বসন্তের নামান্তর
ইসাবেলা আহমেদ
পর্ব: ২
আমাদের বাড়িটা বেশ বড়ো, পুরোনো আর অসাধারণ সুন্দর। শহরের আট-দশটা বাড়ির চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের।
আমি গিটার বাজাতে, গান গাইতে ভীষণ ভালোবাসি। একদিন বিকেলে উঠোনে জামগাছের নিচে হেলান দিয়ে গিটার বাজাচ্ছিলাম আর গান গাইছিলাম—Yeh Raaten Yeh Mausam।
হঠাৎ পাশের বাসা থেকে ভেসে এল আরেকটা কণ্ঠস্বর। কেউ একজন এই গানটাই গাইছিল।
কী চমৎকার মিষ্টি গলা!
আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো, অচেনা ওই গায়িকাকে একবার দেখার। গান আর গিটার থামিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। শুনতে লাগলাম সেই অচেনা কণ্ঠের মায়াবী সুর।
এর কিছুদিন পরের ঘটনা...
হিন্দু মেয়েরা সুন্দরী হয়, ছোটবেলা থেকেই এমনটা শুনে আসছি আমার এক দাদির কাছ থেকে। প্রতিমাকে প্রথম দেখে সেই ধারণাটা আরও দৃঢ় হলো। (যদিও স্রষ্টার সৃষ্টি সবই সুন্দর বলে আমি মনে করি।)
ও এসেছিল আমাদের আলিফ ভাইয়ার ব্যাচে পড়তে। সামনে ওর এসএসসি পরীক্ষা।
সেদিনের সব কথা ঠিক মনে নেই। তবে আজও মনে আছে, ওর উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, নখে নেভি ব্লু রঙের নেইলপলিশ আর ওর তুখোড় ব্যক্তিত্বের কথা।
প্রথম দেখাতেই ও আমার মনে একঝাঁক হাঁস উড়িয়ে দিয়েছিল। আর সেই হাঁসগুলো মনের নদীতে সাঁতার কাটতে শুরু করল যখন শুনলাম, প্রতিমা আমাদের পাশের বাসাতেই ভাড়া থাকে!
ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপটা ছিল একটু হাস্যকর।
আমরা আলিফ ভাইয়ার কাছে অঙ্ক করছিলাম। আর আমি বিস্কুট খাচ্ছিলাম।
হঠাৎ ঘরে ঢুকল প্রতিমা।
কী অসাধারণ দেখতে ওকে! কী সুন্দর মিষ্টি ঘ্রাণ! নিশ্চয়ই কোনো দামি পারফিউম।
পরনে ব্রাউন কালারের ওভারকোট। ওর সঙ্গে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আলিফ ভাইয়া। আমার দিকে আঙুল তুলে ভাইয়া যখন আমার নামটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল "বিস্কুট"! আমার নাম বিস্কুট শুনে
সবাই আচমকা হেসে উঠল। প্রতিমাও হাসল, যেন একগুচ্ছ মুক্তো ঝরে পড়ল ওর ঠোঁট থেকে।
আলিফ ভাইয়া বললেন, “এই গাধাটার নাম বিস্কুট না, নিলয়!”
পরিচয়পর্ব শেষে আলিফ ভাইয়া সবাইকে পড়াতে শুরু করলেন। আমি লজ্জায় একবারও প্রতিমার মুখের দিকে তাকাইনি। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। হাতের তালু ঘামছিল।
ছুটির পর সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রতিমা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যাবে, এমন সময় আমি ওকে ডাকলাম।
“এক্সকিউজ মি, আমি নিলয়।”
প্রতিমা একটু অপ্রস্তুত হেসে বলল, “হ্যাঁ, মনে আছে।”
আমি বললাম, “একটা প্রশ্ন করি, যদি কিছু মনে না করো?”
“শিওর।”
“সেদিন পাশের বাসা থেকে বিকেলে কেউ একজন Yeh Raaten Yeh Mausam গানটা গাইছিল। গলাটা তোমার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। তুমিই কি সেদিন গাইছিলে?”
প্রতিমা মুচকি হেসে বলল, “হ্যাঁ, আমিই গাইছিলাম।”
“তোমার কণ্ঠটা চমৎকার! কোথাও গান শেখো নাকি?”
“নাহ্, এমনি ভালো লাগা থেকে গাই।”
“তোমাদের নিজেদের বাসা কোথায়? তোমার বাবা-মাও কি এখানে থাকেন?”
হঠাৎ প্রতিমার মুখে বিষাদের ছায়া নেমে এল।
বলল, “আমার বাবা নেই। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। আমাদের বাসা রাজবাড়ী।”
“আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি।”
“ইটস অলরাইট। আসছি তাহলে?”
“বাই।”
ও বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি জানি না কেন, আবারও ওকে ডাকলাম।
ওর সামনে গিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে বললাম, “ফ্রেন্ডস?”
ওর মাখনের মতো হাতটা আমার ডান হাতে আলতো ছুঁয়ে গেল।
“ইয়েস।”
সেদিন রাতে আমার ঘুম আসছিল না। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ভাবছিলাম, প্রতিমাকে দেখার পর থেকেই নিজেকে কেমন অচেনা লাগছে। আমি কি আদৌ এমন শান্তশিষ্ট, ভদ্র ছেলে?
কে জানে, প্রতিমা কী জাদুকাঠি ছুঁইয়ে দিল আমায়!
আমাদের এই দোতলার বারান্দা থেকে প্রতিমার ঘর সামনাসামনি দেখা যায়। ওর ঘরের জানালা খোলা ছিল। জানালার সামনেই একটা টেবিল, আর সেখানে বসে পড়ছিল ও।
আমার মনের ভেতর কেমন একটা নাম না-জানা অনুভূতি হলো। একটা মিষ্টি যন্ত্রণা।
আমি নিজের ঘরে ফিরে গেলাম। জানালার তাকে বসে গিটার নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম।
তারপর গিটারের তারে আঙুল ছুঁইয়ে গেয়ে উঠলাম—
Haan, hum badalne lage,
Girne sambhalne lage,
Jab se hain jaana tumhe,
Teri ore chalne lage...

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.