বসন্তের নামান্তর
ইসাবেলা আহমেদ
পর্ব: ৩
প্রেমে পড়লে মানুষ নাকি একটু একটু করে বদলে যায়।
কেউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করে, কেউ অকারণে ফোনের মেসেজ চেক করে, আর কেউ কেউ রাত দুটোয় গিটার হাতে বসে এমন গান গায়, যার অর্থ সে নিজেই বোঝে না।
আমি অবশ্য এই দলের কোনোটাতেই পড়তাম না।
আমি শুধু প্রতিমার কথা ভাবতাম।
শীতের সকাল।
আমি স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জুতার ফিতা বাঁধছিলাম। হঠাৎ পাশের বাড়ির গেট খুলে গেল।
বেরিয়ে এল প্রতিমা। সকালের রোদ এসে পড়েছে ওর মুখে। মেয়েটাকে দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীতে স্কুলে তাড়াতাড়ি যাওয়ার এত সুন্দর কারণ আগে কেন আবিষ্কার করিনি?
প্রতিমা আমাকে দেখে একটু অবাক হলো। বলল,
“তুমি এই সময় বের হও?”
আমি গম্ভীর মুখে বললাম, “হ্যাঁ, আমি তো সকাল সকালই স্কুলে যাই রোজ।” (ডাহা মিথ্যে কথা!)
আমি আসলে জীবনেও ক্লাস শুরু হওয়ার বিশ মিনিট আগে যেতাম না।
কথাটা বলেই মনে পড়ল, গতকালই অঙ্কের খাতায় নিজের নাম লিখে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে একটা অঙ্কের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
ভালো ছাত্র!
মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের বিবেককে বললাম, ভাই, একটু চুপ থাক। আজ আমার সম্মানের প্রশ্ন।
প্রতিমা হেসে বলল, “বাহ্! তোমাকে দেখে তো মনে হয় না।”
“দেখতে কেমন মনে হয়?”
“বলব?”
“হ্যাঁ, বলো।”
“যে ছেলে পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের চেয়ে জানালার বাইরের দৃশ্য বেশি দেখে!”
আমি থমকে গেলাম।
মেয়েটা কি আমার ঘরের জানালায় ক্যামেরা বসিয়েছে নাকি?
“তুমি এসব জানলে কীভাবে?”
“অনুমান।”
প্রতিমা এমনভাবে হাসল, যেন আমার সব গোপন অপরাধের ফাইল ওর কাছে জমা আছে।
আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, মেয়েটাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। এই মেয়ে বিপজ্জনক!
“আচ্ছা, তোমার স্কুল কোন দিকে?” ও জিজ্ঞেস করল।
“সামনের রাস্তা দিয়ে সোজা।”
“আমারও ওই দিকেই। চলো, একসঙ্গে যাই।”
পাঠক, আপনারা কি কখনো খেয়াল করেছেন, কিছু কিছু সাধারণ বাক্য মানুষের মনে অসাধারণ ঘটনা ঘটিয়ে দেয়?
যেমন, ‘একসঙ্গে যাই’।
মাত্র তিনটে শব্দ।
অথচ আমার মনে তখন ব্যান্ড পার্টি বাজছে, আতশবাজি ফুটছে, আর ভেতরের রোমিও মশাই বুক ফুলিয়ে বলছেন, দেখলি? বলেছিলাম না, কিছু একটা হবেই!
আর আমার বিবেক?
সে বেচারা সম্ভবত তখন ছুটিতে গেছে।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।
রাস্তার দুপাশে পুরোনো গাছ। পাতার ফাঁক দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে পিচঢালা পথে। দূরে স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের কোলাহল। প্রতিমা আমার পাশ দিয়ে হাঁটছে, আর আমি চেষ্টা করছিলাম স্বাভাবিক থাকতে।
চেষ্টা করছিলাম বললাম, কারণ আমার হাঁটার গতি কখনো বেড়ে যাচ্ছিল, কখনো কমে যাচ্ছিল।
প্রতিমা একসময় বলেই ফেলল, “তুমি হাঁটছ, নাকি রাস্তার সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতা করছ?”
আমি কাশলাম।
“না তো!”
“তাহলে এত দ্রুত হাঁটছ কেন?”
“আমার স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।”
“কিন্তু তোমার স্কুল তো এখনো অনেক দূরে!”
আমি মনে মনে বললাম, হে আল্লাহ, এই মেয়ের সামনে আমার মানসম্মানটা একটু রক্ষা করো!
তারপর কথার মোড় ঘোরাতে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, তুমি গান এত সুন্দর গাও কীভাবে?”
“আবার গান!”
“মানে?”
“সেদিনও এই প্রশ্ন করলে। আজও করছ।”
“তা করব না? ভালো জিনিসের প্রশংসা করতে হয়।”
প্রতিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “ছোটবেলায় বাবা গান শুনতে ভালোবাসতেন। আমি গাইলে খুব খুশি হতেন। এখনো গান গাইলে মনে হয়, বাবা কোথাও বসে শুনছেন।”
কথাটা বলেই ও অন্যদিকে তাকাল।
আমি আর কোনো প্রশ্ন করলাম না।
হঠাৎ মনে হলো, এই মেয়েটার হাসির আড়ালেও একটা আলাদা পৃথিবী আছে। এমন একটা পৃথিবী, যেখানে হয়তো ও কাউকে ঢুকতে দেয় না।
আমার খুব ইচ্ছে হলো, ওর সেই পৃথিবীটার কথা জানতে।
কিন্তু সব কথা কি প্রথম দিনেই জিজ্ঞেস করা যায়?
আমি শুধু বললাম, “তোমার বাবা নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন তোমার গান শুনলে।”
প্রতিমা আমার দিকে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য ওর চোখে কেমন একটা কোমলতা দেখলাম। তারপর ছোট্ট করে হাসল।
“ভীষণ!”
আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর প্রতিমা বলল, “তুমি গান গাও, গিটার বাজাও, আবার পড়াশোনাও করো—সব সামলাও কীভাবে?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “পড়াশোনাটা বাদ দিলে সবকিছুই খুব সুন্দরভাবে সামলাতে পারি।”
প্রতিমা হেসে উঠল।
সেই হাসি শুনে আমার মনে হলো, আজকের সকালটা বৃথা যায়নি।
স্কুলের গেটের কাছে এসে ও থামল।
“আচ্ছা, নিলয়, তুমি কি প্রতিদিন এই সময় বের হও?”
প্রশ্নটা শুনে আমার বুকের ভেতর কেউ যেন ঢাক বাজিয়ে উঠল।
তবে কি কালও একসঙ্গে হাঁটার সুযোগ আছে?
আমি মুখে যতটা সম্ভব নির্লিপ্ত ভাব এনে বললাম, “হ্যাঁ, মোটামুটি।”
“তাহলে কাল দেখা হবে।”
এই বলে প্রতিমা নিজের স্কুলের দিকে চলে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক সেকেন্ড।
তারপর নিজের স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ঠোঁটের কোণে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করেও পারলাম না।
কাল দেখা হবে।
এই কথাটা যে একটা মানুষের পুরো দিন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, মেয়েটা কি তা জানত?
সেদিন ক্লাসে বাংলা স্যার কী পড়িয়েছেন, আমার মনে নেই।
গণিতের শিক্ষক বোর্ডে কী অঙ্ক করিয়েছেন, সেটাও মনে নেই।
শুধু মনে আছে, খাতার এক কোণে অজান্তেই লিখে ফেলেছিলাম—
প্রতিমা।
তার নিচে আবার লিখলাম—
প্রতিমা মজুমদার।
তারপর নামটার চারপাশে একটা বৃত্ত আঁকলাম।
কাজটা শেষ করে নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজেকে বললাম,
নিলয়, তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?
একটা মেয়ের নাম খাতায় লিখে তার চারপাশে বৃত্ত আঁকছিস কেন?
নামটা কি অঙ্কের উত্তর, যে বৃত্ত দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে?
তাড়াতাড়ি খাতাটা বন্ধ করে ফেললাম।
কিন্তু মানুষ খাতা বন্ধ করতে পারে, মনের ভেতর চলতে থাকা চিন্তাগুলোকে কী দিয়ে বন্ধ করবে?
বিকেলে আলিফ ভাইয়ার ব্যাচে গিয়ে দেখি, প্রতিমা আগেই এসে বসেছে।
ওর সামনে অঙ্কের খাতা খোলা। কপালে সামান্য ভাঁজ, হাতে পেনসিল।
আমি নিজের জায়গায় বসে পড়লাম।
আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পড়াশোনায় মন দেব। একদম ভালো করে মন দেব।
আলিফ ভাইয়া বোর্ডে একটা অঙ্ক লিখে বললেন, “নিলয়, ওঠ তো। করে দেখা।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
অঙ্কটার দিকে তাকালাম।
তারপর বোর্ডের দিকে।
তারপর আবার অঙ্কটার দিকে।
কোথাও যেন কিছু একটা পরিচিত লাগছে। কিন্তু কী, সেটা মনে পড়ছে না।
পেছন থেকে কারও চাপা হাসির শব্দ পেলাম।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখি, প্রতিমা মুখে হাত চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে।
কোনোমতে অঙ্কটা শেষ করে বসতে যাব, এমন সময় আলিফ ভাইয়া বললেন, “বাহ্! আজ তো ভালোই করেছিস।”
ক্লাস শেষে সবাই বেরিয়ে গেলে প্রতিমা আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
“এই যে, ভালো ছাত্র!”
আমি চোখ ছোট করে বললাম, “আবার কী?”
“অঙ্কটা তো বেশ ভালোই করলে!”
“অবশ্যই, আমি তো জাহাজ অঙ্কের!”
“যদিও মাঝখানে তিনবার বোর্ডের দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলে, যেন বোর্ড তোমাকে উত্তর বলে দেবে।”
আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না।
“তুমি সবকিছু এত খেয়াল করো কেন?”
প্রতিমা হাসতে হাসতে বলল, “সবকিছু না। কিছু কিছু।”
কথাটা বলে ও ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল।
আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিছু কিছু।
কোন কোন কিছু?
আমিও কি সেসবের মধ্যে পড়ি?
নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিতে পারলাম না।
সেদিন রাতে আবার গিটার হাতে বসেছিলাম।
বাইরে চাঁদ উঠেছে। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আসছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।
আমি গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে ধীরে ধীরে সুর তুললাম।
যে ছেলেটা কয়েক দিন আগেও পড়াশোনার বই খুললেই বিরক্ত হয়ে যেত, সে এখন সকালে সময়মতো বের হওয়ার কারণ খুঁজছে।
যে ছেলেটা কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবত না, সে এখন আগামীকাল সকালটার কথা ভাবছে।
শুধু একটা মেয়ের সঙ্গে আবার দেখা হবে বলে।
কী অদ্ভুত!
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে, যারা দরজায় কড়া নাড়ে না। নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে। তারপর একদিন দেখা যায়, মনের সবচেয়ে এলোমেলো ঘরটাও তাদের জন্য গুছিয়ে রাখা হয়েছে।
প্রতিমা কি আমার জীবনে তেমনই কেউ?
উত্তরটা তখনো জানতাম না।
শুধু জানতাম, পরদিন সকালে আমার তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে হবে।
কারণ—কাল দেখা হবে।
আর আমি জানতাম না, এই ছোট্ট অপেক্ষাটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা হয়ে উঠবে।
রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে বেশ দেরি হলো। আমি সেই রাত জেগে আকাশকুসুম ভাবছিলাম।
স্বপ্ন দেখলাম...
একটা শীতের সকালের ফাঁকা রাস্তা। আমি আর প্রতিমা একসঙ্গে হাত ধরে হাঁটছি। প্রতিমা শীতে কাঁপছে আর আমাকে ওর বাঁ হাতের কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে বলে,
“এই যে স্যার, আপনি কি দেখছেন না, আমার শীত লাগছে!”
আমি হাঁটা থামিয়ে ওকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে দুষ্টুমি করে বললাম, “এখনো লাগছে কী?”
প্রতিমা একটু লজ্জা পেল, কিন্তু হুট করে ও আমার গালে ওর ঠোঁটটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
আর ওর হাই-ভোল্টেজ ছোঁয়া পেয়ে আমার এত সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে গেল।
আমি ঘামে ভিজে গিয়েছিলাম। ভীষণ লজ্জা লাগছিল আমার।
মানুষ বলে, ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়? এরকম কিছু কি কোনো দিন আসলেও হবে?

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.