দ্বিতীয় পর্ব: একটি ফোনকল, বদলে যাওয়া বিকেল
বিকেলের শেষ আলো জানালার কাচ ছুঁয়ে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে পেঁয়াজ ভাজার মিষ্টি গন্ধ। রৌদ্রময়ী রান্না শেষ করে টেবিল গোছাচ্ছিল। মূসা তখন বসার ঘরে বসে কিছু কাজ করছিল।
সকালটা বেশ সুন্দর কেটেছিল তাদের। ছাদে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে চা খাওয়া, গল্প করা—সবকিছুই যেন রৌদ্রময়ীর মনে এখনো লেগে আছে।
হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল।
রান্নাঘরের পাশের টেবিলে রাখা ফোনের স্ক্রিনে অপরিচিত একটি নম্বর ভেসে উঠল। রৌদ্রময়ী প্রথমে ফোনটা ধরতে চাইল না। কিন্তু কয়েকবার বেজে ওঠার পর সে কলটি রিসিভ করল।
— হ্যালো?
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর একটি পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
— রৌদ্রময়ী, কেমন আছো?
কণ্ঠটা শুনেই তার হাত থমকে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
— কে বলছেন?
— আমাকে চিনতে পারছো না? আমি আরিফ।
নামটা শুনে রৌদ্রময়ীর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বহু বছর আগের কিছু স্মৃতি হঠাৎ করে ফিরে এল। এমন কিছু স্মৃতি, যেগুলো সে নিজের অতীতের পাতায় বন্ধ করে রেখেছিল।
রৌদ্রময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আরিফ আবার বলল,
— কী হলো? কথা বলছো না কেন?
— আপনার নম্বর পেলেন কোথায়?
— পুরোনো পরিচিতদের কাছ থেকে। অনেক দিন পর কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
— কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই।
— এতটা বদলে গেছো?
রৌদ্রময়ী এবার একটু শক্ত গলায় বলল,
— মানুষ বদলায়। সময়ও বদলায়। আমার জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। দয়া করে আর ফোন করবেন না।
কথাটা বলেই সে কল কেটে দিল।
কিন্তু ফোনটা রেখে দেওয়ার পরও তার হাত কাঁপছিল। বুকের ভেতর অস্বস্তি জমে উঠল। সে জানত, অতীতের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবুও হঠাৎ এমন একটি ফোনকল তাকে অস্থির করে তুলেছে।
ঠিক তখনই মূসা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
— কী হয়েছে? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
রৌদ্রময়ী চমকে উঠল।
— কিছু না।
মূসা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিছু না হলে তোমার চোখ-মুখ এমন হয়ে আছে কেন?
— মাথাটা একটু ধরেছে।
মূসা কাছে এসে কপালে হাত রাখল।
— জ্বর তো নেই। তাহলে মন খারাপ?
রৌদ্রময়ী মৃদু হেসে বলল,
— তুমি সব বুঝে ফেলো কীভাবে?
— তোমার মুখটা আমার খুব চেনা। তোমার হাসির আড়ালে কষ্ট থাকলেও আমি বুঝতে পারি।
রৌদ্রময়ী আর কিছু বলল না। শুধু মাথা নিচু করে রান্নাঘরের কাজ শেষ করতে লাগল।
মূসা কিছুক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,
— আচ্ছা, আজ বাইরে থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসব? তোমার শরীর ভালো লাগছে না মনে হচ্ছে।
— না, দরকার নেই। আমি রান্না করেছি।
— তাহলে আজ আমি টেবিল সাজিয়ে দিই।
রৌদ্রময়ী একটু অবাক হয়ে তাকাল।
— তুমি আবার টেবিল সাজাবে?
— কেন? সংসার কি শুধু তোমার একার?
মূসার কথায় রৌদ্রময়ীর মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠল।
রাতের খাবার শেষে দুজন বসার ঘরে পাশাপাশি বসল। টেলিভিশনে কোনো একটি অনুষ্ঠান চলছিল, কিন্তু রৌদ্রময়ীর মন সেদিকে ছিল না। বারবার তার মনে হচ্ছিল, আরিফ আবার ফোন করবে না তো?
মূসা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আজ সারাদিন তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে।
— কেমন?
— যেন তুমি কোথাও হারিয়ে গেছো। আমার সঙ্গে আছো, অথচ মনটা অন্য কোথাও।
রৌদ্রময়ী চুপ করে রইল।
মূসা নরম স্বরে বলল,
— কোনো সমস্যা হলে আমাকে বলতে পারো। আমি তোমার স্বামী, রৌদ্রময়ী। তোমার সুখের মতো তোমার দুঃখেরও অংশীদার হতে চাই।
কথাটা শুনে রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে কি মূসাকে সব বলবে? নাকি বিষয়টা ছোট ভেবে চেপে যাবে?
শেষ পর্যন্ত সে বলল,
— আজ একটা ফোন এসেছিল।
মূসা স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করল,
— কার ফোন?
— একজন পুরোনো পরিচিতের।
— পরিচিত বলতে?
রৌদ্রময়ী একটু থেমে বলল,
— আমার বিয়ের আগের পরিচিত। অনেক দিন আগে আমাদের কথা হতো। আজ হঠাৎ ফোন করেছিল।
মূসা কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল।
— তুমি কি তার সঙ্গে কথা বলতে চাও?
— না। আমি তাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছি, যেন আর ফোন না করে।
— তাহলে এত চিন্তা করছো কেন?
রৌদ্রময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— জানি না। অতীতের কিছু বিষয় হঠাৎ সামনে চলে এলে অস্বস্তি লাগে।
মূসা তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
— অতীত তো অতীতই। মানুষকে তার বর্তমান দিয়ে বিচার করতে হয়। তুমি যদি কোনো ভুল করে থাকো, সেটা নিয়ে তোমাকে সারাজীবন অপরাধবোধে থাকতে হবে না।
রৌদ্রময়ী মূসার দিকে তাকাল।
— তুমি রাগ করোনি?
— রাগ করার কী আছে? কেউ তোমাকে ফোন করলেই তো তুমি দায়ী হয়ে যাও না।
রৌদ্রময়ীর চোখে পানি জমে উঠল।
— তুমি এত সহজভাবে সবকিছু নিতে পারো কীভাবে?
মূসা মৃদু হেসে বলল,
— কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। আর বিশ্বাস ছাড়া ভালোবাসা বেশিদিন টেকে না।
সেদিন রাতে মূসার কথাগুলো রৌদ্রময়ীর মনকে কিছুটা শান্ত করেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো বিষয়টা এখানেই শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু রাত গভীর হওয়ার পর আবার তার ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল।
একটি বার্তা এসেছে।
“তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা বলা দরকার। একবার দেখা করো।”
বার্তাটি পড়ে রৌদ্রময়ীর বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।
সে ফোনটা বন্ধ করে রাখল। পাশে তাকিয়ে দেখল, মূসা ঘুমিয়ে পড়েছে।
রৌদ্রময়ী ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। মূসার মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
— তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না, মূসা। আমার অতীতের কোনো ছায়া যেন আমাদের সুন্দর সংসারটাকে নষ্ট করতে না পারে।
কিন্তু সে জানত না, এই একটি ফোনকলই তাদের জীবনে এমন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিতে যাচ্ছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাদের ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হবে।
চলবে...

Comments (0)
No comments yet. Be the first to comment.