেড়ায়।
আমি ঘরে এসে বই খুলে বসেছিলাম। অথচ একটা অঙ্কও মাথায় ঢুকছিল না।
সত্যি বলতে, সেদিন নিজের ওপর আমারও খুব রাগ হচ্ছিল। প্রতিমা আসার আগে পড়াশোনায় আমি এমনিতেই খুব একটা ভালো ছিলাম না। তবে ওর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে অন্তত একটা চেষ্টা করছিলাম। ওর সামনে একটু সম্মান নিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করত। চাইতাম, ও যেন আমাকে শুধু ফাঁকিবাজ একটা ছেলে হিসেবে না দেখে।
অথচ ফলাফল সেই সাতচল্লিশ!
মনে হচ্ছিল, বাবার কথাটাই হয়তো সত্যি। আমার দ্বারা কিছু হবে না।
পরদিন কোচিংয়ে গিয়ে যথারীতি চুপচাপ বসে রইলাম।
প্রতিমা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,
“কী ব্যাপার? আজও মন খারাপ কেন?”
আমি প্রথমে কিছু বলতে চাইনি। পরে কী মনে করে সব খুলে বললাম—বাবার বকা, পরীক্ষার নম্বর, তাঁর বলা কথাগুলো, আর নিজের ওপর জমে থাকা রাগ।
প্রতিমা মন দিয়ে শুনল। মাঝখানে একবারও বাধা দিল না।
সব শোনার পর বলল, “আমি জানি, নিলয়, তুমি পারবে।”
আমি ম্লান হেসে বললাম, “তুমি জানো না। আমার বাবাও জানেন না। আসলে আমিই জানি না।”
“আচ্ছা, একটা কথা বলো তো—তুমি কি চেষ্টা করছ?”
“করছি তো।”
“তাহলে এখনই হেরে যাচ্ছ কেন?”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
প্রতিমা বলল, “শোনো, পরের পরীক্ষায় একশতে একশ পেয়ে আঙ্কলকে দেখিয়ে দেবে। পারবে না?”
আমি হেসে বললাম, “একশতে একশ? তুমি কি আমাকে মানুষ ভাবো, নাকি কোনো জিনিয়াস?”
“তুমি চেষ্টা করলে পারবে। আর না পারলেও অন্তত নিজের কাছে বলতে পারবে, তুমি হাল ছাড়োনি।”
কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল। পৃথিবীর কত মানুষই তো এমন কথা বলে।
কিন্তু সেদিন প্রতিমার মুখে কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, কেউ যেন আমার ভেতরে নিভে আসা একটা প্রদীপ আবার জ্বালিয়ে দিয়েছে।
হয়তো ওর বিশ্বাসটাই আমার দরকার ছিল। এমন একজনের বিশ্বাস, যে আমার ব্যর্থতাটাকে দেখেও আমার সম্ভাবনাটুকু বাতিল করে দেয়নি।
আমি সোজা হয়ে বসে বললাম,
“আই প্রমিস ইউ, প্রতিমা। আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট টু ACHIEVE FULL MARKS!”
শেষের ইংরেজিটা বলার সময় গলায় এমন আত্মবিশ্বাস এনে ফেললাম, যেন পরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আমিই তৈরি করেছি।
প্রতিমা হেসে বলল, “আগে বানানটা ঠিক করে নাও, তারপর একশতে একশ!”
“এই যে! মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার এটাই তোমার নমুনা?”
“আমি বাস্তববাদী, মশাই!”
আমি হাসলাম।
সেদিন বাড়ি ফিরে সত্যিই পড়তে বসেছিলাম। শুধু প্রতিমাকে দেওয়া কথা রাখার জন্য নয়, নিজের কাছেও একটা প্রমাণ দেওয়ার জন্য। যতবার অঙ্কে আটকে গেছি, ততবার আবার চেষ্টা করেছি। ভুল হলে খাতা মুছে নতুন করে করেছি। কোনো কিছু না বুঝলে জিজ্ঞেস করেছি।
পরীক্ষার দিনও খুব একটা আত্মবিশ্বাস ছিল না। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে মনে হয়েছিল, আল্লাহ, আজ যেন মানসম্মানটা বাঁচিয়ে দাও!
তারপর কীভাবে কী হয়ে গেল, সত্যি বলতে আজও বুঝি না।
ফলাফল প্রকাশের দিন জানতে পারলাম, আমি সবার মধ্যে প্রথম হয়েছি।
হ্যাঁ, সেই নিলয়—যার দ্বারা জীবনে কিছু হবে না বলে বাবা সেদিন রায় দিয়ে দিয়েছিলেন!
ফলাফলটা দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। বারবার নম্বর গুনেছি, নাম মিলিয়েছি, এমনকি পাশের ছেলেটাকে দিয়ে আবারও দেখে নিয়েছি।
সব ঠিক।
আমি প্রথম হয়েছি।
খবরটা বাবাকে জানাতে গিয়ে বুকের ভেতর কেমন করছিল। বাবা প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ভালো করেছিস। এভাবেই চেষ্টা করিস।”
মাত্র কয়েকটা শব্দ।
কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব পুরস্কারের চেয়েও কথাগুলো বেশি মূল্যবান।
আর প্রতিমা?
ওর আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, পরীক্ষাটা ও নিজেই দিয়েছে!
“দেখলে! আমি বলেছিলাম না, তুমি পারবে?”
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “হ্যাঁ, ম্যাডাম। আপনার নির্দেশে আপনার ছাত্রের এই অভাবনীয় সাফল্য!”
“বেশি কথা বলো না। এবার পরের পরীক্ষাতেও ভালো করবে।”
“জ্বি, ম্যাডাম।”
প্রতিমা হেসে উঠল।
পরে ওর কাছ থেকেই শুনেছিলাম, ফলাফল প্রকাশের আগে আমার জন্য নাকি অনেক দোয়া করেছিল। কথাটা শুনে কী যে ভালো লেগেছিল, তা ওকে বোঝাতে পারিনি।
কেউ তোমার জন্য প্রার্থনা করছে—এই অনুভূতিটা বড় অদ্ভুত। মনে হয়, পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ চুপচাপ তোমার ভালো থাকার জন্য নিজের মতো করে কিছু চাইছে।
আর আমি তখনো জানতাম না, সেই মানুষটার মনে আমার জন্য ঠিক কতটুকু জায়গা ছিল।
জানার সাহসও অবশ্য আমার ছিল না।
এরপর বেশ কিছুদিন সবকিছু সুন্দরভাবেই চলছিল।
আমি পড়াশোনায় মন দিচ্ছিলাম, প্রতিমার সঙ্গে আগের মতো কথা বলছিলাম। ওর সঙ্গে স্কুলে যেতাম, কোচিংয়ে বসে খুনসুটি করতাম। আমার জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো যেন আবার ফিরে এসেছিল।
মাঝেমধ্যে প্রত্যয়ের কথা উঠত। ঢাকা থেকে ও ফোন করত, আমার পড়াশোনার খোঁজ নিত। আমিও কথা বলতাম, হাসিঠাট্টা করতাম।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
অন্তত আমি তাই ভাবতাম।
একদিন কোচিং ছুটির পর প্রতিমা আমার পাশে এসে দাঁড়াল। মুখটা কেমন যেন বিষণ্ন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
ও একটু চুপ করে থেকে বলল,
“নিলয়, প্রত্যয়ের কোনো খবর আছে তোমার কাছে?”
“কেন? কী হয়েছে?”
“অনেক দিন কথা হয় না। ওকে ভীষণ মনে পড়ছে।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
প্রতিমা একটু থেমে আবার বলল,
“জানো, ওর সঙ্গে আমার কত পুরোনো স্মৃতি! মাঝে মাঝে সেই ছোটবেলার কথাগুলো খুব মনে পড়ে।”
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ছোটবেলার স্মৃতি?
প্রত্যয়ের সঙ্গে?
আমার মাথার ভেতর যেন আচমকা একটা শব্দ হলো।
আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা কি ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চেনো?”
প্রতিমা আমার দিকে তাকাল। তারপর এমন একটা হাসি দিল, যে হাসির অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।
“চিনি তো। তবে গল্পটা তোমাকে একদিন বলব।”
“কবে?”
“যেদিন বলার সময় হবে।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
কিন্তু সেদিন বাড়ি ফেরার পথে আমার মাথার মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরছিল—
প্রতিমা আর প্রত্যয়ের মধ্যে এমন কী অতীত আছে, যার কথা আমার নিজের ভাইও আমাকে কোনো দিন বলেনি?
আর সবচেয়ে বড় কথা—
প্রতিমা যদি প্রত্যয়কে এত দিন ধরে চিনে থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে ও কেন এমন আচরণ করল, যেন আমাদের সবার গল্পের শুরু এই কয়েক মাস আগেই?
কিছু প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য মানুষ অপেক্ষা করতে পারে।
কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলো একবার মাথায় ঢুকে গেলে আর সহজে বেরোতে চায় না।
আমারও আর সেদিন পড়াশোনায় মন বসল না।
রাতে গিটারটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসেছিলাম। আঙুল তারের ওপর রাখলাম, কিন্তু কোনো সুর তুলতে পারলাম না।
শুধু প্রতিমার শেষ কথাটা মনে পড়ছিল—
“ওর সঙ্গে আমার কত পুরোনো স্মৃতি!”
জানালার বাইরে শীতের রাত নেমে এসেছিল।
আর আমার মনে হচ্ছিল, বসন্তের যে গল্পটা আমি এত দিন নিজের মতো করে লিখে এসেছি, তার প্রথম পাতাটাই হয়তো কোনো দিন পড়া হয়নি আমার।
কারণ, কিছু গল্পের শুরু আমরা নিজেরা জানি বলে বিশ্বাস করি।
অথচ সত্যিকারের শুরুটা লুকিয়ে থাকে অন্য কারও স্মৃতিতে।
Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.