বসন্তের নামান্তর
ইসাবেলা আহমেদ
পর্ব: ০৪
প্রতিমা আর আমার বন্ধুত্বটা বেশ ভালোই জমতে শুরু করেছিল কয়েক দিনের মধ্যেই। যদিও আমি ওকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, কিন্তু ওকে সেটা বুঝতে দিতাম না। কারণ, যদি ও ভুল বোঝে, তাহলে মাঝখান দিয়ে বন্ধুত্বটাও যেত।
প্রেমে পড়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী জানেন, পাঠক?
মনের কথাটা বলার সাহস হয় না, আবার না বলেও শান্তি পাওয়া যায় না!
কয়েক দিন পর আলিফ ভাইয়ার কাছে আমার ভাই প্রত্যয়ও পড়া শুরু করল। প্রত্যয় আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। আমরা দুই ভাই বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো। নিজেদের প্রায় সবকিছুই শেয়ার করি।
তবে জীবনে প্রথমবার আমার ওকে প্রতিমার প্রতি জমে থাকা অনুভূতিগুলো বলতে ইচ্ছে হলো না।
কেন তা, জানি না।
হয়তো কিছু অনুভূতি এতটাই নিজের হয়ে যায় যে, সেগুলো অন্য কারও সামনে প্রকাশ করতে ভয় লাগে।
প্রতিমার সঙ্গে প্রত্যয়েরও ভালোই খাতির জমে গিয়েছিল। আমি বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম। অন্তত তখন পর্যন্ত।
একদিন রাতে আমি আর প্রত্যয় ছাদে বসে ছিলাম। শীতের রাত। আকাশে গোল চাঁদ। চারপাশে কেমন একটা নিস্তব্ধতা।
প্রত্যয় চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পর আমাকে বলল,
“নিলয়, যা তো, তোর গিটারটা নিয়ে আয়।”
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “এখন গিটার দিয়ে কী হবে? চুপ মেরে বসে থাক।”
“যা, শালা! আনতে বলছি, এনে দে।”
বড় ভাই বলে কথা! অগত্যা নিচে নেমে গিটার নিয়ে আবার ছাদে উঠলাম।
প্রত্যয়ের গলাটাও চমৎকার। গিটারটা হাতে নিয়ে ও গাইতে শুরু করল—
Ek Ajnabi Haseena Se, Yun Mulaqat Ho Gayi, Phir Kya Hua, Yeh Na Puchho, Kuch Aisi Baat Ho Gayi...
আমি চুপচাপ শুনছিলাম।
গান শেষ করে প্রত্যয় আবার চাঁদের দিকে তাকাল।
“আচ্ছা, নিলয়?”
“হুম?”
“তোর কখনো কাউকে দেখে মনে হয়েছে, মানুষটাকে আগে থেকেই চিনিস? অথচ বাস্তবে তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে মাত্র কয়েক দিনের?”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
“কেন? তুই কাউকে দেখে ফেলেছিস নাকি?”
প্রত্যয় হাসল। সেই হাসিতে কেমন একটা অচেনা সংকোচ।
“ধর, ফেলেছি।”
আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। তবু মুখে হাসি এনে বললাম,
“ওহ্! তা হলে তো ঘটনা গুরুতর। নাম কী, শুনি?”
“নাম বললেই তো আর সব বলা হয়ে যায় না, ভাই।”
“বাহ্! প্রেমে পড়ার আগেই দার্শনিক হয়ে গেলি!”
প্রত্যয় আমার মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলল, “বেশি পাকামি করিস না।”
আমি হেসে উঠলাম।
কিন্তু হাসির আড়ালে আমার ভেতরে ছোট্ট একটা প্রশ্ন জন্ম নিল।
প্রত্যয় কি সত্যিই কারও প্রেমে পড়েছে?
আর যদি পড়ে থাকে, মেয়েটা কে?
পরদিন বিকেলে আলিফ ভাইয়ার ব্যাচে গিয়ে প্রতিমাকে দেখলাম জানালার পাশে বসে আছে। হাতে একটা বই, চোখ বইয়ের পাতায়। বাতাসে ওর কপালের কয়েকটা চুল উড়ছিল।
আমি নিজের জায়গায় বসে পড়লাম।
প্রত্যয়ও এসে পাশে বসল।
“এই প্রতিমা!” প্রত্যয় ডাকল।
প্রতিমা মুখ তুলে হাসল।
“হ্যাঁ, বলো।”
“গতকাল যে বইটার কথা বলছিলে, সেটা পেয়েছ?”
“না তো। খুঁজছি এখনো।”
“আচ্ছা, আমি দেখব।”
আমি খাতার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুকে বই খুঁজে দেওয়ার কথা বলতেই পারে। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।
একদম নেই।
নিজের ওপরই বিরক্ত হলাম। একটা মানুষকে ভালো লাগলেই কি তার সঙ্গে কথা বলা প্রতিটি মানুষকে অপছন্দ করতে হবে?
ছিঃ, নিলয়!
নিজেকে ধমক দিয়ে অঙ্কে মন দিলাম।
অঙ্কটা অবশ্য আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন সেও আমার প্রেমের দুর্দশা সম্পর্কে অবগত।
সেদিন রাতে প্রত্যয় আবার আমার ঘরে এল।
আমি বিছানায় শুয়ে ফোনে কিছু একটা দেখছিলাম।
“ঘুমাচ্ছিস নাকি ব্রো ?”
“না, তোর জন্যই তো জেগে আছি। বল, কি বলবি ?”
প্রত্যয় আমার পাশে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তোকে একটা কথা বলব। হাসাহাসি করবি না কিন্তু।”
আমি উঠে বসলাম।
“বল।”
“আলিফের ব্যাচে যে মেয়েটা পড়ে... প্রতিমা...”
আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রত্যয় একটু থেমে আবার বলল,
“মেয়েটাকে আমার ভালো লাগে ।”
কথাটা খুব সাধারণভাবে বলেছিল ও।
কোনো নাটকীয়তা ছিল না। কোনো বিশেষ ভঙ্গি ছিল না। যেন ও আমাকে বলছে, আগামীকাল বৃষ্টি হতে পারে।
অথচ আমার কাছে মনে হলো, কেউ যেন মনের মন্দির থেকে একটা ইট খুলে নিয়েছে। শূন্য জায়গাটায় বাতাস ঢুকছে, কিন্তু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।
প্রত্যয় আমার কাঁধে হাত রাখল।
“কী মামা ? চুপ করে গেলি কেন?”
আমি জোর করে হাসলাম।
“না, কিছু না। ভালোই তো! মেয়েটা ভালো।”
“জোস!”
প্রত্যয়ের চোখে তখন এমন একটা আনন্দ দেখলাম, যেটা আমি ওর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারতাম না।
ও আমার ভাই।
শুধু ভাই নয়, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ছোটবেলা থেকে নিজের সবকিছু ওর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। খেলনা, বই, গোপন কথা, বকা খাওয়ার স্মৃতি—সব।
শুধু এবার একটা জিনিস ভাগ করতে পারলাম না।
আমার ভালোবাসা।
প্রত্যয় হঠাৎ বলল, “জানিস, ওর হাসিটা খুব সুন্দর।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হুম।”
“আর গানও খুব ভালোবাসে। আমার মনে হয়, ওকে একদিন গিটার বাজিয়ে গান শোনাব।”
আমি এবার সত্যিই হেসে ফেলে বলি,
“আগে মেয়েটাকে বল তো, তোর গান শুনতে রাজি কি না!”
প্রত্যয় বালিশটা তুলে আমার দিকে ছুড়ে মারল।
“শালা ভাগ!”
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম।
কিন্তু ও চলে যাওয়ার পর আমার হাসিটা আর থাকল না।
সেই রাতে ঘুম এল না।
জানালার পাশে বসে গিটারটা কোলে নিলাম। আঙুলগুলো আপনা থেকেই সেই সুর খুঁজে নিল, যেটা প্রত্যয় আগের রাতে গেয়েছিল।
Ek Ajnabi Haseena Se...
কিন্তু আজ গানটা গাইতে গিয়ে গলা আটকে গেল।
প্রতিমাকে আমি ভালোবাসি।
এই কথাটা নিজেকে বলতেও এত দিন লজ্জা লাগত। আর আজ বুঝলাম, ভালোবাসা শুধু কাউকে পাওয়ার স্বপ্ন নয়। কখনো কখনো নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রেখে প্রিয় মানুষটার হাসি অক্ষত রাখার নামও ভালোবাসা।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।
প্রত্যয় যদি প্রতিমাকে ভালোবাসে, তাহলে আমি কী করব?
নিজের ভালোবাসার কথা বলব?
নাকি চুপ করে থাকব?
আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।
শুধু গিটারটা পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলাম।
ঠিক তখনই ফোনে একটা মেসেজ এল।
প্রতিমার মেসেজ। আমার মনের ভেতর ভূমিকম্প শুরু হলো যেন।
প্রতিমা: ঘুমিয়ে পড়েছ?
আমি প্রায় লাফ দিয়ে উঠে বসলাম।
এত রাতে প্রতিমা আমাকে মেসেজ করেছে!
তাড়াতাড়ি লিখলাম—
আমি: না। বলো।
কিছুক্ষণ পর ওর উত্তর এল।
প্রতিমা: একটা কথা বলব? কাউকে বলবে না কিন্তু।
আমার বুকের ভেতরটা আবার কেঁপে উঠল।
আমি: বলো।
মেসেজটা দেখে বেশ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
আমি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, কয়েকটা মিনিট নয়, কয়েকটা বছর কেটে যাচ্ছে।
তারপর হঠাৎ ওর মেসেজ এল।
প্রতিমা: তোমার ভাই প্রত্যয়কে কেমন চেনো তুমি?
আমি স্থির হয়ে গেলাম,এ আবার কি আজব প্রশ্ন!
প্রত্যয়কে কেমন চিনি?
সে আমার ভাই। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আমার জীবনের এমন একজন মানুষ, যার কাছে আমি নিজের সব কথা বলতে পারি।
কিন্তু প্রতিমা হঠাৎ প্রত্যয়ের কথা জানতে চাইছে কেন?
আমি লিখলাম—
আমি: ভালো করেই চিনি,ও আমার নিজের ভাই,চিনবো না কেন?
প্রতিমা উত্তর দিল—
প্রতিমা: তোমার ভাইকে একটা কথা বলার আছে আমার। কিন্তু সরাসরি বলতে পারছি না। তুমি কি একটু সাহায্য করবে?
আমার হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেল।
এবার প্রতিমা তার সঙ্গে কথা বলার জন্য আমার সাহায্য চাইছে।
তার মানে কি...
না! নিলয়, আগে সবটা জান।(আমার মন তাই বলছিলো)
আমি কাঁপা আঙুলে লিখলাম—
আমি: কী কথা?
এবার উত্তর আসতে একটু বেশি সময় লাগল।
তারপর প্রতিমা যা লিখল, সেটা পড়ে আমার মনে হলো, রাতের আকাশ থেকে চাঁদটা হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
প্রতিমা: আসলে, প্রত্যয়কে আমি আগে থেকেই চিনি। ওর সঙ্গে আমার একটা পুরোনো পরিচয় আছে। কিন্তু ও এখনো জানে না, আমি কে।
আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আগে থেকেই চেনে?
কোথা থেকে?
কীভাবে?
প্রত্যয় কি তাহলে প্রতিমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা নয়?
আর প্রতিমা যদি আগে থেকেই প্রত্যয়কে চিনে থাকে, তাহলে এত দিন কিছু বলেনি কেন?
আমি কিছু লেখার আগেই আরও একটা মেসেজ এল।
প্রতিমা: নিলয়, প্লিজ, প্রত্যয়কে এখনই কিছু বলো না। ওর সঙ্গে আমার পরিচয়ের গল্পটা তুমি জানলে হয়তো তুমিও অবাক হবে।
আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম।
বাইরে তখন শীতের রাত আরও গভীর হয়েছে।
কিছুক্ষণ আগেও আমার মনে হচ্ছিল, আমি দুজন প্রিয় মানুষের মাঝখানে আটকে গেছি।
এখন বুঝলাম, গল্পটা এত সহজ নয়।
প্রত্যয় প্রতিমাকে ভালোবাসে।
আমি প্রতিমাকে ভালোবাসি।
কিন্তু প্রতিমা?
প্রতিমা কি প্রত্যয়কে আগে থেকেই ভালোবাসে, নাকি ওর জীবনে এমন কোনো অতীত আছে, যার কথা আমরা কেউই জানি না?
জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো, চাঁদটা এখনও আকাশে আছে।
শুধু আমার চোখের সামনে মেঘ জমেছে।
আর সেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক সত্য, যা হয়তো আমাদের তিনজনের জীবনই বদলে দেবে।

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.