পঞ্চম পর্ব: যে সত্যিটা বলা হয়নি
সকাল থেকেই রৌদ্রময়ীর মনটা অস্থির। রাতের সেই বার্তাটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
“তোমার স্বামীকে সত্যিটা জানার আগে আমার সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে।”
সে জানে, আরিফের সঙ্গে দেখা করা উচিত হবে না। তবুও লোকটা কী বলতে চাইছে, তা না জেনে যেন শান্তি পাচ্ছে না।
অন্যদিকে মূসাও আজ বেশ চুপচাপ। সকালে নাশতার টেবিলে দুজনের মধ্যে খুব বেশি কথা হয়নি।
মূসা অফিসে যাওয়ার আগে বলল,
— আজ কোথাও বের হবে?
রৌদ্রময়ী একটু থেমে বলল,
— না। কেন?
— এমনিই জিজ্ঞেস করলাম। আর শোনো, কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবে।
— আচ্ছা।
মূসা দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— রৌদ্রময়ী!
— বলো।
— তুমি আমাকে সব বলতে পারো। আমি তোমার কথা শুনব।
রৌদ্রময়ী মাথা নিচু করে বলল,
— জানি।
মূসা চলে গেল। আর রৌদ্রময়ী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
দুপুরের দিকে আরিফের ফোন এল।
— রৌদ্রময়ী, আজ দেখা করবে?
— আমি আপনাকে আগেই বলেছি, দেখা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
— তুমি শুধু আমার কথা একবার শোনো। তারপর চাইলে আর কোনো দিন যোগাযোগ করব না।
— কী এমন কথা, যা ফোনে বলা যায় না?
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— তোমার বিয়ের আগে যে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেটা নিয়ে তোমাকে একটা সত্যি জানাতে চাই।
রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ নীরব রইল।
— কী সত্যি?
— ফোনে বলা ঠিক হবে না। বিকেল পাঁচটায় পুরোনো লাইব্রেরির সামনে এসো।
রৌদ্রময়ী এবার কঠিন গলায় বলল,
— আমি একা আসব না। আমার স্বামীকে সব জানাব।
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— সেটাই তো চাই। তবে আগে তুমি সত্যিটা জানো। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ো।
ফোন কেটে গেল।
রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর মূসাকে ফোন করল।
— হ্যালো, মূসা?
— বলো, কী হয়েছে?
— তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।
— কী কথা? সব ঠিক আছে তো?
— বাসায় ফিরে বলব। আজ একটু আগে ফিরতে পারবে?
মূসা এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
— চেষ্টা করছি। তুমি চিন্তা কোরো না।
বিকেলের আগেই মূসা বাসায় ফিরে এল। ঘরে ঢুকেই দেখল, রৌদ্রময়ী সোফায় বসে আছে। তার চোখ দুটো লাল।
মূসা কাছে গিয়ে বসল।
— কী হয়েছে? কাঁদছো কেন?
রৌদ্রময়ী মূসার হাত দুটো ধরে বলল,
— আজ তোমাকে এমন একটা কথা বলতে চাই, যেটা এত দিন বলা হয়নি।
মূসা শান্ত স্বরে বলল,
— বলো। আমি শুনছি।
রৌদ্রময়ী গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করল,
— বিয়ের আগে আরিফ নামে একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। আমরা একই জায়গায় পড়াশোনা করতাম। একসময় আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব তৈরি হয়। সে আমাকে পছন্দ করত, আমিও তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।
মূসা নীরবে শুনছিল।
রৌদ্রময়ী আবার বলল,
— কিন্তু একসময় বুঝতে পারি, আমাদের সম্পর্কটা ঠিক পথে এগোচ্ছে না। আমি আল্লাহর কাছে তওবা করি এবং সেই সম্পর্ক থেকে সরে আসি। এরপর তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমি অতীতকে পেছনে ফেলে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছিলাম।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
— আমি তোমাকে এসব আগে বলিনি। ভেবেছিলাম, অতীতের একটা অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।
মূসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— তুমি কি এখনো তাকে ভালোবাসো?
রৌদ্রময়ী দ্রুত মাথা নাড়ল।
— না, মূসা। একদম না। আমার জীবনে এখন তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। আমি শুধু চাইনি, অতীতের কোনো বিষয় আমাদের বর্তমানকে নষ্ট করুক।
মূসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— অতীতের ভুলের জন্য আমি তোমাকে বিচার করতে চাই না। কিন্তু তুমি যখন বিষয়টা লুকিয়ে রাখলে, তখন আমার কষ্ট হয়েছে। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারতে।
রৌদ্রময়ী কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— ভয় পেয়েছিলাম। যদি তুমি আমাকে ভুল বোঝো?
মূসা তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
— সত্যি বলার জন্য আমি তোমাকে দূরে ঠেলে দেব না। তবে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে আর কোনো গোপনীয়তা চাই না।
রৌদ্রময়ী মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
কিছুক্ষণ পর মূসা জিজ্ঞেস করল,
— আরিফ এখন কী চায়?
— সে বলেছে, আমার সঙ্গে দেখা করে একটা সত্যি জানাতে চায়। আমি জানি না কী সত্যি।
মূসা বলল,
— তাহলে আমরা একসঙ্গেই শুনব। তুমি একা কোথাও যাবে না।
রৌদ্রময়ী অবাক হয়ে তাকাল।
— তুমি আমার সঙ্গে যাবে?
— অবশ্যই। তোমার অতীত নিয়ে কথা হলে সেটা তোমার একার দায়িত্ব নয়। এখন তুমি আমার জীবনসঙ্গী। তোমার সম্মান আর নিরাপত্তা আমার কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিকেল পাঁচটার কিছু আগে তারা পুরোনো লাইব্রেরির সামনে পৌঁছাল। আরিফ আগে থেকেই সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।
রৌদ্রময়ীকে মূসার সঙ্গে দেখে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
মূসা এগিয়ে গিয়ে বলল,
— আপনি নিশ্চয়ই আরিফ? রৌদ্রময়ীর সঙ্গে আপনার কিছু কথা আছে শুনেছি। বলুন, কী বলতে চান?
আরিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— প্রথমেই বলি, আমি আপনাদের সংসারে কোনো সমস্যা তৈরি করতে চাই না।
মূসা শান্ত গলায় উত্তর দিল,
— তাহলে সরাসরি কথায় আসুন।
আরিফ রৌদ্রময়ীর দিকে তাকাল।
— তোমার কি মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে তোমার নামে একটা অভিযোগ উঠেছিল? বলা হয়েছিল, তুমি নাকি আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলে এবং পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলে?
রৌদ্রময়ী অবাক হয়ে বলল,
— হ্যাঁ, মনে আছে। কিন্তু আমি তো কোনো টাকা নিইনি!
আরিফ মাথা নিচু করল।
— আমি জানি। সেই অভিযোগটা মিথ্যা ছিল। তখন আমার এক বন্ধু তোমার নামে মিথ্যা কথা ছড়িয়েছিল। আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। বরং নিজের ভুল ঢাকতে আমিও চুপ ছিলাম।
রৌদ্রময়ীর চোখ বড় হয়ে গেল।
— তুমি জানতেই যে আমি নির্দোষ?
— হ্যাঁ। অনেক পরে সবকিছু পরিষ্কার হয়েছিল। কিন্তু তত দিনে তুমি আমার জীবন থেকে চলে গিয়েছিলে।
মূসা এবার বলল,
— এত বছর পর এই কথা বলার কারণ কী?
আরিফ কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— কিছুদিন আগে সেই বন্ধুর সঙ্গে আবার দেখা হয়েছে। সে নিজের ভুল স্বীকার করেছে। আমি ভেবেছি, রৌদ্রময়ীর কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার। এত দিন একটা মিথ্যা অপবাদ তার সঙ্গে রয়ে গেছে।
রৌদ্রময়ীর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বলল,
— তুমি জানো, ওই ঘটনার কারণে আমাকে কত অপমান সহ্য করতে হয়েছিল? আমি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারিনি। কত রাত কেঁদেছি, জানো?
আরিফ মাথা নিচু করে বলল,
— জানি না। কিন্তু আমি সত্যিই দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করে দিও।
রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
— আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম। কিন্তু আমাদের জীবনে আর ফিরে আসার চেষ্টা কোরো না। আমার একটা সংসার আছে, একজন স্বামী আছে। আমি সেই সংসার নিয়েই ভালো আছি।
আরিফ মাথা নেড়ে বলল,
— বুঝেছি। আর কখনো বিরক্ত করব না।
মূসা রৌদ্রময়ীর হাত ধরে সেখান থেকে চলে এল।
ফেরার পথে দুজনের কেউই কিছু বলছিল না। কিছুদূর যাওয়ার পর রৌদ্রময়ী নিজেই নীরবতা ভাঙল।
— মূসা, তুমি আমার ওপর রাগ করেছো?
মূসা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— রাগের চেয়ে কষ্টটাই বেশি ছিল। তবে আজ তুমি সব খুলে বলেছো, এটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
— তুমি আমাকে আগের মতোই ভালোবাসবে তো?
মূসা মৃদু হেসে বলল,
— ভালোবাসা কোনো পুরোনো হিসাবের খাতা নয় যে, ভুল হলেই সব মুছে যাবে। তবে বিশ্বাসটা আমাদের দুজনকেই যত্ন করে রাখতে হবে।
রৌদ্রময়ী মূসার হাত শক্ত করে ধরল।
— আমি আর কখনো তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাব না।
মূসা বলল,
— আমিও তোমাকে এমন পরিবেশ দিতে চাই, যেখানে সত্যি বলতে তোমার ভয় না লাগে।
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে রৌদ্রময়ী অনেক দিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো, বুকের ওপর জমে থাকা একটা ভার নেমে গেছে।
কিন্তু জীবনের সব পরীক্ষা যে শেষ হয়ে গেছে, তা নয়।
রাতের খাবারের পর মূসার ফোনে একটি কল এল। ফোনের ওপাশ থেকে তার ছোট ভাইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
— ভাইয়া, আব্বুর শরীরটা আজ আবার খুব খারাপ হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
মূসার মুখ মুহূর্তেই বদলে গেল।
— কী বলছিস! আমি এখনই আসছি।
ফোন রেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
রৌদ্রময়ী উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে?
মূসা ভারী গলায় বলল,
— আব্বু অসুস্থ। আমাদের এখনই হাসপাতালে যেতে হবে।
রৌদ্রময়ী দ্রুত ওড়না নিয়ে বলল,
— চলো। আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।
মূসা স্ত্রীর দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটির চোখে ভয় আর অশ্রু ছিল, সেই মানুষটিই এখন তার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত।
সে মনে মনে বলল, এটাই তো সংসার—শুধু সুখের সময় একসঙ্গে থাকা নয়, বিপদের সময়ও একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখা।
চলবে...

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.